খাদ্য উৎপাদনের প্রথম থেকে ভেজাল

বুধবার, ১৭ জুলাই ২০১৯

খাদ্যে ভেজালের বিষয়টি সবচেয়ে বেশি আলোচিত বর্তমান সময়ে। আমরা আহারের জন্য যে খাবার খাই সে খাবারের অধিকাংশই দূষিত কোনো না কোনোভাবে। ফলে আমাদের খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় ধরনের একটি প্রশ্নবোধক চিহ্ন রয়ে যাচ্ছে বরাবরই। খাদ্য দূষণ শুরু হয় একেবারে বীজতলা থেকেই। তারপরও কিছু কিছু খাদ্য যেমন ব্রয়লার মুরগির মাংস, ডিম এবং পালিত মাছে ভারী ধাতুর বৃদ্ধি আরো বেশি সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। শিল্পাঞ্চলগুলোর খাল, নদী প্রচুর পরিমাণে দূষিত। বপন করার সঙ্গে সঙ্গে ফসলে ঢুকছে ক্ষতিকর সব কিছু এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভয়াবহ আকারে ঢুকছে এন্টিবায়োটিকও। কারণ খাল ও নদীতে সরাসরি ফেলা হয় হাসপাতলের বর্জ্য ও ওষুধ।

সার ও কীটনাশকের ব্যবহারে খাদ্য দূষণকে এখনো সেরকমভাবে আমলে নেয়া হচ্ছে না। অথচ অপরিকল্পিত ও অনিয়মিত কীটনাশক অধিকাংশ ফসলে ঢুকে তা বিষ হিসেবেই থেকে যাচ্ছে। মাটিও দূষণ করছে এবং তা আবার ফসলে ঢুকছে। এর সঙ্গে তো খাদ্যে প্রিজারভেটিভ হিসেবে কেমিক্যালের ব্যবহার, খাবার স্বাদ তৈরির জন্য বিভিন্ন অরগানের ব্যবহার আছেই।

খাদ্যে ভেজাল দূর করার জন্য সুদূরপ্রসারী কাজ হাতে নিতে হবে। পুরো খাদ্য চক্রের লাইফ সাইকেল প্রসপেকটিভ জেনে তাতে কি কি ধরনের উপাদান যোগ হচ্ছে এবং তাতে খাবারের কি কি গুণাগুণ পরিবর্তন হচ্ছে এগুলো সব গবেষণার বিষয়বস্তুতে আনতে হবে। নইলে খাদ্যের ভেজাল বা দূষণ রোধ করা সম্ভব হবে না।

দুধে এন্টিবায়োটিক পাওয়া নিয়ে কয়েকদিন ধরে চলছে তর্ক-বিতর্ক। দ্বিতীয়বারের রিপোর্টেও পাওয়া গেছে এন্টিবায়োটিকের উপস্থিতি। আসলে প্রতিটি খাবারের উৎসই আজ ধ্বংসের পথে। তৈরির পদ্ধতি ও কাঁচামালের মধ্যেও রয়েছে বিভিন্ন উপাদানের ব্যাপ্তি। খাদ্যকে ভেজালমুক্তকরণের সিদ্ধান্ত নেয়ার আগেই কাজে হাত দিতে হবে সামগ্রিক দূষণ বন্ধে।

মাটি, পানি ও বাতাস দূষণ বন্ধ না করে খাদ্য ভেজালমুক্ত পাওয়া কঠিনই। হাসপাতালের বর্জ্য যে খালে ফেলা হয় সে খালের পানিতে কোনো ধান চাষ হলে তাতে এন্টিবায়োটিকের উপস্থিতি থাকবে। হাসপাতালের ইটিপি ব্যবস্থা নেই। সরাসরি রোগীর কফ, থুতু, মল মিশে যাচ্ছে খাল ও নদীর পানিতে। তার মানে দাঁড়াচ্ছে খাদ্যে ভেজালের সঙ্গে ও বিষাক্ততার সঙ্গে দূষণেরও বড় সম্পর্ক রয়েছে। এখন আমরা একটি পর্যায় থেকে খাদ্যে দূষণমুক্ত করতে পারলেও আসলে ব্যাপ্তি থেকে তা মুক্ত হবে না। গবাদিপশুর খাবার, ফসলে ব্যবহৃত সার বিষ, পানি, প্রাকৃতিক অবস্থা সব কিছু মিলে খাদ্যে দূষণের ব্যাপ্তি।

খাদ্যে দূষণ বন্ধে এখন প্রয়োজন সামগ্রিক চিন্তা। পরিবেশ দূষণ বন্ধ করতে হবে। এর সঙ্গে ভেজালবিরোধী অভিযান দ্রুতগতির করতে হবে। প্রতি উপজেলাভিত্তিক খাবার পরীক্ষার জন্য ল্যাবরেটরিও করা প্রয়োজন বলে মনে করি। কৃষি ও খাদ্য গবেষণা কাছাকাছি জায়গায় নিয়ে আসতে হবে। একটির সঙ্গে আরেকটিকে এমনভাবে সমান্তরাল করতে হবে যাতে বীজতলা থেকে একেবারে ভক্ষণ পর্যন্ত কোনো জায়গায় দূষিত বস্তু খাবারে না ঢুকতে পারে। খাদ্য নিয়ে যারা গবেষণা করছেন তাদের অর্থ দিয়ে সরকার সহায়তা করবে এটাও প্রত্যাশা করি।

মনে রাখতে হবে খাদ্য হলো কর্মদক্ষতার নিয়ামক, সুস্থ জাতির প্রথম শর্ত। খাদ্যের ব্যাপারে সতর্ক হতে হলে সমগ্র পরিবেশ নিয়েই ভাবার যে বিষয়টি এটা সরকারের সংশ্লিষ্ট মহল হয়েই আসতে হবে। আশা করি সামগ্রিক দূষণ বন্ধে নতুন কর্মপরিকল্পনা আসবে সামনের দিনগুলোতে আর তবেই খাদ্যকে আমরা দূষণমুক্ত হিসেবে দেখতে পাব।

সাঈদ চৌধুরী
শ্রীপুর, গাজীপুর।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj