অসামান্য কবি সম্পর্কে যৎসামান্য : মুহাম্মদ নিযামুদ্দীন

শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০১৯

আমার এ এক অক্ষমতা যে, আপন কারো সম্পর্কে কেউ কিছু লিখতে বললে গুছিয়ে কিছু লিখতে পারি না, আবেগ এসে ভর করে, এলোমেলো করে দেয় আমাকে। আর তিনি যদি হন আল মাহমুদ, তাহলে তো কথাই নেই; লেখনীর লাগাম ধরে রাখা আমার জন্য মুশকিল হয়ে পড়ে। পার্থিব পৃথিবী ছেড়ে তিনি যে পরলোকে পাড়ি দিয়েছেন, তা বেশি দিন হয়নি, এ বছরেরই ১৫ ফেব্রুয়ারি। সেই শোক শেষ হতে না হতে চলে এসেছে তাঁর জন্মদিন। তাঁর সাথে আমার অনেক স্মৃতি, অনেক প্রীতি জড়িয়ে আছে। সেসব স্মৃতি ও প্রীতির দায়ভার বলেও একটি কথা আছে। সে কারণে তাঁর প্রয়াণের পর অনেকেই আমাকে অনুরোধ করেছিলেন তাঁর সম্পর্কে কিছু লিখতে। কিন্তু সেই বিষাদ ও ব্যক্তিগত ব্যস্ততা এমন এক বাস্তবতা করেছিল তৈরি, যা ছিল লেখালেখির বৈরী। আজো যে লিখতে বসবো তেমনটা ভাবিনি।

প্রথমেই প্রবেশ করে পরিচয়ের প্রসঙ্গটি। তাঁর সাথে আমার প্রথম পরিচয়টি প্রত্যক্ষ কোনো পরিচয় ছিল না, ছিল পরোক্ষ পরিচয়। পরোক্ষ মানে তাঁর মানসপ্রতিমা বলি, প্রিয়া বলি, তার সাথে। সোজা কথায় তাঁর কবিতার সাথে। সালটা ১৯৭৮ সাল। তখন আমি চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার নিজামপুর কলেজের (বর্তমানে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ) বিকম-এর ছাত্র। ফাইনাল পরীক্ষা হবে পাঁচ-ছয় মাস পরে- বছরের শেষের দিকে। কলেজ কর্তৃপক্ষ উদ্যোগ নিলেন সাংস্কৃতিক সপ্তাহ উদযাপনের এবং ছাত্রছাত্রীদের কাছ থেকে স্বরচিত কবিতা আহ্বান করলেন অনুষ্ঠানে আবৃত্তির জন্য। উদ্বোধন করবেন প্রখ্যাত সাহিত্যিক আবুল ফজল। বলা বাহুল্য, বাল্যবেলা থেকে আমার মধ্যে ছিল এক ধরনের বাতিক- কবিতার বাতিক। কবিতা-কাঙালও বলা যায়। এর পেছনে একটি বড় কারণও ছিল। বড় কারণটি হলো আমার বড় দাদু। বড় দাদু মওলানা ওলী আহমদ নিযামপুরী রহ. (১৮৮৫-১৯৬০) যেমন ছিলেন দুনিয়াখ্যাত দেওবন্দ পাস সুপ্রসিদ্ধ আলিম ও অলিয়ে কামিল; তেমনি ছিলেন আরবি-ফারসি ভাষার সুপ্রসিদ্ধ কবি। সেই ইংরেজ আমলে ভারত থেকে তাঁর চারটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল এবং উচ্চ প্রশংসিত হয়েছিল। বড় দাদুর একজন বিশিষ্ট ভক্ত ছিলেন নজরুল-বন্ধু ও কবি সুফি জুলফিকার হায়দার। ‘নজরুল জীবনের শেষ অধ্যায়’সহ অনেকেগুলো গ্রন্থের লেখক ও একুশে পদকপ্রাপ্ত সাহিত্যিক ছিলেন তিনি। দাদুর দেহান্তরের পর প্রতি বছর দেখতাম সুফি সাহেবকে আমাদের বাড়িতে আসতে। মাযার জিয়ারত করার জন্য আসতেন তিনি, কয়েকদিন থাকতেনও। তিনি মাজারে বসে যেমন কবিতা আবৃত্তি করতেন, তেমনি যে রুমটিতে থাকতেন সেখানে বসেও স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি করে শোনাতেন আমাদের। তিনি যখন আবৃত্তি করতেন, তাঁর আবেগ ও উচ্ছ¡াস উপচেপড়ার উপক্রম হতো। সাধারণ কথাবার্তা বলার সময়ও তিনি কবিতার মতো করে কথাবার্তা বলতেন। এগুলো আমার মধ্যে প্রবলভাবে আছর করতো এবং আকর্ষণ সৃষ্টি করতো কবিতার প্রতি। শুনেছি, চল্লিশের অন্যতম কবি আবুল হোসেনও নাকি বড় দাদুর ভক্ত ছিলেন। সরকারি চাকরির সুবাদে যতদিন চট্টগ্রামে পোস্টিং ছিলেন, দর্শন ও দোয়া লাভের জন্য দাদুর দরবারে প্রায়ই আসতেন। এসব কিছু থেকে প্রেরণা পেয়ে আমার পদ্য-পাগলামি এতটাই বেড়ে গিয়েছিল যে, হোক না হোক, কিছু একটা লিখেই ছাড়তাম এবং জোর করে বন্ধুদের শোনাতাম। এটাকে এক ধরনের অত্যাচার হিসেবেও আখ্যায়িত করা যায়। কিন্তু বন্ধুরা আড়ালে হাসলেও, বন্ধুত্ব বিনষ্ট হওয়ার আশংকায় সামনে মুগ্ধ শ্রোতা হওয়ার ভান করতো। কলেজে উঠলে আমার পদ্যপ্রেম আরো প্রবল আকার ধারণ করে। কথায় আছে- যে যা চায়, সে তা পায়। আমিও পেয়ে যাই আমার মতো একজন পদ্যপাগল বন্ধু। তার বাড়ি সীতাকুণ্ডে। উল্লেখ্য, কবি আল মাহমুদ কিশোরকালে কিছুকাল সীতাকুণ্ড কাটিয়েছিলেন এবং সীতাকুণ্ড স্কুলে পড়েছিলেন। যা বলছিলাম, কলেজের আহ্বানে সিলেকশনের জন্য আমিও কবিতা জমা দিই। বন্ধু আবু জাফর, নুরুল ইসলামসহ আরো অনেকে জমা দেয়। সিলেকশন কমিটির প্রধান ছিলেন বাংলার অধ্যাপক হরিসাধন দাশ। সিলেকশনে কাদের কাদের কবিতা স্থান পায়, সে সারণী প্রকাশ পেলে দেখা যায় আমার নাম নেই, স্থান পায় আবু জাফরের, নুরুল ইসলামের এবং আরো কারো কারো কবিতা। নিজের নাম নেই দেখে মনটা মেঘলা হলেও আবু জাফরের নাম দেখে পরে সেই দুঃখটা ভোলার চেষ্টা করি। কারণ জাফর ছিল জানি দোস্ত। তখন নজরুল-নেশায় পেয়েছিল বলে আমার কবিতাটি ছিল নজরুলীয় ঢংয়ে লেখা একটি প্রাচীন ধাঁচের পদ্য। কবিতা যে আরো এগিয়েছে, গ্রামে বাস করার কারণে সে বিষয়ে আমার জানার পরিধি ছিল সীমিত। তবে জাফর ছিল সে ব্যাপারে সময় সচেতন। তার সিলেক্ট হওয়া কবিতাটির নাম আমার এখনো স্পষ্ট স্মরণে আছে, ছিল ‘আমি এক প্রোটোপ্লাজমের বিন্দু’। কি শব্দ চয়নে, কি বাক্যের বুননে, কি চিন্তার চমৎকারিত্বে, আধুনিক ও স্মার্ট যাকে বলা যায়, সে ধরনের কবিতা। পুরো কবিতাটি তখন সে আমাকে পড়তে দিয়েছিল। পড়ে আমি অবাক হয়েছিলাম, আধুনিকতামুক্ত পরিবেশে থেকে কবিতার এই আধুনিকতাকে সে আয়ত্ত বা অধিকার করলো কীভাবে! সেটা বুঝতে অবশ্য বিলম্ব হয়নি। সে আমাকে অগ্রজ একজন কবির নাম বললো। কবির নাম আল মাহমুদ। বললো, দোস্ত আল মাহমুদের ‘কালের কলস’ পড়। কাব্যগ্রন্থের নাম ‘কালের কলস’! যেমন অবাক করা, তেমনি আধুনিক নাম। সে আমাকে ‘কালের কলস’ থেকে একটি কবিতা তৎক্ষণাৎ মুখস্থ আবৃত্তি করে শোনালো। শুনে আমার অবস্থা যে বেহাল- যাকে বলে মুগ্ধ-মাতাল। কবিতার মধ্যে মর্ডানিটির পাশাপাশি মাদকতা যে আছে, তা তার আবৃত্তি শুনে অনুভব করতে বাধ্য হলাম। একেবারে খাঁটি কবিতা, মাটি ও মানুষের কবিতা। এরপর তাঁর কবিতার তৃষ্ণা তুমুলভাবে পেয়ে বসে আমাকে। পত্রপত্রিকায় বিচ্ছিন্নভাবে যেখানেই তাঁর কবিতা নজরে পড়তো, পাগলের মতো পড়ে ফেলতাম, পড়ে পরম পরিতৃপ্তি পেতাম।

এরই মধ্যে আব্বা মারা গেলে সংসারের হাল ধরার জন্য চাকরি করতে চলে যাই চট্টগ্রাম শহরে। ততদিনে আল মাহমুদের ‘সোনালী কাবিন’, ‘কালের কলস’, ‘লোক-লোকান্তর’ প্রভৃতি কাব্যগ্রন্থ ও গল্পগ্রন্থ ‘পানকৌড়ির রক্ত’ পড়া হয়ে গেছে। ‘সোনালী কাবিন’ পড়ে তো আরো অবাক! পুরো বাংলাদেশকে যেন তিনি নান্দনিক নিপুণতায় তুলে ধরেছেন সেই কালজয়ী সনেটগুচ্ছে। কবিতার কারামতি কাকে বলে তা সেই কবিতাসমূহ পড়লে অনায়াসে বোঝা যায়। যদি কালের করাল গ্রাসে হারিয়ে যেতো তাঁর সমস্ত কবিতা, শুধু বেঁচে থাকতো ‘সোনালী কাবিন’-এর সনেটগুচ্ছ, তবুও ভাবীকালের পাঠক বুঝে নিতে পারতো এ এক বিস্ময়কর সৃষ্টি, বিশ্ব প্রতিভার সৃষ্টি। তখন আমি এতটাই আল মাহমুদে আকর্ষিত হয়ে যাই যে, মনে মনে এ প্রত্যাশা পোষণ করতে থাকি- যে করেই হোক এই স্বপ্নের মানুষটির সাথে পরিচিত হতে হবে, তাঁর ওপর সংকলন বের করতে হবে। সে সুযোগটি আসে আমার বিয়ের পর। বিয়ে হয় ১৯৮৩ সালের এপ্রিলে। বিয়ের পর সালাউদ্দীন আইয়ুব (বর্তমানে আমেরিকার শিকাগো স্টেট ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনারত এবং স্বনামধন্য লেখক-গবেষক) আমার নিকটাত্মীয় হয়ে যায়। মাহফুজুর রহমান তো (বর্তমানে বার্তা সংস্থা টঘই-এর এডিটর এবং লেখক) আগে থেকেই আছে এবং আমাদের বেড়ে ওঠা একই বাড়িতেই। এদের নিয়ে গ্রামের বাড়িতে কিংবা বাজারে, যেখানেই আড্ডা জমতো, আড্ডার আলোচনায় আবশ্যিকভাবে ও অধিকাংশজুড়েই থাকতো সাহিত্য। সাহিত্য বলতে বেশিরভাগ আলোচনায় আলো হয়ে আসতেন আল মাহমুদ, আমরা তাতেই থাকতাম বুঁদ। সালাহউদ্দীন ও মাহফুজও ছিল আল মাহমুদ বলতে অন্যরকম। এসবের পেছনে ছিল আল মাহমুদের কবিতার ক্যারিশমা বা কারামতি। ফলে তাদের সাথে আড্ডা দিয়ে বা আলোচনা করে যে আনন্দ পেতাম, তা অন্য কোথাও পেতাম না। এরই মধ্যে মাহফুজুর রহমান ও সালাউদ্দীন আইয়ুবের ঢাকায় অবস্থান। দুজনেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। প্রথমজন জার্নালিজমের, পরেরজন বাংলার। আমি বৌ নিয়ে উঠি চট্টগ্রাম শহরের বাসায়। ওদের সাথে পত্রে ও ফোনে দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতাম। ওরা চট্টগ্রাম এলে আমার বাসায় আড্ডা জমতো। বিশিষ্ট ছড়াকার রহীম শাহ থাকতেন আমার বাসার কাছাকাছি। তিনিও প্রায়ই আসতেন। কখনো কখনো আসতেন আহমেদ মাওলাও। তখন মাঝে মাঝে শুধু বই কেনার জন্যই যেতাম ঢাকায়। এলিফ্যান্ট রোডের আজিজ সুপার মার্কেট ছিল বইয়ের দোকান আর বইয়ের দোকান। উঠতাম মাহফুজ-সালাউদ্দীনের বাসায়। দু’একদিন থাকতামও। একবার ঢাকায় গেলে সালাউদ্দীন আমাকে বললো, আজ আপনাকে নিয়ে এক জায়গায় যাবো। বিকেলে সালাউদ্দীন ও মাহফুজ মিলে আমাকে যে জায়গায় নিয়ে যায়, তা হলো সৈয়দ আলী আশরাফের বাসা। সৈয়দ আলী আহসানের ছোট ভাই তিনি, ছিলেন অক্সফোর্ডের ইংরেজির অধ্যাপকও। কবি, গবেষক ও নামকরা ক্রিটিকও। সেখানে গিয়ে দেখি কি, নক্ষত্রের মেলা! উপলক্ষ ছিল- নবী করিম (সা.)-এর জন্মদিনকে কেন্দ্র করে তাঁকে নিবেদিত কবিতা পাঠের আসর ও তার ওপর আলোচনা। অনুষ্ঠানের সভাপতি, প্রধান অতিথি ও বিশেষ অতিথি যথাক্রমে সৈয়দ আলী আহসান, আবুল হোসেন ও আল মাহমুদ। আরো দেখলাম আবদুল মান্নান সৈয়দ, আফজাল চৌধুরী, আল মুজাহিদী, আবৃত্তিকার শফি কামালসহ আরো অনেকেই। সৈয়দ আলী আশরাফ তো ছিলেনই। স্বপ্নের মানুষদের সর্বপ্রথম ও সামনাসামনি দেখে আমার সে কি আনন্দ! অনুষ্ঠান শেষে সবাই যখন বিদায় নেয়ার পালা, সালাউদ্দীন আমাকে একে একে পরিচয় করিয়ে দেয় সৈয়দ আলী আহসান, আল মাহমুদ ও আবদুল মান্নান সৈয়দের সাথে। এঁরা তিনজনই আমার প্রিয় কবি বা লেখক হলেও, সালাউদ্দীন জানতো তখন আমার আন্বিষ্ট কে! তাই আল মাহমুদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়ার সময় সে আমাকে তাঁর একজন বিশেষ ভক্ত তো বললোই, সাথে আমার উদ্দেশ্যকেও উপস্থাপন করলো উজ্জ্বলভাবে। উদ্দেশ্য একটাই- ‘উপমা’ নামে যে একটি সাহিত্য কাগজ বের করার স্বপ্ন দেখি, তার সূচনা সংখ্যাটি আল মাহমুদের ওপর বের করা। আমিও আমার উদ্দেশ্যের কথাটি বিনয় বাক্যে ব্যক্ত করলাম কবির কাছে এবং তাঁর সানুরাগ সহযোগিতা ও পরামর্শ প্রার্থনা করলাম। শুনে কবি খুব খুশি হলেন। সেই খুশির আভা তাঁর অবয়বে ও কথায় পরিষ্কার প্রতিভাত হচ্ছিল।

ঢাকা থেকে এসে ‘উপমা’- আল মাহমুদ সংখ্যার জন্য লেখা সংগ্রহের কাজ শুরু করে দিই। এরই মধ্যে একবার আল মাহমুদ চট্টগ্রামে আসেন এখানকার একটি সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের আমন্ত্রণে- প্রধান অতিথি হয়ে। তাঁর সাথে আসেন সব্যসাচী লেখক ও কবি আবদুল মান্নান সৈয়দ। সেই অনুষ্ঠানে কবি ময়ূখ চৌধুরীও এসেছিলেন। এই ত্রিরতেœর প্রজ্ঞাপূর্ণ প্রেজেন্টেশনে প্রোজ্জ্বল ও প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছিল পুরো অনুষ্ঠান, যা অন্য অনেকের সাথে আমিও উপভোগ করেছিলাম।

আল মাহমুদ ঢাকা চলে যাওয়ার পর তাঁর ওপর তথ্য ও লেখা সংগ্রহের কাজ যেমন চলতে থাকে, তেমনি চিঠিপত্রের মাধ্যমে যোগাযোগও অব্যাহত থাকে। তিনি দীর্ঘ তিনটি চিঠি লিখে আমার স্মৃতি ও সংগ্রহকে সমৃদ্ধ করেন। সালাউদ্দীন সংগ্রহ করে দেয় আল মাহমুদকে লেখা এপার বাংলা-ওপার বাংলার বিখ্যাত সব বোদ্ধা ব্যক্তিদের চিঠিপত্র। সালাউদ্দীনকে খুবই স্নেহ করতেন আল মাহমুদ। বিশ্বাসও। সেজন্য ফটোকপি না রেখেই সবগুলো মূল্যবান চিঠিপত্র আমাকে প্রদান করার জন্য তুলে দেন সালাউদ্দীনের হাতে। সেগুলো সাহিত্যের ইতিহাসের অংশও এবং গবেষকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। অন্নদাশঙ্কর রায়ের কাছেও লেখা চেয়ে চিঠি লিখেছিলাম। তিনি লেখা দিতে না পারলেও তার উত্তরে একটি চিঠি পাঠিয়েছিলেন। সেই চিঠিতে আল মাহমুদ সম্পর্কে তাঁর মূল্যবান মন্তব্য থাকায় তা সংকলনে স্থান দেয়ার সিদ্ধান্ত নিই। অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রকাশের প্রহর দেখে বহু প্রত্যাশিত ‘উপমা’- আল মাহমুদ সংখ্যা। সেটা ২৬ মার্চ ১৯৯৪। লিটলম্যাগ সাধারণত যা ছাপানো হয় তার দ্বিগুণেরও বেশি ছাপানো হয়েছিল কপি। পূর্বের অভিজ্ঞতা না থাকায় এমনটা হয়েছিল। সাহিত্য সংশ্লিষ্ট সংকলন সম্পাদনাও আমার সেই প্রথম। কম্পিউটার কম্পোজ যে প্রতিষ্ঠানে করিয়েছিলাম, সেই অক্ষর কম্পিউটারসও ছিল চট্টগ্রামের প্রথম কম্পিউটার কম্পোজের প্রতিষ্ঠান। প্রচ্ছদের নামলিপি থেকে শুরু করে পুরো সেটআপ করে দিয়েছিলেন বন্ধু-চিত্রশিল্পী সাফয়াত খান। প্রচ্ছদে ব্যবহার করা হয়েছিল বিখ্যাত চিত্রশিল্পী মুর্তজা বশিরের আঁকা আল মাহমুদের একটি স্কেচ। তখন মুর্তজা বশির থাকতেন চট্টগ্রামে- আলমাস সিনেমা হল সংলগ্ন আবাসে। সংস্কৃতিসেবী আমিরুল ইসলামের কাছে পরে শুনেছি, তাঁরা নাকি ‘নোঙর’-এর জন্য মুর্তজা বশিরের সাক্ষাৎকার নিতে গেলে তিনি (মুর্তজা বশির) ‘উপমা’র প্রচ্ছদে থাকা তাঁর আঁকা স্কেচ দেখে খুব খুশি হয়েছিলেন এবং ‘উপমা’র প্রশংসা করেছিলেন। পত্রপত্রিকা ও জার্নালে ‘উপমা’র উল্লিখিত সংখ্যা রেফারেন্স হিসেবেও ব্যবহৃত হতে দেখা যায় বিভিন্নজনের লেখায়। সংখ্যাটি প্রকাশের পর একদিন দেখি ডা. মুহাম্মদ নাসির উদ্দিনকে সাথে নিয়ে তাঁর গাড়িতে করে আচমকা আল মাহমুদ এসে হাজির আমার অফিসে। আমি তো অবাক! আকাশের চাঁদ দেখছি নাতো! তখন আমি উত্তর পতেঙ্গাস্থ বহুজাতিক কোম্পানি ওঞঞ (ওহঃবৎহধঃরড়হধষ ঞধহশ ঞবৎসরহধষং)-তে চাকরি করতাম। নাসির ভাই আমাকে বলেন, মাহমুদ ভাই এয়ারপোর্টে নেমেই বলেন, আগে নিযামের অফিসে, পরে অন্য কোথাও; সে আমার ওপর যে কাজ করেছে তা তারিফযোগ্য। সেদিন ঘণ্টাখানেকের মতো ছিলেন মাহমুদ ভাই আমার অফিসে। কবির মুখ থেকে কেবল তারিফ আর তারিফ। অফিস কলিগদের কেউ কেউ অটোগ্রাফ নিতে ব্যস্ত। নাস্তা ও কোকাকোলা খেতে খেতে কত কথা কবির সাথে। সেই সোনালি স্মৃতি কি কখনো ভোলা যায়!

সংখ্যাটির সাফল্যের পর কবির ওপর আরেকটি সংখ্যা বের করার সাধ জাগে আমার মনে। কাজও শুরু করে দিই। লেখাও প্রায় জোগাড় করে ফেলি। কিন্তু বাদ সাথে বাস্তবতা। অর্থাৎ আমার ব্যস্ততা ও বিজ্ঞাপন না পাওয়ার ব্যর্থতা। এভাবে কয়েক বছর চলে যায়। এরই মধ্যে ঢাকায় আমাকে টানা থাকতে হয় বেশ কিছুদিন। একুশে পদকপ্রাপ্ত লেখিকা ফরিদা আপার (ফরিদা হোসেনে) বাসায় প্রায়ই যেতাম। তাঁর একটি সাহিত্য পত্রিকা আছে ‘অবিনশ্বর’। প্রায় নিয়মিতই বের হয় ম্যাগাজিন আকারে। নামিদামি লেখকরা তাতে লিখেন। তিনিও আল মাহমুদের ভক্ত। একদিন কথাপ্রসঙ্গে তাঁকে প্রস্তাব দিই আল মাহমুদের ওপর তাঁর পত্রিকার একটি সংখ্যা করার। তিনি সাথে সাথে সানন্দে সায় দেন এবং আমাকে অতিথি সম্পাদক হিসেবে কাজ করার প্রস্তাব দেন। আমিও সাথে সাথে রাজি হয়ে যাই এবং খুব দ্রুত কাজ শুরু করে দিই। আমার সংগ্রহে যা কিছু ছিল সবকিছু উজাড় করে দিই। উল্লেখ্য, সম্পাদনার ক্ষেত্রে ফরিদা আপা আমাকে যে স্বাধীনতা ও সম্মান দিয়েছেন, তার কোনো তুলনা হয় না। অবশেষে অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আল মাহমুদের মৃত্যুর দুদিন আগে আলোর মুখ দেখে ‘অবিনশ্বর’ আল মাহমুদ সংখ্যা। তখন কবি হাসপাতালে মৃত্যুর মুখোমুখি। আমাদের দুঃখ ও দুর্ভাগ্য যে, কবির হাতে সংখ্যাটি তুলে দিতে পারিনি। তবে কবির ইচ্ছে ছিল আমার সম্পাদনায় তাঁর ওপর যেন আরেকটি সংকলন বের হয়। সেই কাজটি করতে পেরেছি বলে দুঃখ ও দুর্ভাগ্য কিছুটা দূর হয়ে যায়। পাঠকরাও নিরাশ করেননি আমাদের। প্রকাশের পরপরই প্রচুর সাড়া পাই পাঠকদের কাছ থেকে- ঢাকায়, চট্টগ্রামে- সবখানে।

ঢাকায়-চট্টগ্রামে অনেকবার দেখা হয়েছে আল মাহমুদের সাথে। একবার শিল্পকলা একাডেমিতে তাঁর সাথে দেখা করতে গেলে কাকতালীয়ভাবে দেখা পেয়ে যাই পঞ্চাশের আরেক প্রভাবশালী কবি ফজল শাহাবুদ্দিনের। দুই বন্ধুর সে কি আড্ডা! আমি আর সালাউদ্দীন আইয়ুব ছিলাম মুগ্ধ শ্রোতা। বিদায় নেয়ার সময় ফজল শাহাবুদ্দীন আমি ও সালাহউদ্দীনকে বললেন তাঁর গাড়িতে উঠতে। তিনি আমাদের তাঁর অফিসে নিয়ে যান এবং তাঁর একটি কবিতার বই উপহার প্রদান করেন। গাড়িতে যেতে যেতে তিনি আমাদের বলেন, ‘আমি এখানে (আল মাহমুদের কাছে) আসি কেন জানো? আমি তো আসি বাংলা কবিতার কাছে- প্রকৃত আধুনিক বাংলা কবিতার কাছে। আল মাহমুদের মতো কবি বর্তমানে বাংলাভাষায় নেই।’ আল মাহমুদের সাথে আমার সর্বশেষ সাক্ষাৎ হয়েছিল চট্টগ্রামে। ‘বাতিঘর’-এর আমন্ত্রণে এসেছিলেন কবি। আমি আগেভাগেই চলে গিয়েছিলাম। আছরের আগেই ‘বাতিঘর’ অন্দর পরিপূর্ণ। দাঁড়াবার এতটুকু জায়গা নেই। এত ভিড় যে, আছরের সাথে সাথেই বন্ধ করে দেয়া হয় প্রবেশের একমাত্র দরজা। তখন বাইরেও ভক্ত-অনুরক্তদের ভীষণ ভিড়। সেই ভিড় সামলাতে পুলিশকেও ভূমিকা নিতে দেখা গেছে। একজন কবি যে কতটা জনপ্রিয়, সেদিন সেখানে যারা ছিলেন, সকলেই সচক্ষে সরাসরি প্রত্যক্ষ করেছেন। দুদিন ছিলেন কবি। দুদিনই দেখা হয়েছে তাঁর সাথে, কথা হয়েছে। কত কথা! কথা বলতে বলতে কখনো তাঁর চোখে কান্না, কখনো শিশুর মতো সরল হাসি। প্রতিটি মুহূর্ত ছিল কাব্যিক। এরকম অসংখ্য স্মৃতি আছে আমার কবির সাথে। সেই সব স্মৃতির সমাবর্তন ঘটালে একটি বই হয়ে যাবে।

আল মাহমুদ আমি, সাজ্জাদ বিপ্লব, সালিম হাসান ও ওমর বিশ্বাস- চারজনকে একসাথে একটি বইও উৎসর্গ করেছেন। বইয়ের নাম ‘কবিশিল্পীদের মাতৃভূমি প্যারিস’। অক্টোবর ২০০২ সালে প্রকাশিত বইটি ছিল কবির ফ্রান্স সফরকে নিয়ে এবং প্রকাশ করেছিল এ্যাডর্ন পাবলিকেশন। কবি তাঁর স্মৃতিকথা ও সাক্ষাৎকারেও আমার সম্পর্কে বলেছেন এবং প্রশংসা করেছেন। সে জন্য কবির কাছে কৃতজ্ঞ।

আল মাহমুদ যখন প্রথম ঢাকা এসেছিলেন, সাথে নিয়ে এসেছিলেন একটি ভাঙা সুটকেস। সেই সুটকেসে ছিল ফুল, পাখি, নদী তথা প্রকৃতির ছায়া ঘেরা মায়া ভরা অপরূপ বাংলাদেশ। আজ কবি নেই। কিন্তু এই নেই কথাটি কবিদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আল মাহমুদের মতো কবিদের ক্ষেত্রে তো নয়ই। আল মাহমুদ নিজেই তো তাঁর এক কবিতায় বলেছেন- ‘পরাজিত হয় না কবিরা’। তাঁর মতো কবিদের মৃত্যুদিন কথাটি মিথ্যে-সত্য শুধু জন্মদিন। তাও নয় কেবল বছরের একটি দিন-সূর্যের মতো প্রতিদিন তাঁর জন্মদিন। কেননা-

আল মাহমুদ মানে নয় শেষ, আল মাহমুদ মানে বাংলাদেশ।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj