কোথায় নিরাপদ আমরা?

শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯

কুমিল্লার আদালতে একটি হত্যা মামলায় হাজিরা দিতে এসে এক আসামির এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাতে একই মামলার অপর আসামি নৃশংসভাবে খুন হয়েছেন। এ ঘটনায় আদালতের নিরাপত্তা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে উদ্বেগ দেখা গেছে।

সম্প্রতি কুমিল্লার অতিরিক্ত তৃতীয় দায়রা জজের উপস্থিতিতে এজলাসেই এক আসামি আরেক আসামিকে ছুরি নিয়ে ধাওয়া করে বিচারকের খাস কামরায় ঢুকে ওই হত্যাকাণ্ড ঘটায়। এতে বিচারক ও আইনজীবীসহ উপস্থিতরা নিরাপত্তাহীন ও আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়েন। অবশ্য বিচারক নিরাপদে সরে যেতে সক্ষম হন এবং হত্যাকারীকে ধরে ফেলতে সক্ষম হন পুলিশের এক উপপরিদর্শক। ছুরিকাঘাতে আহত আসামি হাসপাতালে যাওয়ার পথে মারা যান। এ ঘটনায় আসামিদের প্রহরা দেয়া এবং আদালত প্রাঙ্গণের নিরাপত্তা রক্ষায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

আদালতে এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন আইনজীবী ও আদালত সংশ্লিষ্টরা। প্রশ্ন উঠেছে, জামিনে থাকা একটি হত্যা মামলার আসামি কীভাবে তল্লাশি এড়িয়ে ছুরি নিয়ে বিচার কক্ষে প্রবেশ করলেন? নিয়মানুসারে হাজিরার সময়ে আদালতের এজলাস বা বিচার কক্ষে আসামিরা তাদের জন্য সুরক্ষিত নির্ধারিত প্রকোষ্ঠে থাকবেন এবং প্রয়োজনে প্রহরাধীন অবস্থায় কাঠগড়ায় উঠবেন। তাহলে আসামি কী করে মুক্ত অবস্থায় ছুরি নিয়ে অপর আসামিকে ধাওয়া করলেন? এমনকি ধাওয়া খাওয়া অপর আসামি আত্মরক্ষায় এজলাসের পার্শ্ববর্তী বিচারকের খাস কামরায় আশ্রয় নিলে সেখানে গিয়েও তাকে ছুরিকাঘাত করতে সক্ষম হলেন হত্যাকারী? এ ঘটনায় আসামিদের প্রহরা এবং বিচার কক্ষে প্রবেশকালে তল্লাশির দায়িত্বে কোনো গাফিলতি হয়ে থাকলে দোষীদের চিহ্নিত করে যথার্থ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

আদালতে হত্যাকাণ্ডের এমন নজির সাম্প্রতিককালে আর না থাকলেও আদালত থেকে আসামি পালানোর ঘটনা বিরল নয় মোটেই। বিগত বছরগুলোতে পুলিশের হেফাজতে আদালতে হাজির করা আসামি পালানোর বহু ঘটনা ঘটেছে। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জুবায়ের হত্যা মামলার চার আসামি দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে হাজিরা দিতে এসে জামিন বাতিলের পর কাঠগড়া থেকে পালিয়ে গেলে এ নিয়ে তুমুল সমালোচনা হয়েছিল। ২০১৬ সালের জুলাই মাসে শরীয়তপুরের মুখ্য বিচারিক হাকিম আদালত থেকে মাদক মামলার এক আসামি পালিয়ে যায়। ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে আদালতের হাজতখানা থেকে এজলাসে নেয়ার সময় হাতকড়া খুলে পালিয়ে যায় এক আসামি। একই বছরের জুলাইয়ে নেত্রকোনার আদালত প্রাঙ্গণে পুলিশের হেফাজত থেকে স্ত্রী হত্যা মামলার এক আসামি পালিয়ে যায়। প্রত্যেকটি ঘটনাতেই পুলিশের দায়িত্ব পালনে গাফিলতির অভিযোগ ওঠে এবং কিছু পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে সাময়িক ব্যবস্থাও গ্রহণ করা হয়। কিন্তু আদালত থেকে আসামি পালানো বন্ধ করা যায়নি।

এর আগে পঞ্চগড়ে কারা হেফাজতে থাকা অবস্থায় আইনজীবী পলাশ কুমার রায়ের অগ্নিদগ্ধ হয়ে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এটা হত্যা বা আত্মহত্যা যাই হোক না কেন তা অত্যন্ত দুঃখজনক। কারণ কারাগার সবচেয়ে নিরাপদ জায়গা হিসেবে বিবেচিত হওয়ার কথা। অথচ সেখানে কেরোসিন বা পেট্রোল কীভাবে যেতে পারে, তা তদন্তে বেরিয়ে আসা উচিত।

বিচারপ্রার্থী মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল আদালত। আদালতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটা খুবই জরুরি। একই সঙ্গে এটা মাথায় রাখতে হবে যে, যে কোনো নাগরিক তা সে যে মামলার আসামিই হোক না কেন, পুলিশের হেফাজতেই হোক কিংবা প্রহরায়, আসামির নিরাপত্তা নিশ্চিত করাটাও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিরাপত্তাহীনতা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

শেখ সালাহউদ্দিন আহমেদ
আইনজীবী ও লেখক, ঢাকা।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

তাহলে উপায় কী?

শেখ সালাহউদ্দিন আহমেদ

কোথায় নিরাপদ আমরা?

Bhorerkagoj