দুর্নীতিরোধে মানবীয় গুণাবলি

বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই ২০১৯

সুনীতি ও দুর্নীতি দুটোই মানুষের মধ্যে রয়েছে। দুর্নীতি যখন মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তখনই মানুষ পরিণত হয় অমানুষে। আর দুর্নীতিগ্রস্ত মানুষের সমাজ হয়ে যায় বসবাসের অযোগ্য।

কপট, হিংসুক, দাসভাবাপন্ন, কাপুরুষ, যারা কেবল জড়ে বিশ্বাসী, তারা কখনো কিছু করতে পারে না। ঈর্ষাই আমাদের দাসসুলভ জাতীয় চরিত্রের কলঙ্কস্বরূপ। ঈর্ষা থাকলে সর্বশক্তিমান ভগবানও কিছু করে উঠতে পারেন না। সর্বপ্রকার বিস্তারই জীবন, সর্বপ্রকার সঙ্কীর্ণতাই মৃত্যু। যেখানে প্রেম, সেখানেই বিস্তার; যেখানে স্বার্থপরতা, সেখানেই সঙ্কোচ। অতএব প্রেমই জীবনের একমাত্র বিধান। যিনি প্রেমিক তিনিই জীবিত; যিনি স্বার্থপর তিনি মরণোন্মুখ। অতএব ভালোবাসার জন্য ভালোবাস, কারণ প্রেমই জীবনের একমাত্র নীতি।

বর্তমানে আমরা দুঃখের সঙ্গে উপলব্ধি করছি যে, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রকে ঘিরে একটি অস্থির, অশুভ অমানবিক অবস্থা বিরাজ করছে। কালো টাকা আর রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নে রাষ্ট্র আজ হুমকির মুখে। ‘রাষ্ট্র ব্যক্তিকে গিলে খাচ্ছে’, দার্শনিক টমাস হবস অবশ্য সপ্তদশ শতকের মধ্যভাগেই রাষ্ট্রের ওই প্রবণতা আঁচ করেছিলেন এবং একে তুলনা করেছিলেন এক বিশাল তিমি লেভিয়াথানের (খবারধঃযধহ) সঙ্গে, যার পেটের মধ্যে আমরা।

দুর্নীতি হয় তখন, যখন স্বচ্ছতা থাকে না, জবাবদিহিতা থাকে না। বাংলাদেশের উন্নতির পথে দুর্নীতি এখন প্রধান অন্তরায়। এমন কোনো সরকারি অফিস নেই, যেখানে অবৈধ অর্থের লেনদেন হয় না, টাকা ছাড়া ফাইল নড়ে না- এ যেমন এক অমোঘ সত্য, তেমনি সত্য মন্ত্রী-এমপি থেকে শুরু করে সরকারি কর্মকর্তাদের এক বিরাট অংশ দুর্নীতিগ্রস্ত হওয়ার ব্যাপারটি। সামান্য বেতনে চাকরি করে রাতারাতি বিরাট বিল্ডিং আর ব্যাংক ব্যালেন্সের মালিক হয়ে গেছেন- এমন সরকারি কর্মকর্তার নজির হাজারো।

টিআইর ‘গ্লোবাল করাপশন ব্যারোমিটার ২০০৫’ নামে পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বিশ্বের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত সংস্থা হচ্ছে রাজনৈতিক দল, এরপরে রয়েছে পার্লামেন্ট, পুলিশ, বিচার ও আইন ব্যবস্থা। দুর্নীতি আমাদের সময়ের সবচেয়ে বড় সমস্যা। এ থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন নেতৃত্ব, ইচ্ছাশক্তি এবং সুদূরপ্রসারী প্রভাব।

দুর্নীতি সমাজ, সভ্যতার শক্র। দুর্নীতি মানবতা, মনুষ্যত্ববোধকে পিষ্ট করে। দুর্নীতি সমাজজীবনের অগ্রগতির পথকে রুদ্ধ করে দেয়। যে জাতি দুর্নীতিগ্রস্ত সে জাতি কখনোই সামগ্রিকভাবে ধনে, জ্ঞানে, মানে, সম্মানে বড় হতে পারে না। দুর্নীতির ফলে সত্য, সুন্দর, নিয়মের রাজত্ব ধ্বংস হয়। সমাজ জীবনে স্থবিরতা নেমে আসে। দুর্নীতি জীবনকে কলুষিত করে, সত্যকে আড়াল করে, জ্ঞানকে রুদ্ধ করে, উন্নয়নের গতিকে মন্থর করে দেয়।

বন্ধন আর মুক্তি। বাসনা, অজ্ঞান ও ভেদদৃষ্টি- এই তিনটি বন্ধন। জীবনে অনাসক্তি, জ্ঞান ও সমদর্শিতা- এই তিনটি মুক্তি। মুক্তিই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের লক্ষ্য। যে বলে আমি মুক্ত, সেই মুক্ত হবে। যে বলে আমি বদ্ধ, সে বদ্ধ হবে। সমাজের জন্য যখন সব নিজের সুখেচ্ছা বলি দিতে পারবে, তখন তো তুমিই বুদ্ধ হবে, তুমিই মুক্ত হবে, সে ঢের দূর! পবিত্র কুরআনে বর্ণিত হয়েছে, তোমরাই শ্রেষ্ঠ জাতি, মানবজাতির কল্যাণের জন্যই তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। তোমরা সৎকাজের আদেশ করবে এবং অসৎ কাজ থেকে মানুষদের বিরত রাখবে। কুরআনের এ মর্মবাণী অনুধাবন করে দুর্নীতিমুক্ত, সুখী, সমৃদ্ধ ও শান্তিকামী সমাজব্যবস্থা বিনির্মাণে তৎপর হই।

সতীর্থ রহমান

সহকারী শিক্ষক, নুনসাহার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দিনাজপুর।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj