সবার মাঝে থেকেও লাবলু ছিল ব্যতিক্রম : ভোরের কাগজ স্মরণসভায় সহকর্মীরা

বৃহস্পতিবার, ১১ জুলাই ২০১৯

কাগজ প্রতিবেদক : তার বসার আসনটি শূন্য পড়ে আছে। আলো জ্বলছে না টেবিলের কম্পিউটার মনিটরে। নিউজরুমে নেই বিচরণ। তবুও তাকে অনুভব করে গুমরে কাঁদছে সবাই। ডেস্কে বসে কাজ করতে গিয়ে অনেকেই বেখেয়ালে তাকাচ্ছে তার চেয়ারের দিকে। ভাবছে এখনই বুঝি ডাক দেবেন তিনি। কিন্তু কোথাও তার দেখা নেই। তার হাঁকডাকও নেই। কঠিন সত্য হচ্ছে- তিনি আর নেই। না নিউজরুমে, না গোটা অফিসের অন্য কোথাও। তিনি ভোরের কাগজের প্রধান প্রতিবেদক সৈয়দ আখতারুজ্জামান সিদ্দিকী লাবলু। তার মৃত্যুর পরে গত দুদিনে নিউজরুমের চেহারাটা ছিল এমনই।

গতকাল বুধবার বিকেলে ভোরের কাগজের বোর্ডরুমে যে শোকসভার আয়োজন করা হয়েছিল সেখানেও ছিল শূন্যতা আর প্রিয়জন হারানোর বেদনা। প্রিয় সহকর্মীদের অনেকেই তার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। কেউ কেউ আবার মাঝ পথে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেড়ে থেমে যান। স্মরণসভায় ভোরের কাগজ সম্পাদক শ্যামল দত্ত বলেন, এই বোর্ডরুমে লাবলুকে নিয়ে অনেক মিটিং করেছি। আজ আমরা সেই বোর্ডরুমেই আছি। শুধু লাবলু আমাদের মাঝে নেই। আছে ছবি হয়ে। এটা আমাদের কাছে খুবই কষ্টের ও বেদনার। লাবলু সম্পর্কে বলতে গেলে বলতে হয়, পৃথিবীতে কিছু মানুষ থাকে যারা সামগ্রিকভাবে চাল-চলন, আচার-ব্যবহার ও ব্যক্তিগত জীবনে অন্যদের থেকে ব্যতিক্রম থাকে। লাবলু ছিল তেমনই একজন মানুষ। যাকে কখনো উচ্চৈঃস্বরে কথা বলতে দেখিনি। এটা ঠিক, সবারই একদিন মৃত্যু হবে, কিন্তু লাবলুর এ মৃত্যু ভুলার মতো না।

শ্যামল দত্ত আরো বলেন, লাবলু স্বল্পভাষী থাকায় অনেকেই ওর সম্পর্কে জানে না। লাবলু এক বর্ণাঢ্য পরিবারের সন্তান। কিন্তু ওর জীবনে এর কোনো প্রতিচ্ছবি ছিল না। এমনকি বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স এসোসিয়েশনের মতো সংগঠনের ৬ বার সভাপতি থাকার পরও অতি সাধারণ জীবনযাপন করত। থাকত একটি বাড়ির চিলেকোঠায়। অথচ ইচ্ছা করলেই ও অনেক কিছু করতে পারত। যা হোক, গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালনের কারণে লাবলু যদি কারো মনে কষ্ট দিয়ে থাকে, তাহলে তাকে ক্ষমা করে দেবেন। কারণ সেটা সে করেছে প্রতিষ্ঠানের স্বার্থেই।

লাবলুর অসুস্থকালীন পাশে থাকার জন্য সব সহকর্মী, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, তার প্রেস সচিব এহসানুল করিম হেলাল, দিল্লির প্রেস মিনিস্টার ফরিদ হোসেনসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন তিনি।

বার্তা সম্পাদক ইখতিয়ার উদ্দিন কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমরা সবাই ভারাক্রান্ত হৃদয়ে এখানে হাজির হয়েছি। কারণ কেউই লাবলুর মৃত্যু মেনে নিতে পারছি না। আমাদের হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে। তবে দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, লাবলু দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকায় এমন পরিস্থিতির জন্য আমরা প্রস্তুত ছিলাম।

স্মৃতিচারণ করে তিনি আরো বলেন, লাবলু খুবই উচ্চ মনের অধিকারী এবং সৎ ছিলেন। অফিসের বাইরেও সবাইকে আড্ডায় মাতিয়ে রাখতেন। খেলাধুলায়ও অনেক ভালো ছিলেন। সবারই উচিত হবে লাবলুর গুণাবলি নিজের জীবনে প্রতিফলন ঘটানোর।

প্রয়াত আখতারুজ্জামান লাবলুর স্ত্রী এরিনা সুলতানা শিল্পী কাঁদতে কাঁদতে বলেন, আমি ভোরের কাগজের সবার কাছে চিরকৃতজ্ঞ। বিশেষ করে সম্পাদক ও বার্তা সম্পাদকের কাছে। আপনারা সবাই লাবলুর জন্য দোয়া করবেন। লাবলুর মতো একজনকে জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়ে আমি ধন্য… বলেই আবেগাপ্লত হয়ে পড়েন তিনি। তার কান্নায় ভারী হয়ে ওঠে পুরো বোর্ডরুম।

মফস্বল সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুল মোতালেব বলেন, লাবলু সাংবাদিক জগতে কী ছিলেন তা আগে বুঝতে পারিনি। তার মৃত্যুর পর বুঝেছি আসলে কী হারিয়েছি। ভোরের কাগজের কোনো সদস্য তার কাছে সহযোগিতার জন্য গিয়ে ফিরে আসেনি। আমারও অনেক বড় উপকার তিনি করেছেন। এই পরোপকারী মানুষটার অসুস্থ সময়ে পাশে দাঁড়ানোর জন্য সম্পাদকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। আশা করি ভবিষ্যতে এটি অব্যাহত থাকবে।

প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা ও অর্থ ব্যবস্থাপক মো. আবদুল করিম সোহাগ বলেন, ১৪ বছর লাবলু ভাইয়ের সঙ্গে কাজ করেছি। সব সময় তার সহযোগিতা পেয়েছি। দিল্লি থেকে চিকিৎসা নিয়ে ফিরে লাবলু ভাই আমাকে বলেছিলেন, সুস্থ হয়ে যাচ্ছি। আমিও ভেবেছিলাম তিনি সুস্থ হয়ে যাবেন। কিন্তু সেটা আর হলো না। সবাই তার জন্য দোয়া করবেন।

বিজ্ঞাপন ব্যবস্থাপক এস এম এ রাজ্জাক বলেন, দৈনিক কৃষাণ পত্রিকায় থাকতে আমি লাবলুকে চিনি। ও খুবই বিনয়ী ও পরোপকারী ছিল। অফিসের কাজে সর্বোচ্চ চেষ্টা করত। ভোরের কাগজকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করার বিষয়ে আলোচনা করলে এক বাক্যে হ্যাঁ বলত। তিনি আরো বলেন, লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে কয়েক বছর আগে আমার এক ছোট ভাই মারা যায়। এরপর থেকে যখনই লাবলুকে দেখতাম আমার ছোট ভাইয়ের কথা মনে পড়ত।

প্রশাসনিক ব্যবস্থাপক সুজন নন্দী মজুমদার বলেন, আমরা বিভিন্ন সময়ে অফিসের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে তার কাছে গিয়েছি। তিনি সমাধান করে দিয়েছেন। তার বিদেহি আত্মার শান্তি কামনা করি।

যুগ্ম সম্পাদক মুকুল শাহরিয়ার কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ১৯৯৮ সালে লাবলু ভাইয়ের সঙ্গে পরিচয়। তখনই সবার কাছে শুনতাম তিনি খুব পরোপকারী। যার প্রমাণ কিছু দিন পরেই পেয়েছিলাম। ২০০৪ সালে তিনি ভোরের কাগজে যোগদানের পরে আরো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়। আমি ইচ্ছে করেই অসুস্থ-ভগ্ন স্বাস্থ্যের লাবলু ভাইয়ের দিকে খুব একটা তাকাতাম না। একই কারণে হাসপাতালে দেখতে যাইনি। কারণ আমি পুরনো স্মৃতি নিয়ে বাঁচতে চাই। সুঠাম দেহী পরিশ্রমী সাংবাদিক লাবলু ভাইকে ভালোবেসে যেতে চাই।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক কামরুজ্জামান খান বলেন, লাবলু ভাইয়ের সঙ্গে ভোরের কাগজের আগে থেকে আমার পরিচয়। তিনি ভোরের কাগজে যোগদানের প্রথম দিনেই আমাকে নিয়ে কর্মপরিকল্পনা ঠিক করেন। এরপর সাংগঠনিক ও পারিবারিক জীবনে তার সঙ্গে সম্পর্ক আরো গভীর হয়। এক কথায় আমার পরিবারের একজন অভিভাবকও ছিলেন তিনি। শেষবার তাকে হাসপাতালে দেখতে গেলে তিনি বলেছিলেন, সুস্থ হলে আমার বাসা সাভারে ঘুরতে যাবেন। কিন্তু সে সৌভাগ্য আর হলো না… বলে আবেগাপ্লত হয়ে পড়েন তিনি।

জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক খোন্দকার কাওছার হোসেন বলেন, লাবলু ভাইয়ের সঙ্গে এত স্মৃতি যে অল্প সময়ে তা বলে শেষ করা যাবে না। শুধু এটুকু বলব, আমার পাশের চেয়ারেই বসতেন তিনি। অফিসে এসে তার সঙ্গে দেখা হলেই আগে বলতেন, আজ কী কী নিউজ আছে। গুরুত্বপূর্ণ নিউজের ক্ষেত্রে বার্তা সম্পাদকের সঙ্গে আলাপ করতে বলতেন। এর বাইরেও ব্যক্তিগত জীবনে তার সঙ্গে মধুর সম্পর্ক ছিল… বলেই কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।

প্রতিবেদক আছাদুজ্জামান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, সম্পাদকের নির্দেশে আমি সবসময় লাবলু ভাইয়ের সঙ্গে থাকার চেষ্টা করেছি। দিল্লিতেও গিয়েছিলাম। তিনি সবসময় আমাকে ভাইয়ের মতো দেখতেন, অনেক ভালোবাসতেন। অনেক সময় মনোমালিন্য হতো। পরে মাথায় হাত বুলিয়ে সব ভুলিয়ে দিতেন।

উল্লেখ্য, লিভার ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে গত ৮ জুলাই সোমবার রাত ১০টার দিকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সৈয়দ আখতারুজ্জামান সিদ্দিকী লাবলু। পরের দিন তিন দফা জানাজা শেষে রাজধানীর আজিমপুর কবরস্থানে তাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj