ধর্ষণের বিদ্যমান আইনের কঠোর প্রয়োগ

শুক্রবার, ১৯ জুলাই ২০১৯


সংসদে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ধর্ষণের বিরুদ্ধে আরো কঠোর আইন চাই। সরকারপ্রধানের এমন উপলব্ধি আমাদের একদিকে আতঙ্কিত করে, অপরদিকে আশ্বস্ত করে। আতঙ্কিত হই এই ভেবে যে, তার ভেতরেই উদ্বিগ্নতা ছেয়ে গেছে। আবার আশ্বস্ত হই এই ভেবে যে, স্বয়ং সরকারপ্রধান চাইছেন এর চূড়ান্ত প্রতিকার হোক। তিনি সত্য এড়িয়ে যাননি। অকপটে তার উদ্বিগ্নতা, আতঙ্কের কথা প্রকাশ করেছেন এবং তা সংসদে। ধর্ষণ নিয়ে কতটা উদ্বিগ্ন হলে তিনি আরো কঠোর আইন চাইতে পারেন, তা সহজেই অনুমেয়। এমনটাই হওয়ার কথা। জনগণ তাকে ক্ষমতা দিয়েছেন নিজেদের নিরাপত্তার জন্য, নিরাপদবোধ করার জন্য। তিনি তো সেই জনগণের কথাই ভাববেন। ঠিক এমন এক সময় প্রধানমন্ত্রী ধর্ষণের বিরুদ্ধে তার প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, যখন ধর্ষণ ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। ধর্ষকগোষ্ঠী বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। কোনোভাবেই কমছে না নারীর প্রতি বর্বরোচিত এই নৃশংসতা। বরং লাগামহীন হয়ে পড়েছে দিন যতই যাচ্ছে। সত্য উপলব্ধি ও ধর্ষণ প্রতিকারের অভিব্যক্তি প্রকাশের জন্য সরকারপ্রধানকে ধন্যবাদ জানাই।

সে সঙ্গে সরকারপ্রধানের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে বিনয়ের সঙ্গে বলছি, নতুন করে কঠোর আইন প্রণয়নের চাইতে বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ, উপযুক্ত শিক্ষাব্যবস্থা ও রাজনৈতিক সদিচ্ছা জরুরি আমাদের কন্যাশিশু ও নারীদের ধর্ষণের থাবা থেকে রক্ষা করার জন্য। একটু ভাবুন। আইনের অভাব নেই, যথেষ্ট আইন রয়েছে দেশে। যত আইন আছে, যদি তা সততার সঙ্গে সঠিক ও কঠোরভাবে প্রয়োগ করা হয়, তাহলে অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। অর্থাৎ বিচারহীনতার সংস্কৃতির চর্চা যদি কোথাও সৃষ্টি না হয়, বিচারব্যবস্থাকে যদি সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখা যায় তাহলে আইনের প্রতি অপরাধীর ভীতি কাজ করবে। অন্যথায় না। সাধারণত দেখা যায় যে, অপরাধীদের একটা বড় অংশ রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় পার পেয়ে যাচ্ছে। এই পার পাওয়ার সংস্কৃতি আরো একজন অপরাধীর জন্ম দিচ্ছে খুব সহজে, অবলীলায়। সেই সূত্রে যিনি ধর্ষণ করছেন তিনিই কেবল এই ঘৃণ্য অপরাধের জন্য এককভাবে দায়ী থাকছেন না। বরং যার বা যাদের কারণে ‘পার পেয়ে’ যাচ্ছেন একজন ধর্ষক, তিনি এবং তারাই বড় অপরাধী বা বড় ধর্ষক। তারাই ধর্ষকের প্রতিপালক। এই দৃষ্টিকোণে দাবি করতে পারি যে, রাজনৈতিক ক্ষমতাকে যেন কোনো রাজনৈতিক নেতা বা কর্মী ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধ লালনপালনের জন্য অপব্যবহার করতে না পারে সেই কঠোর শাসন উচ্চারিত হওয়া জরুরি দলের কেন্দ্র থেকে। এবং আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি যে, সেটা সরকারপ্রধানের কাছ থেকে হতে পারে। আশা করতে পারি যে, সরকারপ্রধান তার দল থেকে ‘পার পাওয়া’ সংস্কৃতি চর্চার মূলোৎপাটন করে কঠিন শাসনে তৃণমূল থেকে কেন্দ্র পর্যন্ত সবাইকেই নৈতিক অবস্থানে নিয়ে আসবেন।

বিশেষ করে দুর্নীতি ও ধর্ষণের মতো ঘৃণ্য অপরাধ দমনে। আবার স্থানীয় প্রশাসন কিংবা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সদস্যদের একটা অংশ অপরাধের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যায় ব্যক্তিস্বার্থে। যা পেশাগত আদর্শের পরিপন্থী। সংবেদনশীল একটা গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় অবস্থান করে অপরাধের সঙ্গে এই একাত্ম হয়ে থাকা কতটা হুমকিস্বরূপ, জনগণের নিরাপত্তা লঙ্ঘনের অন্যতম একটা উপায় হয়ে দাঁড়িয়ে যায় তা যেন দেখার, বুঝার আর কেউ থাকে না। আর সেই কারণে সম্ভবত নিরাপত্তা দেয়ার ব্যর্থতার দায় আর কারোর থাকছে না, থাকে না। জনগণের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য রাষ্ট্রের যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করছে, রাষ্ট্রের উচিত জনগণের কাছে সেসব প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। স্বচ্ছতা আর জবাবদিহিতার কোনো বিকল্প নেই, এটা অনুধাবন করতে হবে।

শুধু কি আইনই যথেষ্ট ধর্ষণের হাত থেকে কন্যাশিশু ও নারীদের রক্ষা করার জন্য? বোধহয় না। উপযুক্ত শিক্ষাব্যবস্থাও জরুরি। বিচারব্যবস্থা অপরাধীর ভেতর ভীতি সঞ্চার করবে। কিন্তু সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য প্রয়োজন উন্নত শিক্ষা ও পরিবেশ। কী শেখানো হয় বা হচ্ছে যদি তা দেখি, তাহলে পরিষ্কার যে চিত্র চোখের সামনে ভেসে উঠবে, তা হলো জিপিএ ফাইভের ছড়াছড়ি এবং একাডেমিক পরীক্ষা পাসের সনদপ্রাপ্তি। পরীক্ষায় একটা ভালো ফল চাই, তাই শিক্ষক খুলে বসেন কোচিং সেন্টার। আর অভিভাবক ছোটেন সেই কোচিং সেন্টারে। মরিয়া হয়ে কোচিং সেন্টার থেকে সংগ্রহ করেন নোট। তোতা পাখির মতো সেসব মুখস্থ করে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছে শিক্ষার্থী। জিপিএ ফাইভও পেয়ে যাচ্ছে। তাতে অভিভাবকের বুক গর্বে ভরে উঠছে। আবার পাঠ্যপুস্তকে যেসব বিষয়বস্তু স্থান পাচ্ছে, তাও বা কতটা নৈতিক মূল্যবোধ তৈরি করতে সহায়ক হয়, দেশের কৃষ্টি ও সংস্কৃতির পরিচয় বহন করে, ভেবে দেখেছি কি কেউ? এমন কোনো বিষয়বস্তু নেই যে, যা পাঠ করে ব্যবহারিক অর্থে একজন শিক্ষার্থী আদর্শবান হয়ে উঠবে, ওঠার কথা ভাববে। উৎসাহবোধ করবে। অনৈতিক আচরণে অভ্যস্ত হতে বিরত থাকবে, নিরুৎসাহিত বোধ করবে। ভালোর প্রতি উদ্দীপিত, উজ্জীবিত করে এমন বিষয়বস্তু থাকাটা বাঞ্ছনীয়। এমন কোনো অযোগ্য, অদক্ষ ব্যক্তি বা গোষ্ঠী দিয়ে পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তু, ধাপ ও পদ্ধতি নির্ধারণ করা ঠিক নয় যে, যাতে কিনা পাঠ্যক্রমের কারণেই নেতিবাচক ফল দাঁড়িয়ে যায়, মূল্যবোধ গঠনে সংশয় তৈরি হয়।

জগাখিচুরির মতো একটা কিছু হয়ে থাকা শিক্ষাব্যবস্থার শুদ্ধতা জরুরি। নারীর প্রতি অবহেলা বা অসম্মানজনক মনোভাব তৈরি হতে পারে, এমন কোনো বিষয়বস্তু যেন স্থান না পায় খেয়াল রাখতে হবে। বরং নারীর প্রতি যাতে সম্মানজনক একটা বোধ জাগ্রত হয়। ধর্মীয় কুসংস্কার কিংবা উগ্রবাদ যেন কোনোভাবেই শিক্ষার্থীকে মানবিক গুণাবলি থেকে বিচ্ছিন্ন করে না দেয়, সেই কারণে ধর্মীয় বিষয়বস্তু নির্ধারণে কড়া দৃষ্টি ও নিয়ন্ত্রণ থাকা দরকার। আমার জানা নেই যে, কোনো পাঠ্যপুস্তকে এমন কিছু বিষয় স্থান পেয়েছে কিনা যাতে নারীর প্রতি পুরুষের শ্রদ্ধার জায়গা তৈরি হওয়ার সুযোগ আছে। ব্যক্তির মনোভাব ইতিবাচক কি নেতিবাচক হবে, সেটা কিন্তু নির্ধারণ করে সে কী শিখছে, তার ওপর। নৈতিক মূল্যবোধ সবচাইতে বড় অস্ত্র, যা ব্যক্তিকে অপরাধ থেকে বিরত রাখে। সভ্য জগতে যার চাহিদা সবচাইতে বেশি। আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক কর্তৃক নারী শিক্ষার্থীর ধর্ষণের শিকারের বিষয়টি একটি স্বাধীন দেশকে পরাধীনতার শেকল পরিয়ে দেয়ার মতোই দেখায়। কতটা নৈতিক বিপর্যয় হলে একজন শিক্ষক, তার শিক্ষার্থীকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্ষণ করতে পারেন! ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নারী শিক্ষার্থীর শ্লীলতাহানির ঘটনা ঘটছে। সামাজিক মাধ্যমেও দেখা যায় যে, নারীর প্রতি অবমাননাকর অনেক বক্তব্য ও উদ্ধৃতি ধর্মীয় লেবাসে দিচ্ছেন কথিত মাওলানা, আলেম এবং তা প্রকাশ্যে।

পরিশেষে সরকারপ্রধানের কাছে বিনীত অনুরোধ থাকবে, আইন ও বিচারব্যবস্থাকে নিজস্ব বিধি মোতাবেক, অরাজনৈতিকভাবে এবং সর্বোপরি সংবিধানসম্মত প্রক্রিয়ায় পরিচালিত হওয়ার পথকে নিশ্চিত করার কঠোর উদ্যোগ গ্রহণ করা। শিক্ষাব্যবস্থাকে জনগণের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার উপযোগিতায় ঢেলে সাজানো। রাষ্ট্রের সব সেবা ও নিরাপত্তামূলক প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। যেন আমরা বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতে দেশটাকে ধর্ষণ ও দুর্নীতমুক্ত ঘোষণা দিতে পারি। আমরা আশাবাদী হতে চাই! আশ^স্ত হতে চাই! হতে চাই নিরাপদ।

স্বপ্না রেজা : কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

তাহলে উপায় কী?

শেখ সালাহউদ্দিন আহমেদ

কোথায় নিরাপদ আমরা?

Bhorerkagoj