প্রজাপতি দিন আমার…

শনিবার, ৬ জুলাই ২০১৯

মাইনুল এইচ সিরাজী

সাহিত্যের ছাত্ররা যে কোনো ক্যাম্পাসেই কবি, বুদ্ধিজীবী হিসেবে পরিচিতি পায়। বলাবাহুল্য, এসব উপাধি একেবারেই খোঁচাত্মক। আমি যেহেতু অল্প স্বল্প লেখালেখি করি, তাই বন্ধুরা আমার মাঝে আঁতলামির পূর্ণমাত্রা খুঁজে পেয়েছিল। তার ওপর আমার অন্য একটি বাতিকও ছিল। ক্লাসের সময়টুকু ছাড়া ঘর ছেড়ে তেমন একটা বেরুতাম না। এই সবকিছু গুলিয়ে বন্ধুরা এমন সব গল্প ফেঁদে বসত- আমি অবাক হতাম ওদের কল্পনাশক্তি আর গল্প বলার দক্ষতা দেখে। অবশ্য পুরো ব্যাপারটা ছিল আমার কাছে দারুণ উপভোগ্য। আমার প্রধান দুটো পরিচয়- ঘরকুনো আর লেখক। দুটোই এখন একরকম বিলীন। প্রথমটা শেষের দিকে ক্যাম্পাসেই খুইয়েছি। আর দ্বিতীয়টা খুইয়েছি ক্যাম্পাস ছেড়ে এসে।

আমাকে যারা প্রথম থেকে চিনত, শেষ বেলায় এসে তারা অনেকেই অবাক হয়েছে- এত পরিবর্তন! হঠাৎ যেন খোলস ছেড়ে বেরিয়েছিলাম। কত অজানা স্থান-কালের পরশ পেয়েছি মতিউর, সোনালী, জোনাকিদের কল্যাণে। ছয় বছরের অদেখা ঝরনার জলে হাত রেখেছি, কম্পিত পায়ে হেঁটেছি মুকুল আবিষ্কৃত মুসোফ পাহাড়ে- কী করে ভুলি! এখন কেমন আছে ওরা? ওহ বন্ধু, তোমাদের ছেড়ে নিদারুণ অসহায় আমি, কসম বলছি।

এই তো ক’দিন আগে মতিউরের বার্তা পেলাম। লিখেছে সে- নয়নসমুখে তুমি নাই, নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই…। কেন লিখলে এমনটা মতিউর? স্মৃতির প্রজাপতিগুলো তো নির্জীব বসেছিল বিবর্ণ বাগিচায়। কেন তবে সেখানে তোমরা রং ধরাও? আর তাছাড়া নয়নের মাঝখানে রাখবে কেন আমাকে? কী এমন ভালোবেসেছি তোমাদের!

বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পরই এক-আধটু লিখতে শুরু করি পত্রিকায়। অনেক পরে একদিন পাঠক ফোরামে ছাপা হয় ১১ জন নিয়ে স্বপ্নকাহিনী। হালকা লেখা। তবু লেখাটা জনপ্রিয়তা পেয়ে যায়। এখন অবশ্য ওই জনপ্রিয়তাকে সস্তা বলার স্পর্ধা দেখাতে পারি না। বন্ধুদের ভালোবাসাকে কোন সাহসে সস্তা বলি! অতঃপর অনেকের সঙ্গে যোগাযোগ হয়, বন্ধুত্ব হয়। সুমন্ত, সুপান্থ, শিপলু, বিনয়, পপি, অজন্তা, সুমী, আয়শা, মেসবাহ- আরো কত জন! বন্ধুত্বটা এখনো আছে। শুধু ছেদ পড়েছে যোগাযোগে। আমি ডুব মেরেছি, অথবা ওরা, কিংবা আমরা সবাই একসঙ্গে। তবু জানি, নয়নের মাঝখানে ঠাঁই নিয়েছে সবাই।

আজো তাই চব্বিশ ঘণ্টার বিষণœবেলায় ভালোবাসার চাদরের ভাঁজে ভাঁজে যতেœ রাখা বন্ধুর চিঠিগুলো বুকে ছোঁয়াই। বন্ধুত্বের নির্মল জলে ¯œাত হই ধূলিমাখা অস্তিত্বের এই আমি। পাশাপাশি দীর্ঘশ^াসের সমারোহে বুক চিরে যায়। কী যে অপরূপ সময়গুলো ছিল তখন! বন্ধুরা ছিল, হলুদ-নীলের বার্তা ছিল, মনোরম এক উদ্যান ছিল, পাহাড় ছিল। আর আজ? সবই আছে আগের মতন, শুধু সময়গুলো ছুড়ে ফেলেছে আমাকে দূর ব্যবধানে। ভরা বিষণœতায় তাই আশ্রয় খুঁজি স্মৃতির রঙিন ভেলায়। হামেশাই চড়ে বসি…। প্রতিদিন চামড়ার কালো ঝোলা নিয়ে ডাকপিয়ন আসত। সে আসার সময়টার জন্য কী রুদ্ধশ^াস প্রতীক্ষা ছিল আমার! রংবেরংয়ের খামে চড়ে আসত বন্ধুদের চিঠি। লম্বা এয়ারমেইলে শিপলু, সাদা ধবধবে মেসবাহ, সবুজ কালিতে সুপান্থ, মুক্তোর অক্ষরে অজন্তা…। হাতে নিয়েই ভালোবাসার ঘ্রাণে শুদ্ধ হতাম। সুপান্থের প্রাণদোলানো কাব্যকথা, পপি-আয়শার আটপৌরে কাহিনী, মেসবাহর রসিকতা, শিপলুর ভাবাবেগ, অজন্তার দর্শনে কত যে ঋদ্ধ হয়েছি!

ওদের চিঠি আমার কাছে সেরা সম্পদ ছিল। স্মৃতিকাতর বিধবা যেমন ক্যাচক্যাচ শব্দে সিন্দুক খুলে যুগল ছবির দিকে তাকিয়ে থাকে ঠায়। বেদনা সাঁতরেই যার সুখ। আমিও তেমনি। ভালোবাসার কালো অক্ষরগুলো আমাকে নিয়ে যায় ভালোবাসার দিনগুলোতে। ¯œান করি বিষণœ সুখের মোহনায়। অতঃপর বালুচরে উঠি। আমার হৃদয় আজ বালুচর। ওখানে মিশ্ররাগে গান বাজে। গান না দুন্দুভি! বেহাগ-ভৈরবীর মিশেল।

অতঃপর আমি দৌড়াই। সামনে না পেছনে জানি না। শুধু সেই সময়টাকে ধরতে চাই। কলম নিয়ে বসি। প্রতি- সুপান্থ, মেসবাহ কিংবা আয়শা, শিপলু…। কিন্তু পারি না ইতি পর্যন্ত যেতে। প্রজাপতি দিন চলে গেছে। অক্ষরে গোলাপ ফুটবে কেন! উত্তর খুঁজতে যাই না। উত্তরে পাহাড়। এই রহস্যটা নিয়ে বরং ভাবি- সবার দিন কেন একসঙ্গে যায়!

বিষণœ দুপুরে ঘুমানোর সময়টিতে, কিংবা গোধূলিবেলায় আমার টিনের দরজায় টোকা দিত সোনালী। ও সময়গুলো আমার প্রিয় ছিল, দারুণ প্রিয়। কত রাজ্যের কথা আর তর্কে জমে উঠত আমাদের আড্ডা। শান্তি চুক্তি, নারী মুক্তি নিয়ে যখন ওর সঙ্গে তর্ক বেধে যেত, আমি রীতিমতো ভয় পেতাম। না জানি কখন ঝরঝর করে চোখের ঝরনা খুলে দেয়! সোনালীর মতো নরম মানুষ খুব কম দেখেছি জীবনে। ফারহানা পপির ওপর অভিমানজনিত সোনালীর সেই বিখ্যাত কান্না আমাকে এখনো অবাক করে।

আর ছিল মতিউর, এশা, অরিনীতা, বিপ্লব, অন্তরিকা ও মতিউর, এখনো কি ফেয়ার এন্ড লাভলি মাখো? ফর্সা হতে ছয় সপ্তাহর বেশি তো লাগার কথা নয়। এষা-অরিনীতা, ‘বনই’ সম্বোধনটা করলে বড় অসময়ে। ততদিনে যে ক্যাম্পাসে আমার ছুটির ঘণ্টা বেজে গেছে। অন্তরিকা, সত্যিই আমার স্মৃতিশক্তি খুব কম। তোমাকে চিনতে পারিনি বলে রাগ করেছিলে? দুঃখিত বন্ধু।

বিপ্লব আমার লেখার প্রথম পাঠক। এটা-ওটা লিখুন বলে কী যে জ¦ালাত ছেলেটা! এখন তুমি কোথায়? তোমার কাছে আমি ঋণী হয়ে রইলাম।

শেষের দিকে চট্টগ্রামের পরিচিত সব বন্ধু মিলে একটা কাজে নেমেছিলাম। একদিন হঠাৎ কোত্থেকে আমার কনীনিকায় এসে হাজির এক সম্পাদক। চট্টগ্রাম থেকে সাপ্তাহিকী করবে। তার মিনতি- আমরা যেন সাহায্য করি। রাজি হলাম। জুটিয়ে নিলাম সবাইকে- ওয়াহিদ মুরাদ, এস এম আজাদ হোসেন, সোনালী, ফারহানা পপি, আফরিন, তুলি, সুমিমা, মিলি, আসফিয়া। টিমটা দেখে সবাই দুর্দান্ত একটা পত্রিকা পাওয়ার অপেক্ষায় ছিল। প্রথম সংখ্যা বেরুল ঠিকমতোই। শামসুর রাহমান, আনিসুজ্জামান, বুদ্ধদেব গুহ, নির্মলেন্দু গুণ, আনিসুল হকদের লেখায় সমৃদ্ধ হয়ে। স্পিকার, ভিসি, এমপিদের উপস্থিতিতে জমকালো প্রকাশনা উৎসব হলো এবং এরপরই বন্ধ হয়ে গেল ব্যতিক্রমী এই পত্রিকাটি।

আজ ভাবি, একজন দক্ষ সম্পাদকের হাতে পড়লে দারুণ রকম কিছু একটা করে ফেলতে পারতাম আমরা। তবু ওই অসম্পাদকের প্রতি কৃতজ্ঞতা। তার কল্যাণে অন্তত কয়েকদিন একসঙ্গে কাজ করতে পেরেছি সবাই। নইলে পপি-সুমি-মুরাদ-আজাদের উদ্যম, সোনালী-আফরিনের উৎসাহের সঙ্গে পরিচয় ঘটত না। আজাদ-মুরাদ ভাই এই বয়সে এত তরুণ, তরুণ বয়সে না জানি কেমন ছিলেন! অবাক হই।

প্রকাশনার আগের রাতে পেস্টিং রুমে তোমার-আমার ব্যস্ততা- মনে পড়ে তুলি? ভুলো না বন্ধু। তুমি এখন ঢাকায়। সাফল্যের সিঁড়িতে পা রেখেছ। আর আমার ওখানেই শেষ। এরপর কেবল পিছু হটা। সাগর-পাহাড়-উদ্যান ছেড়ে রুক্ষ ভূমিতে প্রত্যাবর্তন। খরা আর আগাছার দেশে। হোসেন মিয়ার দ্বীপে। এখানে সৃষ্টি নেই। কেবলই ক্ষয়ের আল্পনা। আমার অস্তিত্বে আজ শীতকাল। পাতাঝরা বৃক্ষের মতো হু হু করে মন। সুহৃদ সভায় প্রায়শই প্রশ্ন ওঠে- কেন লিখছি না আগের মতো? এক কথায় জবাব দিই- আলসেমি।

আলসেমি নয়, মনের বিলয়- ঠিকই বুঝতে পারি; কিন্তু বোঝাতে পারি না। তবু মাঝেমাঝে শীত কেটে ফাগুন আসে। একমুঠো মনজাগানিয়া সময় পরম মমতায় আমার হাতে তুলে দেন ভোলানাথ পোদ্দার, ওয়াহিদ মুরাদ, হাফিজ অলোক রহমান, ফাতেমা ইসলাম, আজিজুর রহমান সিদ্দিকী, মেসবাহ য়াযাদ, সুমন্ত আসলাম, আবু ফারুকী, ফরহাদ কিসলু, রেজা য়ারিফ, আতিকুর রহমান দর্জী, ফাহমিদা হায়দার সোমা, সুরাইয়া জামান মিলি, আলাউদ্দিন খোকন, জালাল উদ্দিন সাগর, আলমগীর সবুজ, জামশেদ রেহমান, এনামুল হক চৌধুরী, আনোয়ার আবসার, নুরুল আমিন হৃদয়, পাপন বড়–য়া, মশিউর রহমান মামুন, আবদুল্লাহ আল মামুন, মামুন মুহাম্মদরা। এখনো। সহসা আমি ফেটে যাওয়া প্রান্তরের কোনো এক কোণে বাসমতি ধান আবিষ্কার করি, ঘুঘুডাকা দুপুরে বটতলায় খুঁজে পাই হারিয়ে যাওয়া শেফালিকে এবং আমি আর বউ মিলে টিনের চালে বৃষ্টির গান শুনি।

এই তো ঢের। সময় বদলাবেই। নতুন সময় নতুন করে বেঁচে থাকার আহ্বান জানায়। আমার বিষণœতা ধুয়ে যায়। জেগে উঠি। অতঃপর নমস্কার করি- যারা আমাকে অসাধারণ কিছু সময় উপহার দিয়েছিল এবং এখনো দিচ্ছে। নমস্কার বন্ধু, সালাম।

:: পাফোস-৩২১৬। সিরাজপুর

কোম্পানীগঞ্জ, নোয়াখালী।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj