কেমন হলো অঞ্জনের ‘সেলসম্যানের সংসার’

শনিবার, ১৩ জুলাই ২০১৯

হেমন্ত প্রাচ্য

‘অনেক তো গান শুনেছেন। একটু মঞ্চে আমাদের দেখুন না। হৃদয় থেকে বলছি। অনেক খরচা হচ্ছে বলেই টিকেটের দামটা একটু বেশি। কত টাকা বেকার খরচ হয়। যদি একটু কষ্ট করে টিকেট কাটেন আমাদের যাওয়াটা সার্থক হবে। আমার অনেক দিনের ইচ্ছে বা স্বপ্নটা আপনারাই সার্থক করতে পারেন। প্রথমবার, হয়তো শেষবার। আসুন না। কথা দিলাম ভালো লাগবে।’ ঢাকায় আসার আগে নিজের ফেসবুকে এভাবেই লিখেছিলেন জনপ্রিয় গায়ক, অভিনেতা অঞ্জন দত্ত। প্রথমবার ঢাকায় এসেছিলেন মঞ্চনাটক নিয়ে। রাজধানীর নাটক সরণীর (বেইলি রোড) মহিলা সমিতির নীলিমা ইব্রাহিম মিলনায়তনে গত ৯ জুলাই মঞ্চস্থ হয় অঞ্জন দত্ত অভিনীত ও নির্দেশিত নাটক ‘সেলসম্যানের সংসার’। ঢাকায় আসা প্রসঙ্গে অঞ্জন দত্ত বলেন, আমার একটা স্বপ্ন ছিল ঢাকায় গিয়ে অভিনয় করব। অনেকবার গিয়েছি গান করতে। কিন্তু অভিনয় আমার প্রথম প্রেম। সেই ২১ বছর বয়স থেকে অভিনয় করে চলেছি। এতদিন পর, শেষ বয়সে এসে অভিনয় করতে ঢাকায়। সেই ২১ বছর বয়স থেকে আজ অবধি আমি শুধু আমার বাংলার নয়, পৃথিবীর থিয়েটারকে ভালোবেসে চলেছি। আমার নাটক কলকাতায় অনেক সম্মান পেয়েছে, কিন্তু সেই ভাবে জনপ্রিয় হয়নি। কারণ আমার নাট্যচর্চার প্রথা। আমার নাটক হলো ভর্তি করে দর্শক দেখবে এটা আমার স্বপ্ন ছিল। সেই স্বপ্ন সত্যি করলো সাজ্জাদ, ফারিয়া, পরাগ দত্ত আর বাংলাদেশের দর্শক।

‘সেলসম্যানের সংসার’ নাটকটি আর্থার মিলারের ‘ডেথ অব আ সেলসম্যান’-এর অবলম্বনে তৈরি। ‘ডেথ অব আ সেলসম্যান’ অবলম্বনে ‘সেলসম্যানের সংসার’ তৈরি করেছেন অঞ্জন দত্ত নিজেই। মার্কিন নাট্যকার আর্থার মিলার ১৯৪৯ সালে রচনা করেন নাটক ‘ডেথ অব আ সেলসম্যান।’ বহু পুরস্কারে ভূষিত এই নাটকের মূল উপজীব্য উইলি লোমান নামের একজন সেলসম্যানের জীবনের বিয়োগান্তক পরিণতি। উইলি মনে করে, অর্থনৈতিক সফলতাই জীবনের সর্বক্ষেত্রে সফলতার একমাত্র মানদণ্ড। ফলে সেই সাফল্য অর্জনের জন্য সে মরিয়া হয়ে ওঠে। তার প্রাণপণ চেষ্টার প্রতিটি পদক্ষেপই অবশেষে ছেয়ে যায় ব্যর্থতায়। ব্যর্থতার বোধ অন্তিমে আনে এক অনিবার্য পরাজয় ও মৃত্যু। ‘সেলসম্যানের সংসার’ নাটকে অঞ্জন দত্ত অভিনয় করেছেন উইলি লোম্যান চরিত্রে।

কেউ কেউ মঞ্চে অঞ্জনের অভিনয় দেখেই যেমন মুগ্ধতা প্রকাশ করেছেন। আবার চড়া মূল্যের টিকেটে নাটকটি দেখে হতাশাও প্রকাশ করেছেন অনেকে। তবে অঞ্জন দত্তের অভিনয় দেখার জন্য মিলনায়তন ছিল কানায় কানায় পূর্ণ। চড়া মূল্যের টিকেট কেটে অনেকেই দেখেছেন ‘সেলসম্যানের সংসার’। দুই/তিন হাজার টাকা মূল্যের টিকেট দেখে কিছু ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন কেউ কেউ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, নাটক প্রাায়ই দেখি; কিন্তু একটি নাটকের টিকেট কীভাবে দুই হাজার টাকা হতে পারে? কলকাতার নন্দনে টিকেটের দাম দেড়শ রুপি রাখা হলে আন্দোলন করে সেটি বন্ধ করে দেয়া হয়েছিল। যে অঞ্জন দত্ত নিজের চিন্তায়, গানে প্রান্তিক মানুষের কথা বলেন, তার নাটকের দাম এত বেশি রাখা অনুচিত। এতে তো সাধারণ মানুষ নাটকটি দেখা থেকে বঞ্চিত হলো।

ভীষণ আগ্রহ নিয়ে মিলনায়তনে এসেছিলেন দর্শক মহসিন ইমাম। তিনি বলেন, দুই হাজার টাকা দিয়ে টিকেট কিনেছি। টিকেটের সঙ্গে অঞ্জন দত্তকে নিয়ে লেখা এক হাজার টাকা দামের একটা বই ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। আমি তো বইটা চাইনি। অনেকটা চালাকি করে আমার কাছে বইটা বিক্রি করা হলো। এটা প্রতারণা।

তবে অঞ্জন দত্তকে কাছ থেকে দেখেই ভীষণ খুশি আরেক দর্শক আজমিন চৌধুরী। তিনি বলেন, তার গান শুনে শুনে বড় হয়েছি। মঞ্চে সামনে বসে তার অভিনয় দেখা আমার জীবনের বড় প্রাপ্তি।

এদিকে আয়োজকদের অনভিজ্ঞ আচরণে শুরু থেকেই অঞ্জনের নাটকটির প্রদর্শনী নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়। শুরুতে শিশু একাডেমি মিলনায়তনে নাটকটি মঞ্চস্থ হবে জানানো হলেও হঠাৎ করেই জাতীয় নাট্যশালায় নাটকটির প্রদর্শনীর কথা শোনা যায়। পরে জানা যায়, অঞ্জনের নাটকের জন্য নাট্যশালায় কোনো বরাদ্দ দেয়া হয়নি। পরে আয়োজকরা মহিলা সমিতি মঞ্চে নাটকটির প্রদর্শনীর আয়োজন করে। আয়োজক প্রতিষ্ঠান ছাপাখানার ভূতের কর্ণধার সাজ্জাদ হুসাইন বলেন, অঞ্জন দত্তের নাটক ঢাকার মঞ্চে হবে। এটা আমাদের স্বপ্ন ছিল। সেটা করতে পেরেছি। কিছু ত্রুটি আমাদের ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আয়োজনটি হয়েছে, এটাই আনন্দের।

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj