শিশু ও নারী সমাজের দুঃখাস্তিত্ব

বুধবার, ১০ জুলাই ২০১৯

আমাদের জাতীয় মুক্তি আন্দোলনের সব পর্যায়েই নারীসমাজ বিভিন্ন ধারার সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত থেকে অসম সাহসিকতার সঙ্গে বীরত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। যা নারীদের অবগুণ্ঠনের অন্তরাল থেকে বহির্বিশ্বের মুক্ত আঙিনায় প্রবেশাধিকারের ছাড়পত্র দিয়েছিল, আজ এতদিন পরে মনে হচ্ছে মুক্ত আঙিনায় প্রবেশাধিকারের ছাড়পত্র নারীদের আদৌ হয়নি! সমাজের নৈতিক শীথিলতার প্রথম বলি হচ্ছে নারীসমাজ, এ থেকে মেয়ে হয়ে জন্মগ্রহণ করা ছোট্ট শিশুটিও রেহাই পাচ্ছে না!

মুক্তিযুদ্ধের সময় হানাদার বাহিনী যেমন বর্বরভাবে নারীদের ধর্ষণ করেছিল, তেমনি স্বাধীন দেশেও এর অন্যথা দেখা যাচ্ছে না। সমাজের যূপকাষ্ঠে নারী বরাবরই অনুশাসনের বলি।

আমাদের চারদিকে ঘিরে আছে অসংখ্য মানসিকভাবে অসুস্থ লোক, এ দৃশ্য বড়ই মর্মান্তিক। যৌন জীবন সম্পূর্ণ ব্যক্তির মধ্যে পরিব্যাপ্ত থাকে, তাই বলে জোরপূর্বক নারীদের কেন তাতে বাধ্য করা হবে! পুরুষদের বিকৃত মনোবৃত্তি নারীদের ঠেলে দিচ্ছে মৃত্যুমুখে। যেখানে বাবা-মেয়ের পবিত্র সম্পর্ক, সেখানেও দেখা যাচ্ছে বিরূপ ঘটনা, খুবই লজ্জাজনক, ঘৃণিত একটি ব্যাপার।

বর্তমানে সম্পর্কগুলো যে ঢ়বৎাবৎংরড়হ রূপে দেখা দিচ্ছে, যা অকল্পনীয়। নারীদের অধস্তন করতে গিয়ে যে তারা নিজেরাই অধঃপতিত হয়ে যাচ্ছে, সেদিকে তাদের বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই। বিকৃত স্নায়ুধারী কর্তারা রোগগ্রস্ত ও ভাবাত্মক প্রবৃত্তিগুলো বিকাশ করেই চলেছেন। তাদের মধ্যে বোধশক্তি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়েছে! তারা ঘাতকস্বরূপ জবরদস্তি করে ধর্ষণ করার প্রয়াস চালাচ্ছে, যা কেবল একের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, গণভাবেও হচ্ছে!

নারী মানেই কি ভোগের বস্তু? নারীদের প্রতি ভোগবাদী মনোভাব যেন দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। মেয়েরা সব সময় আতঙ্কে থাকে, তাদের কোথায় নির্যাতনের শিকার হতে হয়। আজ ছোট্ট শিশুদের যেখানে সুন্দর মনন গড়ে ওঠার বয়স, সেখানে তারা ধর্ষণ শব্দটি শুনছে, জানছে এবং আতঙ্কে জড়িয়ে পড়ছে। যা থেকে মানসিক অবস্থা চিরতরে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। তাদের কোমল জীবনে ছন্দপতন ঘটছে।

আজ আমাকে যৌন প্রবৃত্তি ও ধর্ষণ বিষয়ে খোলামেলাভাবে বলতে হচ্ছে। কী করব, বিষয়টা এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যা না বলেও পারছি না। বিষয়টা খুবই ক্ষোভের ও দুঃখের। ক্ষুব্ধতা ও গভীর কষ্ট নিয়েই বলতে হচ্ছে। ধর্মীয় শিক্ষা ও নৈতিকতার শিক্ষা থেকে আমরা ক্রমেই দূরে সরে যাচ্ছি। মনুষ্যত্বের বিবেকবোধ হারিয়ে ফেলছি আমরা।

আমি সেই হীন মানুষদেরই বলছি- তারা এতটাই নীচ মনমানসিকতার মানুষ যে নারী-শিশু নির্যাতনের পক্ষে, অসাম্যের পক্ষে, রীতিনীতিকে বিসর্জন দিয়ে কাজ করে যাচ্ছে। সর্বমহলে নারী ভিকটিম হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে। সত্যিই ব্যাপারটা কতটা ঘৃণ্যতম ভাবার ঊর্ধ্বে।

এবহফবৎ পড়হংঃৎঁপঃরড়হ সেই প্রাচীন যুগ থেকে চলে এসেছে, বর্তমানেও সেটা প্রযোজ্য। নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, ধর্ষণের শিকার হচ্ছেন, এটাই সবচেয়ে বিপর্যয়ের কারণ। ধর্ষণের শঙ্কা আমাদের পিছু ছাড়ছে না। যৌন নির্যাতন বা নিপীড়নের কাহিনী বলে শেষ করা যাবে না। রাস্তাঘাটে, বাসস্টপে, সব স্থানে নারীকে ন্যক্কারজনক পরিস্থিতিতে পড়তেই হয়। আমরা নারী, অনেক সময় লজ্জায় সেগুলো প্রকাশ করতে পারি না। সুতরাং অপ্রকাশিতই থেকে যায় বড় একটা অংশ। যতটুকু প্রকাশিত হয় বা হয় না, সেটার ভার বহন করা আমাদের খুব কঠিন হয়ে পড়ে।

প্রত্যেকটা ধর্ষণ ও হত্যার পর সবাই আলোড়িত হচ্ছে, বিভিন্ন সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় উঠছে, আবার কিছুদিন পর স্তিমিতও হয়ে পড়ছে। সুষ্ঠুভাবে কোনো বিচার প্রক্রিয়াই ফলপ্রসূ হয় না। আমরা চাই নারীরা সুস্থ ও নিরাপদ জীবন নিয়ে বসবাস করুক। নারী ও শিশুর জন্য ভীতিময় এ সমাজ চাই না।

শর্মিষ্ঠা সরকার

কবি ও লেখক, ময়মনসিংহ।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj