বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে বাড়ছে শিশু ধর্ষণ

সোমবার, ৮ জুলাই ২০১৯

ঝর্ণা মনি

প্রতিদিনের মতো বিকেলের দিকে ওপরতলার ফ্ল্যাটে তার সমবয়সী এক শিশুর সঙ্গে খেলতে বের হয়েছিল আফরিন সায়মা। দরজা খুলে ওই ফ্ল্যাটের শিশুটি পরিবারের সঙ্গে বাইরে যাবে বলে খেলতে পারবে না জানালে, বাসার উদ্দেশ্যে লিফটে ওঠে সাত বছরের সায়মা। কিন্তু ওই লিফটে চড়াই কাল হলো তার। সায়মা আর ফিরে আসেনি। ওয়ারী সিলভারডেল স্কুলে নার্সারিতে পড়–য়া সায়মার মৃতদেহ পাওয়া যায় ভবনের নবম তলায় অবিক্রীত একটি শূন্য ফ্লাটের ভেতর রান্নাঘরের সিংকের নিচে। তখনো তার নাক-মুখ দিয়ে রক্ত বেরুচ্ছিল। গলায় পেঁচানো ছিল রশি। ময়নাতদন্তের পর ঢাকা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক বিভাগের প্রধান ডা. সোহেল মাহমুদ জানালেন, মেয়েটিকে ধর্ষণ করা হয় এবং এরপর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়েছে। শিশু আফরিন সায়মার ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় শনিবার রাতে কুমিল্লা থেকে হারুন উর রশিদ (২৬) নামের এক যুবককে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

শুধু আফরিন সায়মাই নয়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত এই ছয় মাসে বাংলাদেশে ৩৯৯ জন শিশু ধর্ষণ ও ধর্ষণ চেষ্টার শিকার হয়েছে বলে জানিয়েছে বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন। ছয়টি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত ৪০৮টি সংবাদ পর্যবেক্ষণ করে এই তথ্য পেয়েছে সংস্থাটি। তাদের ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ধর্ষণের পর একজন ছেলে শিশুসহ মোট ১৬ জন শিশু মারা গেছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে যে, অন্তত ৪৯টি শিশু (৪৭ জন মেয়েশিশু ও ২ জন ছেলেশিশু) যৌন হয়রানির শিকার হয়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১ থেকে ৬ বছরের ৪৬ জন শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। এর মধ্যে রাজধানী ঢাকায়ই শিকার হয়েছে ৪৪ জন। ৭ থেকে ১২ বছরের ১৩৭ জন। ১৩ থেকে ১৮ বছরের মধ্যে ১৩১ জন। এর আগে ২০১৮ সালে ৩৫৬টি শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছিল বলে জানিয়েছিল সংস্থাটি। এর মধ্যে মারা গিয়েছে ২২ জন এবং আহত হয়েছে ৩৩৪ জন। শিশু অধিকার নিয়ে কাজ করে সংগঠনগুলো বলছে, উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে শিশু ধর্ষণ এবং ধর্ষণের পর খুন। তবে ‘চাইল্ড রাইটস এডভোকেসি কোয়ালিশন ইন বাংলাদেশ’ এর মতে, ২০১৮ সালে সারাদেশে ২৮ প্রতিবন্ধী শিশুসহ ৫৭১ শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। সংগঠনের ‘শিশু অধিকার সংরক্ষণে ২০১৮-এর পরিস্থিতি’ শীর্ষক এক গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, এর মধ্যে ৯৪ শিশু গণধর্ষণের শিকার হয়েছে। ৬ শিশু ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করেছে।

মূলত এসব পরিসংখ্যানই গণমাধ্যমে প্রচারিত সংবাদের ভিত্তিতে তৈরি। লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যায় সঠিক পরিসংখ্যান। তবুও গত দেড় বছরের এই পরিসংখ্যান স্তম্ভিত করে বিবেক। মানবতা মুখ লুকায়। কুঁড়ি থেকে ফুল হওয়ার আগেই নিষ্ঠুর এক অধ্যায়ের মুখোমুখি হয়ে নির্মমভাবে ঝরে যাচ্ছে কোমলমতি শিশুরা। ধর্ষকদের পৈশাচিক উন্মাদনায় ক্ষণকাল আলোচনার ঝড় ওঠে। মানববন্ধন, সেমিনার, গোলটেবিল, চায়ের কাপের আড্ডা কিংবা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে টকশো চলে। কখনো কখনো জোরালো প্রতিবাদ হয়। প্রতিবাদে ফুঁসে ওঠে সারাদেশ। কিন্তু আবার কোনো এক ইস্যুর আড়ালে হারিয়ে যায় আগের ইস্যু। শুধু ধর্ষণের শিকার ও ধর্ষণের পর নিহত শিশুদের মিছিল দীর্ঘ হয়। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হয় না খুনিদের। সামাজিক ও মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয়ে অমানুষ হয়ে ওঠা নারীখেকোরা দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj