ঐতিহ্য ও আধুনিকতার পথিক : সাহিত্যিক আবুল ফজল

শুক্রবার, ৫ জুলাই ২০১৯

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

আবুল ফজল মারা গেছেন ৮০ বছর বয়সে, জন্ম তার ১৯০৩-এ, মৃত্যু ১৯৮৩ তে। অকালমৃত্যু বলা যাবে না তাঁর এ মৃত্যুকে, তবু এ মৃত্যুর দুঃখ তাতে কমবার নয়, যে-কালেই হোক মৃত্যু অবশ্যই মৃত্যু, অবশ্যই বিচ্ছেদ। ৮০ বছরের জীবনে আবুল ফজল ব্যস্ত ছিলেন সব সময়েই; কর্মঠ ছিলেন তিনি সারা জীবন। প্রথম জীবনে শিক্ষকতা করেছেন, প্রথমে মাদ্রাসায়, পরে স্কুলে, তারপর কলেজে, শেষ জীবনে উপাচার্য হয়েছিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে। ছিলেন তিনি রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা। ১৯৫৯-এ অবসর নেন তিনি সরকারি কলেজ থেকে, কিন্তু অবসর ছিল না তাঁর কাজ থেকে। উপাচার্য ও উপদেষ্টার পদ তিনি আনুষ্ঠানিক অবসর নেয়ার পরেই নিয়েছিলেন। তা ছাড়া লিখতেন সব সময়ই। জড়িত থেকেছেন নানাবিধ সংগঠন, উদ্যম ও আয়োজনের সঙ্গে। সেই ছাত্রজীবনেই সংশ্লিষ্ট হয়েছিলেন তিনি বহু উদ্যোগের সঙ্গে, এ্যান্টি-পরদা লীগের সদস্য ছিলেন, অংশ নিয়েছেন মুসলিম সাহিত্য-সমাজের বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনে। ভাষণ দিয়েছেন, অভিভাষণ দিয়েছেন। যাকে বলে কর্মময় জীবন, তাই ছিল তাঁর। কিন্তু তাঁর প্রধান পরিচয় শিক্ষকতা নয়, সাংগঠনিকতাও নয়, প্রধান পরিচয় অবশ্যই এ যে, তিনি একজন সাহিত্যিক ছিলেন। সেই পরিচয়েই বিশিষ্ট ছিলেন তিনি, সেখানেই তাঁর বিশেষ রকমের নিজস্বতা, আর সেই পরিচয়েই বেঁচে থাকবেন তিনি আমাদের সংস্কৃতির প্রবহমান ধারায়।

কিন্তু তিনি সাহিত্যিক ছিলেন এ কথা বললে কতটুকুইবা বলা হয় তাঁর সম্বন্ধে। না, অনেকটা বলা হয় না। সাহিত্যের চর্চা আরো অনেকেই করেছেন। তাঁর প্রথম জীবনের ছোটগল্পগুলোর মধ্যে তো দেখি বিস্তর তৎপরতা, লেখকদের এবং লেখাজোখার। কবির বিড়ম্বনা নাটকে, কবিতার কাটা, গল্পের নমুনা, গল্পের নায়িকা, কবিতার অপমৃত্যু, বিয়োগান্ত-এসব ছোটগল্পে, কবিতা আছে, কবি কল্পনা আছে, এমনকি প্রদীপ ও পতঙ্গ উপন্যাসেও নায়ক কবিতা লিখেছেন দেখতে পাই, সাহসিকা উপন্যাসের নায়ক জাফর চাকরি না পেয়ে সাহিত্যচর্চার কথা ভাবছে। আবুল ফজলের কথা-সাহিত্যেও রোমান্টিসিজম পুরোমাত্রাতেই আছে। সে কথা তিনি নিজেও বলেছেন অনেকবার। কিন্তু আবুল ফজল অবাস্তব কবিতা লেখেননি, তিনি চর্চা করেছেন গদ্যের। প্রবন্ধ লিখেছেন, নাটকও লিখেছেন, আর লিখেছেন উপন্যাস ও ছোটগল্প। অর্থাৎ মানুষকে দেখতে চেয়েছেন তাঁর সামাজিক পরিস্থিতিতে, সমাজে বহুবিধ বন্ধনের মধ্যে জর্জরিত অবস্থায়।

সেই সঙ্গে চিন্তাও করেছেন এ মানুষের বিষয়ে। আবুল ফজলের সব রচনাই মনে হয় স্বতঃস্ফ‚র্ত, কিন্তু কোনো রচনাই চিন্তাকে বাদ দিয়ে নয়। মানুষের চেয়েও মনুষ্যত্ব বড়, এ কথা বলেছেন তিনি প্রবন্ধে; কিন্তু মনুষ্যত্বের যে আলাদা কোনো অস্তিত্ব নেই মানুষ ভিন্ন এ সত্যের সাক্ষী তো তাঁর নিজের লেখা। এ মানুষগুলো অবশ্যই তাঁর নিজের শ্রেণির। কিন্তু নিজের শ্রেণির কথা ভাবতে গিয়ে গোটা সমাজে কথা এসেছে। বস্তুত আবুল ফজলের সব রচনার মধ্যেই একটি দার্শনিক মত আছে। অনুভবকে বাদ দিয়ে তাঁর লেখা নয়, কিন্তু তিনি অনুভবের ব্যাখ্যা করেন একটি দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে, তাঁর মূল্যায়নও করেন দর্শন দিয়েই। সে জন্য দেখি একটি উদার মানবতাবাদ পরিব্যাপ্ত তাঁর সব রচনায়। ‘মানবতন্ত্র’ নামে একটি অত্যন্ত তেজস্বী এবং সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে সাহসী রচনায় তিনি মানুষকে ধর্ম ও রাষ্ট্রের চেয়ে বড় করে দেখিয়েছেন এবং মনুষ্যত্বের অবরোধ ধর্মান্ধতা ও রাষ্ট্রীয় নির্যাতন কীভাবে অমানবিক ভূমিকা পালন করে তা তুলে ধরেছেন। কিন্তু এই একটি বিচ্ছিন্ন লেখা বলে নয়, তাঁর সব লেখাই মানবতাবাদের জয়গান। এর অনুরোধেই, বলা যায় তাগিদে, তাঁর লেখায় আছে অসাম্প্রদায়িকতার কথা, আছে সমাজতন্ত্রের কথা। সেই কত আগে শুরু করেছিলেন তিনি তাঁর উপন্যাস ‘জীবনপথের যাত্রী’, সেই ১৯৩৩ সালে, সেখানে দেখি নায়ক নয় কেবল, নায়িকাও সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী হয়ে উঠেছে। রাঙা প্রভাতের প্রকাশ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর, ১৯৫৭তে, সেখানে গণতান্ত্রিকতার কথা আছে। স্পষ্ট আছে সমাজতন্ত্রের কথা।

সাহিত্যকে তিনি অত্যন্ত মূল্যবান বলে মনে করতেন বলেই ব্রতী হয়েছিলেন সাহিত্যচর্চায়, অন্য কোনো কারণে নয়। তাঁর নিজের ভাষায়, সাহিত্যকে আমি কোনোদিন বিলাসের বস্তু মনে করিনি। মানুষের জীবনে সভ্যতা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সাহিত্যের এক বিশেষ ভূমিকা আছে, যে ভূমিকা সম্বন্ধে আমি সচেতন ছিলাম। তাই দেশের মানুষ ও সমাজের সমস্যা বারবার আমার লেখায় ছায়াপাত করেছে। ভয়ে বা প্রলোভনে আমি কখনো আমার কথাকে সাহিত্যের তথা সত্যের পথ থেকে বিপথগামী হতে দিইনি। দেশ ও সমাজের কথা ভেবে যখনই আমার মন আলোড়িত হয়েছে তখন আমি তা নির্ভয়ে প্রকাশ করেছি। আমার কণ্ঠস্বর কখনো চাপা থাকেনি। চেষ্টা করেছি লেখায় যথাসম্ভব যুক্তি ও বুদ্ধিনির্ভর হতে। যা তার খেলাপ তার বিরুদ্ধে আওয়াজ তুলতে কোনোদিন দ্বিধা করিনি। লেখকের আত্মপ্রকাশের একমাত্র মাধ্যম লেখা- লেখার ভিতর দিয়েই তিনি তোলেন আওয়াজ। আমার আওয়াজও আমার লেখার ভিতরই খুঁজে পাওয়া যাবে। (সাহিত্যের পথ ও পাথেয়)।

তা যাবে বৈকি। এ আওয়াজ একজন সাহসী মানুষের, সাহসিকা তাঁর একজন নায়িকা নয় কেবল, সাহসী তিনি নিজেও। নজরুল ইসলাম নন তিনি অবশ্যই। অঙ্গীকারে তিনি নজরুল অনুসারী। তাঁর কালের লেখকদের পক্ষে অনিবার্য ছিল নজরুল ইসলামের প্রভাব, কিন্তু আবুল ফজল সে প্রভাব যেভাবে নিয়েছেন অনেকেই তা পারেননি। একুশে ফেব্রুয়ারি মানে মাথা নত না করা একবার বলেছিলেন তিনি এবং নিজে তিনি নত করেননি মাথা। মনের বাঘই বেশি খায় বনের বাঘের চেয়ে, অন্যত্র তিনি লিখেছেন; তাঁর বনে বাঘ যে ছিল জানত সবাই, জানতেন তিনিও, ছিল বাঘ মনেও, কিন্তু মনের বাঘকে দমন করতে পেরেছিলেন বলেই বনের বাঘকে বিশেষ পরোয়া করেননি। আমার ছেলেবেলা বেশ বেপরোয়াভাবেই কেটেছে, নিজের সম্বন্ধে বলেছিলেন তিনি তাঁর আত্মজৈবনিক রেখাচিত্রে। এ বেপরোয়াভাব সব সময়ই ছিল তাঁর লেখায়। ‘লা-পরওয়া’ ছদ্মনামে লিখতেন তিনি এক সময়ে, সব সময়েই লা-পরওয়াই আসলে। তাঁর মতো সাহসী লেখক তাঁর সময়ে বিরল ছিল বৈকি।

কিন্তু যুক্তি? বুদ্ধিনির্ভরতা? সে-ও ছিল। ওপরের উদ্ধৃতিতে যে যুক্তি ও বুদ্ধিনির্ভরতার কথা বলেছেন তিনি, তা কখনো দূরে থাকেনি তাঁর লেখা থেকে। সেজন্য তিনি প্রবন্ধকার। কিন্তু প্রবন্ধ তাঁর সৃষ্টিশীল লেখাতেও আছে, যেমন সৃষ্টিশীলতা আছে তাঁর প্রবন্ধে। বস্তুত এই বিভাজন কৃত্রিম তাঁর ক্ষেত্রে, কথাসাহিত্যে তিনি চিন্তা করেন এবং প্রবন্ধও লেখেন কথাসাহিত্যের মতো সাবলীল গতিতে। সর্বত্র তিনি সমান যুক্তিবাদী, সর্বত্র সমান প্রবহমান। তাঁর প্রবন্ধে তাই কথাসাহিত্যের গুণ থাকে, কথাসাহিত্যে পাওয়া যায় প্রবন্ধেরও চিন্তা।

এ যুক্তিবাদী চিন্তাও তাঁকে বাধ্য করেছে সমাজকে বিশ্লেষণ করে দেখতে। উদার মানবতাবাদ বাইরের ব্যাপার অবশ্যই; সামন্তবাদ-শাসিত, ঔপনিবেশিকতার দ্বারা কবলিত সমাজে তার বিকাশ স্বাভাবিক নয়। বাইরে থেকে নতুন চিন্তা গ্রহণের ব্যাপারে অন্তত আবুল ফজলের মনে কোনো দ্বিধা নেই; সাহিত্যে ঐতিহ্যের প্রশ্নকে সামনে রেখেই যদিও বলেছেন তিনি কথাটা তবে এ বক্তব্য জীবনের অন্য ক্ষেত্রেও তাঁর দৃষ্টিতে যে প্রযোজ্য সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই। আজ জ্ঞান-বিজ্ঞান, রাজনীতি, সমাজনীতি, অর্থনীতি কিছুই আর আগের মতো একই ভৌগোলিক সীমারেখায় আবদ্ধ নয়।…আমাদেরও আয়ত্ত করতে হবে সর্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গি, করতে হবে বিশ্বসাহিত্যের খবরদারি।…শুধু বাপের মিরাস নিয়ে যেমন কোনো ছেলেরই দীর্ঘকাল চলে না তেমনি দেশগত ঐতিহ্য নিয়েও আমাদের দীর্ঘকাল চলবে না। (সাহিত্যের ঐতিহ্য) দেশের সঙ্গে মিলবে বিদেশ, তিনি চেয়েছেন। সাহিত্য, সংস্কৃতি, জীবন- এ তিনকে তিনি সব সময়েই একটি অবিভাজ্য সত্য বলে জেনেছেন, তবে জীবন তাঁর কাছে আগে, জীবনের জন্যই সাহিত্য, জীবনের জন্যই সংস্কৃতি। সংস্কৃতি বলতে মানুষের সঙ্গে তার পরিবেশের দ্ব›েদ্বর শিল্পগত প্রকাশকে অবশ্যই বোঝাননি তিনি, সংস্কৃতি বলতে উপভোগ, অবকাশ, উৎকর্ষ ইত্যাদিকেই বুঝিয়েছেন এবং তাঁর সার্বক্ষণিক আলাপ ছিল এটি যে, তাঁর নিজের সমাজে সংস্কৃতি অত্যন্ত নির্বস্তরের। সাহিত্যের চর্চা করেন তিনি একে উপরে তুলতে।

তবে তাঁর চিন্তার কথাই যদি বলতে হয় তবে এটাও উল্লেখ করা অত্যাবশ্যক যে, উদারনীতি তাঁকে রক্ষণশীল করেনি, যেমন অনেককে করে থাকে, উদারনীতি তাঁকে পথ দেখিয়ে এগিয়ে নিয়ে গেছে সমাজতন্ত্রের দিকে। তাঁর সমাজতন্ত্র কল্পলোকের, এ কথা বলা যাবে; কিন্তু সমাজতান্ত্রিক জগৎ গড়ে তোলার আবশ্যকতা বিষয়ে তিনি যে অসন্দিগ্ধ সে কথা মানতেই হবে। তিনি জানেন : ‘কারা সমাজ বা রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখে? একমাত্র উত্তর, দেশের শ্রমিক। ব্যাপক অর্থে দৈহিক শ্রম খাটিয়ে যারাই করে উৎপাদন আর উপার্জন তারাই শ্রমিক। তারাই সোনার ডিম পাড়ে।…অতিলোভে ফাঁদে পড়ে পুঁজিপতি আর মালিকেরা সে হাঁসকে জবাই করে একসঙ্গে সব ডিম কুড়িয়ে রাতারাতি আঙুল ফুলে কলাগাছ হতে চায়। কিন্তু তা-তো হওয়ার নয়। গল্পে হাঁসের মালিকের যা পরিণতি এঁদের পরিণতিও তার থেকে ভিন্নতর হবে না। প্রকৃতি এবং ইতিহাসের এই নির্দেশ।’ (যে হাঁস সোনার ডিম পাড়ে।)

শুরুতে বলেছি তিনি সাহিত্যিক ছিলেন এ কথা বললে সব কথা বলা হয় না। সে কথা ঠিক; বলতে হয় তাঁর সাহিত্যে দর্শন ছিল, যে দর্শন সামাজিক অগ্রগতির, যে দর্শনের ব্যাপারে তিনি ছিলেন নিরাপস। কিন্তু তিনি সাহিত্যিক ছিলেন কথাটা বললেও অনেক কথাই বলা হয় তাঁর সম্বন্ধে তাঁর বিশেষ পরিবেশের কথা স্মরণ করলে। কেননা তিনি সাহিত্যিক হবেন পরের কথা, তিনি বাংলাভাষার চর্চা করবেন এমন কোনো সুদৃঢ় প্রতিশ্রæতিও তাঁর পরিবেশে অদৌ ছিল না। জন্মেছিলেন গ্রামে; তাঁর পিতা হতে পারতেন পীর, না হয়ে হয়েছিলেন নিষ্ঠাবান মৌলভী। আবুল ফজলের হবার কথা ছিল মৌলভী, হয়েছেন তিনি সাহিত্যিক। বাল্যশিক্ষা শুরু হয় গ্রামের মক্তবে। সেখানে বাংলার চল ছিল না, ছিল আরবি। পরে চট্টগ্রামে এসে ভর্তি হন মাদ্রাসায়। সৌভাগ্য তাঁর ভর্তি হবার বছরখানেক পরেই ওই মাদ্রাসা বদলে গিয়ে রূপ নিল নিউ স্কিম মাদ্রাসার। রেখাচিত্রে তিনি লিখেছেন, সাবেক মাদ্রাসা শিক্ষায় আকস্মিক পরিবর্তন না ঘটলে ইংরেজি-বাংলার যে বাতায়নটুকু আমার মনের সামনে খুলেছিল তা আদৌ খুলত কি-না সন্দেহ। খোলা দূরে থাক, হয়তো ভালো করে বাংলা পড়ার সুযোগও জুটত না। পিতা উৎসাহী ছিলেন না এই নতুন শিক্ষায়। পরে যখন শুনলেন পুত্র লিখতে চান, পিতা তখন বলেছিলেন, উর্দুতে লিখবে, আরবি-ফারসিতে যদি না পারো।

বলাই বাহুল্য পিতৃনির্দেশ পালন করেননি তিনি। পিতৃনির্দেশ তখনও মান্য করেন নি যখন বিএ পাস করবার পর কলকাতা গেলেন আইন পড়তে। আইন পড়া হয়নি বটে, তবে পরে তিনি বিটি পাস করেছেন এবং ৩৭ বছর বয়সে বাংলায় এমএ ডিগ্রি নিয়েছেন। তখন তিনি চাকরি করেন স্কুলে। এসব ঘটনা একটি সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে। সেটি এ যে, পরিবেশ ছিল বৈরী। কিন্তু তিনি ছিলেন অদম্য।

শুধু তাঁর পিতা নয়, সমাজে অনেকেই মনে করত যে, বাঙালি মুসলমানের মাতৃভাষা বাংলা নয়। আবুল ফজল সেকালেরই লোক। ১৯২৭-এ তাঁকে লিখতে হয়েছে। প্রবন্ধ-মাতৃভাষা ও বাঙালি মুসলমান। বলতে হয়েছে সে প্রবন্ধে, পৃথিবীতে অনেক কিছুই অদ্ভুত দেখিতে ও শুনিতে পাওয়া যায়। বাঙালি মুসলমানদের মাতৃভাষা কি? উর্দু? না বাংলা? আমার মতে ইহা সর্বাপেক্ষা অদ্ভুত কথা। আম গাছে আম ফলিবে না কাঁঠাল- এমন অদ্ভুত প্রশ্ন অন্য কোনো দেশে কেহ করিয়াছেন কিনা জানি না। কেবল অদ্ভুত নয়, এখন মনে হবে অবিশ্বাস্যও। কিন্তু সেই অবিশ্বাস্যরকম অদ্ভুত পরিবেশেরই তো মানুষ ছিলেন আবুল ফজল। তার ভেতর থেকেই বেরিয়ে এলেন, এসে গল্প লিখলেন, উপন্যাস লিখলেন, নাটক, প্রবন্ধ কোনোটাই বাদ দিলেন না। যার পক্ষে বিস্ময়ের ব্যাপার হতো না মৌলভী হওয়া, তিনি বাংলাভাষার খ্যাতনামা সাহিত্যিক হয়েছেন। এ কিছু কম কথা নয়।

কথাসাহিত্যিক আবুল ফজল গল্প ও উপন্যাস লিখতে এসে মুখোমুখি হয়েছেন আরেক প্রতিক‚লতার। সে তাঁর সমাজের সামান্যতা। কোথায় পাবেন উপযুক্ত নায়ক-নায়িকা? কোথায় ঘটনা? মুসলিম মধ্যবিত্ত তখন কেবলমাত্র গড়ে উঠেছে। তাদের জীবনে চলমানতা কম, বন্ধ্যত্ব সর্বব্যাপ্ত। আবদ্ধ মানুষগুলোকে কী করে আনেন গল্প-উপন্যাসে? বিশেষ করে মেয়েদের। ১৯২৭ সালেই প্রবন্ধ লিখেছিলেন পর্দা প্রথার সাহিত্যিক অসুবিধা বিষয়ে। বলেছেন, আমার মনে হয় মুসলমানদের কথাসাহিত্য সৃষ্টিতে অকৃতকার্যতার প্রধান কারণ, মুসলমান সাহিত্যিকেরা সমাজের সর্বাঙ্গীণ জীবনকে জানতে পারছে না। কারণ ওই পর্দা। মেয়েরা থাকছে দূরে। সামনে ঝুলছে পর্দা। দূরে থাকার কারণেই তাদের সম্পর্কে কৌত‚হল বেশি, আবুল ফজলের নিজের রচনাও বলছে সে কথা। প্রদীপ ও পতঙ্গ তাঁর একটি উপন্যাসের নাম; প্রদীপ ও পতঙ্গের সম্পর্ক তার অধিকাংশ রচনারই প্রধান বিষয়বস্তু। মেয়েরা টানছে পুরুষকে।

কিন্তু পুরুষের জীবনে ওই যে বৈচিত্র্যহীনতা সেটা প্রধান সমস্যা। এমনকি চাকরিও দেয়া যাচ্ছে না ভালো রকমের। বেকার যুবক কবিতা লিখছে। কখনো কখনো নায়ক যাচ্ছে বিদেশে, কিন্তু ঠিক উৎপাদন করছে না বিশ্বাসের। নায়িকা যাচ্ছে চলে পতিতালয়ে, সেটি আবার ওই সামাজিক কারণেই। প্রদীপ ও পতঙ্গের শেষ অধ্যায়ে তাঁর বক্তব্যটি অভিজ্ঞতার ভেতর থেকেই বেরিয়ে এসেছে, ‘আধুনিক মানুষকে নিয়া গল্প লিখিতে বসাই এক ঝকমারি ব্যাপার। জানাইবার মতো লিখিবার মতো কী সংবাদই বা ইহাদের জীবনে আছে?’ কিন্তু সমাজের এ সামান্যতায় নিরুৎসাহিত হননি আবুল ফজল। তিনি একে নিয়েই সৃষ্টি করেছেন সাহিত্য।

বস্তুত নিরুৎসাহ হবার কোনো ভঙ্গিই আবুল ফজলের নেই। তাঁর ব্যক্তিগত জীবনেও না। জীবন-পথের যাত্রী তিনি, চলমানতাই তাঁর জীবনের প্রধান বৈশিষ্ট্য। এরই ফলে তিনি মাদ্রাসা শিক্ষক হিসেবে শুরু করে শেষ পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হয়েছেন। পরিবেশের সব বাধা ডিঙিয়েই চর্চা করেছেন সাহিত্যের এবং চিন্তাধারায় সব সময়েই ছিলেন তিনি আধুনিক। সময় বদলেছে, সেই চলমান সময়ের সঙ্গে সঙ্গতি রাখতে অনেকেই পারেননি, আবুল ফজল পেরেছেন। তাঁর উপন্যাস সাহসিকার নায়ক জাফর নিজের জীবনের মূলমন্ত্র হিসেবে এমিয়েলের একটি বাণীকে দেয়ালে বাঁধিয়ে রেখেছিল যেখানে এমিয়েল বলেছেন, যে চুপ করে থাকে সে বিস্মৃত হয়; যে আগায় না সে পিছিয়ে যায়; যে বড় হয় না সে ছোট হতে থাকে। আবুল ফজলের জীবনেরও যদি কোনো মূলমন্ত্র থেকে থাকে তবে সেটি বুঝি এটি। তিনি চুপ করে থাকেননি কখনো, পিছিয়ে যাননি, ছোট হতে রাজি হননি।

আবুল ফজলের ওপর একটি পূর্ণাঙ্গ বই লিখেছেন শহীদ বুদ্ধিজীবী আনোয়ার পাশা। সে বইতে আনোয়ার পাশা লিখেছেন যে, আবুল ফজল ট্র্যাজেডির লেখক নন। সত্যি তাই। তাঁর লেখা আশাবাদী, সাহিত্যিককে তিনি বলেছেন সমাজের বিবেক। এ বিশেষ অর্থেই সাহিত্যিক তিনি। তিনি আমাদের চলমানতারই অংশ, আমাদের আশাবাদের স্থপতিদের একজন। জীবন-পথের এ অক্লান্ত যাত্রীর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক শ্রদ্ধার যেমন, তেমনি কৃতজ্ঞতারও।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj