নিয়োগ বাণিজ্যে শতাধিক পুলিশ সদস্য চাকরিচ্যুত!

বৃহস্পতিবার, ১১ জুলাই ২০১৯

কামরুজ্জামান খান : পুলিশ বাহিনীতে কনস্টেবল পদে প্রায় ১০ হাজার সদস্য নিয়োগে এবারো বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। নিয়োগ বাণিজ্যে জড়িয়ে পড়ায় পুলিশের প্রায় শতাধিক সদস্যকে স্ট্যান্ড রিলিজ (অবমুক্ত) করা হয়েছে। তারা মূলত চাকরিচ্যুত হয়েছে বলে জানা গেছে। এরমধ্যে কনস্টেবল থেকে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার কর্মকর্তাও রয়েছেন। তাদের কাছ থেকে উদ্ধার হয়েছে এক কোটিরও বেশি টাকা। এ সংক্রান্ত ১৮টি মামলায় একজন সাব-ইন্সপেক্টরসহ ৪০ জন প্রতারককে আটক করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১০ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দিয়েছে ভ্রাম্যমাণ আদালত।

এ প্রসঙ্গে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের অতিরিক্তি আইজিপি হিউম্যান রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট (এইচআরএম) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন গতকাল বুধবার ভোরের কাগজকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নির্দেশ এবং ইন্সপেক্টর জেনারেল অব পুলিশের (আইজিপি) তদারকিতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় পুলিশে নিয়োগ সম্পন্ন হয়েছে। জেলা পুলিশ সুপারদের চিঠি দিয়ে, বৈঠক করে এবং ভিডিও কনফারেন্সে এ ব্যাপারে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। জেলা পুলিশ সুপারদের পাশাপাশি পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সের টিম সব জেলায় কাজ করেছে। তাদের অনুসরণ করেছে একটি গোয়েন্দা টিম। ওই গোয়েন্দা টিমকে অনুসরণে করেছে আরেকটি গোয়েন্দা টিম। তিনি বলেন, নিয়োগ স্বচ্ছ করতে কয়েকটি স্তর কাজ করেছে। প্রশ্নপত্র তৈরি ও বিররণ এবং পরীক্ষার্থীদের সিট বণ্টনসহ নম্বর কোডিং করা হয়েছে। সবশেষে চূড়ান্ত তালিকা করতে ডোপ টেস্ট করানো হয়েছে। এতসবের পরও নিয়োগ বাণিজ্যে জড়ানোর অভিযোগে শতাধিক পুলিশ সদস্যকে স্ট্যান্ড রিলিজ করা হয়েছে। বর্তমানে তাদের ব্যাপারে তদন্ত চলছে।

জানা গেছে, অন্যবারের চেয়ে অনেক বেশি স্বচ্ছ পক্রিয়ায় এবার মাত্র ১০৩ টাকায় পুলিশ বাহিনীতে কনস্টেবল পদে চাকরি দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়। অনভিপ্রেত তদবির বা ঘুষ দিয়ে যাতে কেউ চাকরি না পায় সেজন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ হেডকোয়ার্টার্র্স থেকে সকল রেঞ্জ ডিআইজি ও জেলার পুলিশ সুপারদের কঠোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছিল। বিশেষ করে লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ছাড়া কেউ যাতে চাকরি না পায় তা নিশ্চিত করতে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে ৬৪ জেলায় একজন করে পুলিশ সুপার ও একজন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পাঠানো হয়। এবারই প্রথমবারের মতো কাক্সিক্ষত নারী সদস্য না মিললে পুরুষ দিয়ে সেই স্থান পূরণ করা হয়েছে। চাকরিতে আগ্রহী মাদকাসক্ত কিনা তা নিশ্চিত হতে রক্তের ডোপ টেস্ট করা হয়।

৬৪ জেলায় ৯ হাজার ৮৬০ জনের নিয়োগ কার্যক্রম ২২ জুন শুরু হয়ে পর্যায়ক্রমে ৯ জুলাই শেষ হয়েছে। শারীরিক পরীক্ষার পর লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা শেষে ডাক্তারি পরীক্ষা সম্পন্ন করা হয়। এবার ৬ হাজার ৮০০ জন পুরুষ ও ২ হাজার ৮৮৪ জন নারী সদস্য নিয়োগের লক্ষ্য ছিল। যার মধ্যে ছিল সাধারণ, মুক্তিযোদ্ধা, পোষ্য ও বিশেষ কোটা।

সূত্র মতে, নিয়োগ বাণিজে জড়িয়ে চুয়াডাঙ্গায় একজন ইন্সপেক্টর, ঝিনাইদহে একজন সাব-ইন্সপেক্টর ও একজন কনস্টেবল, টাঙ্গাইলে একজন সাব-ইন্সপেক্টর ও এক নারী প্রতারক, নারায়ণগঞ্জে একজন ইন্সপেক্টর, দুজন সাব-ইন্সপেক্টর ও সাতজন কনস্টেবল, সাতক্ষীরায় চাকরি প্রার্থীসহ দুজন, নড়াইলে (খেলার জার্সির ভেতরে পুলিশ সুপারকে ৭ লাখ টাকা ঘুষ দিয়ে) আটক হয়েছে একজন।

এদিকে মাদারীপুরে ৫৪ জন পুলিশ কনস্টেবল নিয়োগে বাণিজ্যের অভিযোগে গত ২৪ জুন পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স থেকে বিশেষ অভিযান চালিয়ে জেলার পুলিশ সুপার সুব্রত কুমার হালদারের দেহরক্ষী পুলিশ সদস্য নুরুজ্জামান সুমনকে ঘুষের টাকাসহ আটক করা হয়। পুলিশ লাইন্সের মেস ম্যানেজার জাহিদ হোসেন (৩ লাখ টাকাসহ আটক), টিএসআই গোলাম রহমান এবং পুলিশ হাসপাতালের স্বাস্থ্য সহকারী পিয়াস বালার কাছ থেকেও ঘুষের টাকা উদ্ধার করা হয়েছে। পরে সুমন ও জাহিদকে পুলিশ হেডকোয়ার্টার্সে নজরদারিতে রাখা হয়। গোলাম রহমান ও পিয়াস বালাকে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে প্রায় ৭২ লাখ টাকা উদ্ধারের খবর পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে কুড়িগ্রামের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মহিবুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, নিয়োগ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে তাৎক্ষণিকভাবে জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রিপন কুমার মোদককে খাগড়াছড়ি, এসআই আবু তালেবকে বরিশাল রেঞ্জে বদলি করা হয়। বরখাস্ত করা হয়েছে পুলিশ সুপার কার্যালয়ের হিসাবরক্ষক আবদুল মান্নান ও উচ্চমান সহকারী ছকমল এবং রংপুর ডিএসবির এএসআই রুহুলকে। এ ছাড়া ডিআইজি অফিসে ক্লোজড করা হয়েছে স্পিড বোট ড্রাইভার সাইদুর রহমান সায়েম ও রেশন স্টোরের ওজনদার আনিছুর রহমানকে। তিনি বলেন, ঘুষের ২৩ লাখ টাকা উদ্ধার করে বরখাস্ত করা হয়েছে পুলিশ সুপার কার্যালয়ের হিসাবরক্ষক আবদুল মান্নান ও উচ্চমান সহকারী ছকমলকে। এ ছাড়া রংপুর ডিএসবি শাখার এএসআই রুহুলকে ১০ লাখ টাকাসহ কুড়িগ্রামে আটক করা হয়। পরে রংপুর এসপির হাতে তাকে হস্তান্তর করা হলে তাকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তিনি বলেন, নিয়োগপ্রাপ্ত ৩৩ জন পুলিশ সদস্যের কারো বিরুদ্ধে টাকা বিনিময়ের অভিযোগ পেলে নিয়োগ বাতিল করা হবে। এর সঙ্গে পুলিশের কেউ জড়িত থাকলে তার বিরুদ্ধেও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ঢাকা জেলার পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান জানিয়েছেন, প্রার্থীর সব রকম তথ্য যাচাইবাছাই করে শতভাগ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ১২’শ ৩৭ জনকে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। যোগ্য নয় এমন কাউকে মনোনীত করা হয়নি। তিনি বলেন, আগের তুলনায় এবার নারী প্রার্থী বেশি থাকলেও কাক্সিক্ষত কোটা পূরণ করা হয়েছে পুরুষ দিয়ে। নিয়োগ বাণিজ্যে জড়াতে পারে এমন তথ্যে বেশ কয়েকজনকে থানায় ডেকে সতর্ক করা হয়েছে। সরকারি নির্দেশে সবার ডোপ টেস্ট করানো হয়েছে।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj