ইউএসটিসির ৪ শিক্ষার্থী বহিষ্কার : তদন্ত রিপোর্ট নাকচ অধ্যাপক মাসুদ মাহমুদের

শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০১৯

চট্টগ্রাম অফিস : চট্টগ্রামে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স এন্ড টেকনোলজি চিটাগংয়ের (ইউএসটিসি) ইংরেজি বিভাগের প্রবীণ শিক্ষক মাসুদ মাহমুদকে লাঞ্ছিত ও কেরোসিন ঢেলে হত্যা প্রচেষ্টার মতো ন্যক্কারজনক ঘটনায় এক ছাত্রকে আজীবন এবং তার ৩ সহযোগীকে এক বছরের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। আপাতত এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েই ইউএসটিসি কর্তৃপক্ষ তাদের দায়িত্ব শেষ করেছে। গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে ইউএসটিসির প্রক্টর কাজী নুর-ই-আলম সিদ্দিকী জানান, তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গ্রেপ্তার হওয়া মাহমুদুল হাসানকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার করা হয়েছে। একই সঙ্গে শেখ রাসেল শাহেন শাহ, মো. মইনুল আলম এবং মোহাম্মদ আলী হোসাইন নামে অপর ৩ ছাত্রকে এক বছরের জন্য বহিষ্কার করা হলেও তাদের আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য ১৫ জুলাই পর্যন্ত সময়ও দিয়েছে ইউএসটিসি। ইউএসটিসি কর্তৃপক্ষের এ সিদ্ধান্তকে অধ্যাপক মাসুদ মাহমুদ প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন, এই তদন্ত অভিযুক্ত শিক্ষার্থীদের ‘খুশি করার’ তদন্ত। পুলিশের ভূমিকায়ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এই শিক্ষক। ইউএসটিসি কর্তৃপক্ষের ভূমিকার ক্ষোভ প্রকাশ করে অধ্যাপক মাসুদ মাহমুদ জানিয়েছেন, তিনি আর ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতায় যোগ দিচ্ছেন না।

তিনি বলেন, ‘আমি একজন শিক্ষক। পড়ানোই আমার একমাত্র কাজ। আমার কাছে সম্মান অনেক বড় বিষয়। যাদের কাছে শিক্ষকের সম্মানের গুরুত্ব নেই, তাদের প্রতিষ্ঠানে আমি যেতে পারি না। ঘটনার পর থেকে ভিসি, বোর্ড অব ট্রাস্টের চেয়ারম্যান, রেজিস্ট্রার- কেউই ঘটনার পর আমার সঙ্গে একবারও যোগাযোগ করেননি। আমাকে সামান্যতম সহানুভূতি দেখানোর সৌজন্যতাটুকুও উনারা দেখাতে পারলেন না। সেই প্রতিষ্ঠানে গিয়ে আমি আর কী করব?’ ইউএসটিসির প্রক্টর কাজী সিদ্দিকী অধ্যাপক মাসুদ মাহমুদের এই সিদ্ধান্তকে ব্যক্তিগত উল্লেখ করে এই বিষয়ে তাদের কোনো বক্তব্য নেই বলে জানিয়েছেন।

প্রসঙ্গত, গত ২ জুলাই দুপুরে ইউএসটিসির একদল শিক্ষার্থীর হাতে লাঞ্ছিত হন ইংরেজির অধ্যাপক মাসুদ মাহমুদ। ওই দিন ক্যাম্পাসের ভেতরে এই শিক্ষককে লাঞ্ছিত করে তার গায়ে কেরোসিন ঢেলে দেয়া হয়। পরে ওই শিক্ষার্থীরাই এই অধ্যাপকের পদত্যাগের দাবিতে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করে।

গতকাল বৃহস্পতিবার চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে ইউএসটিসির ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার দিলীপ কুমার বড়ুয়া বলেন, অধ্যাপক মাসুদ মাহমুদকে লাঞ্ছিত করা ও গায়ে কেরোসিন ঢালার ঘটনা তদন্তে ৫ সদস্যের একটি কমিটি করা হয় এবং কমিটির দেয়া প্রতিবেদনের ভিত্তিতে গত ৮ জুলাই শৃঙ্খলা কমিটির জরুরি সভায় ৪ জনকে চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার সিদ্ধান্ত হয়। সংবাদ সম্মেলনে ইউএসটিসির প্রক্টর কাজী নূর-ই আলম সিদ্দিকী বলেন, ‘ভবিষ্যতে কেউ এ ধরনের ঘৃণ্য কাজ করলে তা কঠোর হাতে দমন করা হবে। ইউএসটিসি কর্তৃপক্ষের বাইরে পুলিশ প্রশাসন একটি পৃথক তদন্ত কমিটি করেছে, আমরা সে প্রতিবেদনটিও বিবেচনা করব।’ শিক্ষকদের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা নিশ্চিতের ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।

ইউএসটিসির বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও পুলিশ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপকালে জানা গেছে, অধ্যাপক মাসুদ মাহমুদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূত্রপাত দুই মাস আগে। সে সময় বিশ্ববিদ্যালয়টির ইংরেজি বিভাগের একদল শিক্ষার্থী তার পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন শুরু করে। তাদের অভিযোগ ছিল, ইংরেজি সাহিত্য পড়াতে গিয়ে তিনি নারী-পুরুষের সম্পর্ক, পোশাক ও জীবনাচরণসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা করেন, যা ‘যৌন হয়রানিমূলক’। বিভিন্ন সময় ছাত্রীদের উদ্দেশ্যে করা তার মন্তব্য ‘অসম্মানজনক’ বলেও ছাত্রদের অভিযোগ ছিল। তখন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক একদল শিক্ষার্থী মাসুদ মাহমুদের পক্ষে চট্টগ্রাম নগরীতে কর্মসূচিও পালন করেছিল।

ইউএসটিসি কর্তৃপক্ষ তখন দাবি করেছিল, ক্লাসে উপস্থিতির হার কম থাকায় ২০ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নেয়ার অনুমতি না পেয়ে অধ্যাপক মাসুদের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে। বিশ্ববিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা জানান, ওই আন্দোলনের নেপথ্যে ছিল মূলত মাসুদ মাহমুদ দায়িত্ব নেয়ার পর ইংরেজি বিভাগের কয়েকজন শিক্ষকের চাকরিচ্যুতি এবং কয়েকজন শিক্ষার্থীর পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা। শিক্ষা উপমন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের অনুরোধে অধ্যাপক মাসুদকে লাঞ্ছিত করার নেপথ্যে জড়িতদের শনাক্তে পুলিশও কাজ করছে বলে এর আগে জানিয়েছিলেন চট্টগ্রামের পুলিশ কমিশনার মাহবুবুর রহমান।

এই জনপদ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj