বৈচিত্র্যের ছুতোয় রুচিহীনতা

শনিবার, ৬ জুলাই ২০১৯

একটা সময় ছিল যখন সপরিবারে নাটক উপভোগ করতেন এ দেশের দর্শকরা। ড্রয়িংরুম মিডিয়া বলেই তখন পরিচিতি ছিল টেলিভিশনের। সামাজিক বক্তব্যধর্মী নাটকগুলোই দর্শকরা বেশ পছন্দ করতেন। শিক্ষামূলক নাটককেও দর্শকরা ফিরিয়ে দিতেন না। নাটকে ফুটে উঠত সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে টিভি নাটকের সেই চেহারা অক্ষুণœ নেই। বদলে গেছে টিভি নাটকের চেহারা। তবে বদলে যাওয়া এই চেহারা মোটেও সুখকর নয়। নাটকে বৈচিত্র্যের ছুতোয় ঢুকে পড়েছে রুচিহীনতা। যে নাটক একসময় মা-বাবা-ছেলে-মেয়ে-ভাই-ভাবি সদলবলে দেখতেন, সেই নাটক এখন পরিবার নিয়ে দেখতে উশখুশ করেন দর্শকরা। নাটক থেকে ধীরে ধীরে উধাও হয়ে যাচ্ছে পারিবারিক আবহ। নাটক থেকে বিদায় নিচ্ছে গুরুজনের চরিত্রগুলো। প্রেমিক আর প্রেমিকা, তাদের ন্যাকামি, উচ্ছৃঙ্খলতা ভর করেছে নাটকের ওপর।

মূলত ইউটিউবে দেশীয় নাটক প্রবেশের পর থেকেই নাটকের ধরন-ধারণ বদলে যাচ্ছে। যে নাটক একসময় পারিবারিক সম্পর্কের গভীরতার উপরে আলোকপাত করত, সেই নাটক এখন পারিবারিক বিচ্ছিন্নতাকে উসকে দিচ্ছে। প্রেমিক-প্রেমিকার আবর্তে হারিয়ে যেতে বসেছে নাটকের ঐতিহ্য। আর ‘প্রেম’ও নাটকে তার সুমধুর রূপ ধরে আসছে না। অনেক নাটকেই প্রেমকে সস্তা হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে। বর্তমান প্রজন্মের তরুণ-তরুণীদের প্রেম নিয়ে তুচ্ছ মনোবৃত্তিই নাটকে উঠে আসছে। তাই নাটকে প্রেম মানেই যেন যৌন সুড়সুড়ি। নাটকের ভাষা হারিয়েছে শ্রæতিমাধুর্য, সেখানে স্থান করে নিয়েছে ইঙ্গিতপূর্ণ সংলাপ। শরীরী প্রেমেরই প্রতীক হয়ে উঠেছে নাটক। নাটকের এই অধঃপতনে উদ্বিগ্ন সচেতন নাট্যনির্মাতা থেকে শুরু করে নাট্যকর্মী পর্যন্ত সবাই।

নাটকের অধঃপতনের পেছনে টিআরপি নামক অদৃশ্য ভূত আর ইউটিউব ভিউকেই দায়ী করেছেন সংশ্লিষ্টরা। স্যাটেলাইট চ্যানেলগুলো টিআরপিতে এগিয়ে থাকার জন্য নাটকের রুচিহীনতাকে মাথা পেতে নিচ্ছেন। নির্মাতারা আপত্তিকর বিষয়বস্তুর নাটক বানিয়ে চ্যানেলে জমা দিচ্ছেন। নাটকের প্রিভিউ কমিটি সেসব নাটককে অনাপত্তি দিয়ে চ্যানেলে প্রচারের সুযোগ করে দিচ্ছেন। সস্তা ও কদর্য নাটক দর্শকরা গোগ্রাসে গিলছেন। একই অবস্থা ইউটিউবে। সেখানে নেই কোনো প্রিভিউ কমিটি, নেই সেন্সরের ব্যবস্থা। ফলে ইউটিউব হয়ে উঠেছে রুচিহীন নাটকের স্বর্গরাজ্য। চ্যানেল থেকে ফেলে দেয়া অংশগুলো জোড়া দিয়ে প্রচার করা হয় ইউটিউবে। সেসব নাটকের ভিউ হয় দেখার মতো। হামলে পড়ে দর্শকরা। ইউটিউব চ্যানেলের হিট বাড়াতে একই রকম নাটকের প্রচার চলতেই থাকে।

ইউটিউব, নাটকের নতুন প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রশংসিত হলেও নিন্দিত হচ্ছে রুচিহীন নাটকের ভাগাড় হিসেবে। চ্যানেলে প্রচারিত নাটক তো আসেছেই এখানে, আসছে অননুমোদিত নাটকও। সরাসরি ইউটিউবে প্রচারিত অনেক নাটকের বিষয়বস্তুই আপত্তিকর। এসব নাটকে থাকছে কুরুচিপূর্ণ সংলাপ ও দৃশ্য। সুড়সুড়ি নেয়ার জন্যই দর্শকরা এসব নাটক দেখতে ইউটিউবে ভিড় করছেন।

গেল ঈদে ইউটিউবে ছিল এরকম রুচিহীন নাটকের ছড়াছড়ি। অধিকাংশ নাটকেই ভালো কোনো বিষয়বস্তু ছিল না। সহজলভ্য প্রেম, ব্রেকআপ, প্যাচআপ ইত্যাদি এসব নাটকের সারবত্তা। পাড়া-মহল্লার প্রেম, গলিতে মাস্তানি, জোরাজুরি, টানাহেঁচড়া এসবই নাটকের পরিবেশ বিষিয়ে তুলেছে। সম্প্রতি এসব নাটকে যুক্ত হয়েছে গালাগাল। নাটকে ‘বাস্তবতা’ আনতে নির্মাতাদের পছন্দ এখন গালাগাল। জনপ্রিয় অভিনেতা-অভিনেত্রীরা অবলীলায় পর্দায় গালাগালে অংশ নিচ্ছেন।

গেল ঈদুল ফিতরের সর্বাধিক জনপ্রিয় নাটক ‘দ্য এন্ড’। এই নাটকের একটি দৃশ্যে আফরান নিশোকে বিশ্রী একটি গালি দেন তানজিন তিশা। গালির দৃশ্যটি নাটক প্রচারের আগেই সামাজিক মাধ্যমে প্রকাশ করে দেয়া হয়। ফলে নাটকটি আলোচনায় চলে আসে প্রচারের আগেই। প্রচারের পর নাটকটি ঈদের শত শত নাটকের ভিড়ে প্রথম স্থান অধিকার করে।

গেল ঈদের নাটকের প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখা গেছে এই গালাগাল। গত কয়েক বছর ধরেই নাটকে গালাগাল আসছিল। আগে গালাগাল থাকলে সেই দৃশ্য মিউট করে দেয়া হতো। এখন অনেক নির্মাতাই চ্যানেলে এই নিয়ম মানলেও ইউটিউবে মানছেন না। অকথ্য ভাষার সব গালাগালা কোনো রকম দ্বিধা ছাড়াই নির্মাতারা নাটকের পাত্র-পাত্রীদের মুখে তুলে দিচ্ছেন। ইউটিউবের এই অবাধ স্বাধীনতার সঙ্গে যোগ হয়েছে ওয়েব সিরিজ। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে প্রচারিত এসব ওয়েব সিরিজে সেন্সরের কোনো বালাই নেই। সমাজের অন্ধকার দিক নিয়ে নানা রকম সিরিজ নির্মিত হচ্ছে। সিরিজগুলো দেখলেই বোঝা যাচ্ছে- নির্মাণে নতুনত্ব আনার চেয়ে, দর্শকদের সচেতন করার চেয়ে নারী চরিত্রগুলোকে খোলামেলাভাবে উপস্থাপন করে দর্শক টানাই নির্মাতাদের উদ্দেশ্য। সিরিজে অবারিত গালাগাল আর ইঙ্গিতপুর্ণ দৃশ্য থাকায় সেগুলো ‘হিট’ও হয়ে যাচ্ছে রাতারাতি।

চ্যানেলের সীমাবদ্ধ গণ্ডি থেকে বেরিয়ে অনলাইন দুনিয়ায় গেলে নাটকে নতুন দিগন্ত আসবে, এমন স্বপ্ন ইতোপূর্বে যারা দেখেছেন তারা এখন নির্মাতাদের গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসানো দেখে হতাশা প্রকাশ করেছেন। গেল ঈদে মানসম্পন্ন নাটকের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা। অধিকাংশ নাটকে ছিল ন্যাকামি, ভাঁড়ামি আর নষ্টামি। রুচিহীনতার ছোবলে নাটকের সাজানো বাগান তছনছ হয়ে গেছে। নির্মাতাদের একটা বড় অংশ দর্শক টানতে নাটকে রুচিহীনতা প্রশ্রয় দিচ্ছেন। দায়সারা ভূমিকা পালন করছেন অভিনেতা-অভিনেত্রীরা। নাটকের সংখ্যা বাড়ানোর দিকেই তারা মনোযোগী। নাটকের নাম থেকে শুরু করে সংলাপ পর্যন্ত কোথাও তাদের নজর নেই। মোটা পারিশ্রমিক নিয়েই তারা কেটে পড়ছেন। সেসব নাটকে কোথায় প্রচার হচ্ছে, সচেতন দর্শকদের সমালোচনার শিকার হচ্ছে কিনা, তাদের সেদিকে কোনো মনোযোগ থাকছে না।

সবশেষে বলতে হয় নাটকের নামের কথা। ‘টাইম পাস’, ‘ব্রেক আপ’, ‘নটি ফোর্টি’, ‘ফেয়ার ইন লাভ’, ‘টু মাচ’, ‘এক্সিডেন্টাল ব্রেকআপ’, ‘ব্যাডম্যান’, ‘লাভলি ওয়াইফ’, ‘আই এম সিঙ্গল’, ‘ব্যাচেলর ট্রিপ’, ‘এক্স হাজব্যান্ড’ ইত্যাদি ছিল এবারের ঈদে প্রচারিত কিছু নাটকের নাম। ইংরেজি নামের নাটকে সয়লাব ছিল চ্যানেলগুলো। বাংলা নামগুলোতেও ছিল মাধুর্যের অভাব। ‘ময়ূরী শক দেয়’, ‘আমি গাধা বলছি’, ‘নারী বিশেষজ্ঞ নাজিবুল্লাহ’, ‘টাউট হইতে সাবধান’, ‘মি এন্ড মিসেস এফবি’ এসব নাটকের নামে ছিল না রুচির ছাপ।

নাটকের নাম দেখেই বিষয়বস্তু সম্পর্র্কে ধারণা পাওয়া যায়। সস্তা বিষয়কে ধারণ করে নির্মিত এসব নাটক একবার দেখেই ছুড়ে ফেলে দিচ্ছেন দর্শকরা। নাটক পাচ্ছে না ক্ল্যাসিকের মর্যাদা। এক সময় বছরের পর বছর নাটক দর্শকদের মনের মুকুরে থেকে যেত। এখনকার নাটক প্রচারের পরই চলে যাচ্ছে বিস্মৃতির খাতায়। অন্তঃসারশূন্যতার কারণেই নাটক হারিয়ে যাচ্ছে দর্শকদের হৃদয় থেকে। নাটক সংশ্লিষ্টরা নাটকের সুদিন ফিরিয়ে আনার জন্য বস্তাপচা নাটক থেকে দর্শকদের মুখ ঘুরিয়ে নেয়ার আহ্বান জানিয়েছেন, আর জানিয়েছেন সাময়িক জনপ্রিয়তার পেছনে ধাওয়া না করার জন্য নির্মাতাদের অনুরোধ।

:: স্বাক্ষর শওকত

মেলা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj