কবি, প্রিয় কবি আল মাহমুদ : মাহফুজুর রহমান

শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০১৯

গত কয়েক মাস আগে আমার জন্মদিনে আমার সহকর্মীদের কাছ থেকে কয়েকটি বই উপহার পাই। এর মধ্যে একটি বইয়ের নাম ‘উপমহাদেশ’। জানতে চাইলে এক সহকর্মী স্ব-উৎসাহে এগিয়ে এসে বললেন, ‘আমি জানি আপনি আল মাহমুদের বই পছন্দ করেন।’ আসলেও তাই। আল মাহমুদ আমার প্রিয় কবি। শুধু আমার না, বাংলাদেশের অনেকেরই প্রিয় কবি আল মাহমুদ।

আল মাহমুদ বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত উৎসাহ জাগে আমার বন্ধু সালাহউদ্দিন আইউব এবং চট্টগ্রামের কবি মুহাম্মদ নিযামুদ্দীনের সাথে ব্যক্তিগত আলোচনার মধ্য দিয়ে। আশির দশকের প্রথম দিকে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই, তখন ঐ সব লেখকদের লেখাই বেশি পড়তাম যারা সামাজিক বিষয়াবলি নিয়ে লেখেন। এর মধ্যে অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম প্রধান। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর গদ্য আমাকে বেশ আকৃষ্ট করে। তাঁর গদ্যশৈলী সহজ-সরল এবং প্রকাশভঙ্গি চমৎকার। যোগাযোগের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখা হলে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর লেখা অনেক বেশি প্রাণচঞ্চল এবং কার্যকর। সে কারণেই হয়তো এই লেখকের লেখা সকল স্তরের পাঠকদের কাছে এত বেশি জনপ্রিয়।

আমি প্রথম দিকে মূলত গদ্যের পাঠক ছিলাম। পাঠক হিসেবে আমি সব কিছু সরাসরি বুঝতে চাই। সালাহউদ্দিন আইউবের সংস্পর্শে এসে কবি এবং কবিতা বিষয়ে প্রবল আগ্রহ তৈরি হয়। সালাহউদ্দিন আইউব ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের ছাত্র। তিনি এখন আমেরিকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। এরই মধ্যে গদ্য বিষয়ে আমার নতুন করে আগ্রহ তৈরি হয়। সে সময় যখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ক্লাস শুরু করলাম। আমাদের প্রথম দিনের প্রথম ক্লাসে বিভাগের জনপ্রিয় শিক্ষক আহাদুজ্জামান মোহাম্মদ আলী বুদ্ধদেব বসুর রচনা সমগ্র নিয়ে উপস্থিত হন। উনি যতটা না সংবাদ এবং সাংবাদিকতা নিয়ে বললেন তার চেয়ে বেশি বললেন ভাষা এবং ভাষা শেখার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে। এটি আমার জীবনের একটি অবিস্মরণীয় স্মৃতি। ক্লাস থেকে বের হয়ে সরাসরি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বুক সেন্টারে গেলাম এবং বুদ্ধদেব বসুর এই বইটি সংগ্রহ করলাম। এর কয়েকটি প্রবন্ধ পড়ে ধারণা হলো বাংলা গদ্য কত শক্তিশালী!

আমরা সে সময় ‘শিল্পতরু’ অফিসে প্রতিদিন সন্ধ্যায় আসা-যাওয়া করতাম। ‘শিল্পতরু’ আশির দশকের মাঝামাঝির একটি জনপ্রিয় লিটল ম্যাগাজিন। এটি প্রকাশ করতেন সত্তর দশকের কবি আবিদ আজাদ। এটি ছিল একটি মানসম্পন্ন লিটল ম্যাগাজিন। আমার এবং সালাহউদ্দিন আইউবের লেখা এই ম্যাগাজিনে প্রায়ই ছাপা হতো। একবার কবি আবিদ আজাদের সাথে বিদেশি কবিতার অনুবাদ নিয়ে কথা বললাম। আলোচনায় উঠে আসলো এক স্প্যানিশ কবির কবিতা নিয়ে। আমি আবিদ ভাইকে বললাম, ‘এই স্প্যানিশ কবির কবিতা (যার নাম আমি এই মুহূর্তে স্মরণ করতে পারছি না) খুবই রোমান্টিক।’ আবিদ ভাই বললেন, ‘কয়েকটা অনুবাদ করে নিয়ে আসেন।’ যথারীতি আমি পাঁচটি কবিতার অনুবাদ করলাম এবং কয়েকদিন পর সেগুলো আবিদ ভাইয়ের হাতে দিয়ে আসলাম। শিল্পতরুর পরের সংখ্যায় আবিদ ভাই সবগুলো কবিতা ছেপে দিলেন। তখন আমার মধ্যে নিজের অনুবাদ এবং লেখা নিয়ে কিছুটা আস্থা তৈরি হলো। এরপর আমার অনেক লেখা শিল্পতরুতে ছাপা হয়।

এই শিল্পতরুতে কবি-প্রাবন্ধিক আব্দুল মান্নান সৈয়দ প্রতিদিন সন্ধ্যায় আসতেন। কবি আল মাহমুদকে মাঝেমধ্যে দেখা যেত। অনেক সময় মান্নান সৈয়দ এবং আল মাহমুদ দুজনকেই আমরা একসাথে পেয়ে যেতাম। তারা দুজন যখন একসাথে থাকতেন শিল্পতরুর এ সান্ধ্যকালীন আড্ডাটা প্রবলভাবে জমে উঠতো। আমি মনে মনে নিজেকে খুব সৌভাগ্যবান মনে করতাম এই দুই কবির সান্নিধ্যে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে। কবি আব্দুল মান্নান সৈয়দের বাচনশৈলী এবং উচ্চারণ ছিল খুবই চমৎকার। আর আল মাহমুদ খুবই সরলভাবে অনেক গভীর কথা বলে যেতেন। আমরা তরুণরা ছিলাম তাদের আলোচনার মনোযোগী শ্রোতা। দুয়েকবার সাহস করে তাদের সামনে সাহিত্য আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছিলাম আমি এবং সালাহউদ্দিন আইউব। পরবর্তীতে কোনো এক নিবন্ধে কবি আল মাহমুদ আমাদের প্রশংসা করেছিলেন। আমাকে কেন কবি প্রশংসা করলেন সেটা আমি বুঝতে পারিনি। কারণ আমি নিজেকে কখনো একনিষ্ঠ সাহিত্যানুরাগী হিসেবে বিবেচনা করতে পারিনি। তবে সালাহউদ্দিন আইউব ছিলেন অসাধারণ।

সেই থেকে এই কবির সাথে বিভিন্ন সাহিত্যের অনুষ্ঠানে আমাদের দেখা হয়েছে। ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। সে সময় কোনো একদিন আমি এবং সালাহউদ্দিন আইউব কবি আল মাহমুদের শিল্পকলা একাডেমির কার্যালয়ে যাই দুপুরবেলা। আমার হাতে ছিল যোগাযোগের একটি ইংরেজি বই। কবি জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি ইংরেজি বই পড়ো?’ আমি বললাম, ‘আমি গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের ছাত্র। আমাদের যাবতীয় বই ইংরেজিতে। কাজেই আমাদের ইংরেজি এড়ানোর সুযোগ নেই। তা ছাড়া, ব্যক্তিগতভাবে ইংরেজি বিষয়ে আমার প্রবল আগ্রহ রয়েছে।’ কবি আল মাহমুদ শুনে বেশ প্রশংসা করলেন।

কবি আল মাহমুদের সাথে যখন দেখা হতো আমি অবাক বিস্ময়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকতাম। একটা ছোটখাটো মানুষ কীভাবে এত মেধাবী হয়। তখন আমি শুনেছিলাম কবি আল মাহমুদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা খুবই সামান্য। আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামেরও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না বললেই চলে। আমি শুধু অবাক হতাম এসব ভেবে একটা মানুষ যিনি নিজে কোনো তথাকথিত বড় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষা গ্রহণের জন্য যাননি সেসব প্রতিষ্ঠানই তাদের নিয়ে গবেষণা করছে, আলোচনা করছে। এটি আমার মতো একজন নিরীহ মানুষের সাধারণ ভাবনা।

আশির দশকের শেষের দিকে ‘আমার ছেলেবেলা’ নামে আল মাহমুদের একটি বই বের হলো। ঐ বইটি আমি সংগ্রহ করলাম এবং পড়ে শেষ করলাম খুব দ্রুতই। ঐ বইয়ের কোনো এক জায়গায় আমি পেলাম কেন এই কবি স্কুল ছাড়লেন। আমার স্মৃতি যদি প্রতারণা না করে থাকে তাহলে আমি বলতে পারি কবি তার বইতে বলেছেন ঐ সময় কবির পরিবার সীতাকুণ্ডে অবস্থান করছিলেন। কোনো এক সকালবেলা এই কবির হাত পড়ে তাদের বাসার গৃহকর্মীর গায়ে। পরে কবির মনে হলো এটা তো একটা মহা কেলেঙ্কারি হয়ে গেল! এ অপরাধের জন্য তার পরিবার তাকে ক্ষমা করবে না।

আল মাহমুদ শেষ পর্যন্ত জানাজানি হওয়ার আগেই বাড়ি থেকে পালিয়ে গেলেন। তখন তিনি নবম শ্রেণির ছাত্র। এরপর তার আর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়া হয়নি।

কবি আল মাহমুদের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়ে একবার আশির দশকের মাঝামাঝি খুব আলোচনা হলো যখন তিনি ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হচ্ছে ডাকাতদের গ্রাম’ কবিতাটি লিখলেন। অনেক সমালোচক তখন বললেন কবি আল মাহমুদ এ জাতীয় কবিতা লিখেছেন এই জন্যই যে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাননি। হয়তো তাই। তাদের বিবেচনায়। কিন্তু কবি আল মাহমুদ তো নিজেই অনেক বড় প্রতিষ্ঠান। একবিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি।

বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হওয়ার পর সাহিত্যের সাথে আমার যেটুকু সম্পর্ক ছিল নব্বইয়ের দশকের শুরুতে সেটুকু শেষ হয়ে গেল। আমি যোগ দিলাম ইংরেজি বার্তা সংস্থা ইউএনবিতে। মনোযোগ দিতে থাকলাম ইংরেজি লেখার ওপর। তখন আমার প্রতিদিনকার পড়ার বিষয়াবলি হয়ে গেল সব ইংরেজি। মাথায় ঢুকলো ইংরেজি শিখতে হবে ভালোভাবে। এরপর দীর্ঘকাল বাংলা ভাষার অনেক প্রিয় সাহিত্যিকের লেখা আর পড়া হয়নি। আমেরিকা পাড়ি দেয়ার আগে সালাহউদ্দিন আইউব একদিন হঠাৎ করে আমাদের ইউএনবি অফিসে আসলেন। পরে তাকে নিয়ে কথা বলতে বলতে আমি অফিসের বাইরে আসলাম। সালাহউদ্দিন আমাকে অনুরোধ করেছিলেন বাংলা সাহিত্যের পড়াশোনা এবং লেখালেখি পরিত্যাগ না করতে। কিছুক্ষণ পর সালাহউদ্দিন আইউব চলে গেলেন। কিন্তু তার সেই অনুরোধ আমার রক্ষা করা হলো না।

ইউএনবি অফিসে যাবতীয় বাংলা এবং ইংরেজি পত্রিকা প্রতিদিন পাওয়া যায়। পত্রিকা ঘাঁটাঘাঁটি করতে গিয়ে যখনই কবি আল মাহমুদের লেখা চোখে পড়েছে তখনই সেটা পড়েছি। আল মাহমুদের গদ্য আমার কাছে সব সময় ভালো লাগে। আমার মনে হতো তার গদ্যে বক্তব্য প্রকাশের একটি অসাধারণ শক্তি ছিল। আঞ্চলিক শব্দগুলো খুব সহজেই তিনি অর্থপূর্ণ করে তুলতেন। কবি আল মাহমুদের ব্যবহারে অনেক আঞ্চলিক শব্দ বাংলা সাহিত্যে জায়গা করে নিয়েছে। গ্রামের মানুষ কীভাবে কথা বলতো, কীভাবে ভাব প্রকাশ করতো সেগুলো তিনি খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন এবং তার লেখায় সেগুলো খুব শৈল্পিকভাবে তুলে এনেছেন।

কবি নিজেই এক ছড়ায় লিখেছেন :

উড়াল দাও গাঁয়ের দিকে

শব্দ চুরির ইচ্ছায়

ইচ্ছে মতো শব্দ পাবে

দাদি নানির কিচ্ছায়।

অনেক লেখক আছেন যারা বড় বড় লেখকের লেখা পড়ে প্রভাব গ্রহণ করেন। কেউ কেউ হয়তো প্রভাব গ্রহণ করেন স্বদেশি লেখকের। আবার কেউ হয়তো বিদেশি লেখকের। কিন্তু কবি আল মাহমুদকে দেখা গেল তিনি সব কিছু গ্রহণ করেছেন প্রকৃতি থেকে, গ্রাম থেকে, গ্রামের মানুষের কাছ থেকে এবং গ্রামের মানুষের মুখের ভাষা থেকে। ফলে তার লেখায় গড়ে উঠলো আরেক নতুন প্রকৃতি, আরেক নতুন জগৎ!

এই মহাকবি যখন গত ফেব্রুয়ারি মাসের ১৫ তারিখে মারা গেলেন আমরা কিন্তু তাকে যথাযথ মর্যাদা দিতে পারিনি। আমরা বুঝতে পারিনি কী হারিয়েছে, কাকে হারিয়েছি, কী ক্ষতি আমাদের হয়েছে। কবি আল মাহমুদের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে বাংলা সাহিত্যের যে ক্ষতি হয়েছে তা পূরণ করার জন্য তো আশপাশে কাউকে দেখা যায় না। বাংলা সাহিত্যের সে লেখক আজ কোথায় যিনি সোনালী কাবিনের মতো লেখা লিখে পাঠকের মনে ঝড় তুলবেন!

কবি আল মাহমুদের ধর্ম বিশ্বাস তাঁকে অনেকের কাছ থেকে শেষ দিকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিল। এই কবির শেষ জীবন খুব একটা ভালো যায়নি। কষ্টের মধ্যে কাটিয়েছেন শেষ বছরগুলো। তার শেষ দিককার লেখাগুলো পড়লে সেসব টের পাওয়া যায়। শুধু কবি আল মাহমুদ নন কবি ফররুখও এই দেশ, এই সমাজ থেকে প্রকৃত মূল্যায়ন পাননি। আমরা সহযোগিতা করিনি বলে কি কবি ফররুখ হারিয়ে গেছেন? না, হারিয়ে যাননি। সেটা সম্ভব নয়। কবি আল মাহমুদও হারিয়ে যাবেন না। তাকে হারানো সম্ভব নয়। এই কবি তার শিল্পোত্তীর্ণ লেখার মধ্যে অবিনশ্বর হয়ে থাকবেন বাংলা সাহিত্যে।

আমি যখন রাস্তাঘাটে চলাফেরা করি তখন কবি আল মাহমুদকে একটি ভিন্ন কারণে স্মরণ করি। কবি এক সময় একটা ছড়া লিখেছিলেন ‘দানব ট্রাক’ নিয়ে। আল মাহমুদ লিখেছিলেন :

ট্রাক ট্রাক ট্রাক

শুয়োরমুখো ট্রাক

ট্রাকের মুখে আগুন দিতে

মতিউরকে ডাক।

কী অসাধারণ ছড়া, কী অসাধারণ বক্তব্য! রাস্তাঘাটে যখন এই শুয়োরমুখো ট্রাক দানবের মতো ধেয়ে আসে তখন আল মাহমুদের এই ছড়াটি সব সময় মনে পড়ে। কবি আল মাহমুদ ছিলেন বাংলার কবি। বাঙালির কবি। মুক্তিযোদ্ধাদের কবি। স্বাধীনতার কবি। যে কবি স্বাধীনতা যুদ্ধে স্বয়ং অংশগ্রহণ করেছিলেন অস্ত্র হাতে। সুতরাং কবি আল মাহমুদের মরণ সম্ভব নয়। এই কবি অমর।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj