প্রবৃদ্ধি অর্জনে আঞ্চলিক বাণিজ্যের গুরুত্ব

বুধবার, ১০ জুলাই ২০১৯

টেকসই প্রবৃদ্ধি অর্জনে আঞ্চলিক বাণিজ্য বিশেষ করে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্যের পরিমাণ বাড়ানো একান্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়ানো গেলে দেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) বাড়ানো সম্ভব। বিশে^র বিভিন্ন অঞ্চলে আঞ্চলিক বাণিজ্যের ব্যাপক প্রসার ঘটলেও আমাদের এই অঞ্চলে তার পরিমাণ খুবই কম। শুল্ক ও অশুল্ক বাধা দূর করার সঙ্গে সঙ্গে আঞ্চলিক যোগাযোগ বাড়াতে হবে। আঞ্চলিক বাণিজ্য নিয়ে বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে নানা ধরনের সমস্যার মোকাবেলা করছে।

বৈশি^ক বাণিজ্যে বাংলাদেশ মোটামুটি ভালো করলেও আঞ্চলিক বাণিজ্যে মার খাচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের বাণিজ্য খুবই নাজুক অবস্থার মধ্যে রয়েছে। এর জন্য বাংলাদেশ যতটা না দায়ী, তারচেয়ে দায়ী প্রতিবেশী শক্তিশালী দেশ। তারাই এ অঞ্চলের বাণিজ্য নিজেদের দখলে রাখতে এ অঞ্চলের অন্য কোনো দেশকে কোনোভাবে উঠতে দিচ্ছে না। ফলে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বাণিজ্য যেমন খুবই নি¤œ অবস্থানে রয়েছে, তেমনি বাংলাদেশের বাণিজ্যেও রয়েছে হতাশাব্যঞ্জক অবস্থা। বর্তমানে বিশে^ বাংলাদেশের বাণিজ্যের পরিমাণ ৮৪ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। অথচ দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের বাণিজ্যের পরিমাণ মাত্র ৭ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। বিশে^ যেখানে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য হচ্ছে সেখানে গত ২৫ বছরে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের বাণিজ্যের পরিমাণ ২৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে আটকে আছে। অথচ কিছু বাণিজ্য বাধা দূর করতে পারলে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর বাণিজ্য তিনগুণ বাড়ানো সম্ভব। এটা বর্তমান আঞ্চলিক বাণিজ্য ২৩ বিলিয়ন ডলার থেকে ৬৭ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা যায় অনায়াসেই। মূলত বেশ কিছু কারণে সৃষ্ট বাধার জন্য বাংলাদেশের আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়ছে না। দক্ষিণ এশিয়ায় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ চার ধরনের বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। এগুলো হচ্ছে উচ্চ শুল্ক, আধা শুল্ক ও অশুল্ক বাধা, কানেক্টিভিটি খরচ এবং সীমান্তে আস্থার সংকট। অথচ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সাফটা চুক্তি রয়েছে। ফলে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে কোনো শুল্ক থাকার কথা নয়। অথচ এ অঞ্চলেই সবচেয়ে বেশি শুল্ক রয়েছে। সরাসরি শুল্কের বাইরেও আছে আধা বা প্যারা ট্যারিফ। ২০০৪ সালে যখন সাফটা (সাউথ এশিয়ান ফ্রি ট্রেড এরিয়া) চুক্তি হয়, তখন বিশ^বাণিজ্য দক্ষিণ এশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের অংশগ্রহণ ছিল ৫ শতাংশ। সাফটা করার উদ্দেশ্যই ছিল এ অঞ্চলের বাণিজ্য বাড়ানো। কিন্তু দুঃখজনক ব্যাপার হলো সাফটা চুক্তির পর দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য না বেড়ে বরং কমে গেছে। বর্তমানে তা কমে হয়েছে আড়াই শতাংশ। বিশ^ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিশ^বাণিজ্যে এশিয়ার অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের অবদান ২৫ শতাংশ। অন্যদিকে ইউরোপের অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের অবদান ৬৩ শতাংশ। অথচ ১৯৪৭ সালের আগে এটি ছিল ৩০ শতাংশ। একটা বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয় যে, এ অঞ্চলের গড় শুল্ক হার অন্যান্য অঞ্চলের দ্বিগুণেরও বেশি। ফলে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলের চেয়ে দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্য ব্যয়ও সবচেয়ে বেশি। অর্থাৎ পৃথিবীর অন্য যে কোনো অঞ্চলের চেয়ে এ অঞ্চলে আমদানিতে সবচেয়ে বেশি বাধা দেয়া হয়। দেশগুলো উচ্চহারে নিয়ন্ত্রণমূলক ও সম্পূরক শুল্কারোপ করে এ অঞ্চলে বাধা সৃষ্টি করে রাখছে। পাশাপাশি সংবেদনশীল পণ্যের তালিকায় ফেলা হয়েছে এক-তৃতীয়াংশ পণ্যকে। ফলে পণ্যের সংখ্যা কমে গিয়ে বাণিজ্যের পরিমাণও কমছে। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে এটা সুস্পষ্ট যে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাণিজ্য বাধা দূর করতে পারলে এই অঞ্চলের বাণিজ্য তিনগুণ বাড়ানো সম্ভব। আসলে বিশ^ায়নের যুগে এককভাবে এগিয়ে যাওয়া অসম্ভব। বাণিজ্য বাধা দূর করে দক্ষিণ এশিয়ার বাণিজ্যের আকার তিনগুণ বাড়ানো সম্ভব। বাস্তবতার নিরিখে ক্রমেই আঞ্চলিক বাণিজ্যে পরিবর্তন আসছে। যেমন সীমান্তহাট চালুর ফলে বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যে স্বল্প আকারে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হলেও মানুষের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ছে। এতে সম্পর্কের উন্নতি ঘটছে। সীমান্ত এলাকার মানুষের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা তৈরি হচ্ছে।

অর্থনৈতিক উন্নয়নে বর্তমানে বিভিন্নমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে। বাস্তবতার আলোকে গৃহীত পদক্ষেপগুলো কাজ দিতে শুরু করেছে। টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য আঞ্চলিক বাণিজ্য বৃদ্ধি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হলে অবশ্যই প্রতিবেশীদের সঙ্গে বাণিজ্য বাড়ানোর কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। আসলে দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক বাণিজ্য এখনো বাজারের ওপর নির্ভর করছে না। এখানে মূলত কাজ করছে রাজনীতি। এ ছাড়াও নিরাপত্তা, আমলাতন্ত্র বাণিজ্যকে নিয়ন্ত্রণ করছে। অঞ্চল বাড়াতে এশিয়ান হাইওয়ে ও ট্রান্স এশিয়ান রেলওয়ে শক্তিশালী কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত কারণে তা বন্ধ হয়ে গেছে। আঞ্চলিক যৌথ উদ্যোগের সাফল্য এবং ব্যর্থতা যা হয়েছে তা রাজনৈতিক কারণেই হয়েছে। ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভুটানে নিরাপত্তা বড় বিষয়। এসব দেশে রাজনীতির ভূমিকাটা অনেক গুরুত্বপূর্ণ এ জন্য আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়াতে হলে প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়াতে হবে। বাজারগুলোতে সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে বাণিজ্য অনেকটা সহজ হয়ে উঠবে। ভ্যালু চেইন সৃষ্টি করা গেলে এক দেশের পণ্যের প্রতি অন্য দেশের ব্যবসায়ীরা আগ্রহী হবেন।

বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ভারতের কয়েকটি রাজ্যে বাংলাদেশের বিভিন্ন পণ্য রপ্তানির সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন হওয়ায় এসব রাজ্যে পণ্য পরিবহনেও বিদ্যমান ব্যবস্থা অনেকটা অনুক‚ল। যে কারণে এসব রাজ্যে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে ভারতের সঙ্গে বাণিজ্যিক ভারসাম্য অনেকটা বজায় রাখা সম্ভব।

প্রতিবেশী দেশ নেপালের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগ লেনদেন আগের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে বাংলাদেশ এখন এগিয়ে যাচ্ছে। নেপালে বাংলাদেশের পণ্য সামগ্রী রপ্তানি আয় বেড়েই চলেছে। আর হ্রাস পাচ্ছে আমদানি উভয় দেশের সরকারের ব্যবসাবান্ধব নীতি বিশেষ করে বাংলাদেশের ক‚টনৈতিক তৎপরতা বৃদ্ধিসহ দূরদর্শী কিন্তু পদক্ষেপের ফলে নেপালের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য এখন বাংলাদেশের অনুক‚লে চলে এসেছে। নেপালে বাংলাদেশের উৎপাদিত বিভিন্ন ধরনের ভোগ্যপণ্য, খাদ্যদ্রব্য, শৌখিন, গৃহস্থালি পণ্য ও নির্মাণ সামগ্রীর বিরাট চাহিদা রয়েছে, নেপাল অনেকদিন ধরেই আমদানিতে একচেটিয়া ভারত নির্ভরতা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে নেপালে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার বিস্তৃতির সম্ভাবনা উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে দিনে দিনে। এখানে সুযোগ রয়েছে রপ্তানি পণ্য বহুমুখীকরণের। বিপুল চাহিদার তুলনায় নেপালে বাংলাদেশের রপ্তানি বাজার এখনো অনেকটা সীমিত রয়ে গেছে। প্রাকৃতিকভাবে বন্দর সুবিধাবঞ্চিত ভূমি পরিবেষ্টিত (ল্যান্ড লক্ড) দেশ হওয়ায় বাংলাদেশ চট্টগ্রাম ও মোংলাবন্দর সুবিধাকে কাজে লাগিয়ে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য প্রসারিত করতে পারে। বাংলাদেশ তার নিজের বন্দর ব্যবহার করে নেপালে অনেক পণ্য পুনঃরপ্তানি করতে পারে। বাংলাদেশের বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য সিরামিকস সামগ্রী, ওষুধ, আসবাবপত্র, পোশাক সামগ্রী প্রভৃতি নেপালে রপ্তানি হচ্ছে। নেপাল থেকে আমদানি করা হচ্ছে ডাল, মসলাসহ বিভিন্ন খাদ্যদ্রব্য।

নেপাল, মিয়ানমার, ভুটান, ভারতের কয়েকটি সীমান্তবর্তী রাজ্য আমাদের নিকট-প্রতিবেশী। দ্বিপাক্ষিক, আঞ্চলিক বাণিজ্য বাড়াতে হলে প্রথমেই দরকার এসব দেশ এবং রাজ্যের সঙ্গে কানেক্টিভিটি বৃদ্ধি করা। বিশেষ করে চার দেশীয় (ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল ও ভুটান) প্রস্তাবিত সরাসরি সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা শক্তিশালী করা হলে বাংলাদেশ থেকে এসব দেশে রপ্তানির পথ সুগম হবে এবং রপ্তানির পরিমাণও বৃদ্ধি পাবে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সক্ষমতা বাড়িয়ে বাংলাদেশ নেপালকে ট্রানজিট সুবিধা দিতে পারে। বাণিজ্যিক যোগাযোগ বাড়লে দুই দেশের টেকসই উন্নয়নের পথ সুগম হবে।

প্রতিবেশী দেশ ভারত, নেপাল, মিয়ানমার ও ভুটানের সঙ্গে বাংলাদেশের আঞ্চলিক বাণিজ্য প্রসারের ব্যাপক সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশের উৎপাদিত ও প্রক্রিয়াজাত বিভিন্ন ধরনের খাদ্যপণ্য, পানীয়, রাসায়নিক দ্রব্য, সিরামিকস সামগ্রী, ওষুধ, আসবাবপত্র, স্টিল ও আয়রন সামগ্রী, সাবান, মেলামাইন, প্লাস্টিকজাত পণ্য, হোম টেক্সটাইল, টেরিটাওয়েল ও পোশাক সামগ্রী, খেলনা, পাটজাত দ্রব্য, বৈদ্যুতিক সামগ্রী, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প পণ্য, বিভিন্ন শৌখিন দ্রব্য, মোবাইল ফোন, ইলেকট্রনিক্স সামগ্রী, আইটি সামগ্রী ইত্যাদির বিরাট বাজার রয়েছে এসব দেশে। আঞ্চলিক বাণিজ্যের প্রসার ঘটিয়ে বাংলাদেশ সমৃদ্ধির নতুন সোপানে উন্নীত হতে পারে খুব দ্রুত।

রেজাউল করিম খোকন : লেখক ও ব্যাংকার।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj