হুমায়ূন আহমেদ ও তার শিল্পীরা

শনিবার, ১৩ জুলাই ২০১৯

প্রথম টিভি দেখেছিলেন পঁয়ষট্টি সালে। টেলিভিশন ভবনেও যাওয়া-আসা ছিল। তবে টিভি দেখতে তার ভালো লাগত না। প্রযোজক নওয়াজীশ আলী খানের সঙ্গে তার পরিচয় ছিল। একটা ভৌতিক নাটক লিখলেন। সে নাটক বাদ। ঈদ উপলক্ষে একটা নাটক লিখলেন। সেটাও অপ্রচারিত রয়ে গেল। টিভির লোক নন তিনি। তারপরও নাটকে জড়িয়ে যাচ্ছিলেন। নওয়াজীশ আলী খানের প্রযোজনায় একক নাটক ‘প্রথম প্রহর’ দিয়েই শুরু। আশির দশকের গোড়াতেই করলেন ‘এইসব দিনরাত্রি’, মোস্তফিজুর রহমানের প্রযোজনায়। নাটকের জগত উল্টে-পাল্টে দিলেন। ‘নিরস গল্প’ নামে দুটি এপিসোড নিয়ে গেলেন নওয়াজীশ আলী খানের কাছে। পরিবর্তিত নামে সেটা হয়ে গেল ‘বহুব্রীহি’। ‘এইসব দিনরাত্রি’ ও ‘বহুব্রীহি’ সিরিয়াল দুটি লেখার পর একিদন ঘুরতে গেলেন গারো পাহাড়ে। সেখানে পেলেন ‘অয়োময়’ নাটকের প্লট। এভাবেই টেলিভিশন নাটকের সর্বকালের জনপ্রিয় নাট্যকার হুমায়ূন আহমেদের নাটক জীবন শুরু। বরকতউল্লাহর প্রযোজনায় ‘কোথাও কেউ নেই’ দিয়ে দর্শকপ্রিয়তার সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছে গেলেন। এই দর্শকপ্রিয়তা অটুট ছিল বিটিভি আমল থেকে থেকে ফি ঈদে তার নাটক নিয়ে চ্যানেলগুলোর সাম্প্রতিক যুদ্ধ পর্যন্ত। এর পেছনে রয়েছে হুমায়ূন আহমেদের চরিত্র সৃষ্টির অননুকরণীয় ক্ষমতা। তার নাটকের চরিত্ররা দর্শকের মধ্যে তৈরি করেছে মোহ। পর্দা ছাড়িয়ে রাস্তায় তার চরিত্রের সমর্থনে হয়েছে মিছিল। এসব চরিত্রে অভিনয় করে অনেক অভিনয় শিল্পী খ্যাতির চূড়ায় উঠে গেছেন। অনেকে অভিনেতা-অভিনেত্রী পেয়েছেন আত্মপরিচয়।

আসাদুজ্জামান নূর

‘প্রথম প্রহর’ নাটকে দেড় মিনিটের ছোট চরিত্রে নূরের অভিনয় দারুণ মনে ধরল হুমায়ূন আহমেদের। প্রযোজক নওয়াজীশ আলী খানকে বললেন, তাকে যেন আরো বড় চরিত্র দেয়া হয়। নূরের সহজাত অভিনয় তার ভালো লেগেছে। তারপর শুরু। হুমায়ূন আহমেদের নাটকে নূর নানা ভঙ্গিতে আসতে লাগলেন। এইসব দিনরাত্রির রফিক, আয়োময়ের মীর্জা সাহেব, মাটির পিঞ্জিরার মাঝে বন্দী হইয়ারের নান্দাইলের ইউনূস, কোথাও কেউ নেই-এ বাকের ভাই ইত্যাদি। বাকের ভাই এমন একটি চরিত্র যার ফাঁসির রায়ে দেশব্যাপী প্রতিবাদ সভা হয়েছে। আগুনের পরশমণির মুক্তিযোদ্ধা নূর, শঙ্খনীল কারাগারের কলেজ পড়–য়া বেকার যুবক, চন্দ্রকথার দাম্ভিক জমিদার, হুমায়ূনের সেলুলয়েডেও আছেন নূর। তার এমন কম নাটকই আঝে যেখানে নূরের উপস্থিতি নেই।

আবুল হায়াত

হুমায়ূন আহমেদের পাঠকমাত্রই মিসির আলীর নামের সঙ্গে পরিচিত। আর মিসির আলীর কথা মনে করতেই ভেসে উঠে মিসির আলীর চরিত্রে অভিনয় করা আবুল হায়াতের কথা। হুমায়ূন আহমেদের নাটকে আবুল হায়াত এক অপরিহার্য অভিনেতা। অয়োময়ের গরিবী হাল থেকে উঠে নতুন জমিদার হোক আর অন্যান্য নাটকে বাবার চরিত্রেই হোক, হুমায়ূন আহমেদের নাটক বলতেই আবুল হায়াত আছেন।

আবুল খায়ের

এইসব দিনরাত্রিতে সুখী নীলগঞ্জ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে মাস্টারের ভূমিকায় অভিনয় করে হুমায়ূন আহমেদের নাটকে আবুল খায়েরের যাত্রা শুরু। এরপর তার অসংখ্য নাটকে অভিনয় করছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বহুব্রীহির দাদা, আজ রবিবারে বাবাসহ এ ধরনের অনেক চরিত্র।

আলী যাকের

‘বহুব্রীহি’ নাটকে পাগলাটে মামার চরিত্রে দারুণ অভিনয় করেছেন আলী যাকের। সারা বাংলার মামা হয়ে উঠেছিলেন তিনি। হুমায়ূন আহমেদের নাটকে পাগলাটে ধরনের চরিত্র হলেই ডাক পড়ত আলী যাকেরের। আজ রবিবারেও তার অভিনয় অনেকের মনে আছে।

ইনামুল হক

অয়োময় নাটকে ছোট মীর্জার ঘরের পাশে পাঙ্খা টানা মতি মিয়াকে অনেকেই হয়তো ভুলে যেতে পারেননি। এই চরিত্রটিতে অভিনয় করে যিনি দর্শকের কাছে টাইপকাস্ট হয়ে গিয়েছিলেন তিনি ড. ইনামুল হক। এমন চরিত্রে আর তাকে আমরা পাইনি।

মোজাম্মেল হক

অয়োময় নাটকের ছোট মীর্জাার লাঠিয়াল হানিফের চরিত্রের মধ্য দিয়েই ছোটপর্দায় মোজাম্মেল হকের আসন পোক্ত হয়। ছোট মীর্জার সঙ্গে কথা বলতে গেলেই হানিফের কেশে নেয়ার ভঙ্গিটি বিজ্ঞাপনেও ব্যবহার করা হয়েছিল সেই সময় খাদক নাটকের খাদক চরিত্রে অভিনয় করেও জনপ্রিয়তা পেয়েছেন তিনি। কোথাও কেউ নেই নাটকে সুবর্ণার মামা চরিত্রসহ হুমায়ূন আহমেদের নাটক মানেই ছিলেন মোজাম্মেল হক।

সুবর্ণা মুস্তাফা

হুমায়ূন আহমেদের অনেক নাটকেই কাজ করেছেন সুবর্ণা মুস্তাফা। তবে কোথাও কেউ নেই’ নাটকে মুনা চরিত্রে তার অভিনয় তাকে যতটা জনপ্রিয়তা দিয়েছে তার আর কোনো নাটক তাকে দিতে পারেনি। এই একটি চরিত্রই তাকে দর্শকের কাছে চিরস্মরণীয় করে রেখেছে।

জাহিদ হাসান

আজ রবিবারে চশমাপরা আর আহ্লাদি কণ্ঠে কথা বলা আনিসের চরিত্র, সবুজ সাথী নাটকে লাঠিধরা পাগলা মফিজের চরিত্র, শ্রাবণ মেঘের দিনে ছবিতে গাতক মতির চরিত্র, হুমায়ূন আহমেদের নাটক-সিনেমায় জাহিদ এক আবশ্যক চরিত্রে।

বিপাশা হায়াত

অয়োময় নাটকে ছোট মীর্জার শালির চরিত্রে তার অভিনয় ছিল মনে রাখার মতো। এ ছাড়া হুমায়ূন আহমেদের আরো অনেক নাটকেই অভিনয় করেছেন বিপাশা। তবে বিপাশার ক্যারিয়ারের সেরা অর্জন জাতীয় পুরস্কার তিনি পেয়েছেন ‘আগুনের পরশমণি’ ছবিতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করে।

সারা যাকের

অয়োময় নাটকে ছোট মীর্জার বড় বউ চরিত্রে অভিনয় করেছেন সারা যাকের। স্বল্পসংখ্যক টিভি নাটকে অভিনয় করা সারা যাকেরকে এই একটি চরিত্রের জন্যই শুধুমাত্র অনেক দর্শক তাকে মনে রেখেছেন। হুমায়ূন আহমেদের নাটকে অভিনয় কম করলেও তাকে ভোলার উপায় নেই।

ডলি জহুর

এইসব দিন রাত্রি নাটকে মা, ভাবি আর স্ত্রী এই তিন ভূমিকায় অভিনয় করে টিভি নাটকে অপ্রতিদ্ব›দ্বী অবস্থান তৈরি করেন ডলি জহুর। এরপর হুমায়ূন আহমেদের আরো অনেক নাটকে বাধাধরা অভিনেত্রী ছিলেন তিনি। সিনেমায় পা রাখার পর ‘আগুনের পরশমণিতে দুর্দান্ত অভিনয় করেন।

মাহফুজ আহমেদ

অভিনেতা হিসেবে তার জন্ম কোথাও কেউ নাটক দিয়ে। এরপর হুমায়ূন আহমেদের কত নাটকে অভিনয় করেছেন- মাহফুজ তার কোনো ইয়ত্তা নেই। বিশেষত হুমায়ূন আহমেদের সিনেমাগুলোতে মাহফুজ চমৎকার সব চরিত্রে অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছেন।

শাওন

হুমায়ূন আহমেদই শাওন নামের অভিনেত্রীটির ¯্রষ্টা। হুমায়ূন আহমেদের নাটক ছাড়া তাকে দেখা যাওয়া বিরল অভিজ্ঞতা। টিভি দর্শকদের কাছে। আজ রবিবারের কঙ্কা চরিত্রটিই তাকে জনপ্রিয়তা এনে দেয়। হুমায়ূন আহমেদের সিনেমাগুলোতে কেন্দ্রীয় চরিত্রে অভিনয় করে নিজের অভিনয় প্রতিভা মেলে ধরার অনন্য সুযোগ পেয়েছেন শাওন। হুমায়ূন আহমেদের সর্বোচ্চ সংখ্যক নাটকের অভিনেত্রী গর্বিত হতেই পারেন তিনি।

মমতাজউদ্দিন আহমেদ

টেলিভিশনের এই শক্তিমান অভিনেতাকে হুমায়ূন আহমেদের নাটকে দেখা গেছে। তবে শঙ্খনীল কারাগার এর বাবার চরিত্রেই দর্শক দীর্ঘদিন তাকে মনে রাখতে চাইবেন। পুরো পরিবারের ভরণপোষণের ভারে চাকরি থেকে অবসর নেয়া বাবার ভূমিকায় তার অভিনয় সত্যি মনে রাখারই মতো।

দিলারা জামান

কখনো মা, কখনো দাদি, বিভিন্ন নাটকে তার উপস্থিতি বিভিন্ন রকম। তবে অয়োময় নাটকে ছোট মীর্জাার জমিদারি দেখাশোনায় পটু অন্ধ মায়ের ভূমিকায় তার অভিনয় সব কিছুকে ছাপিয়ে গেছে। আজও দর্শক তাকে মনে রেখেছেন এই চরিত্রে অনবদ্য অভিনয়ের জন্য।

আফজাল শরীফ

হুমায়ূন আহমেদের নাটকের প্রথমদিকে নিয়মিত অভিনেতা। কাদের, মোবারক, এমন নানা ভৃত্যের চরিত্রে তার বিশ্বাসযোগ্য অভিনয় তাকে হুমায়ূন আহমেদের নাটকের জনপ্রিয় অভিনেতায় পরিণত করেছিল। এখান থেকেই কমেডিয়ান হিসেবে তার যাত্রা শুরু হয়।

শিলা আহমেদ

অভিনয় ছেড়েছেন বহুদিন। হুমায়ূন আহমেদের মেয়ে হলেও চরিত্র আর অভিনয়ের কারণেই দর্শক আজো তাকে মিস করেন। হুমায়ূন আহমেদের নাটকের বাঁধা অভিনেত্রী ছিলেন তিনি। পেয়েছেন অসম্ভব জনপ্রিয়তা। আজ রবিবার এর তিতলী কিংবা কোথাও তেউ নেইতে মিমির ছোট বোন, সবটাতেই দারুণ অভিনয় করতেন তিনি। আগুনের পরশমণিতে যেমন অভিনয় করেছেন অসাধারণ, তেমনি নিম ফুল নাটকে তার একলার অভিনয় ছিল উপভোগ করার মতো।

হুমায়ূন ফরিদী

একদিন প্রতিদিন নাটকে কঙ্কাল বেয়ে বেরানো লজিং মাস্টার, কোথাও কেউ নেই নাটকে সৎ উকিল, সবুজ সাথী নাটকে ঘোড়ায় চড়া ভিড়–ক, হুমায়ূন আহমেদের নাটক মানেই হুমায়ূন ফরিদীর স্বল্প অথচ সরব উপস্থিতি। শ্যামল ছায়া ছবিতে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে তার অভিনয় ছিল আলাদা করে ভাবার মতো।

সালেহ আহমেদ

হুমায়ূন আহমেদ যে ক’জন অভিনেতার ওপর নির্ভরশীল ছিলেন তাদের মধ্যেই একজন সালেহ আহমেদ। প্রচলিত বাবা চরিত্রের চেহারা না হলেও হুমায়ূন আহমেদ তার বাবা চরিত্রগুলো এই অভিনেতাকে দিয়েই করাতেন। শ্রাবণ মেঘের দিন ছবিতে শাওনের বাবার চরিত্রে অভিনয় তাকে অনেকদিন বাঁচিয়ে রাখবে দর্শক হদয়ে। অন্যান্য চরিত্রেও তার সাবলীল অভিনয় মনে রাখার মতো। হবলঙ্গের বাজারে এমনই একটি নাটক।

চ্যালেঞ্জার

ক্ষণজন্মা এই অভিনেতার ¯্রষ্টা হুমায়ূন আহমেদ। চ্যালেঞ্জারকে নিজের অসংখ্য নাটকে অভিনয় করিয়েছেন তিনি। তাকে একজন শক্তিমান অভিনেতা হিসেবে বিকাশের সমস্ত সুযোগ দিয়েছিলেন। বাবা কিংবা পাগলাটে ধরনের চরিত্রে অনবদ্য হয়ে উঠেছিলেন চ্যালেঞ্জার। হুমায়ূন আহমেদ আর চ্যালেঞ্জার হয়ে উঠেছিলেন সমার্থক। তার নাটক চ্যালেঞ্জার ছাড়া ভাবাই যেত না।

ডা. এজাজুল ইসলাম

শ্রাবণ মেঘের দিনের ঢুলির চরিত্রে তার অভিনয় দর্শকের মনে দাগ কেটে আছে। হুমায়ূন আহমেদ এই অভিনেতাটিকেও ভিন্ন আঙিনা থেকে এনে একের পর এ দুর্দান্ত চিরত্রে অভিনয় করিয়ে দর্শকের হৃদয়ে বসিয়ে দিয়েছেন। গত দুই তিন বছরে হুমায়ূন আহমেদ যত কাজ করেছন তার পঁচানব্বই শতাংশ নাটক-সিনেমাতেই তার অসাধারণ উপস্থিতি রয়েছে।

হুমায়ূন আহমেদের নাটকে অভিনয় যেকোন অভিনেতা-অভিনেত্রীর জন্য ছিল ভিন্ন মাত্রার এক অভিজ্ঞতা। বহু তারকার জন্ম হয়েছে তার নাটকে অভিনয় করে। তিনি হাতে ধরে তুলেছেন অনেক অভিনয় শিল্পীকেই। মাজনুন মিজান, দিহান, পুতুল, এমন অনেক শিল্পীরই তার নাটক দিয়ে উত্থান। মহিলা কমেডিয়ান শবনম পারভীন তারই নাটকের কুশলী। মনিরা মিঠুও একইভাবে দর্শকচিত্ত জয় করেছেন। আশির দশকে রহিমার মা চরিত্রের আড়ালে হারিয়ে গেছেন মাহমুদা খাতুন। লুৎফর রহমান জর্জ কোথাও কেউ নেই নাটকে মজনু চরিত্রে অভিনয় করে অমরত্ব পেয়েছেন। মুক্তি শ্রাবণ মেঘের দিন ছবিতে পেয়েছেন ক্যারিয়ারের সেরা চরিত্র। গোলাম মুস্তাফা, আফসানা মিমির মতো তারকারা যখনই হুমায়ূন আহমেদের নাটকে-সিনেমায় কাজ করেছেন তা নতুন কিছু যোগ করেছে তাদের অভিনয় জীবনে। টেলিভিশন নাটকের অপ্রতিদ্ব›দ্বী নাট্যকার-নির্মাতা হিসেবে অগণিত দর্শকনন্দিত নাটকের পাশাপাশি অসংখ্য কালজয়ী চরিত্র হুমায়ূন আহমেদ সৃষ্টি করেছেন। এসব চরিত্রের মুখে জনপ্রিয় ‘মাইরের মদ্যে ভাইটামিন আছে’, ‘সালাম ইজ নট রিকোয়ার্ড’, ‘আমি নেত্রকোনার পোলা’, ‘বেশি কথা বলা আমি পছন্দ করি না’ সংলাপগুলো এক সময় আওড়েছে জনগণ। চরিত্রগুলোও সময় পেরিয়ে দর্শকপ্রিয়তার নতুন নতুন নজির তৈরি করেছে। এইসব চরিত্রে অভিনয় করেই ইতিহাসের পাতায় চিরস্থায়ী হয়ে গেছেন অভিনেতা-অভিনেত্রীরা।

:: স্বাক্ষর শওকত

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj