ধর্ষণ : ৮ থেকে ৮০ রেহাই পাচ্ছে না কেউই!

সোমবার, ৮ জুলাই ২০১৯

শরীফা বুলবুল

স্কুলছাত্রী থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী, গৃহবধূ থেকে প্রতিবন্ধী নারী, শিশু এমনকি ৮ থেকে ৮০ কেউই রেহাই পাচ্ছে না ধর্ষণের কবল থেকে। এক এলাকায় ধর্ষণের ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই গণমাধ্যম কেঁপে উঠছে নতুন আরেক ধর্ষণের খবরে। গত কয়েক মাসে দেশের বিভিন্ন স্থানে নারী ও শিশু ধর্ষণের অর্ধশতাধিক ঘটনা ঘটেছে। আর এসব ঘটনায় ১০টি মামলা দায়ের হওয়ার পর পুলিশ অভিযুক্ত ১০ জনকে গ্রেপ্তার করেছে।

নোয়াখালীর সেনবাগে ৪র্থ শ্রেণির এক ছাত্রীকে ধর্ষণ করেছে ষাটোর্ধ্ব এক ব্যক্তি। এ ছাড়া নরসিংদীর বেলাবতে ১০ বছর বয়সী এক শিশুকে ধর্ষণ করেছে মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি। রংপুরেও এক শিশু ধর্ষিত হয়েছে। রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলায় ৫ম শ্রেণির এক মাদ্রাসা ছাত্রী ধর্ষণের শিকার হয়েছে। চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় ৬ষ্ঠ শ্রেণির এক ছাত্রীকে অপহরণের পর ধর্ষণ করা হয়। ফেনীর সোনাগাজীর চর দরবেশ ইউনিয়নের আদর্শ গ্রামে এক প্রবাসীর স্ত্রীকে গণধর্ষণ করেছে স্থানীয় বখাটেরা। বান্দরবানের লামা উপজেলায় মদ খাইয়ে এক নারীকে গণধর্ষণ করা হয়েছে। সিলেটের বিমানবন্দর থানাধীন বনকলাপাড়ার নূরানী আবাসিক এলাকার একটি কলোনিতে এক তরুণীকে গণধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। ছাত্রীকে যৌন নিপীড়নের দায়ে লালমনিরহাটের আদিতমারী বড়াবাড়ি এমএইচ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লুৎফর রহমান বরখাস্ত হয়েছেন। যশোরে শিশুকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে প্রকাশ ব্যানার্জি (৫৪) নামে পুরোহিতকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। পাবনার চাটমোহর উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চল পার্শ্বডাঙ্গা ইউনিয়নের বোলিয়া গ্রামে এক স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে মুখোশপরা ধর্ষকরা ছুরিকাঘাত করে পালিয়ে যায়। সর্বশেষ বলি কেন্দুয়ার শিশু ধর্ষক মাদ্রাসার শিক্ষক। যিনি শিশুদের ধর্ষণ শেষে, ধর্ষণের কথা প্রকাশ করলে দোজকের ভয় দেখাতেন।

শিশু নির্যাতনের এই খবরগুলো সাধারণত সমাজের নিম্ন শ্রেণির মানুষদের মধ্যকার খবর। উঁচু শ্রেণির মধ্যকার শিশু ধর্ষণ এবং নির্যাতনের খবর গণমাধ্যমে আসে না।

এসব সমাজের শিশু নির্যাতনের খবর প্রকাশ পায়, শিশুটি যখন বড় হয়ে নিজের অধিকার নিয়ে কথা বলতে শিখে তখন। তাও আবার সমাজের লাজলজ্জায় ৯০ ভাগই মুখ খুলে না। এক কথায়, সমাজের উঁচু শ্রেণির মধ্যেও শিশু নির্যাতনের হার মোটেই কম নয়।

মানবাধিকার বিষয়ক সংগঠন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের (এমজেএফ) এক প্রতিবেদনে জানা যায়, গত ২ এপ্রিল থেকে ১৬ এপ্রিলের মধ্যে দেশে ৩৯ জন ধর্ষিত হয়েছে। ধর্ষণসহ যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছে ৪৭ জন। এরপর তিন মাসের ঘটনার তালিকা আরো দীর্ঘ।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের দেয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ৩ হাজার ৫৮৭ জন নারী ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ২৭৮ জনকে। এর মধ্যে ৮৬ শতাংশই শিশু ও কিশোরী। ধর্ষণের সংখ্যা ও ব্যাপ্তি বাড়ছে দিন দিন। ২০১৪ সালে ৭০৭, ২০১৫ সালে ৮৪৬, ২০১৬ সালে ৭২৪, ২০১৭ সালে ৯২২ ও সর্বশেষ ২০১৮ সালে ৮৩৫টি আর চলতি বছরের প্রথম তিন মাসে ধর্ষণের ঘটনা ৩০০ ছাড়িয়ে গেছে।

নারীর ক্ষমতায়নসহ অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও উন্নয়নে বাংলাদেশের নারীসমাজ বিশ্বে ঈর্ষণীয় পর্যায়ে এগিয়ে থাকলেও পিছিয়ে আছে এদিক থেকে। নারী নির্যাতন, ধর্ষণ ইত্যাদি প্রতিরোধে ১৮০ দিনের মধ্যে বিচার সম্পন্নসহ দেশে যথেষ্ট ভালো আইন রয়েছে। ধর্ষকদের ক্রসফায়ারে দেয়ার দাবিও উঠেছে। তবে দুঃখের সঙ্গে স্বীকার করতে হয়, বিস্তৃত পরিসরে এর প্রয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে।

বেসরকারি সংস্থাগুলোর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারাদেশের আদালতগুলোতে বিচারাধীন রয়েছে ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের দেড় লক্ষাধিক মামলা। প্রত্যেক বছরে গড়ে নিষ্পত্তি হচ্ছে ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ মামলা আর সাজা পাচ্ছে হাজারে সাড়ে ৪ জন আসামি। প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত ১০ বছরে ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে ৫ হাজার ১১৭টি। এর মধ্যে রায় ঘোষণা হয়েছে ৮২১টির, শাস্তি হয়েছে ১০১ জনের। মামলার অনুপাতে রায় ঘোষণার হার ৩.৬৬ শতাংশ ও সাজার হার দশমিক ৪৫ শতাংশ।

সারাদেশে বিচারের জন্য ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের দেড় লক্ষাধিক মামলা ঝুলে আছে। এসব মামলার বিচার চলছে ঢিলেঢালাভাবে। বছরে নিষ্পত্তি হচ্ছে মাত্র ৩ দশমিক ৬৬ শতাংশ মামলা। আর সাজা পাচ্ছে হাজারে মাত্র চারজন আসামি।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বিশিষ্ট সমাজবিজ্ঞানী ড. অনুপম সেন ভোরের কাগজকে বলেন, সাইকোলজিস্ট সিগমেন ফ্রয়েড একটা কথা বলেছিলেন, মানুষের মধ্যে দুই ধরনের মানুষ আছে, একজন হচ্ছে ধর্ষকাম আরেকজন হচ্ছে মর্ষকাম। একদল ধর্ষিত হয়ে আনন্দ পায়, আরেকদল ধর্ষণ করে আনন্দ পায়। ধর্ষিত হয়ে আনন্দ পায় এদের সংখ্যা খুব কমই আছে। কিন্তু বিশ্বে ধর্ষকাম লোকের সংখ্যা প্রচুর। এগুলো দেখা যায় বেশি সভ্য এবং নাগরিক সমাজে। এখন তো আমাদের সমাজ দিন দিন নাগরিক সমাজ হয়ে উঠছে।

ছোটবেলা থেকেই এই প্রবৃত্তিগুলোকে চাপা দেয়ার জন্য সামাজিকীকরণ হয়। আর এটা হয় দুই জায়গায়। একটা হয় পরিবারে আরেকটা স্কুল-কলেজ ইত্যাদি ক্ষেত্রে। পরিবার যেহেতু নাগরিক পরিবার। স্বামী-স্ত্রী দুজনেই ব্যস্ত থাকে। ছেলেমেয়েদের সময় দিতে পারে না।

অপরদিকে গ্রামীণ সমাজের লোকজন শহরে আসার পর তাদের মধ্যে নানা প্রবৃত্তি বেড়ে যায়। যেমন টিভি, সিনেমা, পর্নোগ্রাফি দেখার প্রবণতা বেড়ে যায়। এর ফলে কোথাও কোথাও তারা এসব হইচইয়ের খবর পায়। আমাদের পত্রপত্রিকায়ও প্রতিনিয়ত এই খবরগুলো বেরুচ্ছে। ফলে এদের মধ্যে প্রবৃত্তিটা জেগে ওঠে। এর কারণে কিছু লোকের মধ্যে দেখা যায়, তারা যখন সুযোগ পায় চরিতার্থ করে। আরো একটা বিষয় হলো পরিবার থেকে তারা দূরে থাকে, এসব কারণে এমন ঘটনা ঘটছে। এর জন্য কঠোর শাস্তি দরকার। যারা ছোটখাটো অপরাধের সঙ্গে যুক্ত তাদের পরিশোধন সেন্টারে বেশ কিছুদিন আটকে রেখে চিকিৎসা দেয়া উচিত। আর দৃষ্টান্তমূলক অপরাধের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই হওয়া উচিত। তখনই এসব কমে যাবে। এ ছাড়া আমাদের আইনটা দেড়শ দুশো বছরের পুরনো। যার ফলে এসব জঘন্য অপরাধের দ্রুত বিচার হচ্ছে না। আইনেরও সংশোধন হওয়া প্রয়োজন। ধর্ষণের বিচার করার ক্ষেত্রে আইন প্রয়োগের দুর্বলতা ও দীর্ঘসূত্রতার ফলে সমস্যাটি অত্যন্ত জটিল হয়েছে। আইন প্রয়োগকারীদের একটি অংশ ধর্ষণের শিকার নারীর প্রতি বিরূপ ধারণা প্রকাশ করেন, তারা নারীটির ব্যক্তিগত ‘চরিত্র’ সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করেন। ফলে ধর্ষণের অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এটা আদালতে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করার জন্য যতটা আন্তরিক তাগিদের সঙ্গে আইন প্রয়োগ করা প্রয়োজন, বাস্তবে তার অভাব রয়েছে। শুধু আইন প্রয়োগকারীদের মধ্যে নয়, আমাদের সাধারণ মানুষেরও একটি অংশের ভেতরে ধর্ষণের শিকার নারীর প্রতি নেতিবাচক ধারণা পোষণ করা হয়। ফলে অত্যন্ত কঠোর আইন থাকা সত্ত্বেও ধর্ষণের ঘটনা প্রতিনিয়ত ঘটেই চলেছে।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj