আহসান হাবীব >> স্বীয় স্বাতন্ত্র্যে মহিমান্বিত

শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০১৯

এক সাহিত্য শিল্পী : নীতিন রায়

ঝরা পালকের ভস্মস্ত‚পে তবু বাঁধলাম নীড়,

তবু বারবার সবুজ পাতার স্বপ্নেরা করে ভিড়।

তবু প্রত্যহ পীত অরণ্যে শেষ সূর্যের কণা,

মনের গহনে আনে বারবার রঙের প্রবঞ্চনা।

(এই মন -এ মৃত্তিকা)

‘ঝরা পালকের ভস্মস্ত‚পে’ নীড় বাঁধার স্বপ্ন নিয়ে ত্রিশ দশকে বাংলার কবিতাঙ্গনে যে কবির আবির্ভাব অগণিত পাঠককে চমকিত করেছিল- তাঁর নাম আহসান হাবীব। উজ্জ্বল গৌরবর্ণের শান্ত সৌম্য প্রচারবিমুখ এই বরেণ্য কবি জন্মগ্রহণ করেছিলেন তৎকালীন বরিশাল জেলার পিরোজপুরের শংকরপাশা গ্রামে ২ ফেব্রুয়ারি, ১৯১৭ সালে এক সাধারণ পরিবারে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন কবিতানুরাগী। লোকসাহিত্য ও পুঁথি থেকে শুরু করে মীর মশাররফ হোসেনের তাবৎ রচনাবলির এক মনস্ক পাঠক। আর্থিক টানাপড়েনে ব্রজমোহন কলেজে ছাত্র জীবনের আকস্মিক ইতি টেনে যেদিন তিনি মহানগরী কলকাতার উদ্দেশে যাত্রা করলেন, ঠিক সেদিন থেকেই তাঁর সাহিত্যময় কর্মজীবনের দীর্ঘ পথপরিক্রমার সূচনা।

১৯৩৭ সাল। কলকাতায় কিছুদিন বেকার জীবনযাপনের পর যোগ দিলেন ‘দৈনিক তকবীর’ পত্রিকায়। মাসিক সতেরো টাকা বেতনে সহকারী সম্পাদকের কাজ। এরপর যুক্ত হন ‘বুলবুল’, ‘সওগাত’ পত্রিকায়, এমনকি আকাশবাণী কলকাতা কেন্দ্রে। দেশ বিভাগের পর আহসান হাবীব স্থায়ীভাবে ঢাকায় চলে আসেন। একে একে জড়িত হন বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়- ‘দৈনিক আজাদ’, ‘দৈনিক ইত্তেহাদ’, ‘সাপ্তাহিক প্রবাহ’ ইত্যাদি। ১৯৫৭ থেকে ১৯৬৪ সালে অবধি তিনি যুক্ত ছিলেন ফ্রাঙ্কলিন পাবলিকেশনে, এরপর ১৯৬৪ থেকে ১৯৮৫ সাল পর্যন্ত ‘দৈনিক পাকিস্তান’ (পরবর্তীকালে দৈনিক বাংলা) পত্রিকায়।

বাংলা সাহিত্যে ত্রিশ ও চল্লিশ দশক নানা তাৎপর্যে দীপ্যমান। ভারতীয় উপমহাদেশের সাম্প্রদায়িক বিভেদ, শ্রেণি চেতনা বাংলা সাহিত্যে এক নব দিগন্তের সূচনাকারী। সেই যুগ সন্ধিক্ষণে বাংলা কবিতাঙ্গনে আহসান হাবীবের চমকিত আবির্ভাব। তৎকালীন বাংলা সাহিত্যের প্রধান উপজীব্য হিসেবে একদিকে ধর্মীয় ঐতিহ্যানুরাগ অপরদিকে শ্রেণি সচেতনতা- দুটি বিপরীত কাব্যধারা সৃষ্টি করেছিল। আহসান হাবীব ও কতিপয় সাহিত্যকর্মী এই দ্বিবিধ ধারার বাইরে একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যময় সাহিত্য শিল্প নির্মাণে ব্রতী হয়েছিলেন।

জীবনভর সাহিত্যকে নিবিড়ভাবে আঁকড়ে ধরেছিলেন আহসান হাবীব। কবিতা শিল্পে তিনি ছিলেন যেমন নিবেদিত প্রাণ, তেমনি মানবতাবাদী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর অবিভক্ত বাংলার দুর্ভিক্ষ পীড়িত বিপন্ন গণমানুষের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করে পুঁথির আঙ্গিকে তিনি রচনা করেন ‘ছহি জঙ্গেনামা’-

কোথায় লড়াই হয় রাজায় রাজায়

ধানের মরাই মোর খালি হয়ে যায়।

খালি হয়ে গেল মোর চালভরা জালা

বন্ধক পড়েছে কবে বাটি আর থালা।

সোনার সংসার মোর হলো ছারখার

একমাত্র পুত্র গেল, মা-জননী তার

গেল সেই পুত্র শোকে। হুজ্জত সরদার

আমি একা বেঁচে আছি গজব খোদার।

চল্লিশ দশকে এই ভূখণ্ডে মহামারী, মন্বন্তর ও সাম্প্রদায়িক বিভাজনে আহসান হাবীব মোটেও নিরাশ হননি, কখনো আশ্রয় নেননি হতাশার অন্ধকার বিবরে। এ সবুজ ভূখণ্ডে মাটি ও মানুষকে ভালোবেসে তিনি সর্বদা ন¤্র ও নির্ভীক কণ্ঠে গেয়েছেন জীবনের জয়গান। রসজ্ঞ পাঠকের হৃদয়ে প্রজ¦লিত করেছেন অমিত আশার প্রদীপ।

আছে শুধু হাতের মশাল

আছে এই নগ্ন শির বিবর্ণ উলঙ্গ এই ভাল।

আমাদের রক্তে আছে পাদপিষ্ট রক্তের ছোঁয়াচ!

আমাদের অস্থি ঘিরে আছে এক নতুনের ছাঁচ। (কয়েদি)

ব্যক্তি জীবনে আহসান হাবীব যেমন নির্মোহ ছিলেন, কবিতার ভুবনেও তেমনি রচনা করেছেন এক স্বপ্নিল আশার জগৎ। তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থের নাম ‘রাত্রি শেষ’। গ্রন্থটির নামকরণের মধ্যেই ফুটে উঠেছে কবির আশাবাদী মনের স্পষ্ট পরিচয়। ক্রমান্বয়ে প্রকাশিত হয়েছে তার অন্যান্য কাব্যগ্রন্থ- প্রান্তিক, প্রতিভাস, পদক্ষেপ, ছায়া হরিণ, সারা দুপুর, আশায় বসতি, মেঘ বলে চৈত্রে যাবো, দুহাতে দুই আদিম পাথর এবং প্রেমের কবিতা। আহসান হাবীবের প্রতিটি কাব্যগ্রন্থে ফুটে উঠেছে মানুষের নিরন্তর জীবন সংগ্রাম ও জয়যাত্রার আশাবাদী প্রতিচ্ছবি।

বিশের দশক থেকে এ যাবৎ বাংলা সাহিত্যে প্রগতি চেতনায় অনুপ্রাণিত হয়ে যাঁরা কাব্য রচনা করেছেন আহসান হাবীব তাঁদের অন্যতম। শিল্প শিল্পের জন্য নয়, শিল্প যে মানুষের জন্য এই ধারণাটি স্পষ্টত প্রতিফলিত হয়েছে তাঁর সাহিত্য সমগ্রে।

শুধু কবিতা নয়, সাহিত্যের অন্যান্য ক্ষেত্রও তাঁর অবাধ পদচারণায় মুখরিত হয়েছে। আহসান হাবীবের উপন্যাস আরণ্য নীলিমা ও জাফরানী রং পায়রা সুধী পাঠক মহলে বিপুল সাড়া জাগিয়েছিল।

কিশোর কবিতা ও ছড়ার জগতে আহসান হাবীবের অবদান অনস্বীকার্য। কিশোরদের জন্য রচিত তাঁর গ্রন্থাবলি জ্যোৎ¯œা রাতের গল্প, ছুটির দিন দুপুরে প্রসঙ্গত উল্লেখ্য। শিশু-কিশোরদের প্রতি তাঁর ¯েœহ, মায়া, মমতায় উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে তাঁর অনেক কবিতা।

কার না মনে আছে, সেই চমৎকার ছন্দে রচিত কিশোর কবিতাটি-

আমি মেঘনা পাড়ের ছেলে

আমি মেঘনা নদীর নেয়ে।

মেঘনা নদীর ঢেউয়ের বুকে

তালের নৌকা বেয়ে

আমি বেড়াই হেসে খেলে,

আমি মেঘনা পাড়ের ছেলে।

শুধু সাহিত্য শিল্প সৃষ্টিতে নয়, সাহিত্য সম্পাদনার ক্ষেত্রে আহসান হাবীবের নৈপুণ্য ও নিরপেক্ষতা অবিস্মরণীয়। লেখা ও লেখক শনাক্তকরণে তিনি ছিলেন এক অসাধারণ সম্পাদক। তাঁর শান্ত-সৌম্য ব্যক্তিত্বের গভীরে ছিল তারুণ্যের উদ্দীপনা। তিনি ছিলেন একদিকে তরুণদের প্রতিযোগী, অন্যদিকে তরুণদের প্রেরণা। পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর ও আশির দশকের অনেক প্রথিতযশা কবি ও কথাশিল্পীর প্রথম লেখাটি তাঁর সম্পাদিত সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়েছে।

ষাট দশকে তৎকালীন সামরিক শাসক নিয়ন্ত্রিত ‘দৈনিক পাকিস্তান’ পত্রিকায় নানা প্রতিক‚ল পরিস্থিতিতে শুদ্ধ ও শৈল্পিক কবিতা, গল্প কিংবা প্রবন্ধ নিয়ে সাহিত্য সাময়িকীর পাতায় তিনি কোনোদিন কোনো পক্ষপাতিত্ব ও আপস করেননি।

১০ জুলাই ১৯৮৫ বাংলা সাহিত্যের এই চিরতরুণ নিভৃতচারী কবি ইহলোক ছেড়ে চলে যান। না, সত্যিকার অর্থে তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যাননি, যেতে পারেন না। কবি আহসান হাবীব আজো বেঁচে আছেন আমাদের হৃদয়ে, বাংলা সাহিত্যামোদী বিদগ্ধ পাঠকের অন্তরের অন্তস্থলে। তার মন বেঁধে আছে স্বদেশের মাটি ও মানুষের সাথে- এ দেশের নদী-নালা, গাছ-পালা ও প্রকৃতির সাথে। সংকটাপন্ন স্বদেশ ও নিজের সমস্যাসংকুল জীবনকে অন্তরঙ্গভাবে ভালোবেসে কবি নিজেই বলেছেন-

‘প্রেমহীন সেই বন্ধুর দেশে নীড় বাঁধলাম তবু,

এই মন আর এ মৃত্তিকায় বিচ্ছেদ নাই কভু।’

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj