শেয়ারবাজারের ৩৭ মিউচুয়াল ফান্ড : সম্পদ ব্যবস্থাপকের পোয়াবারো বিনিয়োগকারীর প্রাপ্তি শূন্য

শুক্রবার, ১২ জুলাই ২০১৯

ওবায়দুর রহমান : পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের শেয়ারবাজারের অন্যতম শক্তিশালী খাত হচ্ছে মিউচ্যুয়াল ফান্ড। ঝুঁকিহীন বিনিয়োগে সর্বোচ্চ লভ্যাংশ প্রাপ্তির নিশ্চয়তায় পেনশনভোগী থেকে শুরু করে সব শ্রেণির মানুষই দেদার বিনিয়োগ করেন নানা ধরনের মিউচ্যুয়াল ফান্ডে। এমনকি টিভিতেও হরহামেশা প্রচারিত হয় মিউচ্যুয়াল ফান্ডের বিজ্ঞাপন। অথচ বাংলাদেশের পরিস্থিতি পুরো উল্টো। সম্পদ ব্যবস্থাপকদের অদক্ষতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার খামখেয়ালিপূর্ণ সিদ্ধান্তের কারণে দেশের সবগুলো মিউচ্যুয়াল ফান্ডের অবস্থাই এখন শোচনীয়। সঠিকভাবে বিনিয়োগ না করায় যথাযথ মুনাফা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে ফান্ডগুলো। ফলে বিনিয়োগকারীদের কাক্সিক্ষত লভ্যাংশ দিতে পারছে না তারা। তবে সম্পদ ব্যবস্থাপকদের তাতে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। নিট সম্পদের ওপর সম্পদ ব্যবস্থাপকদের ফি নির্ধারিত থাকায়, ফান্ডের লোকসান হলেও ফি বাবদ তাদের আয় থেমে থাকে না। এমতাবস্থায় সম্পদ ব্যবস্থাপকদের কার্যক্রমের সঠিক মূল্যায়নের পাশাপাশি ফান্ডের ব্যবসায়িক পারফরমেন্সের ওপর তাদের ফি নির্ধারণ করা উচিত বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।

সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের মিউচ্যুয়াল ফান্ড বিধিমালা ২০১১ অনুযায়ী, ফান্ডের নিট সম্পদের পরিমাণ ৫ কোটি টাকার মধ্যে হলে, সম্পদ ব্যবস্থাপক সর্বোচ্চ ২.৫ শতাংশ ফি নিতে পারবে। এ ছাড়া নিট সম্পদ ২৫ কোটি টাকার মধ্যে হলে ৫ কোটি টাকার অতিরিক্ত অংশের জন্য ২ শতাংশ, নিট সম্পদ ৫০ কোটি টাকার মধ্যে হলে ২৫ কোটি টাকার অতিরিক্ত অংশের জন্য ১.৫ শতাংশ এবং নিট সম্পদ ৫০ কোটি টাকার অতিরিক্ত অংশের জন্য ১ শতাংশ ফি নিতে পারবে।

শেয়ারবাজার বিশ্লেষক আবু আহমেদ বলেন, ব্যবসায় কোনো পারফরম না করেও সম্পদ ব্যবস্থাপকরা অফিসে গিয়ে বসে বসে ফি নেবে- এটা ঠিক না। অবশ্যই পারফরমেন্সের ওপরে ফি নির্ধারণ করা উচিত। কিন্তু বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এন্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) বিনিয়োগকারীদের স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে অ্যাসেট ম্যানেজারদের স্বার্থে আইন-কানুন করেছে। তারা তদবিরের কাজ করে। কমিশনের এই খামখেয়ালিপনার জন্য মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগকারীদের কোনো আস্থা নেই। এখন আর কেউ মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ করে নতুন করে ডুবতে চায় না।

দেখা গেছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিক (জানুয়ারি-মার্চ) শেষে তালিকাভুক্ত ৩৭টি ফান্ডের নিট মুনাফা হয়েছে ২১১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা। এই মুনাফা অর্জনে সম্পদ ব্যবস্থাপকের ফি বাবদ খরচ হয়েছে ৫৯ কোটি ৩১ লাখ টাকা। যা নিট মুনাফার ২৮ শতাংশ। এর মধ্যে ভ্যানগার্ড এএমএল রূপালী ব্যাংক ব্যালেন্সড ফান্ডের লোকসান হলেও সম্পদ ব্যবস্থাপক ভ্যানগার্ড অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট ঠিকই নির্ধারিত ফি পেয়েছে। ফান্ডটিতে সম্পদ ব্যবস্থাপক কোনো দক্ষতা দেখাতে না পারা সত্ত্বেও তার আয়ে কোনো সমস্যা হয়নি।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশের প্রথম প্রাইভেট অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি এইমস অব বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইয়াওয়ার সায়ীদ বলেন, সম্পদ ব্যবস্থাপকের পারফরমেন্সের ওপরে ফি নির্ধারণ হওয়া উচিত। যে ভালো পারফরম করবে সে বেশি পাবে, যে কম পারফরম করবে সে কম পাবে। তাহলে সবার মধ্যে ভালো ব্যবসা করার তাগিদ আসবে। আর এখন তো মুনাফা না করলেও বসে বসে ফি পাওয়া যায়। এটা ঠিক না। এ নিয়ে অনেকবার কমিশনে আলাপ-আলোচনা হয়েছে। কিন্তু কোনো লাভ হয়নি। তিনি আরো বলেন, মুনাফার তুলনায় ম্যানেজম্যান্ট ফি ২৮ শতাংশ হওয়াটা অনেক বেশি। এ ক্ষেত্রে কোনো ফান্ড হয়তো অনেক বেশি মুনাফা করেছে, কোনটি হয়তো লোকসান করেছে। যাতে গড়ে ২৮ শতাংশ হয়েছে। যদি পারফরমেন্সের ওপরে ফি নির্ধারিত হতো, তাহলে ফান্ডগুলোর মুনাফা আরো বেশি হতো। এ কারণেই পারফরমেন্সের ওপরে ফি নির্ধারণ করা উচিত।

এদিকে বিনিয়োগকারীদের আস্থার তলানিতে অবস্থান করায় এখন পানির দরে পাওয়া যাচ্ছে মিউচ্যুয়াল ফান্ডের ইউনিট। তালিকাভুক্ত ৩৭টি ফান্ডের মধ্যে ৩১টির ইউনিট দর অভিহিত মূল্যের নিচে। এর মধ্যে ৭টির দর ৪ টাকার ঘরে রয়েছে। শুধু তাই নয়, গত দুই বছরের আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়- ৩৭টি মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে বিনিয়োগকারীদের জন্য ২-৩ শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে ২৩টি ফান্ডের ব্যবস্থাপকরা। দুই শতাংশ লভ্যাংশ দিয়েছে এমন মিউচ্যুয়াল ফান্ডের মধ্যে রয়েছে- ফার্স্ট জনতা ব্যাংক মিউচ্যুয়াল ফান্ড, এবি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচ্যুয়াল ফান্ড, ইবিএল মিউচ্যুয়াল ফান্ড, ইবিএল এনআরবি মিউচ্যুয়াল ফান্ড, এক্সিম ব্যাংক মিউচ্যুয়াল ফান্ড। বাকি কয়েকটি ফান্ড ব্যবস্থাপকরা বিনিয়োগকারীদের কোনো লভ্যাংশই দেয়নি। যার কারণে সস্তা হওয়ার পরও বিনিয়োগকারীদের মধ্যে মিউচ্যুয়াল ফান্ড নিয়ে আগ্রহ নেই। আগে যারা বিনিয়োগ করেছেন কাক্সিক্ষত লভ্যাংশ না পেয়ে তারাও হতাশ হয়ে পড়েছেন।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj