বাজেট, স্বপ্ন ও মোদির রাজনীতি

শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০১৯

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্পর্কে রটনা যে উনি এমন কিছু করে দেখাতে চান যাতে দেশের লোক বহু বছর ধরে মনে রাখে। মনে রাখানোর জন্য মোদির হাতে আর বেশি সময় নেই। এখন ওনার বয়স ৬৯ ছুঁই ছুঁই। বিজেপির নিয়মে ৭৫ বছর বয়সে দল ও সরকারে ক্ষমতা থেকে সরে আসতে হবে। অর্থাৎ ২০২৪-এর নির্বাচনে বিজেপি জিতলেও প্রধানমন্ত্রী হবেন অন্য কেউ। কিন্তু ওনার চেষ্টার ত্রুটি নেই। গত পাঁচ বছরে মোদির মূল কাজ ছিল, দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য যেসব প্রকল্প বা প্রস্তাব বছরের পর বছর ধরে ঝুলছিল তার রূপায়ণ। দেশজুড়ে এক কর ব্যবস্থা (জিএসটি) চালু করা; ব্যাংকের ঋণখেলাপ রুখতে আইন প্রণয়ন করা কিংবা রাস্তা, গ্যাস, রেল ইত্যাদি পরিকাঠামো গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব জোর; তারই উদাহরণ।

বিরোধীরা এ কারণেই বলতেন মোদি নতুন কিছু করেনি। ঠিকই বলতেন। জিএসটি তো সেই ২০০০ সাল থেকে ঝুলছিল। আসামে বগিবিল ব্রিজ কিংবা মিয়ানমারে রাস্তা, বন্দর গড়ার প্রস্তাব দুই দশকের পুরনো। কিন্তু ভোটের ফল বলছে, লোকে ঘোষণাবাজ নেতার থেকে কাজ করে দেখানো নেতাকে বেশি পছন্দ করে।

দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় এসে মোদির লক্ষ্য দেশের অর্থনীতিকে নতুনভাবে গড়ে তোলা আর তার প্রমাণ পাওয়া গেল এ মাসের পাঁচ তারিখে পেশ করা বাজেটে। আপাতভাবে দেখলে এ বাজেটে কোনো আহামরি ঘোষণা নেই। থাকার কথাও নয়। বাজেট মানে আগামী বছরে সরকার কীভাবে আয়-ব্যয় করবে, তার হিসাব। উদারীকরণের আগে, সরকার সরাসরি উৎপাদনে অংশগ্রহণ করত আর জোগান নিয়ন্ত্রণ করত। তাই বাজেটের গুরুত্ব ছিল অপরিসীম। উদার অর্থনীতিতে উৎপাদন বাজারের হাতে। সরকারের কাজ দিকনির্দেশনা আর সেটা বাজেট ছাড়াই করা যায়। তবুও বাজেট নিয়ে জনমানসে একটা আগ্রহ থেকেই যায়।

আগেরবারের মতোই, পরিকাঠামো উন্নয়ন, গ্রামীণ অর্থনীতি, নতুন ধরনের ছোট উদ্যোগ (স্টার্ট-আপ), স্বাস্থ্য, শিক্ষা ইত্যাদিতে গুরুত্ব চলবেই। ভারত টেকনোলজির দুনিয়ায় পিছিয়ে আছে। গণ্ডা গণ্ডা টোকা পিএইচডির থেকে দেশের এখন দরকার টেকনোলজিতে পেটেন্ট। গবেষণা খাতে ব্যয়কে তাই ছাঁকনিতে ফেলা হবে।

সবার পছন্দ হবে না হয়তো, কিন্তু টাকার জোগান যদি কম থাকে, তাহলে জরুরি আর কম-জরুরির প্রভেদ তো করতেই হবে। না হলে দেশের ছেলেমেয়ে বিদেশে গিয়ে গবেষণা করবে আর শিল্পের রাশ থাকবে আমেরিকা কি চীনের হাতে। আমরা যে তিমিরে আছি, সেখানেই থাকব। সেলসম্যানের চাকরি বরাদ্দ। মোদি এ জায়গাটাতেই বদল আনতে চান। এটা জানা যে ভারত শিল্পক্ষেত্রে চীনের থেকে পিছিয়ে আছে। এর মূল কারণ হলো, পরিকাঠামো ও টেকনোলজির অভাব।

সারা পৃথিবীতেই রাস্তা, ব্রিজ তৈরিতে বেসরকারি পুঁজি আসতে চায় না, কারণ লাভ আসতে অনেক দেরি হয়। বুলেট ট্রেন সরকারি ভর্তুকিতে চলে। লাভ হয় রপ্তানি থেকে। আর রপ্তানি বাড়াতে হলে নিত্যনতুন টেকনোলজি চাই। সে টেকনোলজি আবিষ্কার করতেও কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা লাগে। বারবি ডল ইকোনমিক্স দিয়ে এ যুগে বেশি দূর এগোনো যাবে না।

এখানেই বিসমিল্লায় গলদ। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ভারত ৩৩০ বিলিয়ন ডলার মূল্যের রপ্তানি করেছে। উল্টোদিকে আমদানির পরিমাণ ৫১৪ বিলিয়ন ডলার, যার ১১২ বিলিয়ন ডলার গেছে তেল আমদানি করতে। এরপর আছে, যুদ্ধের অস্ত্রশস্ত্র কেনার খরচ। দুটো যদি বাদ দেয়া যেত, তাহলে দেশের বাণিজ্য ঘাটতি থাকে না। বাণিজ্য ঘাটতি না থাকলে সরকারকে দেশের লোকের কাছ থেকে ধার নিয়ে সংসার চালাতে হয় না। ধার নেয়ার চাহিদা কম থাকলে, সুদের হার কমে যায় ফলে উৎপাদনের খরচা কমে, চীনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এঁটে ওঠা যায় আর ইচ্ছে করলেই খরচা করা যায়।

মোদি সরকার এই জায়গাতেই ঘা দিতে চাইছেন। একদিকে যেমন সামরিক বাহিনীর অস্ত্র কেনার হার বেড়েছে, অন্যদিকে অস্ত্র কোম্পানিদের বাধ্য করা হয়েছে, ভারত থেকে যন্ত্রাংশ আমদানির হার বাড়াতে বা দেশে এসে উৎপাদন করতে। অর্থাৎ হয় ডলারের চাহিদা কমাব বা ডলারের জোগান বাড়াব। ভারত যেহেতু বড় খরিদ্দার তাই এই ওষুধে কাজও হচ্ছে। রপ্তানি বাড়ানোর আরো নানা পরিকল্পনা সরকারের আছে। এবারের বাজেটে যেমন ভারতকে প্লেন ভাড়া নেয়া ও লিজের জন্য ঋণ পাওয়ার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। সাধারণত বিমান সংস্থারা বিদেশ থেকে ডলার দিয়ে প্লেন ভাড়া নেয়। ভারত হিসাবটা উল্টাতে চাইছে।

এ রকম আরো পরিকল্পনার মধ্যে সবথেকে বড় যেটা সেটা হলো, ইলেক্ট্রিক বা ব্যাটারিচালিত গাড়িকে জনপ্রিয় করা। ভারতের পরিকল্পনাকারী সংস্থা নীতি আয়োগ আগেই বলে দিয়েছে ২০২৫ পরে তেলে চলা দু-চাকার বাহন তৈরি করা যাবে না। গাড়ির ক্ষেত্রে এই সময়সীমা ২০৩০ সালে বেঁধে দেয়া হয়েছে।

লক্ষণীয় এবারের বাজেটে ব্যাটারি গাড়ির ক্ষেত্রে বিরাট কর ছাড় দেয়া হয়েছে আর তেলের ওপর বাড়তি কর বসানো হয়েছে। সরকারের উদ্দেশ্য দুটো তেল আমদানি কমানো আর ভারতকে ব্যাটারি গাড়ির সবথেকে বড় উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা। বলে রাখা দরকার, নানা অপ্রাপ্তির মধ্যেও ভারত কিন্তু বিশ্বে ছোট গাড়ি তৈরির সবথেকে বড় কেন্দ্র।

শেষ করার আগে একটু রাজনীতির কথা বলা দরকার। বাজেট পেশ করতে গিয়ে ভারতের প্রথম মহিলা অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন বলেছেন, সরকারের লক্ষ্য পাঁচ বছরে দেশের জিডিপি ২.৭ ট্রিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ৫ ট্রিলিয়ন ডলার করা। জিডিপিতে সাধারণ মানুষের কি এসে যায় জানা নেই, তবে হিসাব বলছে বছরে ৭% প্রবৃদ্ধি হলেই এই লক্ষ্য পূরণ সম্ভব। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর মতো মোদিবিরোধীরা অবশ্য সেকথা মানতে রাজি নন। তারা নিয়মমাফিক বাজেটকে লক্ষ্যহীন বলেছেন।

যেটা বিরোধীরা খেয়াল করলেন না, তা হলো ২০১৯-এ মোদির অভূতপূর্ব জয় এসেছে বদলে দেয়ার স্বপ্নের হাত ধরেই। নতুন ভোটার আর গরিবিতত্ত্বে তেমন উৎসাহ পাচ্ছে না। তারা টিভি, মোবাইলে, চীনের উন্নতির যে ছবি দেখছে, নিজের দেশেও তাই চায়। যে দল তাদের মতো স্বপ্ন দেখবে, সেই দলই ২০২৪-এ এগিয়ে থাকবে।

প্রতিম বসু

লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
মুসাহিদ উদ্দিন আহমদ

বায়ুদূষণ নীরবে কেড়ে নেয় প্রাণ

মোস্তাফা জব্বার

ডিজিটাল বাংলাদেশ ২.০

অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান

সমৃদ্ধির চতুর্দশ বর্ষপূর্তি

অধ্যাপক ড. মীজানুর রহমান

ছাত্ররাজনীতির সেকাল একাল

মুহম্মদ জাফর ইকবাল

ছাত্ররাজনীতি

মাহমুদুর রহমান মানিক

সঠিক পথে চলুক ছাত্ররাজনীতি

মাহমুদুল হক আনসারী

বুয়েটে শিক্ষার পরিবেশ ফিরুক

Bhorerkagoj