চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতায় চরম দুর্ভোগে লাখো মানুষ : বান্দরবানের সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ এখনো বিচ্ছিন্ন

বৃহস্পতিবার, ১১ জুলাই ২০১৯

চট্টগ্রাম অফিস : বর্ষা মৌসুমে গত কয়েকদিন ধরে প্রায় একটানা মাঝারি ও তুমুল বৃষ্টিতে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম ও জেলার বিভিন্ন স্থানে জলাবদ্ধতায় চরম দুর্ভোগে রয়েছেন লাখো মানুষ। নগরীর কোনো কোনো এলাকা থেকে পানি নামলেও বাকলিয়া, হালিশহর, আগ্রাবাদের কোথাও কোথাও হাঁটু পানিতে তলিয়ে আছে। দুপুরে ভারী বৃষ্টিপাতে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ফ্লাইট ওঠানামার কাজও চরমভাবে ব্যাহত হয়েছে। অবশ্য বিকেলে তা স্বাভাবিক হয়ে আসে। বঙ্গোপসাগর উত্তাল থাকায় এবং বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে অবস্থানরত পণ্যবাহী বড় জাহাজগুলো থেকে কোনো পণ্য সরবরাহ করতে পারেনি লাইটারেজ (ছোট) জাহাজগুলো।

এদিকে পাহাড়ি ঢলে চট্টগ্রাম-বান্দরবান সড়কের বাজালিয়ায় সড়কের ওপর দিয়ে পানি প্রবাহিত হওয়ায় দ্বিতীয় দিনের মতো সরাসরি যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন ভোরের কাগজের বান্দরবান প্রতিনিধি মংসানু মারমা। বরং গত মঙ্গলবার বাজালিয়ায় যে পরিমাণ পানি ছিল সড়কে তার চেয়ে আরো বেড়েছে গতকাল বুধবার। বান্দরবানের রুমাতে একটি খর¯্রােতা খালে পানিতে চাচা-ভাতিজা ভেসে নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের কোনো পরিচয় পাওয়া যায়নি। মাতামুহুরী ও শঙ্খ নদীর পানি উপচে পড়ে বিস্তীর্ণ এলাকা পানিতে তলিয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন মংসানু। তিনি বান্দরবানে বাস মালিকদের বরাত দিয়ে জানিয়েছেন, বাজালিয়া এলাকার সড়ক থেকে পানি নেমে যানবাহন চলাচলে উপযোগী হলে তারা বাস চালানো শুরু করবেন। বান্দরবানের লেমুঝিড়ি, কালাঘাটা, স্টেডিয়াম এলাকাসহ কয়েকটি স্থানে পাহাড়ের মাটি ধসে পড়লেও জানমালের কোনো ক্ষতি হয়নি।

গতকাল বুধবার দুপুরের দিকে শুরু হওয়া ভারী বৃষ্টি ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রামমুখী ২টি আন্তর্জাতিক ফ্লাইট এবং ঢাকা থেকে চট্টগ্রামমুখী একটি ফ্লাইট অবতরণ করতে না পেরে ২টি ঢাকায় এবং আরেকটি কক্সবাজার বিমানবন্দরে

নামতে বাধ্য হয়েছিল। প্রায় ৩ ঘণ্টা পরে আবার বিকেলের দিকে চট্টগ্রাম ফিরে আসতে পেরেছে বলে জানিয়েছেন চট্টগ্রাম শাহ আমানত বিমানবন্দরের ব্যবস্থাপক উইং কমান্ডার সারোয়ার ই জামান। মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় চট্টগ্রাম জেলায় গত শনিবার থেকেই ভারী বর্ষণ চলছে। আরো দুয়েকদিন এই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে বলে পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের ডিউটি এসিসট্যান্ট সঞ্জয় বিশ্বাস জানিয়েছেন। বৃষ্টিতে বিমানবন্দর সড়কে পানি জমে যাওয়াসহ নানা বিশৃঙ্খলায় গত সোমবার থেকে যে দীর্ঘ যানজট সৃষ্টি হয়েছে তা গতকালও অব্যাহত ছিল। কাস্টমস মোড় থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় রাস্তায় গর্ত হয়ে যাওয়া, চউক-এর এক্সপ্রেসওয়ের কাজের জন্য রাস্তা খোঁড়ার কারণে এ দীর্ঘ যানজটের কবলে পড়ে ভোগান্তি বাড়ছে যাত্রীদের। বুধবার সকালের দিকে নগরীতে তেমন বৃষ্টি না হলেও দুপুরের পরে প্রচণ্ড বৃষ্টিতে আবারো নগরীর বিভিন্ন নিচু এলাকা ও সড়কে পানি জমে গিয়েছিল। বিশেষ করে বাকলিয়া, রাহাত্তারপুল, চকবাজার ধৃনিরপুল, হালিশহর, আগ্রাবাদে পানি জমে যায়। এমনিতেই এসব এলাকার পানি নামছিল বেশ ধীরগতিতে। গতকালও বাকলিয়ার বিভিন্ন এলাকার সড়কে হাঁটু পানিতে ডুবে ছিল।

ভূমিধসের শঙ্কায় হাটহাজারীর ফরহাদাবাদ ইউনিয়নে পাহাড়ের পাদদেশে মৃত্যুঝুঁকি নিয়ে বাস করা মনাই ত্রিপুরাপল্লীর ১৫টি পরিবারকে সরিয়ে নিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। বুধবার দুপুরে স্থানীয় আশ্রয়কেন্দ্রে তাদের নিয়ে আসেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুহুল আমিন। গতকাল সন্ধ্যায় তিনি বলেন, আশ্রয় নেয়া পরিবারের সদস্যদের আপাতত দুর্যোগকালীন প্রতিদিনই উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে খাবার সরবরাহ করা হবে। পাশাপাশি মনাই ত্রিপুরাপল্লীর কাছেই সমতল সরকারি মালিকানাধীন জমিতে তাদের ঘরবাড়ি তৈরি করারও একটি প্রক্রিয়া চলছে।

এদিকে গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে ফটিকছড়ি উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে পানিবন্দি হয়ে পড়েছে প্রায় ৪০টি গ্রামের মানুষ। পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে ৫০ হেক্টর আউশ, ৪০ হেক্টর আমন ধানের বীজতলা। হালদা নদী ও ধুরংসহ বিভিন্ন খালের পানিতে সয়লাব হয়ে গেছে আশপাশের জনপদ। উপজেলার দাঁতমারা, নারায়ণহাট, ভুজপুর, সুয়াবিল, লেলাং, রোসাংগিরি, সমিতিরহাট ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা প্লাাবিত হয়েছে। এ ছাড়া নারায়ণহাটে কয়েকটি মাটির ঘর বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। পানিতে ডুবে রয়েছে ভুজপুর ইউনিয়ন পরিষদের আঙিনা। সমিতিরহাট ইউনিয়নে হালদায় বিলীন হয়েছে সাত বসতঘর। খিরামের পাহাড়ি এলাকা থেকে ২০ পরিবারকে সরিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আনা হয়েছে।

বাঁশখালী উপজেলার আনোয়ারা-বাঁশখালী সীমান্তের পুকুরিয়া ইউনিয়ন ও খানখানাবাদ এলাকায় শঙ্খ নদীর ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। এ বর্ষায় প্রবল আকারে ভাঙছে এলাকাটি। পুকুরিয়া ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের তেচ্ছিপাড়া গ্রামে ও সাধনপুর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডে জলদাশপাড়ার অর্ধ শতাধিক বাড়িঘর, মাদ্রাসা, রাস্তাঘাট, ফসলি জমি, মাছের পুকুর, মসজিদ, গরু-হাঁস মুরগির খামার নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। টানা বর্ষণে শঙ্খ নদীর পানির ¯্রােতে অর্ধশতাধিক বাড়িঘর ভেঙে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে অর্ধশতাধিক পরিবার।

এ ছাড়া জেলার সাতকানিয়া লোহাগাড়া, বোয়ালখালী, চন্দনাইশ, আনোয়ারা, পটিয়া, রাঙ্গুনিয়া, রাউজানের বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের ¯্রােতে বেশ কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থাও অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্ন রয়েছে।

শেষ পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj