দেশ ত্যাগ ও আমাদের স্বাধীনতা

মঙ্গলবার, ৯ জুলাই ২০১৯

বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক চেতনার দেশ। এখানে হিন্দু-মুসলিম-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে। ধর্মীয়করণে যদি কোনো ধর্মের মানুষ দেশ থেকে বিতাড়িত হয় তখন শুধু ওই মানুষগুলোই বিতাড়িত হয় না সঙ্গে বিতাড়িত হয় দেশের মেধা এবং ইতিহাস-ঐতিহ্য, ভাষা-শিক্ষা, সাহিত্য-সংস্কৃতি, জ্ঞান-বিজ্ঞান, অর্থনৈতিক উন্নয়ন। বিনষ্ট হয় সম্প্রীতির বন্ধন।

ধর্মীয় চেতনায় নয় অসাম্প্রদায়িক চেতনায় রচিত হয় বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান। কিন্তু ইদানীংকালে একটি মহল সাম্প্রদায়িকতাকে উসকে দিয়ে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের (হিন্দু) বাড়িঘর, জমাজমি দখল করে নিচ্ছে। কোথাও কোথাও হিন্দু পরিবারের নারী ও শিশুদের ওপর নির্যাতন করছে, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও মূর্তি ভাঙচুর করছে। এতে তারা ভয়ে দেশ ছেড়ে পালাচ্ছে। বাংলাদেশকে সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতাবলম্বীশূন্য রাষ্ট্রে পরিণত করার সব রকম অপচেষ্টা চালাচ্ছে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু ও ভিন্নমতাবলম্বীদের নির্যাতনের ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা ও প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাদের ওপর এই নির্যাতন-নিপীড়ন করা হচ্ছে।

১৯৫০ সালে এক লাখ সনাতন ধর্মানুসারীদের দেশান্তরিত করা হয়। সেই যে শুরু তা এখনো চলমান। মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশের সংখ্যালঘু হিন্দুদের দেশ ত্যাগের ধারা অব্যাহত রয়েছে। পত্রিকা এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রায়ই হিন্দুদের বাড়িঘর, জমাজমি দখল ও হিন্দু পরিবারের নারী ও শিশুদের ওপর নির্যাতনের চিত্র চোখে পড়ে। কোনো রাষ্ট্র ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে না পারলে রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে এক ধরনের বিশৃঙ্খল পরিবেশ সৃষ্টি হয় এবং সেই দায় রাষ্ট্রের ওপরই বর্তায়। সুযোগসন্ধানীরা এই সুযোগকে কাজে লাগায়। রাষ্ট্রকে সজাগ থাকতে হবে।

এ দেশের সংখ্যালঘুরা নানা কারণে দেশ ত্যাগ করছে। তার মধ্যে প্রধান কারণ হচ্ছে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় নিরাপত্তাহীনতা। অর্থনীতিবিদ আবুল বারকাত বলেন, ‘হিন্দুদের প্রায় ২৬ লাখ একর জমি জবরদখলে রয়েছে। অর্পিত সম্পত্তির আইনের জেরে প্রতিদিন গড়ে ৬৩০ জন হিন্দু বাংলাদেশ ছাড়ছেন।’ যা একটি দেশ ও জাতির জন্য খুবই উদ্বেগের। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার। একদল কুচক্রী লোক রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার বীজ বপন করে নির্যাতন এবং সম্পদ দখলের এক ধরনের উর্বর পরিবেশ তৈরি করেছে। এরা বরাবরই বিচারে বাইরে থেকে যাচ্ছে। ভোক্তভোগীরা মামলা করতে ভয় পায় আবার কোথাও মামলা করলে জান ও মাল উভয়ই হুমকির মুখে পড়ে। আজ যারা এই কাজের সঙ্গে যুক্ত তারা কেউ এ দেশের মুক্তিযুদ্ধে অবদান রাখেনি। এরা মুক্তিযুদ্ধের সময়ও লুটপাট করেছে। ক্ষমতার পালা বদলের সঙ্গে সঙ্গে এরা নিজেরাও নিজেদের রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তন করেছে।

একটি স্বাধীন দেশে যখন কোনো ধর্মীয় সম্প্রদায়ের লোক ক্রমাগত হ্রাস পেতে থাকে তখন সেই রাষ্ট্রের স্বাধীনতা, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে ওঠে। আমরা আমাদের দেশের সেই অবস্থান চাই না। হিন্দুদের বিতাড়িত করার চেষ্টা বা তাদের ধনসম্পদ লুট, নির্যাতন, দখল এটা আমাদের দেশের সংবিধানের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। জড়িতরা চিহ্নিত হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না। এরা দিন দিন আরো ভয়ঙ্কর হয়ে উঠছে।

বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূল ভিত্তি হলো মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক চেতনা। এই চেতনার বিস্তার ঘটানো ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বাস্তবায়ন ও স্বাধীনতার স্বাদ পাওয়া অসম্ভব। আমাদের শিক্ষা, সাহিত্য, সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র ইত্যাদি মাধ্যমে অসাম্প্রদায়িক চেতনার বিস্তার ঘটাতে হবে। সারাদেশে একটি সংঘবদ্ধ চক্র হিন্দুদের সম্পদ লুট করছে, বাড়িঘরে হামলা চালাছে, অগ্নিসংযোগ করছে, নির্যাতন করছে। এই সংঘবদ্ধ চক্র আমাদের স্বাধীনতার জন্যও হুমকি। মনে রাখা দরকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য বিনিষ্ট হলে যেমন প্রাকৃতিক বিপর্যয় নেমে আসে ঠিক তেমনি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট হলে রাষ্ট্রীয় বিপর্যয় নেমে আসবে।

সুধীর বরণ মাঝি
হাইমচর-চাঁদপুর।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj