হাওরে মানুষের আবারো কান্না

মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই ২০১৯

পল্লী জনপদের বিপর্যস্ত মানুষ মারাত্মক সংকটকাল অতিক্রম করছে। পানিতে ভাসছে ভাটির জনপদসহ দেশের নি¤œাঞ্চল। জীবনযাপনে নেমে এসেছে স্থবিরতা। তলিয়ে গেছে ফসল, গ্রামীণ রাস্তাঘাট, শিক্ষাঙ্গন, ঘরবাড়ি ও উঠোন। বেড়ে চলেছে পানির প্রবাহ। চারপাশ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় ঘর থেকে বেরুতে পারছেন না পানিবন্দি এলাকার মানুষ। এ অবস্থায় চরম সংকটকাল অতিক্রম করছে বন্যার্তরা। চতুর্দিকে পানি থাকায় নিজেরা যেমন অসহায় হয়ে পড়েছেন তেমনি গবাদিপশু নিয়ে আছেন মহাবিপদে। সবকিছু মিলিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন হাওর পাড় ও হাওরের মাঝখানে অবস্থিত অসংখ্য গ্রামের মানুষ। খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করছেন ভাটির জনপদ সুনামগঞ্জসহ দেশের বন্যাক্রান্ত লাখ লাখ মানুষ।

আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এসব বন্যা সংক্রমিত মানুষের দুঃখ-দুর্দশা যেন বুঝেও বোঝে না। অনেক বিত্তশালী সমাজপতি আছেন, যারা নিজের সুখ-শান্তি ও আরো চাই নীতিতে বিশ্বাসী। আর রাজনীতির সংস্পর্শে থাকা কিছু চাটুকার হাইব্রিড নেতাদের কথা বলাটাও ঝুঁকির ব্যাপার। বন্যায় বিপদসঙ্কুল মানুষের জন্য সরকারি বরাদ্দকৃত ত্রাণসামগ্রীর বেশিরভাগ অংশ চলে যায় ওদের পকেটে। যারা ফুলেফেঁপে হয় হৃষ্টপুষ্ট আর পীড়িত জনতা বন্যার ঘোলাটে পানিতে ভেসে বেড়ান সারাক্ষণ।

প্রাকৃতিকভাবে বিস্তীর্ণ এই জলদুর্যোগ ঠেকানোর ক্ষমতা হয়তো কারো নেই। তবে বন্যা চলাকালীন দুর্ভোগ-দুর্গতি নিরসনে সরকারি ও ব্যক্তি উদ্যোগে সহযোগিতা বানবিপন্ন মানুষকে কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। বানে ভাসা অসহায় মানুষদের নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্রে ফিরিয়ে এনে ত্রাণ তুলে দেয়ার মাধ্যমে সরকারের দুর্যোগ ও ত্রাণ ব্যবস্থাপনা সংস্থা দিতে পারে দায়িত্ববোধের পরিচয়। কিন্তু বন্যা চলাকালীন এই দায়িত্ববোধ অনেকটা স্তিমিত আকারে দেখা যায়। বন্যাক্রান্ত মানুষজন এই আপদকালীন সময়ে একটু সাহায্য-সহযোগিতার আশায় চেয়ে থাকলেও কোনো মাধ্যম থেকেই তেমন মিলে না সহযোগিতা। তবে সরকারের পক্ষ থেকে মাঝেমধ্যে যৎসামান্য ত্রাণ তৎপরতা চালালেও তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। এ ছাড়া স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের সহযোগিতা পান না বানভাসী মানুষ। ছোটখাটো সামাজিক সংগঠনের তরফ থেকে টুকটাক ত্রাণ সহযোগিতার চিত্র চোখে পড়লেও তা কেবলমাত্র ফেসবুককেন্দ্রিক বাহবা কুড়ানোর অভিলাস ব্যতীত আর কিছু নয়।

২০১৭ সালের অকাল বন্যায় হাওরপারে ফসল তলিয়ে মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনার পরবর্তী বছরে পানির দেখা পায়নি মানুষ। গত বর্ষা মৌসুমটি ছিল প্রায় পানিশূন্য। রাস্তাঘাট তলানো দূরের কথা বর্ষায় যে স্বাভাবিক পানি হওয়ার কথা ছিল তাও হয়নি। তাই পরের মৌসুমে ফসল বন্ধ্যাত্বের উদ্বেগ কাজ করছিল কৃষক পরিবারে। কারণ বর্ষায় পানি স্বল্পতা দেখা দিলে পলিহীনতায় কৃষিজমি হারায় উর্বরতা। এ ক্ষেত্রে উৎপাদন বৃদ্ধির সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে ফসলি জমি। কিন্তু এ বছর বর্ষার শুরুতেই দেখা দিয়েছে বন্যা। ঘর-বাড়িতে পানি উঠে আশ্রয়শূন্য করে তুলেছে মানুষকে।

হাওরপারের মানুষকে বন্যার জলযন্ত্রণা থেকে মুক্ত করতে যথেষ্ট পূর্ব প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন। যে অঞ্চলের মানুষ দেশের প্রধান খাদ্যশস্য ধান এবং পর্যাপ্ত আমিষের (মাছ) জোগান দিয়ে দেশকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যেতে মুখ্য ভূমিকা পালন করে চলেছে সেই অঞ্চলের মানুষ বন্যার অথৈ জলে ভেসে সাহায্যের আকুতি জানালেও তেমন সাহায্য পাচ্ছে না। সার্বিক অর্থে দেশ এগিয়ে গেলেও প্লাবিত মানুষের কষ্ট দূর করার তৎপরতায় পিছিয়ে রয়েছে রাষ্ট্রের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো। এ ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত ত্রাণের বিশেষ ব্যবস্থাসহ জলমগ্ন মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে পুনর্বাসন করার স্বচ্ছ প্রক্রিয়া গ্রহণ করে রাষ্ট্রকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে।

বিশ্বজিত রায়
জামালগঞ্জ, সুনামগঞ্জ।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj