শ্রোতাদের আনন্দ দেয়াই আমার কাজ : শ্রাবণী সেন

শনিবার, ১৩ জুলাই ২০১৯

সঙ্গীতশিল্পী শ্রাবণী সেন। পূরণ করলেন সঙ্গীতের সঙ্গে তিরিশ বছরের পথ হাঁটা। নিজের গান নিয়ে খুব কিছু বলতে চান না, কিন্তু রবীন্দ্রনাথের গান তার তিরিশ বছরের সঙ্গী। সম্প্রতি সুর আর মনের দরজা মেলে ধরেন ভারতীয় গণমাধ্যমের কাছে। তারই অংশবিশেষ মেলার পাঠকদের জন্য-

সঙ্গীত জীবনের তিরিশ বছরে এসে শ্রাবণী সেন নিজের গানের জন্য যা ভাবলেন সেখানে প্রেমই এল কেন?

শ্রাবণী সেন : হ্যাঁ, প্রেমের গান আর পিয়ানো নিয়ে এই প্রথম কাজ। রবীন্দ্রনাথের সব গান গাইতেই ভালো লাগে। তবে প্রেমের গানে মনে হয় আমাদের নিজের কথা বেশি শুনতে পাই। আর প্রেম থেকে বিরহ এবং সেখান থেকে উত্তরণ…রবীন্দ্রনাথ প্রেমের মরীচিকাকে যেভাবে আলো দেখান সে রকম মনে আর কিছু ধরে না। আজকের দিনে এই ‘আলো’, ‘উত্তরণ’, এই বিষয়গুলো মনে হয় আরো জরুরি।

কেন?

শ্রাবণী সেন : প্রেম ভাঙলেই মানুষ ডিপ্রেশনে পৌঁছে যাচ্ছে। জীবনের মানে হারাচ্ছে। কেন? জগতে আরো তো অনেক বিষয় আছে! রবীন্দ্রনাথের গানের সন্ধান পেলে, তার মানে বুঝলে আমার তো মনে হয় মানুষ উত্তরণের পথও নিজে চিনে নেবে। এতটাই শক্তি রবীন্দ্রনাথের গানে।

সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে এখন সবাই রবীন্দ্রনাথের গান গায়। রোজ চল্লিশ জনের মুখ দেয়া পোস্টার আপলোড হয় ফেসবুকের দেয়ালে। কী মনে হয়?

শ্রাবণী সেন : এভাবে হয় না, জানেন। তিরিশ বছরের অভিজ্ঞতা নিয়ে বলছি। চল্লিশ জনের যে অনুষ্ঠান তাতে দেখেছি মঞ্চে যিনি গান করেন তার বাড়ির লোকেরা আসেন। তার গান হয়ে যাওয়ার পর তারা সঙ্গে সঙ্গে উঠে যান। হল খালি হতে থাকে। এখন রোজ অনুষ্ঠান হয়। কিন্তু হলো তো পুরো ভরে না। পঁচিশে বৈশাখ থাকি না এই কারণে। এবার হায়দরাবাদে গিয়েছিলাম। সাড়ে ১০টা বেজে গেছে লোকে ছাড়তে চাইছে না। আমি শহরের বাইরে শো করতে বেশি পছন্দ করি।

সবাই রবীন্দ্রনাথের গান করেন। রোজ অনুষ্ঠান করেন। মনে হয় এতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্ষতি হচ্ছে?

শ্রাবণী সেন : রোজ মুখ দেখানো। রোজের অনুষ্ঠান শ্রোতাদেরও বিরক্তির কারণ হচ্ছে। সপ্তাহে তিনটে দিন যদি শ্রোতাকে চল্লিশ জনের রবীন্দ্রনাথের গান শুনতে হয়! ভাবুন ক্ষতিটা কোথায় হচ্ছে। তিনি তো রবীন্দ্রসঙ্গীতের ওপর বিরক্ত হবেন। অতিরিক্ত কোনো কিছুই ভালো না। আর শুধু শ্রোতা নয়। শিল্পীদের আগের মতো আর সম্মান করা হয় না।

তাহলে কী বিশ্বভারতী মিউজিক বোর্ডের কড়া বন্ধন রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্ষেত্রে প্রয়োজন ছিল?

শ্রাবণী সেন : দেখুন। কড়া বন্ধন দিয়ে শিল্পকে বাঁধা যায় না। এটা ঠিক। তবু এই পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে বলব রবীন্দ্রসঙ্গীতের মান নির্ধারক হিসেবে কোনো একটা সংগঠন থাকা উচিত ছিল। ধারাবাহিকে আমার গান ব্যবহার করা হয়। অথচ রেকর্ডিং কোম্পানি বা আমার অনুমতি নেয়া হয় না! যে গাইছে তার নাম অবধি উল্লেখ হয় না। এটা অন্যায়। অথচ এ রকম হয়েই আসছে।

শ্রাবণী সেন এমন এক শিল্পী যাকে মাচা থেকে মঞ্চ, জনপ্রিয়তার জন্য কখনো রবীন্দ্রনাথের গান ছাড়া অন্য কিছু গাইতে হয়নি।

শ্রাবণী সেন : আমার সৌভাগ্য। তবে জনপ্রিয়তা পেতে গেলে সব রকম গান গাইতে হবে এটা আমি মনে করি না। তবে উপস্থাপনাটা খুব জরুরি। ধরুন আমি যেমন দাঁড়িয়ে গাই। আমি একটা স্মার্ট উপস্থাপনার কথা বলছি। হুল্লোড়, বিয়ে বাড়ির মতো সাজ বা নাচের দরকার নেই। একজন দর্শক হয়তো বলল এই গানটা গাইতে হবে। সঙ্গে সঙ্গে ওই গানটাই গাইলাম। এটা করতেই হবে। পুরোটা না জানলেও গাইতে হবে। শ্রোতারাই আমায় শ্রাবণী সেন করেছেন। তাদের অনুরোধ রাখলে তারা খুশি হবেন। আমি খুব বাস্তববাদী। আমি জানি শ্রোতারা পছন্দের মতো গান শুনবেন বলে আমাকে পয়সা দিয়ে এনেছেন। তাদের আনন্দ দেয়াই আমার কাজ।

নতুন প্রজন্মের সঙ্গে নিয়মিত কাজ করছেন। এই প্রজন্ম রবীন্দ্রনাথের গানের বিষয়ে কি উৎসাহী?

শ্রাবণী সেন : অবশ্যই। আমার গান শেখাতে খুব ভালো লাগে। আমার পাঁচশোর বেশি ছাত্রছাত্রী। তবে এখন প্রলোভনের জায়গাটা এত বেশি না, কেউ ঠিকমতো গান শিখলই না। চ্যানেলে গাইতে চলে গেল। সুরই বসছে না। ফেসবুক লাইভ করে দিল। এগুলো বেশ গণ্ডগোলের।

পিয়ানোর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের গান। এ রকম ভাবলেন কেন?

শ্রাবণী সেন : আমার প্রিয় মানুষ ‘প্রজ্ঞা’র গোপা রায় একটা অনুষ্ঠানের অনুরোধ করেছিলেন আমায়। ইতোমধ্যে সৌমিত্র সেনগুপ্তর পিয়ানো শুনে আমি মুগ্ধ। ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক্যাল মিউজিকের মানুষ। রবীন্দ্রনাথের প্রেমের গানের সঙ্গে আঠাশে জুলাই উত্তম মঞ্চে কিছু সুর উনি তুলে আনবেন। হয়তো কোথাও মিলে যাবে রবীন্দ্রনাথ আর মোৎজার্ট। সঙ্গে সুমন্ত্র সেনগুপ্ত রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়বেন। এ রকম ভাবনা। এই অনুষ্ঠান থেকে যা টাকা পাওয়া যাবে তার একটা অংশ আমরা বৃদ্ধাবাসে দিচ্ছি। এটা আমরা ফলাও করে কোথাও জানাতে চাইনি, কিন্তু এই সাক্ষাৎকারে বললাম। আমিও এই অনুষ্ঠানে কোনো পারিশ্রমিক নিচ্ছি না।

প্রেম নিয়ে আজ কথা হলো। কিন্তু আপনি তো একা, বিয়ে করলেন না…

শ্রাবণী সেন : আসলে একা আমরা সবাই। বিয়ে করা বা না করার মধ্যে কিছু ফারাক হয় না। ফারাক শুধু মনে। যে মন স্বপ্ন দেখতে ভোলে না। যে মন জীবনের সমস্ত প্রতিক‚লতাকে উপেক্ষা করে সুরের আত্মাকে বাঁচিয়ে রাখে। আলোতে, আঁধারে, মরীচিকায়…

:: মেলা ডেস্ক

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj