সিলেট, সুনামগঞ্জ, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে নি¤œাঞ্চল প্লাবিত

শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০১৯

কাগজ ডেস্ক : কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেট, সুনামগঞ্জ, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবানে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। রাস্তাঘাট, জনপদ, হাট-বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। টানা বৃষ্টির কারণে নি¤œ আয়ের মানুষরা বিপাকে পড়েছেন। পানিবন্দি হয়ে আছেন হাজার হাজার মানুষ। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পাঠদান বন্ধ রয়েছে। এ সম্পর্কে আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো রিপোর্ট-

সিলেট : গত কয়েকদিন থেকে টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা ঢলে পানি বেড়েছে পিয়াইন ও সারি নদীতে। এ কারণে গত বুধবার সন্ধ্যা থেকে উপজেলার নি¤œাঞ্চলগুলোতে পানি বৃদ্ধি পেতে থাকে। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেল পর্যন্ত উপজেলার পূর্ব জাফলং, আলীরগাঁও, রুস্তমপুর, ডৌবাড়ী, লেংগুড়া, তোয়াকুল ও নন্দীরগাঁও ইউনিয়নের অধিকাংশ গ্রামের রাস্তাঘাট ও বাড়িঘর প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া গোয়াইনঘাট উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ সড়ক তলিয়ে গেছে। ফলে উপজেলা সদরের সঙ্গে এসব এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা এক রকম বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

অপরদিকে পাহাড়ি ঢলের তোড়ে উপজেলার নয়াগাঙ্গের পাড় ও বাউরবাগ হাওর গ্রামের নদী তীরবর্তী বসতবাড়ি ভাঙনের কবলে রয়েছে। পাশাপাশি এই এলাকার নদীর তীর সংরক্ষণ ও ফসলি জমি রক্ষায় বেড়িবাঁধগুলোও রয়েছে হুমকির মুখে।

গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ^জিত কুমার পাল বলেন, উপজেলার বন্যা পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক মনিটরিং করা হচ্ছে। ইতোমধ্যেই বিভিন্ন ইউনিয়নে বন্যার্তদের মধ্যে বিতরণের জন্য ত্রাণ পৌঁছে দেয়া হয়েছে। এ ছাড়া বন্যাকবলিত এলাকার ক্ষয়ক্ষতির বিবরণ তুলে ধরে প্রয়োজনীয় আরো ত্রাণসামগ্রীর জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বার্তা পাঠানো হবে।

সুনামগঞ্জ : অব্যাহত ভারি বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে জেলার ৫ উপজেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। রাস্তাঘাট, জনপদ, হাট-বাজারসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণ মানুষ। টানা বৃষ্টির কারণে নি¤œ আয়ের মানুষরা বিপাকে পড়েছেন। ঢল ও বর্ষণে জেলার ১৮৮টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পানি প্রবেশ করেছে। ওই সব বিদ্যালয়ে পাঠদান কার্যক্রম সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। আরো শতাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের স্কুলে পাঠাচ্ছেন না অভিভাবকরা।

এদিকে জেলার সবগুলো প্রধান নদ-নদীসহ সীমান্ত নদীগুলোর পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। গত ৩ দিনের টানা ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জ সদর উপজেলা, বিশ^ম্ভরপুর, তাহিরপুর, ধর্মপাশা ও দোয়ারাবাজার, জামালগঞ্জ উপজেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

পাউবো সূত্রে জানা গেছে, গত তিন দিনের টানা ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের প্রধান নদী সুরমা, কুশিয়ারাসহ সবকটি নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সুনামগঞ্জের সুরমা নদীর পানি বিপদসীমার ৯৭ সে.মি. উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল।

গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ১৪৭ মি.মি বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বৃষ্টিপাত ও ঢল অব্যাহত থাকায় পানি বৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। ফলে বন্যা প্রকট আকার ধারণ করতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

নদীতে পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ইতোমধ্যে জেলা সদরের পৌরসভাসহ বিভিন্ন উপজেলার নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হয়েছে। সুনামগঞ্জ-তাহিরপুর-বিশ^ম্ভরপুর ডুবন্ত সড়ক গত ৩ দিন ধরে ডুবে আছে। ফলে যান চলাচল বন্ধ আছে এসব সড়কে। পানিতে ভেসে গেছে সদর উপজেলা, দোয়ারাবাজার, বিশ^ম্ভরপুর উপজেলার ৪ শতাধিক পুকুরের মাছ। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন মৎস্যচাষিরা।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য প্রতি উপজেলায় কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। তা ছাড়া বন্যা মোকাবেলায় প্রশাসনের সব প্রস্তুতি রয়েছে বলে জানিয়েছেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা করে মাঠ প্রশাসনকে প্রস্তুত থাকতে বলেছেন তিনি। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, পরিস্থিতি মোকাবেলায় জেলায় ৩ লাখ টাকা, ২০০ টন চাল এবং ৩ হাজার ৮০০ প্যাকেট শুকনো খাবার মজুদ আছে। আরো ১০ লাখ জিআর টাকা ও ৩০০ টন জিআর চালের জন্য ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছেন বলে জানান জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ আবু বকর সিদ্দিক ভঁ‚ইয়া বলেন, ঢল ও বর্ষণে নদ-নদীর পানি বাড়ছে। আগামী ২-৩ দিন বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকবে।

তাহিরপুর (সুনামগঞ্জ) : তাহিরপুর উপজেলায় নতুন করে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। তাহিরপুর-সুনামগঞ্জ সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে প্রায় ১০ দিন ধরে। শতাধিক গ্রামের মানুষ পানিবন্দি হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। এসব এলাকার গ্রামীণ ছোট ছোট রাস্তাঘাট, ব্রিজ, কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে উপজেলা সদরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

রাঙ্গামাটি : রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন বাঘাইছড়ির ৬টি গ্রামের এক হাজার মানুষ। বারিবিন্দু ঘাটের বন্যানিয়ন্ত্রণ বাঁধের আংশিক ক্ষতি হয়েছে। এদিকে বৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে কাপ্তাই হ্রদের পানির উচ্চতা বেড়ে ৮৩ এমএসএল (মিনস সি লেভেল) অবস্থান করছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় প্রতিনিয়ত পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে।

উপজেলা প্রশাসন থেকে ২৪টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আহসান হাবিব জিতু জানান, তুলাবান, বারিবিন্দুঘাট, মধ্যম ডেবারপাড়া, মুসলিম ব্লুক, পুরান মারিশ্যা, মাস্টারপাড়া বটতলী এলাকার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। এলাকাগুলোতে খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে আশ্রয়কেন্দ্র খোলার পর প্রায় ৩০০ মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। অনেকেই আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছেন।

বাঘাইছড়ি পৌরসভার মেয়র জাফর আলী খান জানান, পৌরসভার অনেক এলাকায় মানুষ পানিবন্দি রয়েছেন। টিউবওয়েলগুলো ডুবে যাওয়ায় খাবার পানির সংকট দেখা দিয়েছে। উপজেলা প্রশাসন থেকে আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে। যারা আশ্রয়কেন্দ্রে আসবেন তাদের খাবারের ব্যবস্থা করা হবে। বাঘাইছড়ি উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আহসান হাবিব জিতু বলেন, বৃষ্টি না কমলে আরো অনেক এলাকা প্লাবিত হতে পারে। নদীতে ¯্রােতের কারণে ত্রাণ এখনো পৌঁছায়নি। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা নিজ নিজ আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে খাবারের ব্যবস্থা করছেন। পৌর এলাকার আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে বাজার থেকে খাবার কিনে সরবরাহ করা হচ্ছে।

থানচি (বান্দরবান) : বান্দরবানে থানচি উপজেলায় নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। উপজেলা সদরের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ থাকায় স্কুল-কলেজে যাওয়া বন্ধ রয়েছে শিক্ষার্থীদের। উপজেলা প্রশাসন ও উপজেলা পরিষদ যৌথভাবে থানচি সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও বলিবাজার উচ্চ বিদ্যালয়ে ২টি আশ্রয়কেন্দ্র খুলেছে। ওই সব আশ্রয়কেন্দ্রে চাল, ডাল, চিনিসহ যাবতীয় খাদ্যসামগ্রী বিতরণ অব্যাহত রয়েছে।

ধোবাউড়া (ময়মনসিংহ) : ধোবাউড়ায় টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বন্যা দেখা দিয়েছে। এতে উপজেলার ৭টি ইউনিয়নের মধ্যে দক্ষিণ মাইজপাড়া, গামারীতলা, পোড়াকান্দুলিয়া, ঘোষগাঁও, গোয়াতলা এবং ধোবাউড়া সদর ইউনিয়ন বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া উপজেলার বাঘবেড় ইউনিয়নের কিছু অংশেও বন্যার পানি প্রবেশ করেছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে ৩ শতাধিক পরিবার। উপজেলা চেয়ারম্যান ডেভিড রানা চিসিম বলেন, আমি বন্যাদুর্গত এলাকা পরিদর্শন করেছি, পানিবন্দি মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নেয়ার এবং ত্রাণের ব্যবস্থাও করা হচ্ছে।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj