স্বপ্নের শেষ বিন্দু : রোমেনা আফরোজ

শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০১৯

বাবার জীবনযাপন দেখে মনে হতো, তিনি নিশাচর পাখি। সবাই ঘুমিয়ে গেলে, মধ্যরাতে কলিংবেলের বাজ পড়া শব্দ। সেই শব্দে জেগে উঠতাম আমি এবং দিদা। কাজের মেয়ে বুলবুলিও। কিন্তু দায়িত্বটুকু একনিষ্ঠভাবে পালন করতেন মা। এরপর কথাকাটাকাটি। গালিগালাজ। দুপক্ষই সমানে সমান। কেউ নীরবতা শিখেনি। ছোটবেলা থেকে অনুভব করেছি, এ ভাষা সবাই আত্মস্থ করতে পারে না। মাঝে মাঝে জিনিসপত্র ভাঙচুরের আওয়াজ পেতাম। কদাচিৎ গায়ে হাত তোলার শব্দ। সেই শব্দ শুনে মনে হতো, যেন আমাকেই প্রহার করা হচ্ছে। অনবরত। দীর্ঘস্থায়ী। সে রাতে ঘুম হতো না। বিছানায় ছটফট করতাম। এপাশ ওপাশ। তারপরের কয়েকদিন মা আমার চোখে চোখ রাখতে পারতেন না। একটা লজ্জা। আড়ষ্টতা। লজ্জা থেকে বাঁচতে এবং বাঁচাতে আমার অবস্থান দূরে দূরে।

মা-বাবার সাথে একটা দূরত্ব সব সময় বিদ্যমান ছিল। তাই দিদার সাথে গড়ে উঠেছিল বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। ছোটবেলায় দিদার মুখে মুক্তিযুদ্ধের অনেক ঘটনা শুনেছি। তিনি বলতেন, তখন যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। চারদিকে থমথমে অবস্থা। প্রতিটি বাড়ি থেকে কেউ না কেউ ট্রেনিং নিতে ভারতে যাচ্ছে। সবার একটাই স্বপ্ন। একটাই চিন্তা, যে কোনোমতে দেশকে স্বাধীন করা। এ ভিন্ন অন্য কোনো স্বপ্নের কথা মানুষ জানতো না। আমাদের দক্ষিণ ঘরে মুক্তিযোদ্ধারা অস্ত্র লুকিয়ে রাখতো। তোর দাদা বিষয়টা পছন্দ করতেন না বলে তাদের জন্য লুকিয়ে লুকিয়ে রান্না করতাম আমি। অস্ত্রের খবর পেয়ে কিনা কে জানে, একদিন বাড়িতে পাকিস্তানিরা এল। তখন তোর বড় চাচা ঢাকায়। রঞ্জুকে না পেয়ে ওরা সিদ্ধান্ত নিল, তোর দাদাকে ধরে নিয়ে যাবে। এ কথা শুনে বুঝে নিলাম মানুষটা আর আমাদের মধ্যে ফিরবে না। এই শেষ দেখা। সবাই হাউমাউ করে কান্না করছি। আমাদের শত অনুরোধ, অনুনয় উপেক্ষা করে মানুষটাকে ধরে নিয়ে গেল ওরা। সাথে গেল তোর বাবাও। অনেক চেষ্টা করেও সেদিন মঞ্জুকে ফেরাতে পারিনি। ও বাবার সাথে যাবেই। বাড়ি থেকে একটু দূরে নিয়ে গিয়ে পাকিস্তানিরা তোর দাদার চোখ বেঁধে ফেললো। একটা বিশাল ছুরি নাকি ছেনি হাতে কালো দৈত্যের মতো একজন জল্লাদ অপেক্ষা করছে। অন্যপাশে দুজন মানুষ মঞ্জুকে আটকে রেখেছে যাতে কাজে বাধা দিতে না পারে। ছেলেটা বাবার কাছে ছুটে যেতে চায়। কিন্তু ছোট বলে শক্তিতে কুলিয়ে উঠতে পারছে না। অবশেষে জল্লাদ আদেশ পেল। এতক্ষণ মানুষটার মনে আশা ভরসার যে নৌকা দুলছিল নিমিষে সব বন্ধ। তিনি শেষবারের মতো উচ্চারণ করলেন, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ। সেদিন ঐ দোয়ার বরকতেই তিনি বেঁচে গেছেন। জল্লাদ নাকি তিন তিনবার ঘাড়ে কোপ বসাতে চেয়েছিল। কিন্তু পারেনি। তার হাত অবশ হয়ে যাচ্ছিল। বারবার ছেনি পড়ে যাওয়ায় জল্লাদ ভয় পেয়ে কমান্ডারকে বলেছিল, এ লোক নিশ্চয় আল্লাহর নেককার বান্দা। একে আমি হত্যা করতে পারবো না।

দিদার বেশিরভাগ গল্প বিয়ের পরের। অভিমান এবং আক্ষেপ থেকে অনেক গল্পের জন্ম হয়। আমারও অনেক গল্প আছে। এসব গল্প মানুষ সহজে ভুলতে পারে না। ইদানীং সেই গল্পগুলোকে মনে হয় ধূসর বর্ণের। মলিন। ওগুলোতে বাস্তবতার রঙ দেয়া অসম্ভব। ছোটবেলা থেকে যখনই তুলি ধরতে গেছি তখনই ক্যানভাসে কয়েকটি ধূসর রঙ ঘুরেফিরে আসে। কৃষ্ণচূড়ার লাল রঙ হয়ে যায় ফিকে। পাতার রঙ কালো। কৃষ্ণচূড়া গাছের ডানপাশে বিশাল মাঠ, একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাঠের মধ্যখানে। একা একা। আকাশে অনেক মেঘ। কালো বৃষ্টি। ক্লাসে আমার কোনো বন্ধু কিংবা বান্ধবী নেই। ছিলও না। সম্ভবত কালো বলে সবাই এড়িয়ে যায়। আমার জন্য অপেক্ষা করে একাকীত্বের মন্ত্র পাঠ করা শেষ বেঞ্চটি। সেখানে গিয়ে চুপচাপ বসে থাকি। পড়ালেখার দিকে মনোযোগ নেই। প্রতিবারই টেনেটুনে পাস করা। এ কারণে কিছুদিন পর পর প্রাইভেট টিউটর পাল্টে যায়। কিন্তু ফলাফল একই। জানতাম আমাকে দিয়ে কিছুই হবে না। আমার কোনো স্বপ্ন নেই। স্বপ্নের পথঘাট জলে এবং কাদায় পরিপূর্ণ।

দিদার মৃত্যুর পর থেকে মা-বাবা আর আগের মতো ঝগড়া করেন না। তাঁদের মধ্যে এখন ঠাণ্ডা যুদ্ধ। মাসে এক কি দুবার বাবা নিয়ম করে বাড়ি মাথায় তোলেন। সে আগুনে কেরোসিন ঢেলে দেন মা। তাঁদের ঝগড়ার মূল প্রতিপাদ্য আমার গায়ের কালো রঙ। দুজনের পরিবারের সবাই ফর্সা। এ নিয়ে শুধু যে তাদের মনেই ক্ষোভ বিরাজ করে তা নয়। দুদিকের আত্মীয়-স্বজন, ভাইবোনেরাও একটু দূরত্ব বজায় রাখে। দেয়াল টপকে দু’একজন মিশতে চায়। কিন্তু মুরব্বিদের গুঞ্জন বাধা দেয়। তবে কেউই সরাসরি কিছু বলে না। এই নীরবতা সম্ভবত বাবার টাকা-পয়সার বদৌলতে। আমার মনে হয়, মা-বাবা কথা কাটাকাটির মধ্যে এক ধরনের শান্তি খুঁজে পান। ঝগড়া না করলে তাঁরা বোধহয় মারাই যেতেন। বাকবিতণ্ডার সময় আমি নিজের মধ্যে গুটিয়ে থাকি। তাঁদের এক একটি বর্ণ, কণ্ঠের উঠানামা, চিৎকার, রাগের সাক্ষী একমাত্র আমি। মাত্র নয় বছর বয়সে জেনেছি, আমি বাবার মেয়ে নই। প্রথমদিকে ওসব দুর্বোধ্য ঠেকতো। বাবা কী করে বাবা থাকেন না অথচ মা মা-ই থেকে যান সে রহস্য উদঘাটিত হয়েছিল অনেক পরে। যেদিন কিশোরী হলাম সেদিন ধীরে ধীরে সব টের পেয়েছি। বাকি কাজটুকু রাকিব স্যারের।

সেবার সপ্তম শ্রেণিতে উঠেছি। রেজাল্ট খারাপ দেখে বাবা আবার শিক্ষক পাল্টে দিলেন। ভর্তির দ্বিতীয় মাসে তলপেটে প্রচণ্ড অস্বস্তি। ব্যথা। একটু একটু রক্ত যাচ্ছে। জীবনের প্রথম রঙ। তারপর থেকে আমার ক্যানভাসগুলোতেও রঙ চড়ছে। লাল কৃষ্ণচূড়া। সবুজ বন। কিশোরী মেয়ের হাতে রঙিন ছাতা। সেই ছবি দেখে রাকিব স্যার বললেন, কী রে, বড় হয়ে গেলি নাকি? কথাটার মধ্যে তেমন কোনো বিশেষত্ব ছিল না। অথচ এক আকাশ পরিমাণ পুলক রাঙিয়ে দিল। অজান্তেই বেদখল হয়ে গেল পুরো শরীর। দিদা বেঁচে থাকলে এসব বুঝতেন। তাঁর মৃত্যুর পর থেকে আমি একা। যেন গৃহহীন পাখি। একটা খড়কুটো কিংবা ঝরাপাতা। রাকিব স্যারের আগমনে প্রথম আনন্দের ছোঁয়া লাগে। সে এক অলীক জগত। বাবা-মায়ের অগোচরে ছাদে যাচ্ছি। চাঁদের জলে গা ভেজাই। বেসুরে গান। ভুলভাল নাচের মুদ্রা। ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ঘোরাঘুরি। মাসখানেক পরে প্রথম সাময়িক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হলো। তার এক সপ্তাহ পর ফল প্রকাশ। আমি বেশিরভাগ বিষয়ে অকৃতকার্য। এমনকি আগে যেসব বিষয়ে মোটামুটি পাস করেছি সেগুলোতেও খারাপ। এমন বিপর্যয়ের ব্যাপারে আমি প্রস্তুত ছিলাম। তবে রেজাল্ট পেয়ে মা-বাবা সন্ধ্যা থেকে যুদ্ধ করছেন। এসব নতুন নয়। তবুও কখনোই কেন জানি মানিয়ে নিতে পারি না!

আজ রাকিব স্যারের আসতে দেরি হচ্ছে। উনি এলে ক্লান্তিকর অবস্থা থেকে ক্ষণিক মুক্তি পাওয়া যেতো। কিছুটা সময় স্বপ্নের জগত। কোলাহল থেকে মুক্তি। দরজা ভিড়িয়ে দিয়ে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালাম। ওপাশে সন্ধ্যা নামছে। দুঃস্বপ্নের মতো ঘন কালো অন্ধকার। বাতাসকে ভর করে একটা দুটো শব্দ ঘরের ভেতর আলগোছে ঢুকে যাচ্ছে।

-মেয়েটা একেবারে তোমার মতো…

-কী বলতে চাও তুমি? স্পষ্ট করে বল…

-আমার মেয়ে হলে বুদ্ধিটা শান দেয়া হতো।

-সে তো বুঝতেই পারছি। তবে ভেবো না, রাত-বিরেতে কী কর সেটা টের পাই না…

কয়েকদিন ধরে নতুন যন্ত্রণায় অস্থির হয়ে আছি। পিরিয়ডের দশদিন পার হলেও দেখা নেই। এমন কখনোই হয়নি। এই প্রথম কেমন জানি গা গুলাচ্ছে। বমি বমি ভাব। খেতে ইচ্ছে করে না। খালি ঘুম পায়। আর স্বপ্ন। পরামর্শ চাইবার মতো কেউ নেই। কী করবো, কার কাছে যাবো, কিছুই বুঝে উঠতে পারছি না। এমন সময় কলিং বেলের শব্দ পেলাম। রাকিব স্যার প্রবেশ করতে বুঝলাম, মন খারাপ। আমার দিকে একটিবার তাকালেন না পর্যন্ত।

-আপনাকে অমন দেখাচ্ছে যে?

-বাড়িতে বিয়ের কথাবার্তা চলছে।

কথাটা শুনে বিস্মিত হলাম। বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো। কিছু না ভেবে বললাম, আমার কী হবে?

এ প্রশ্ন শুনে রাকিব স্যার এমনভাবে তাকালেন যেন ঘোরতর পাপ করেছি।

-তোমার কী হবে মানে? বিভা, আমার পরিবার তোমাকে কখনোই মেনে নেবে না। আমার বড় দুই ভাইয়ের জন্য মা ফর্সা বউ এনেছেন। আমার বেলায়ও তিনি অন্যথা হতে দেবেন না। এ কথার পরিপ্রেক্ষিতে কী বলা যায় বুঝতে না পেরে চুপ থাকি। পাথরের মতো। আমার বুক ভেঙে যাচ্ছে। যেন সদ্য অঙ্কুরিত স্বপ্নের চারাগাছগুলোকে কেউ বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে। বাবা-মায়ের যুদ্ধ এখনো থামেনি। চলছে। অবিরাম। বৃষ্টির মতো। দরজার ওপাশ থেকে বিভিন্ন ইঙ্গিত তীরের মতো বিদ্ধ করছে।

আর চোখের সামনে প্রতারকের ভঙ্গিমায় বসে আছে প্রথম পুরুষ।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj