সচেতনতাই পারে দুর্নীতির অবসান ঘটাতে

মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত শনিবার তার কার্যালয়ে বার্ষিক কর্মসম্পাদন চুক্তি (এপিএ) স্বাক্ষর উপলক্ষে দেয়া এক ভাষণে বলেছেন, ‘এত পরিশ্রমের অর্জন দুর্নীতিতে নষ্ট হলে সহ্য করব না’। এ উপলক্ষে তিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বলেছেন তারা যেন তৃণমূল পর্যায়ের কর্মকর্তাদের দুর্নীতি বন্ধে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিয়ে থাকেন। প্রধানমন্ত্রী দেশের প্রশাসনের মধ্যে দুর্নীতির বিষয়ে যে নির্দেশনাটি দিয়েছেন সেটি কতটা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের নির্দেশে কার্যকর হবে সেটি অবশ্য বলা মুশকিল। কেননা আমাদের প্রশাসনের বিরুদ্ধে আগাগোড়াই যে অভিযোগটি করা হয়ে থাকে তা হলো দুর্নীতি। এটি যেন প্রশাসন থেকে বের হচ্ছেই না। অন্যভাবে বলা হয়ে থাকে যে, প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি এতটাই বাসা বেঁধে আছে যে, সেখান থেকে সবকিছুই সরে যাবে দুর্নীতি বোধহয় নয়। এমন অভিযোগটি পুরোপুরি সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নাও হতে পারে। কিন্তু প্রশাসন থেকে দুর্নীতি আপনা-আপনি যাওয়ার মতো নয়। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো প্রশাসনে টেন্ডার, প্রকল্প প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, বিল উত্তোলন ইত্যাদি নিয়ে নানা ধরনের খবর মিডিয়াতে প্রচারিত হচ্ছেই। অনেক সময় অবিশ্বাস্য দুর্নীতির খবরও প্রকাশিত হচ্ছে। এ নিয়ে আমরা প্রায়ই গণপূর্তমন্ত্রীকে তার কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে গণমাধ্যমের সম্মুখে বক্তব্য দিতে দেখি। তিনি অনেক ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিচ্ছেনও। এই সময়ে সরকার দুর্নীতির ব্যাপারে বেশ কঠোর অবস্থানে আছে- এটি দেশের প্রায় সবাই কমবেশি জানেন। প্রশাসনের লোকজন তো বেশি জানার কথা। কিন্তু তারপরও দুর্নীতিকে ‘না’ বলতে প্রশাসনের ভেতরের অনেকেরই কষ্ট হচ্ছে! এটি মনে হয় তাদের দীর্ঘদিনের অতিথি- যাকে ত্যাগ করতে তাদের কষ্ট হচ্ছে।

গত জাতীয় বেতন স্কেল কার্যকর হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন যে, তিনি সরকারি চাকরিতে মোটামুটি চলার মতো বেতন নির্ধারণ করে দেয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা যেন সৎভাবে জীবনযাপন করতে পারেন। প্রধানমন্ত্রীর এই আশাবাদ খুবই সঙ্গত। কিন্তু বাস্তবে দেখা গেছে সরকারি চাকরিতে বেতন ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা বাড়ার পরও অফিস-আদালতে দুর্নীতি খুব বেশি কমেনি। ঘুষ ছাড়া অনেক অফিসেই ফাইল নড়ে না, আবার কাজও হয় না। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই ঘুষ দেন। এটি এক অর্থে অপরাধ কিন্তু ঘুষদাতাদের তো অন্য কোনো উপায়ও থাকে না। অনেক অফিসেই সিস্টেম এমনি করে রাখা হয়েছে। যদি কেউ নিয়মমতো কাজ পেতে চায় তাহলে তার জীবদ্দশায় সেই কাজ নাও হতে পারে- এমন বাস্তবতা আমাদের অনেক অফিসে এখনো দিব্যি দেখা যায়। তবে এই কথা স্বীকার করতেই হবে অনলাইন ব্যবস্থা চালু হওয়ার পর ঘুষের লেনদেন কোনো কোনো ক্ষেত্রে করার সুযোগ বন্ধ হয়ে গেছে। সে কারণেই বর্তমান সময়ে যত অফিস, আদালত যত বেশি ডিজিটালাইজড হবে ততবেশি ঘুষ দুর্নীতি লেনদেনের সুযোগ কমে যাবে। সরকার এ ক্ষেত্রে ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থাটি যতবেশি নিখুঁতভাবে করবে ততবেশি সরকার এবং সেবা প্রার্থীরা লাভবান হবে এমনটি সবাই এখন বিশ্বাস করে। সে কারণে সরকারি সব প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি রোধে ব্যাপক ডিজিটালাইজেশন ও এর পরিবীক্ষণ ব্যবস্থা যতবেশি চালু করা হবে ততবেশি দুর্নীতির সুযোগ কমে যাবে। আমাদের দেশে অফিসে ফাইল চালাচালি অভ্যাস গড়ে উঠেছে ব্রিটিশ যুগ থেকেই। পরবর্তী যুগে সেই ব্যবস্থাকে আমরা আরো বেশি লালন-পালন ও শক্তিশালী করে এতটাই বিস্মৃত করেছি যে এখন কোনো একটি অফিসে একটি আবেদনপত্র জমা দেয়া হলে সেটি কত হাত ঘুরে তবেই অনুমোদনকারী কর্তার সান্নিধ্য লাভ করে, আবার সেখান থেকে সর্বনি¤œ পর্যায়ে গমন করে সেটি এক বিশাল উপাখ্যান। এত হাত ঘুরতে হয় বলেই দুর্নীতির সুযোগ এত বেশি। ভোগান্তিও অনেক বেশি। সে কারণেই অনেকে ‘চুক্তিবদ্ধ’ হয়ে কাজটা করে নিতে বাধ্য হয়। এসব বিষয় সবারই কমবেশি জানা আছে। তারপরও অনেক অফিসই এখনো ফাইলের মায়া ত্যাগ করতে পারছে না, প্রযুক্তির মাধ্যমে দ্রুত সেবাদানে আগ্রহ প্রকাশ করছে না। কেননা তাতে বাড়তি উপার্জনের সুযোগ কমে যেতে পারে! এসব বিষয় ছাড়াও দেশে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা, কোর্ট-কাচারী, বন্দর ইত্যাদি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি কতটা গ্রাস করে আছে সেটি সবারই জানা আছে। বিশেষত চাকরি নিয়োগের ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন থেকেই ‘নিয়োগ বাণিজ্যের’ অভিযোগ শোনা যাচ্ছে। এমনকি বিভিন্ন নিয়োগ পরীক্ষাতেও অর্থের বিনিময়ে অনেকেই প্রক্সি পরীক্ষা দিচ্ছে। এমনকি শিক্ষাব্যবস্থাতেও নানা ধরনের পরীক্ষায় চলে কমবেশি আর্থিক লেনদেন। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ নম্বর দেয়ার বিষয়টি এখন মহামারী আকার ধারণ করছে। নানা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে অনেকেই দুর্নীতির আশ্রয় নিচ্ছেন। সমাজের এমন কোথাও খুব বড় আকারের গর্ব করার স্থান খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, যেখানে মানুষ দুর্নীতি ও নানা ধরনের অনিয়ম থেকে মুক্তভাবে কাজকর্ম করতে পারছে। সব জায়গাতেই এক ধরনের স্বার্থ উদ্ধারের মানসিকতা বিরাজ করছে। বিষয়টি সমাজের গভীরে প্রোথিত বিষয়। গ্রামে জায়গা জমি, বাড়ি-ঘর, গাছপালা ইত্যাদি বিষয় নিয়ে দ্ব›দ্ব ও বিরোধ মানুষে মানুষে বেড়ে উঠেছে তা থেকে মুক্তির কোনো সম্ভাবনা এখনো কেউ দেখছে না। সুতরাং সেখানে যারা বসবাস করছেন তাদের মধ্যেও নানা বিষয়ে রয়েছে নিয়মবহির্ভূতভাবে কিছু পাওয়া ও চাওয়ার মানসিকতা। এই মানসিকতা থেকে মুক্ত হওয়া খুব সহজ ব্যাপার নয়। অনেকেই দাবি করে থাকেন তাদের বেশি কিছু চাওয়া পাওয়ার নেই। কেউ কেউ হয়তো এই নিয়ম ও আদর্শ চর্চা করার চেষ্টা করে থাকেন। অবৈধভাবে কিছু পাওয়া বা নেয়ার চিন্তা থেকে বিরত থাকার চেষ্টা করেন। কিন্তু এই সংখ্যাটি খুবই কম। বাস্তবে দেখা যায় অনেকেই স্ববিরোধিতায় ভোগেন। মুখে হয়তো বলেন কিন্তু স্বার্থের ঊর্ধ্বে খুব বেশি উঠতে পারেন না। কোথাও না কোথাও তিনি দুর্বলতা প্রকাশ করেন। সেখানেই তার আপসকামিতার পরিচয় পাওয়া যায়। এমন স্ববিরোধী মানুষের সংখ্যা আমাদের সমাজে এখন আদৌ কমার কোনো পর্যায় আছে কিনা- বলা মুশকিল। তবে উন্নত জীবনের অনেক কিছুই যেহেতু মানুষের নাগালের মধ্যে পৌঁছে গেছে, অর্থবিত্ত হাতে আসলেই সেটি অর্জন করা সহজ হয়ে যাচ্ছে- সে কারণে দুর্নীতির খপ্পরে পড়ার সুযোগও অনেকের মধ্যেই বেশি বেশি ঘটছে। নিজের শ্রম, মেধা ও দক্ষতায় যতটুকু উপার্জন করা যায় তাতে তুষ্ট থাকার মানসিকতাই হচ্ছে দুর্নীতি মুক্ত জীবনযাপনের ধারণা ও সাধনা। এটি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত নিরন্তর করতে পারা ব্যতীত একজন মানুষ নিজেকে সম্পূর্ণরূপে দুর্নীতি থেকে মুক্ত বলে দাবি করতে পারেন না। তবে এ কথা সত্য যদি কোনো মানুষ শিক্ষা-দীক্ষা, সৃজনশীলতা, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং দক্ষতায় নিজেকে যুক্ত রাখার চেষ্টা করেন তাহলে তার ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক চাহিদা পূরণের মতো অর্থ ও বিত্ত উপার্জন কিংবা সঞ্চয় করা কঠিন কোনো ব্যাপার নয়। প্রশ্ন হচ্ছে যখন কোনো মানুষের অর্থ ও সম্পদ সীমিত আকারে হয় তাতে সন্তুষ্ট থাকবেন কিনা?

যদি থাকতে পারেন তাহলে তার দুর্নীতির মাধ্যমে অর্থ ও বিত্ত অর্জনের প্রয়োজন পড়বে না। যখনই তিনি তার অর্থ ও বিত্তের চাহিদা সীমাহীন করে ফেলবেন তখনই তিনি সৎভাবে চলা ও অর্জনের সীমানা অতিক্রম করতে হয়তো বাধ্য হবেন। আমাদের দেশে অনেক মানুষই এ কারণেই নিজের চিত্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারছেন না, বিত্ত তাকে নতুন বৃত্তে পরিচালিত করছে। জীবনের এমন জানা-অজানা বিষয়ের সঙ্গে ব্যক্তিমানুষ কতটা সচেতন থেকে চলবেন, জীবনযাপন করবেন, দেশ ও সমাজকে সন্তুষ্ট চিত্তে সেবা দিয়ে যাবেন, সেটি মস্তবড় প্রশ্ন। আমাদের সমাজে অনেকেই পরার্থে নিজেকে কমবেশি যুক্ত করে অতীতে অবদান রেখেছেন, এখনো কেউ কেউ রাখছেন। আমরা হয়তো তাদের সবার কথা জানি না। তবে সমাজ, রাষ্ট্র, রাজনীতি, অর্থনীতি, শিক্ষা-সংস্কৃতিসহ সর্বত্র মানুষকেই নিজস্ব দক্ষতা, সৃজনশীলতা, দেশপ্রেম, ইত্যাদিতে পরিচালিত হওয়ার শিক্ষা নিয়ে চলার উদাহরণ সৃষ্টি করতে হবে। তাহলেই দুর্নীতিমুক্ত সমাজের পথে সচেতন মানুষের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পাবে। সচেতন মানুষ ব্যতীত সমাজ কখনোই দুর্নীতি, অনিয়ম, সাম্প্রদায়িকতা, উগ্র মতবাদ, হঠকারিতা, অন্যের অধিকার হরণসহ নানা ধরনের অপরাধের শিকার থেকে মুক্ত হতে পারবে না। প্রয়োজন এসব সম্পর্কে সচেতন হওয়া, জীবনকে সেভাবে পরিচালিত করা।

মমতাজউদ্দীন পাটোয়ারী : অধ্যাপক (অবসরপ্রাপ্ত), ইতিহাসবিদ ও কলাম লেখক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মোস্তফা কামাল

ওয়াজে ধর্মনাশের আওয়াজ

আবু রেজা মো. ইয়াহিয়া

মানবিক পৃথিবীর প্রত্যাশা

রায়হান আহমেদ তপাদার

অপরাধী মিয়ানমার এবং অতঃপর

মো. মামুনুর রশিদ

পুঁজিবাজার কি বাঁচবে না!

মুহম্মদ জাফর ইকবাল

শিশুদের জন্য উৎসব

Bhorerkagoj