সূর্য ওঠার আগে : রফিকুর রশীদ

শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০১৯

সে প্রস্তুতির প্রথম ধাপ হচ্ছে প্রচারণা। গ্রাম গ্রামান্তরের সাধারণ মানুষকে জানিয়ে দেয়া- কী হয়েছে, কী হতে যাচ্ছে এবং সেই প্রেক্ষাপটে আমাদের কী করণীয়। এই করণীয় কাজের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নকরণ। প্রকৃতপক্ষে মেরহপুর শহরের ভৌগোলিক অবস্থানটাই এমন যে কুষ্টিয়া এবং চুয়াডাঙ্গার সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পারলেই যেন অনেকাংশে নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। তাছাড়া মাত্র দুতিন মাইলের মধ্যে ভারতীয় সীমান্ত অতিক্রম করলেই বেতাই কৃষ্ণনগর হয়ে কলকাতার সঙ্গে সহজ যোগাযোগও সম্ভব। ভারতীয় সীমান্ত ঘেঁষে মেহেরপুর মহকুমার প্রায় ৪০ মাইল সীমানা অবস্থিত। প্রয়োজন হলে অতি সহজেই সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নেয়া যেতে পারে।

যোগাযোগ বিচ্ছিন্নকরণের পাশাপাশি গুরুত্ব দেয়া হয় সামরিক আয়োজনের প্রতি। বাস্তবতা হচ্ছে, মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় অবস্থিত সি কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে এক কোম্পানি ইপিআর সদস্য আছে। তবে তারা আছে বিভিন্ন সীমান্ত ফাঁড়িতে ছড়িয়ে। প্রায় প্রত্যেক ফাঁড়িতে দু’একজন করে অবাঙালি ইপিআরও আছে, তাদের নিরস্ত্রকরণের দায়িত্ব পালন করেন কোম্পানি কমান্ডার সুবেদার মুকিত। এদের সঙ্গে যুক্ত হয় বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে থাকা দু’আড়াই শ’ আনসার মুজাহিদ। আনসার ব্যারাকে একত্রিত হলে এসডিও সাহেবের অনুমতিক্রমে এদের প্রত্যেকের হাতে একটা থ্রি নট থ্রি রাইফেল ও পাঁচ রাউন্ড গুলি দিয়ে সংক্ষিপ্ত ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা হয়। এই সীমিত সৈন্য এবং সামান্য অস্ত্র নিয়ে কি কুষ্টিয়ায় অবস্থিত আধুনিক অস্ত্রসজ্জিত পাকিস্তানি সৈনিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামা ঠিক হবে? মেহেরপুরে শাহাবাজউদ্দিন নিজ্জু এবং মেহেদী বিল্লাহ, গাংনীতে আক্তারুজ্জামান অলড্রাম এবং নূরুল হুদা প্রয়োজনে যুদ্ধে যেতে আগ্রহী ছাত্র যুবকদের তালিকা প্রস্তুত করেছে, এদের জন্য চাই ট্রেনিং, চাই অস্ত্র গোলাবারুদ। এই সহযোগিতা কোথায় পাওয়া যাবে? মেহেরপুরের এসডিও তৌফিক এলাহী চৌধুরী স্থির করে ফেলেন- ভারতের কাছেই এই সহযোগিতা চাওয়া যায়।

কিন্তু কে লিখবে চিঠি? সে চিঠি কার উদ্দেশে লেখা হবে? কে বা কারা সে চিঠি প্রাপকের কাছে পৌঁছে দেয়ার দায়িত্ব পালন করবে? মাথার ওপরে টিক্কা খানের সামরিক ফরমানের খড়গ ঝুলছে। রেডিও থেকে বারংবার ঘোষণা করছে হুঁশিয়ারি। এ বড়ই দুঃসময়। পাকিস্তান সেনাবাহিনী রাতের অন্ধকারে নিষ্ঠুরতম গণহত্যা চালিয়েছে ঢাকায়। ক্যান্টনমেন্ট থেকে হিংস্র সৈনিকেরা বেরিয়ে এসে কুষ্টিয়াসহ দেশের প্রধান শহরগুলো দখল করে নিয়েছে অস্ত্রের জোরে। গোটা বাংলাদেশ আজ পাকিস্তানি হায়েনাদের হাতে অবরুদ্ধ। নিরস্ত্র অসহায় বাঙালি আত্মরক্ষার জন্য ঘুরে দাঁড়াতে চায়। কিন্তু তারা কোথায় পাবে অস্ত্র-গোলাবারুদ, খাদ্য রসদ ওষুধপত্র? নিকটতম প্রতিবেশী ভারতই পারে এ দুঃসময়ে অবরুদ্ধ বাংলাদেশের প্রতিবাদী মানুষের পাশে দাঁড়াতে, সাহায্যের হাত বাড়াতে। কিন্তু পুরো বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ সাহায্যের আবেদন কে জানাবে?

প্রথমে কথা ওঠে জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে মহিউদ্দিন পারেন ভারত সরকারের কাছে আবেদন জানাতে। তিনি বললেন অন্য কথা। সরকার নয় ভারতীয় জনগণের কাছে তিনি সাহায্য চাইতে পারেন। তার জন্ম এবং বেড়ে ওঠা মেহেরপুরের পশ্চিমে নদীয়া জেলার বেতাই শহরে। ওখানকার অনেক মানুষ এখনো তাকে মনে রাখে। ব্যক্তিগতভাবে তাদের সহযোগিতা চাইতে পারেন তিনি। এসডিও তৌফিক এলাহী চৌধুরী চান চিঠি লেখা হোক নদীয়ার জেলা প্রশাসককে। উপস্থিত রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এই মতই সমর্থন করেন এবং এসডিও সাহেবকেই এ চিঠি লেখার জন্য অনুরোধ জানান। তৌফিক এলাহী চোখ বন্ধ করে এক মিনিট কী যেন ভাবেন, তারপর মহকুমা প্রশাসকের প্যাড টেনে নিয়ে দ্রুত হাতে ইংরেজিতে চিঠি লেখেন নদীয়ার জেলা প্রশাসকের উদ্দেশে। আবার তারই একটা কপি করেন মেহেরপুরের বিপরীতে অবস্থিত বিএসএফের কমান্ডিং অফিসার লেফটেন্যান্ট কর্নেল চক্রবর্তীকে দেয়ার জন্য। চিঠি দুটো পাঠাবেন কার দায়িত্বে? নেতৃবৃন্দ আশ্বস্ত করেন, সে আপনি ভাববেন না। এ চিঠি আজই পৌঁছে যাবে।

বর্ডার অনেকটাই খেলামেলা। ভারতে চিঠি পৌঁছানোর দায়িত্ব নিতে অনেকেই আগ্রহ প্রকাশ করে। দারিয়াপুরের ইদ্রিস মিয়া এবং মেহেরপুরের শাহাবাজউদ্দীন সাফ জানিয়ে দেন- কাকে দিয়ে কীভাবে চিঠ পাঠাতে হবে সেটা আমরাই দেখব।

সবাইকে না জানিয়ে তৌফিক এলাহী চৌধুরী ভারতীয় জনগণের উদ্দেশে ওইদিনই একটা খোলা চিঠি লেখেন সহযোগিতা চেয়ে। সে চিঠি বিএসএফ-এর নাটনা ক্যাম্পে পৌঁছুনোর দায়িত্ব পালন করেন সীমান্তবর্তী বাড়ি বাঁকা গ্রামের দুই যুবক মজিবর রহমান এবং ইদ্রিস আলী। এ সব চিঠি ভারতীয় পত্রিকায় বিশেষভাবে ছাপা হলে ব্যাপক সাড়া পড়ে যায় এবং ২৯ মার্চ বেতাই বিএসএফ ক্যাম্পে এসে দেখা করার জন্য ভারতীয় কর্তৃকপক্ষ মেহেরপুরের এসডিওকে আহ্বান জানান।

ঠিক একই সময়ে চুয়াডাঙ্গায় ঘটে যায় অন্যরকম ঘটনা।

ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের ৪র্থ উয়িংয়ের হেড কোয়ার্টার চুয়াডাঙ্গায়। বহু বছর পর এখানে উয়িং কমান্ডার হয়ে এসেছেন বাঙালি মেজর আবু ওসমান চৌধুরী। মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা-ঝিনাইদহ-মাগুরা রাজবাড়ি-গোয়ালন্দ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ অঞ্চল তখনো হানাদারমুক্ত। এসব মুক্তাঞ্চল রক্ষা করা এবং অবিলম্বে কুষ্টিয়াকে শক্রমুক্ত করার লক্ষ্যে চুয়াডাঙ্গায় গঠন করা হয় বাংলাদেশ সশস্ত্রবাহিনীর দক্ষিণ-পশ্চিম কমান্ড। এ কমান্ডের উপদেষ্টা হন স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। নির্বাচিত এমএনএ ডা. আসহাব-উল হক (হ্যাবা) প্রধান উপদেষ্টা এবং ব্যারিস্টার বাদল রশিদ এমপিএ ও এ্যাডভোকেট ইউনুস আলী উপদেষ্টা; আর ইপিআর প্রধান মেজর আবু ওসমান চৌধুরী হন এই কমান্ডের অধিনায়ক বা কমান্ডার। সহঅধিনায়কের দায়িত্ব পালন করেন ক্যাপ্টেন এ. আর. আজম চৌধুরী। মেহেরপুরের এসডিও তৌফিক এলাহী চৌধুরী ২৬ মার্চ রাতেই চুয়াডাঙ্গায় এসে মেহেরপুরের প্রস্তুতি এবং কুষ্টিয়া অভিযানের পরিকল্পনার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। বলা যায় প্রতিরোধ যুদ্ধের পরিকল্পনায় নতুন মাত্রা যুক্ত হয় এই আলোচনা থেকে।

স্বাধীনতার প্রথম প্রহর থেকেই মেহেরপুরে মহকুমা প্রশাসকের কার্যালয়টি হয়ে ওঠে প্রতিরোধ আন্দোলন পরিচালনার কন্ট্রোলরুম। প্রকৃতপক্ষে ২৭ মার্চের পর তৌফিক এলাহী চৌধুরী রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষাসহ প্রতিরোধ যুদ্ধ সংগঠনের নানা কাজে ব্যস্ত থাকায় সেকেন্ড অফিসার মতিয়ার রহমানের উপরে মহকুমা প্রশাসনের ভার অর্পণ করেন এবং নিজ কার্যালয়ে টেলিফোন সুবিধাসহ কন্ট্রোলরুম খুলে দেন। এখানে পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করেন এবং সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করেন ইসমাঈল হোসেন, ইদ্রিস মিয়া, শাহাবাজউদ্দীন নিজ্জু, আশকারী পটল, খাদেম, বিশু, মেহেদী, মোজাম্মেল হক প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। এদিকে জলির মিয়ার মিল ঘরে গাংনীর কট্রোলরুম খোলা হলেও টেলিফোনের পাবলিক কল অফিসটিই হয়ে ওঠে যোগাযোগের প্রদান কেন্দ্রস্থল। পোস্ট মাস্টার শামসুদ্দীন মিয়া এখানে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন। পালাক্রমে দায়িত্ব পালন করেন আব্দুর রহমান, জালাল উদ্দীন, ইসমাঈল ডাক্তার, এনামুল হক, আব্দুর রশীদ প্রমুখ নেতৃবৃন্দ।

কুষ্টিয়ার প্রতিরোধ যুদ্ধে অংশগ্রহণের লক্ষ্যে ২৭ মার্চের মধ্যেই মেহেরপুর এবং গাংনী থানার বিভিন্ন গ্রাম থেকে আনসার মুজাহিদ বাহিনীর প্রায় দুই শতাধিক সদস্য সংগ্রহ করে এনে মেহেরপুর আনসার ব্যারাকে সংক্ষিপ্ত প্রশিক্ষণ ও কুচকাওয়াজরে ব্যবস্থা করা হয়। তাদের নিয়মিত খাদ্য সরবরাহের জন্য মেহেরপুরে নিউমার্কেটের মধ্যে একটি ঘরে এবং গাংনীতে জলিল মিয়ার মিলঘরে খোলা হয় খাদ্য সংগ্রহ কেন্দ্র। বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর কর্মীবৃন্দ সংগ্রহ করে চাল-ডাল-ময়দা-গম, গুড়-চিনি-লবণ, তরিতরকারি। সাধারণ মানুষ স্বেচ্ছায় পৌঁছে দেয় বিভিন্ন খাদ্য সামগ্রী। এমনকি গৃহবধূরা পর্যন্ত স্বতঃস্ফ‚র্তভাবে গাছের লাউ শাক সবজি মুরগির ডিম স্বেচ্ছাসেবকদের হাতে তুলে দিয়ে এই অভিযানে অংশগ্রহণ করে।

দশ.

হাফিজুরের মনটা আজ সকাল থেকেই বেশ ভালো।

ভালো ছিল না। ভালো হয়ে গেছে সূর্য ওঠার পরপরই। ঘুম থেকে জেগে উঠেছে ভালো লাগার অনুভূতি নিয়ে। কপালে মায়ের ঠাণ্ডা হাত। সেই হাত চোখে মুখে আদরের পরশ বুলিয়ে দেয়। চোখ মেলবার আগেই হাফিজুর নিজের হাতটা রাখে সেই হাতের উপরে এবং একই সঙ্গে ডেকে ওঠে- মা!

ধরা পড়ে যাওয়া বেকুব চোরের মতো নিজের হাতটা টেনে নেয় মা। আর তখনই ছেলে বলে,

ওঠ খোকা! উঠে পড়। বেলা হয়ে গেল, গাংনী যাবিনে?

স্প্রিং লাগানো পুতুলের মতো দুম করে লাফিয়ে উঠে বসে বিছানার উপরে। মায়ের মুখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,

গাংনী নয় মা, মেহেরপুরে যাব।

যেখানেই যাস তোর আব্বাকে বলে যাস, তাহলেই হবে।

সত্যি বলছ! আব্বা রাগ করবে না তো?

রাগ তো করেনি সে! তোরাই বলছিস- দেশের অবস্থা ভালো না। এ সময়ে ছেলেপিলে রাতে বাড়ি না ফিরলে কার না চিন্তা হয়!

হাফিজুর ব্যাখ্যা দেয়,

আমারও মন খারাপ করেছিল মা। ওই যে তোমার জামাই কিছুতেই ছাড়লো না। সে নাকি কাকে দিয়ে খবর পাঠয়েছিল আব্বার কাছে!

খবর না ছাই! এ সময়ে কে কার খবর রাখে!

আচ্ছা না হয় সেলিম ভাইকে জিজ্ঞেস করো।

আমার কাজ নেই, জামাইকে জিজ্ঞেস করতে যাব। তুই ওঠ দেখি খোকা!

হাফিজুর বলে,

এই তো উঠছি মা। এই যে উঠে পড়েছি।

এভাবেই মায়ের ডাকে মন ভালো হয়ে যায় হাফিজুরের। গত রাতে মন খারাপ হয়েছিল মা-বাবার মন খারাপ দেখে। তাদের না বলে বাড়ির বাইরে রাত কাটানোয় তারা খুব চিন্তিত। এ জন্য পুত্রকে মৃদু তিরস্কারও করেছিলেন মুজিবুর রহমান। তখন না বুঝলেও হাফিজুর এখন পরিষ্কার বুঝতে পারে- বাবার তিরস্কারের মধ্যে ক্ষমারও মিশেল ছিল অনেকখানি।

হাফিজুরের আরেকটু মন খারাপ ছিল নূরু চাচার জন্য। সূর্যখোলা গ্রামের দু’জন আনসার সদস্যের মধ্যে একজন হচ্ছে পাতান আলী, দু’দিন আগে সে গিয়েছে মেয়ের বাড়ি; অন্যজন হচ্ছে এই নূর মোহম্মদ। ধর্মীয় শিক্ষক মুজিবুর রহমান এবং এ রকম দু’তিনজন ছাড়া গ্রামের সবাই নুরু বলে ডাকে। দেশের প্রয়োজনে আনসার বাহিনীর সদস্যদের প্রথমে গাংনীতে এবং পরে মেহেরপুর আনসার-ব্যারাকে একত্রিত হবার জন্য যে আহ্বান জানানো হয়েছে, গত রাতে বাড়ি ফেরার আগে সেই কথাটা বুঝিয়ে বলতে গিয়েছিল হাফিজুর; নূর মোহম্মদ ব্যাপারটা বুঝতেই চায়নি। তার সোজা কথা সে গ্রাম ছেড়ে কোথাও যাবে না। হাফিজুর বুঝাতে চেষ্টা করেছে- কেন ভোটের ডিউটি করতে সাহেবনগর যাওনি চাচা? এমন দৃষ্টান্ত উল্লেখ করায় আরো ক্ষিপ্ত হয় নূর মোহম্মদ। মুখ খিস্তি করে সে বলে বসে- হ্যাঁ, জরুরি কাজের সময় আনসার বাহিনীর খোঁজ হয়, অন্য সময় তো কেউ ফিরেও তাকায় না। তখন আর দাম থাকে না আনসারের।

নূরু চাচার বেদনার জায়গাটা বুঝতে পারে হাফিজুর, কিন্তু দেশের এই দুঃসময়ে সেই অভিমান দেখানো যে ঠিক নয় এই কথাটা কিছুতেই তাকে বুঝানো সম্ভব হয় না। ঘাড়ে হাত রেখে গভীর আন্তরিকতার সঙ্গে বলে হাফিজুর- মায়ের দুর্দশা দেখে কোনো সন্তান মুখ বুঁজে থাকতে পারে চাচা?

নূর মোহম্মদ কাঠে কোপ মেরে দাঁড়িয়ে থাকে। সে যাবে না গাংনী কিংবা মেহেরপুরে। এমনতিতে অত্যন্ত সহজ-সরল মানুষ। কিন্তু এই সরল বুঝটুকু কিছুতেই তাকে বুঝাতে না পেরে মন খারাপ করে বাড়ি চলে আসে হাফিজুর। অথচ সেই মানুষটাই সকাল বেলায় কেমন আমূল বদলে যায়, কত সহজেই বাড়ির উঠোনে এসে বলতে পারে,

কই গো হুজুরের ব্যাটা, চলো তুমার মেহেরপুরে যাই।

হাফিজুর এক লাফে নেমে আসে উঠোনে, তার চোখে অবাক বিস্ময়,

নূরু চাচা, আপনি এত সকালে!

এক গাল হেসে নূর মোহম্মদ বলে,

চলো বাপু গাংনী মেহেরপুর, যিখানে যাবা চলো।

হাফিজুর আনন্দে নেচে ওঠে,

যেতে হবে কুষ্টিয়ায়। যুদ্ধ করতে হবে পাক সেনাদের সঙ্গে। ওরা আমাদের কুষ্টিয়া শহর দখল করে নিয়েছে। এরপর হয়তো মেহেরপুর দখল করবে।

এরই মাঝে উঠোনে পেয়ারাতলায় এসে মুজিবুর রহমান বলেন,

হ্যাঁরে নূরু, পারবি তো পাঞ্জাবিদের সঙ্গে?

নূর মোহম্মদ নির্বিকার ভঙ্গিতে নির্ভয়ে উত্তর দেয়,

পারবু না মানে! আমরা না পারি, আমাদের ছেইলিপিলি পারবে।

উত্তরের দৃঢ়তায় চমকে ওঠেন মুজিবুর রহমান।

সাবাস নূর মোহম্মদ! তোর দোস্ত পাতান আলী কই?

আমাক ফাঁকি দিয়ি সে শালা আগেই চইলি গিয়িচে মেহেরপুরে।

এবার হাফিজুর অবাক হয়,

পাতান চাচা তো গেছে মেয়ের বাড়ি!

নূর মোহম্মদ ফোঁস করে ওঠে,

হ্যাঁ! খোঁজ ন্যাওগা দিনি মেয়ির বাড়ি! আমাক ফাঁকি দিয়ার জন্যি সে আগেই হাজির। আমি তাকে চিনি নি!

এরপর আর কথা না বাড়িয়ে নূর মোহম্মদকে সঙ্গে নিয়ে হাফিজুর বেরিয়ে পড়ে।

সন্ধ্যার আগেই বাড়ি ফেরার কথা বারবার মনে করিয়ে দেয় তার মা-বাবা। পথে নেমে মাকে নিয়ে নয়, বাবাকে নিয়েই বিশেষ ভাবনা হয়- এত চেনা এত জানা এই মানুষটিকেই যেন পুরোপুরি জানা হলো না তার। এতদিন যত কঠোর অভিভাবক মনে হতো, এখন তাও আর মনে হয় না।

গাংনী এসে পৌঁছুনোর পর জানা গেল, বিভিন্ন গ্রামে ছড়িয়ে থাকা আনসারদের মধ্যে প্রায় ৩০/৩৫ জন এখানে একত্রিত হয়েছিল বটে, মাত্র কয়েক মিনিট আগে চিৎলা ফার্মের ট্রলি এসে তাদের নিয়ে গেছে মেহেরপুরে। সারাদিনে আরো কিছু আনসার মুজাহিদ জড়ো হলে দিনের শেষে তাদেরও নিয়ে যাওয়া হবে মেহেরপুর আনসার ব্যারাকে। আপাতত কন্ট্রোলরুমের সামনে এসে তাদরে অপেক্ষা করতে হবে পরবর্তী আহ্বানের জন্য। না, এত অপেক্ষার মানুষ নূর মোহম্মদ নয়, সারাদিন গাংনীতে বসে থাকতে পারবে না, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সে মেহেরপুরে পৌঁছুতে চায়।

গাংনীতে প্রতিরোধ আন্দোলন পরিচালনার কন্ট্রোলরুম বলতে বাজারের মাঝখানে জলিল মিয়ার পরিত্যক্ত মিল ঘরকেই বুঝায়। সহসা সেটা হয়ে উঠেছে খাদ্য গুদাম। প্রতিরোধ যোদ্ধাদের আহারের জন্য বিভিন্ন গ্রাম থেকে চাল ডাল গম আটা ক্ষেতের শাকসবজি ঘরে পোষা মুরগি এবং মুরগির ডিম পর্যন্ত নিয়ে এসে জমা করেছে স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর সদস্যেরা। এ সব কাজে তাদের আনন্দের এবং উৎসাহের শেষ নেই। হাফিজুরেরও খুব ইচ্ছে করে সূর্যখোলার স্বেচ্ছাসেবকদের সঙ্গে নিয়ে এই খাদ্য সংগ্রহ অভিযানে ঝাঁপিয়ে পড়তে। তার এই ইচ্ছের কথাটি নূরু চাচাকে জানাতেই তারা মুখ উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে অন্যরকম আলোয়। সে অত্যন্ত আনন্দের সঙ্গে জানায়, তার উঠোনের মাচায় লতিয়ে ওঠা লাউ গাছে বেশ ক’টা লাউয়ের জালি এসেছে, হাফিজুর যেন দুটো লাউ ছিঁড়ে এনে এইখানে জমা দেয়।

কাঁধে বন্দুক ঝুলিয়ে সেলিমকে কন্ট্রোলরুমের দিকে আসতে দেখে হাফিজুর খুবই অবাক হয়, সে কথা আবার মুখের উপরে বলেও ফেলে,

কী ব্যাপার সেলিম ভাই, যুদ্ধ কি শুরু হয়ে গেল নাকি?

তা তো হয়েছেই, কিন্তু কেন বলো তো!

কাঁধে বন্দুক ঝুলছে…

(চলবে)

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj