আল মাহমুদের কবিতার সামর্থ্য : ফরিদ আহমদ দুলাল

শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০১৯

বাংলাদেশের কাব্যভূগোলে আল মাহমুদ-এর কৃতি এবং অবস্থান নিয়ে বলতে বসে দুই ধরনের পরস্পরবিরোধী মনোসংযোগ কখনো দ্বিধায় ফেলে বটে, কিন্তু একজন কবি হিসেবে আল মাহমুদকে অগ্রাহ্য করবার স্পর্ধা দেখাবার সাহস হয় না কখনোই; এবং এ সত্য স্বীকার করে নিয়েই বর্তমান আলোচনা। বলে রাখা ভালো, আল মাহমুদ বাংলা কাবিতার আকাশে এক অনিবার্য জ্যোতিষ্ক। প্রবল প্রভাববলয় সৃষ্টিকারী এ কবির উত্থান পঞ্চাশের দশকে। তাঁর সমসাময়িককালের যাঁরা প্রতিনিধিত্বকারী কবি, তাঁদের অনেকেই বাংলা কবিতার উজ্জ্বল নক্ষত্র। সহজ করে বললে বলা যায়, বাংলাদেশের কবিতার আঙিনায় পঞ্চাশের দশক মানেই এক গুরুত্বপূর্ণ সময়। এ সময়ের অন্য কবিদের নাম উচ্চারণ করলেই এ কথার সত্যতা প্রমাণিত হয়ে যায়। যাঁদের নাম স্মৃতি থেকে সহজে মনে আসে তাঁরা হলেন, শামসুর রাহমান, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, ওমর আলী, দিলওয়ার, শহীদ কাদরী, সৈয়দ শামসুল হক প্রমুখ; যাঁরা সবাই কারো না কারো কাছে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে আসীন হয়ে যান। আবার আজিজুল হক, আবু বকর সিদ্দিক, আলাউদ্দিন আল আজদ, ফজল শাহাবুদ্দীন, সাইয়িদ আতীকুল্লাহ বা হাসান হাফিজুর রহমানও কম গুরুত্বপূর্ণ নন। তুলনা করে কে আগে আর কে পরে, সে কথা বলার অবকাশ নেই। কালপ্রবাহে কার অবস্থান কোথায় হবে, সে কথা বলারও সুযোগ নেই। তবে আপাত বলা যায়, পঞ্চাশের এই সংক্ষিপ্ত তালিকার শীর্ষে না হলেও কবি হিসেবে আল মাহমুদ কখনোই পেছন সারির নন। এ ছাড়া ব্যক্তিগত-গোষ্ঠীগত-দলগত-সম্প্রদায়গত-আদর্শগত অথবা কৌশলগত; যে কারণেই হোক, এবং বিধ কারণেই বিভিন্নজনের পাল্লা বিভিন্নজনের দিকে হেলে পড়া বিচিত্র নয়; অন্যদিকে সমাজের সংখ্যালঘুরা সব সময়ই নিরাপত্তাজনিত কারণে সংঘবদ্ধ থাকে। আল মাহমুদ বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় সংখ্যালঘু না হলেও, রাজনৈতিকভাবে ‘অস্পৃশ্য’ গোত্রের প্রশ্রয়ে থাকার কারণে; তাঁর নিজের গায়েও অস্পৃশ্যতার কালি লেগে গিয়ে থাকবে; এবং একই কারণে নির্বিরোধ শ্রেণির মানুষের জন্য কবি আল মাহমুদকে নিয়ে আলোচনা অনেকটাই সংশয়ের। তবু সংশয়ের দোদুল্যমানতাকে অগ্রাহ্য করেই কবি আল মাহমুদকে আলোচনায় আনতে চাই। আল মাহমুদকে তাঁর গোষ্ঠী-গোত্রের মানুষেরা তাঁর সময়ের শীর্ষকবি বলে যেমন তৃপ্তিবোধ করেন; তেমনি তাঁর প্রতিপক্ষের সমালোচকগণ তাঁকে স্খলিত-বিভ্রান্ত মানুষ হিসেবে ‘বাতিল’ তালিকায় রাখতে পারলে স্বস্তিবোধ করেন। এমন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েও আমি কবি আল মাহমুদকে উন্মোচন করতে চাই।

সন্দেহ নেই কবি আল মাহমুদ তাঁর কাব্যজীবন শুরু করেন প্রাগ্রসর চিন্তার প্রতিনিধি হয়েই, তাঁর কবিতায় আমরা দ্রোহ-প্রতিবাদ পড়ি, পড়ি গভীর প্রেম এবং রোমান্টিকতা। তাঁর কবিতায় রোমান্টিকতা পড়তে মনোযোগ দিতে পারি-

স্মাগলার আলোচক সম্পাদক তরুণীর দল,

কবিতা বোঝে না কোনো সঙ

অভিনেত্রী নটিনারী নাটের মহল

তার মনে কতোটুকু রঙ?

ও পাড়ার সুন্দরী রোজেনা

সারা অঙ্গে ঢেউ তার, তবু মেয়ে

কবিতা বোঝে না।

(অবুঝের সমীকরণ \ আল মাহমুদ)

আল মাহমুদ-এর প্রস্তুতি মাটি থেকে, সমকালের মানুষ- পরিপার্শ্ব থেকে, প্রকৃতি-পরিবার থেকে; প্রাতিষ্ঠানিক পাঠের চেয়ে সে প্রস্তুতি স্বতন্ত্র মাত্রায় উজ্জ্বল হওয়াই সঙ্গত।

পঞ্চাশের দশক বাঙালির বোধোদয়ের দশক। স্বপ্নভঙ্গ এবং নতুন স্বপ্ন রচনার পথে এগিয়ে চলার দশক। বাঙালির ভাষা আন্দোলনের চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছার দশক। মায়ের মুখের ভাষার জন্য বাঙালি রাজপথ রঞ্জিত করে এ দশকেই, ভাষা আন্দোলনের স্ফুলিঙ্গ পলকেই ছড়িয়ে পড়ে সারাদেশে; বাংলা কবিতায় তার প্রভাবও পড়ে প্রবলভাবে। আল মাহমুদ-এর কবিতাও সেখানে ব্যতিক্রম নয়। আল মাহমুদ তখন লিখলেন-

তাড়িত দুঃখের মতো চতুর্দিকে স্মৃতির মিছিল

রক্তাক্ত বন্ধুদের মুখ উত্তেজিত হাতের টঙকারে

তীরের ফলার মতো

নিক্ষিপ্ত ভাষার চীৎকার

বাঙলা, বাঙলা

কে নিদ্রামগ্ন আমার মায়ের নাম উচ্চারণ করো?

(তাড়িত দুঃখের মতো \ আল মাহমুদ)

অথবা-

ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখ দুপুরবেলার অক্ত

বৃষ্টি নামে বৃষ্টি কোথায় বরকতের রক্ত

হাজার যুগের সূর্যতাপে জ্বলবে এমন লাল যে

সেই লোহিতেই লাল হয়েছে কৃষ্ণচূড়ার ডাল যে;

…………………………………

প্রভাতফেরী, প্রভাতফেরী আমায় নেবে সঙ্গে

বাংলা আমার বচন, আমি জন্মেছি এই বঙ্গে।

(একুশের কবিতা \ পাখির কাছে ফুলের কাছে)

৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানের সময় তিনি লেখেন-

ট্রাক ট্রাক ট্রাক

শুয়োরমুখো ট্রাক আসছে

দুয়ার বেঁধে রাখ।

…………………………………

ট্রাকের মুখে আগুন দিতে

মতিউরকে ডাক।

কোথায় পাবো মতিউরকে

ঘুমিয়ে আছে সে

তোরাই তবে সোনা-মানিক

আগুন জ্বেলে দে।

(উনসত্তরের ছড়া-১ \ পাখির কাছে ফুলের কাছে)

অথবা

৬৯-এর সমাজ-রাজনীতির বাস্তব চিত্র জানতে আমরা পড়তে পারি-

খড়খড়িটা ফাঁক করে কে

বিড়াল ডাকে মিউ;

খোকন সোনার ভেংচি খেয়ে

পালালো কারফিউ।

(উনসত্তরের ছড়া-২ \ পাখির কাছে ফুলের কাছে)

সন্দেহ নেই আল মাহমুদ মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ছিলেন, সে সময় তিনি লেখেন-

আমার মায়ের সোনার নোলক হারিয়ে গেল শেষে

হেথায় খুঁজি হোথায় খুঁজি সারা বাংলাদেশে

নদীর কাছে গিয়েছিলাম, আছে তোমার কাছে?

হাত দিও না আমার শরীর ভরা বোয়াল মাছে।

(নোলক \ নদীর কাছে ফুলের কাছে)

আল মাহমুদ-এর কবিতায় তাঁর পরিপার্শ্বের মানুষ আর সাধারণ মানুষের প্রসঙ্গ উঠে এসেছে বারবার ঘুরে-ফিরে। কয়েকটি পঙ্ক্তি উদ্ধৃত করছি-

ক.

আমার মাথার জন্য অশ্রæসজল আবেদনে কাঁপছে

ভ্রমরকৃষ্ণ একজোড়া চোখের পাতা;

তার সন্তানদের কেউ যেন

‘বেঈমানের বাচ্চা’ না বলে।

দূর মফস্বল শহরের এক দুর্বল বৃদ্ধা

তার সান্ধ্য প্রার্থনায় জায়নামাজ বিছিয়েছে;

প্রভু আমার ছেলের ঘাড় পাথরের মতো শক্ত করে দাও।

সাবধান আমার মাকে কেউ যেন গোলামের গর্ভধারিণী না বলে!

(আমার মাথা \ আল মাহমুদ)

কবি আল মাহমুদ-এর সোনালী কাবিন (১৯৭৩) বাংলা কবিতার জগতে তাঁকে এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত করেছে। বাংলার পাঠকসমাজ সোনালী কাবিনে পড়েছেন লোকবাংলার সাধারণের বুকের আকুতি; কেউ পড়ে, কেউ আবার না পড়েও তাঁর কবিতার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন অন্যের মুখে শুনে শুনে। সোনালী কাবিন কাব্যের ‘শিরোনাম’ কবিতাগুচ্ছে লোকায়ত বাংলার গ্রামীণ জীবনের যে শাশ্বত চিত্র বাক্সময় হয়েছে প্রতি পঙ্ক্তিতে, এখানে তার উল্লেখ করতেই সোনালী কাবিন কাব্য থেকে কয়েকটি পঙ্ক্তি উদ্ধৃতি দিচ্ছি-

ক.

বৃষ্টির দোহাই বিবি, তিলবর্ণ ধানের দোহাই

দোহাই মাছ মাংশ দুগ্ধবতী হালাল পশুর

লাঙল জোয়াল কাস্তে বায়ুভরা পালের দোহাই

হৃদয়ের ধর্ম নিয়ে কোনো কবি করে না কসুর

কথার খেলাপ করে আমি যদি জবান নাপাক

কোনদিন করি তবে হয়ো তুমি বিদ্যুতের ফলা।

খ.

বধূবরণের নামে দাঁড়িয়েছে মহামাতৃকুল

গাঙের ঢেউয়ের মতো বলো কন্যা কবুল, কবুল।

আল মাহমুদ-এর কাব্যভাষা আর উপস্থাপনশৈলীর অভিনবত্বে তিনি হয়ে উঠলেন স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। হয়ে উঠলেন কাব্যাঙ্গনের প্রভাববিস্তারী কবি। কবি আল মাহমুদ-এর কাব্য অভিযাত্রার দিকে যদি আমরা তাকাই দেখবো, কবির প্রথম কাব্য ‘লোক লোকান্তর’ প্রকাশিত হয় ১৩৭০ বঙ্গাব্দে, অর্থাৎ ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে। এরপর ‘কালের কলস’ ১৯৬৮তে, তাঁর জনপ্রিয়তম কাব্য ‘সোনালী কাবিন’ প্রকাশিত হয় ১৯৭৩-এ। পর্যায়ক্রমে প্রকাশিত হয়েছে তাঁর ‘মায়াবী পর্দা দুলে উঠো’ (১৯৭৬), ‘অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না’ (১৯৮০), ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’ (১৯৮৪), ‘আরব্যরজনীর রাজহাঁস’ (১৯৮৬), ‘একচক্ষু হরিণ’ (১৯৮৯) এবং অতঃপর ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’, ‘আমি, দূরগামী, দোয়েল ও দয়িতা’, ‘সেলাই করা মুখ’ ইত্যাদি।

বাংলা কাব্যভুবনের প্রভাববলয় সৃষ্টিকারী কবিপুরুষ আল মাহমুদ ‘লোক লোকান্তর’-‘কালের কলস’-‘সোনালী কাবিন’ থেকে ‘অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না’, ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’, ‘আরব্যরজনীর রাজহাঁস’, ‘একচক্ষু হরিণ’ অথবা ‘মিথ্যাবাদী রাখাল’ লিখে ধর্মীয় আদর্শের দিকে নিজের কবিতার বাঁক বদল করেন, অথবা ধর্মের ‘আচকান’ গায়ে চাপান, তাঁর বিরুদ্ধে আমার বলার কিছু থাকে না; একজন কবি তাঁর ধর্মবিশ্বাস থেকে ধর্মীয় সংস্কৃতি, ধর্মীয় আদর্শ-মূল্যবোধ প্রচারে উৎসাহী হতেই পারেন; তাঁর ধর্মের সৌন্দর্যের বাণী জনসমক্ষে প্রচার করতেই পারেন। তাঁর মধ্যে কবিত্বশক্তির যে ঋদ্ধি, তা তাঁর ধর্মপ্রচারেও ব্যবহার করতে পারেন; কিন্তু যে কবি বাঙালির মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীনতার পক্ষে নিজের মেধা-মনন-মনীষা ব্যয় করলেন; যে যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ বাঙালিকে জীবন দিয়ে বিজয় অর্জন করতে হলো, যে যুদ্ধে লক্ষ লক্ষ বাঙালি মা-বোনকে সম্ভ্রম দিতে হলো; নিজে একজন মুক্তিযোদ্ধা হয়ে যখন, সেই যুদ্ধের বিরোধিতাকারী-লুণ্ঠনকারী-ধর্ষণকারী-গণহত্যাকারীদের সাথে যদি কবিকে গাঁটছড়া বেঁধে স্বাচ্ছন্দ্য কিনতে দেখি, তখন সেই প্রিয় কবিকে আর আদর্শের তালিকায় রাখতে পারি না; সেই কবিকে আর আগামীর ঋষি বলে ভাবতে পারি না।

তারপরও বলি পঞ্চাশের শক্তিধর কবি আল মাহমুদ তাঁর আদর্শ স্খলনের পূর্ব পর্যন্ত কল্যাণের কবি ছিলেন, যে কল্যাণে আমাদের অনেকেরই আস্থা; তবে তাঁর স্খলনের কারণে, তাঁর পাঠকের মনে একজন ঋষি পাবার যে স্বপ্নাকাক্সক্ষা তিনি জাগিয়েছিলেন, তাকে তিনি নিজেই প্রশ্নবিদ্ধ করে দিলেন; কিন্তু স্খলিত হবার পরও তিনি অকবি হয়ে যাননি, কেবল ঋষি হবার সম্ভাবনাটি হারিয়ে ফেলেছেন; স্বাধীনতাকামী-বিজ্ঞানমনষ্ক পাঠকের কাছে নিজেকে খলনায়ক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে গেলেন; তাঁর স্খলনকালিমা মুছে দিতে চাইলে, বাঙালি জাতির বোধোদয়ের স্বপ্নাকাক্সক্ষাকে গলা টিপে হত্যা করতে হয়; অথবা আত্মঘাতী হতে হয় মুক্তচিন্তার প্রাগ্রসরতাকেই; যা আমরা কিছুতেই প্রত্যাশা করতে পারি না; তাই বলি, আল মাহমুদ বরং অমীমাংসিতই থাকুন সময়ের অচলায়তনে। এই অচলায়তন যেদিন ভাঙবে, যেদিন সূর্যালোক ঢুকবে আমাদের মগজের কোষে কোষে, যেদিন ক‚পমণ্ড‚কতার অন্ধকার দূর হয়ে যাবে; সেদিন নিশ্চয়ই দ্বিধা-সংশয়ের আড়াল সরিয়ে আলো আর অন্ধকারে পার্থক্য চূড়ান্ত হয়ে যাবে। কবি আল মাহমুদও সেদিন তাঁর পক্ষপাতদুষ্ট ভক্তকুলের গণ্ডি পেরিয়ে বাংলার আপামর কাব্যানুরাগী পাঠকের অন্তরে নিজস্ব ঠিকানা খুঁজে পাবেন; এবং তা পাবেন কবি তাঁর কবিতার শক্তিতেই।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj