ড্রেজিং বন্ধ, আধুনিকায়ন না করা : বরিশালে একে একে বন্ধ হচ্ছে অভ্যন্তরীণ লঞ্চ চলাচল রুট

শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০১৯

এম মিরাজ হোসাইন, বরিশাল থেকে : এক সময় বরিশাল অভ্যন্তরীণ নৌপথে যাতায়াতের অন্যতম মাধ্যম ছিল লঞ্চ। তবে নদীপথ ড্রেজিং ও লঞ্চগুলো আধুনিকায়ন না করায় আর সড়কপথ ভালো হয়ে যাওয়ায় লঞ্চের যাত্রী সংখ্যা কমে গেছে। এর ফলে অতীতের ২৬টি রুটের মধ্যে একে একে ১৫টি রুটে লঞ্চ চলাচল বন্ধ হয়ে গেছে। আর এসব রুট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেশি সমস্যায় পড়েছেন প্রত্যন্ত অঞ্চলে যাতায়াতকারী যাত্রীরা।

লঞ্চ মালিক সমিতির তথ্যে জানা গেছে, ১৫ বছর আগেও বরিশাল অভ্যন্তরীণ নৌবন্দর থেকে দক্ষিণাঞ্চলের ২৬টি রুটে চলাচল করত যাত্রীবাহী একতলা লঞ্চ। কালক্রমে ১৫টি রুট বন্ধ হয়ে এখন ১১টি রুট টিকে আছে। এসব রুটে চলাচল করছে ৩৬টি লঞ্চ। এর মধ্যে বরিশাল-ভোলা রুটে ১৩টি ও বরিশাল-পাতারহাট রুটে ৯টি, কালিগঞ্জে ২টি, হিজলায় ২টি, বরগুনায় ২টি, চরকমলী ২টি, লালমোহন ২টি, লক্ষীপুর রুটে ২টি এবং অপর ২টি রুটে ১টি করে লঞ্চ চলাচল করেেছ।

এক সময় যেখানে বরিশাল-বরগুনা রুটে ৮টি লঞ্চ চলাচল করত সেখানে এখন চলছে একটি মাত্র লঞ্চ। এভাবে পটুয়াখালী, ঝালকাঠী, পিরোজপুর, বাগেরহাট, গলাচিপা, পাথরঘাটা, কালাইয়া, চরবিশ্বাস ও চরদেওয়ানীসহ মোট ১৫টি রুট বন্ধ হয়ে গেছে। আর এসব রুট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ২০টিরও বেশি লঞ্চ ঘাটে বসে আছে।

বরিশাল নদী বন্দর ঘুরে জানা গেছে, একসময় নদীপথে অনেক লঞ্চ যাত্রী হলেও বর্তমানে যাত্রী সংখ্যা কমে গেছে। ষাট দশকের কাঠের নির্মিত লঞ্চগুলো স্টিলে রূপান্তরিত করা হয়েছে। যাত্রীসেবায় তেমন কোনো আধুনিকায়নের ছোঁয়া নেই লঞ্চগুলোতে। যার মধ্যে ৬৫ ফুটের কম দৈর্ঘ্যরে লঞ্চ রয়েছে কয়েকটি। মেয়াদোত্তীর্ণ এসব লঞ্চ বর্ষার নদী উত্তাল থাকলে ঝুঁকির মধ্যে চলতে হয় যাত্রীদের। তেল খরচ বেশি হয় বলে মালিকদের নির্দেশে লঞ্চগুলোর ইঞ্জিনের হর্স পাওয়ার কমিয়ে চালানো হয়। এতে করে লঞ্চগুলো চলে ধীরগতিতে। নদীর বিভিন্ন স্থানে ডুবোচর জেগে ওঠায় অহরহ আটকে যায় লঞ্চ। এর ফলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকে অধৈর্য হয়ে ওঠে যাত্রীরা। তাই খরচ বেশি হলেও বেছে নিচ্ছে সড়কপথ। এ কারণে লঞ্চের যাত্রী সংখ্যা ক্রমেই কমছে।

এদিকে বরিশাল নদী বেষ্টিত ও দ্বীপাঞ্চল হওয়ায় যাতায়াতের সুবিধার তালিকায় রয়েছে লঞ্চ। কম খরচে গন্তব্যে পৌঁছার অন্যতম এই মাধ্যম লঞ্চরুট বন্ধ হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন প্রত্যন্ত অঞ্চলের যাত্রীরা। বর্তমানে জেলা ও উপজেলা সদরের সঙ্গে সড়কপথে যাতায়াত কিছুটা ভালো হলেও বন্ধ হয়ে যাওয়া নৌরুটগুলোতে যাতায়াতকারী প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষজনকে খেয়া নৌকা, ট্রলার ও স্পিডবোটে করে এবং হাঁটাপথে গন্তব্যে পৌঁছতে হচ্ছে। তবে এসব রুট পুনরায় চালু করতে হলে লঞ্চগুলোকে আধুনিকায়নের পাশাপাশি দ্রুত চলার উপযোগী করতে হবে বলে মনে করছেন যাত্রীরা। মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার কালীগঞ্জ রুটের যাত্রী জামাল খা জানান, লঞ্চগুলো খুব ধীরগতিতে চলে। গন্তব্যে পৌঁছতে ৫ ঘণ্টারও বেশি সময় ব্যয় হয়। এতে করে আমাদের সময়ের অপচয় বেশি হয়। তাই খরচ বেশি হলেও ভিন্ন কোনো পথ ব্যবহার করি। ভোলার যাত্রী সোবাহান বলেন, এখানকার একতলা লঞ্চগুলো আকারে অনেক ছোট। বর্ষায় নদী উত্তাল থাকে বলে ভয়ের মধ্যে থাকি। তাই খরচ বেশি হলেও সড়কপথের কাটা লাইনে চলে যাই।

পারিজাত লঞ্চের মাস্টার মো. নজরুল ইসলাম জানান, বর্তমানে ভোলা ও পাতারহাটের রুটে সবচেয়ে বেশি লঞ্চ চলাচল করছে। আর এই দুটি রুটের পাতার হাট রুটের মাছকাটা নদীর চরছিপুলি ও সাদেকপুর নামক স্থানে এবং ভোলা রুটের বিশ্বাসের হাট ও সাহেবের হাটের দুটি পয়েন্টে ডুবোচরের কারণে লঞ্চ চলাচলে বেশি সমস্যা হয়। এসব স্থানে ড্রেজিং না করায় লঞ্চ চরে আটকে যায় এবং মাঝেমধ্যে লঞ্চের পাখা ভেঙে যায়। যার ফলে নির্ধারিত সময়ে গন্তব্যে পৌঁছতে পারে না লঞ্চগুলো। এসব সমস্যার কারণে যাত্রীরা বিরক্ত হয়ে সড়কপথ বেছে নেয়।

শ্রীপুর লঞ্চ কোম্পানির ম্যানেজার আব্দুস ছাত্তার জানান, তাদের কোম্পানির ৫টি লঞ্চ রয়েছে। বিভিন্ন সময় রুটগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ২টি লঞ্চ ঘাটে অলস পড়ে আছে। বর্তমানে তিনটি লঞ্চ চলাচল করলেও প্রতি ট্রিপে ৭০ থেকে ৮০ জনের বেশি যাত্রী হয় না। সে ক্ষেত্রে কোনো কোনো দিন খরচ শেষে লোকসান গুনতে হয়। এমভি সুপারসনিক লঞ্চের মালিক স্বপন খান জানান, সচল রুটগুলো চালু রাখতে দ্রুত ক্ষমতাসম্পন্ন আধুনিক লঞ্চ নামানোর পরিকল্পনা মালিকদের আছে।

সম্প্রতি বরিশাল-লক্ষীপুর রুটের পারিজাত নামে আধুনিক ও দ্রুত ক্ষমতাসম্পন্ন নতুন লঞ্চটি ব্যবসা সফল হচ্ছে। পর্যায়ক্রমে আরো লঞ্চ নামানো হবে। তবে নদীগুলো ড্রেজিং না করা এবং অবৈধভাবে স্পিডবোট ও ট্রলারে করে যাত্রী বহন লঞ্চ ব্যবসায়ীদের একটি বড় বাধা বলে জানান তিনি।

বিআইডব্লিউটিএর বন্দর কর্মকর্তা আজমল হুদা মিঠু বলেন, বিআইডব্লিউটিএ নতুন পন্টুনসহ অন্যান্য উন্নত অবকাঠামো করে দিয়েছে। চলমান রুটগুলো সচল রাখতে এবং বন্ধ হয়ে যাওয়া রুটগুলো পুনরায় সচল করতে মালিক পক্ষ থেকে আরো দ্রুতগামী লঞ্চ নিয়ে এলে আমরা ব্যবস্থা করে দেব। আর যেসব রুটে ডুবোচর আছে তা শনাক্ত করে ড্রেজিং করে দেয়া হবে।

এই জনপদ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj