সোনালি ফ্রেমের বুলবুল

শনিবার, ১৩ জুলাই ২০১৯


চলচ্চিত্রে অহংকারের এক নাম বুলবুল আহমেদ। অভিনয় ও পরিচালনা দিয়ে নিজেকে তিনি করেছেন কালজয়ী। চারবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার অর্জন করেছেন। ২০১০ সালের ১৫ জুলাই তিনি না ফেরার দেশে পাড়ি জমান। তবে রয়ে গেছে তার কাজ ও সৃষ্টি শিল্প। বুলবুল আহমেদ অভিনীত কিছু সেরা চলচ্চিত্রের খোঁজ থাকল মেলার পাঠকদের জন্য

ধীরে বহে মেঘনা (১৯৭৩)

বুলবুল আহমেদের ক্যারিয়ারকে সমৃদ্ধ করা একটি অন্যতম ছবির নাম ‘ধীরে বহে মেঘনা’। আলমগীর কবির পরিচালিত এই ছবিতে বুলবুলের নায়িকা ছিলেন ববিতা। তাদের সঙ্গে আরো ছিলেন গোলাম মুস্তাফা, আনোয়ার হোসেন, খলিল উল্লাহ খান প্রমুখ। অতিথি শিল্পী হিসেবে অভিনয় করেন সুচন্দা। এটি ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পটভূমিতে নির্মিত। ২০০২ সালে ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের দক্ষিণ এশিয়ার চলচ্চিত্র তালিকায় সেরা ১০টি চলচ্চিত্রের মধ্যে ৮ নম্বর অবস্থানে স্থান পেয়েছে ‘ধীরে বহে মেঘনা’।

সূর্য কন্যা (১৯৭৫)

‘ধীরে বহে মেঘনা’ ছবির সাফল্যের পর বুলবুল আহমেদের সঙ্গে দারুণ সখ্য গড়ে ওঠে নির্মাতা আলমগীর কবিরের। দুজনে জুটি হয়ে বেশ কিছু চলচ্চিত্র উপহার দিয়েছেন এ দেশের চলচ্চিত্রকে। সেগুলো মানে যেমন ছিল সেরা, দর্শকপ্রিয়তাও পেয়েছিল দারুণ। সে সঙ্গে এই জুটির সিনেমাগুলো বাংলাদেশি সিনেমার আর্কাইভকেও করেছে সমৃদ্ধ। তাদের জুটির দ্বিতীয় ছবিটি হলো ‘সূর্য কন্যা’। ১৯৭৫ সালে মুক্তি পাওয়া এই ছবিতে বুলবুলের নায়িকা ছিলেন জয়শ্রী কবির। তাদের সঙ্গে আরো ছিলেন রাজশ্রী বোস, সুমিতা দেবী, আহসান আলী, অজয় ব্যানার্জীর মতো নন্দিত তারকাশিল্পীরা।

সীমানা পেরিয়ে (১৯৭৭)

বুলবুল আহমেদকে অন্য এক উচ্চতায় পৌঁছে দেয়া ছবির নাম ‘সীমানা পেরিয়ে’। এটিও পরিচালনা করেন আলমগীর কবির। ১৯৭০ সালে উপক‚লীয় অঞ্চলে এক ভয়াবহ জলোচ্ছ¡াসের ঘটনাকে কেন্দ্র করে ছবিটি নির্মিত হয়েছিল। এখানে মূল চরিত্রে অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেতা হিসেবে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ঘরে তুলেছিলেন বুলবুল আহমেদ। ছবিতে তার বিপরীতে ছিলেন জয়শ্রী কবির। এ ছাড়াও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন মায়া হাজারিকা, কাফী খান, গোলাম মোস্তফা ও তনুজা। চলচ্চিত্রটি ১৯৭৭ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ অভিনেতাসহ মোট তিনটি বিভাগে পুরস্কার লাভ করেছিল। এ ছাড়াও ব্রিটিশ ফিল্ম ইনস্টিটিউটের ‘বাংলাদেশের সেরা ১০ চলচ্চিত্র’ তালিকায় স্থান পেয়েছে ‘সীমানা পেরিয়ে’।

রূপালী সৈকতে (১৯৭৯)

এই ছবিটিও বুলবুল আহমেদ, আলমগীর কবির, জয়শ্রী কবির জুটির। চমৎকার গল্পের পাশাপাশি শ্রæতিমধুর কিছু গান সিনেমাটিকে দিয়েছিল অনন্য জনপ্রিয়তা। এখানে বুলবুল-জয়শ্রী ছাড়া আরো অভিনয় করেছেন শর্মিলী আহমেদ, আনোয়ার হোসেন, নুতন, অঞ্জনা রহমান, রোজী সামাদ ও উজ্জল।

দেবদাস (১৯৮২)

অনেকেই বুলবুল আহমেদকে ‘দেবদাস’ বলে অভিহিত করে থাকেন। তার কারণ, তিনি শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের তুমুল জনপ্রিয় এই চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন ‘দেবদাস’ ছবিতে। ১৯৮২ সালে এটি মুক্তি পেয়েছিল। নির্মাণ করেছিলেন নন্দিত চলচ্চিত্রকার চাষী নজরুল ইসলাম।

এটি ছিল বাংলাদেশে প্রথম ‘দেবদাস’ উপন্যাসের চলচ্চিত্রায়ন। ছবিতে বুলবুলের বিপরীতে পারুর ভূমিকায় কবরী সারোয়ার ও চন্দ্রমুখীর ভূমিকায় আনোয়ারা অভিনয় করেন। চলচ্চিত্রটি ১৯৮২ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার কয়েকটি বিভাগে মনোনয়নের জন্য জমা দেয়া হয়। কিন্তু জুরিবোর্ড সদস্যরা চলচ্চিত্রটিকে পুনর্নির্মিত/রিমেক অভিহিত করে কোনো শাখাতেই মনোনয়ন দেয়নি। তবে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির পুরস্কারে সেরা অভিনেতাসহ দশটি বিভাগে পুরস্কার জিতে নিয়েছিল। পরিচালক হিসেবে পুরস্কার না পেলেও চাষী নজরুল ইসলাম ‘দেবদাস’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা লাভ করেন।

মহানায়ক (১৯৮৪)

বাংলাদেশি চলচ্চিত্রে মহানায়ক বলা হয় বুলবুল আহমেদকে। মূলত এই ছবিটির পর থেকেই তার উপাধি হয়েছিল মহানায়ক। আলমগীর কবির এই ছবিতে দুর্দান্ত এক অভিনেতাকে দেখিয়েছেন। বুলবুল আহমেদ এখানে তিনজন নায়িকার বিপরীতে কাজ করেছেন। তারা হলেন কাজরী, জুলিয়া ও রিনা খান। ছবিতে সুবীর নন্দীর গাওয়া ‘আমার এ দুটি চোখ পাথর তো নয়’, ‘পৃথিবীতে প্রেম বলে কিছু নেই’ গান দুটি সর্বকালের সেরা বাংলা গানের তালিকায় স্থান পেয়েছে। শেখ সাদী খানের সুর-সঙ্গীতে গানগুলোর গীত রচনা করেছেন মাসুদ করিম। এই দুটি গানে বুলবুল আহমেদকে পর্দায় দেখাটা দারুণ ব্যাপার হয়ে ধরা দিয়েছিল তৎকালীন দর্শকদের কাছে। আজো তার ব্যতিক্রম নয়। ছবিটিতে বেকার এক যুবকের ধোঁকাবাজ হয়ে ওঠা, অপরাধকে আঁকড়ে ধরার গল্প রয়েছে। জীবনের বৈরিতাতেও সেই যুবকের প্রেম ও বিরহের টানাপড়েন দর্শককে নিয়ে যায় সুন্দর এক মুগ্ধতার অনুভূতির পথে।

শুভদা (১৯৮৬)

বুলবুল আহমেদের ক্যারিয়ারকে সমৃদ্ধ করা আরো একটি ছবির নাম ‘শুভদা’। এটিও শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে নির্মাণ করেছিলেন চাষী নজরুল ইসলাম। এখানে বুলবুল আহমেদ অভিনয় করেছেন জমিদার চরিত্রে। যে জমিদারের কাছে আশ্রিতা ছিল ‘শুভদা’র মেয়ে ললনা। এখানে ‘শুভদা’ চরিত্রে আনোয়ারা ও তার স্বামী হারানোর চরিত্রে গোলাম মোস্তফা অভিনয় করেছেন। ছবিতে নায়করাজ রাজ্জাককে দেখা গেছে ললনার প্রেমিক সদানন্দের ভূমিকায়। আর ললনা চরিত্রে অভিনয় করেছেন জিনাত।

রাজলক্ষী শ্রীকান্ত (১৯৮৭)

বুলবুল আহমেদ সবসময়ই সাহিত্যধর্মী চলচ্চিত্রে নিজেকে নিয়োজিত রেখেছেন। আর শরৎচন্দ্রের সাহিত্যের প্রতি তার ছিল বিশেষ অনুরাগ। ‘দেবদাস’ চরিত্রে জনপ্রিয়তা পাওয়ার পর তিনি একই সাহিত্যিকের তুমুল জনপ্রিয় আরেকটি চরিত্র ‘শ্রীকান্ত’ হিসেবেও নিজেকে রুপালি পর্দায় নিয়ে আসেন। এই ছবিটির পরিচালনা করেছিলেন তিনি নিজেই। চিত্রনাট্য ও সংলাপ লিখেছেন বুলবুল আহমেদ, মমতাজউদ্দীন আহমদ ও জহিরুল হক। এখানে তার বিপরীতে রাজলক্ষী চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন নন্দিত অভিনেত্রী শাবানা। অন্যান্য ভূমিকায় অভিনয় করেছেন প্রবীর মিত্র, নুতন, রাজ্জাক, সৈয়দ হাসান ইমাম ও আরো অনেকে। ছবিটি ১৯৮৭ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে মুক্তি পায়। ছবিটি ১২তম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে দুটি অভিনয় (শ্রেষ্ঠ পার্শ্বচরিত্রে অভিনেতা ও শ্রেষ্ঠ শিশু শিল্পী) ও একটি সঙ্গীত (শ্রেষ্ঠ নারী কণ্ঠশিল্পী) বিভাগে মোট চারটি পুরস্কার অর্জন করে এবং বাচসাস চলচ্চিত্র পুরস্কারে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্রসহ ১১টি বিভাগে পুরস্কার লাভ করে।

দীপু নাম্বার টু (১৯৯৬)

বুলবুল আহমেদের তুমুল জনপ্রিয় চলচ্চিত্রের তালিকায় অন্যতম ‘দীপু নাম্বার টু’। শিশুতোষ এই চলচ্চিত্রে তিনি ববিতার স্বামী চরিত্রে অভিনয় করেন। মুহাম্মদ জাফর ইকবালের ১৯৮৪ সালের একই নামের কিশোর উপন্যাস অবলম্বনে সরকারি অনুদানে নির্মিত হয় চলচ্চিত্রটি। এটি পরিচালনা করেছেন মোরশেদুল ইসলাম।

এই ঘর এই সংসার (১৯৯৬)

মালেক আফসারী পরিচালিত ‘এই ঘর এই সংসার’। এটি ১৯৯৬ সালে মুক্তি পায়। এখানে সালমান শাহ ও আলীরাজের দুলাভাই চরিত্রে অভিনয় করে দর্শকদের মন ছুঁয়ে গিয়েছিলেন বুলবুল আহমেদ। তার স্ত্রীর চরিত্রে আছেন রোজী আফসারী। চমৎকার এক পারিবারিক গল্পের ছবিটি বুলবুল আহমেদ নিজেও খুব পছন্দ করতেন।

:: মেলা প্রতিবেদক

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj