বিষাদে বন্দিদশা

শুক্রবার, ৫ জুলাই ২০১৯

আহমেদ আববাস

কাঠবিড়ালের কিচিরমিচির শব্দ পেয়ে ওপরে তাকাতেই দৃশ্যটি চোখে পড়ে। মাটি থেকে হাত দশেক ওপরে যেখানে জামগাছের অবিমিশ্র প্রকৃত কাণ্ডটি ওয়াইশেপে বিভাজিত হয়েছে- ঠিক সেখানে, গাছের কাণ্ডদ্বয় ভূমির সমান্তরাল হয়ে ওপরের দিকে দুপাশে আলগোছে একটু একটু করে ক্রমোন্নত। যুগলের ভেতর কাঠবিড়ালিটি ঊর্ধ্বদিকে লেজ আর শরীরের সম্মুখভাগ নিচের দিকে। পুরুষ প্রকৃতির কাঠবিড়ালটি সহচরির ঠিক অপরদিকে, একটু নিচুতে শরীরটি স্থাপন করে মুখটি ওপরের দিকে রেখেছে। অর্র্র্থাৎ দুটিতে মুখোমুখি। ঊর্ধ্বমুখী কাঠবিড়ালটি পরম আদরে ও নিরন্তর আবেগে তার সঙ্গিনীর চোখে-মুখে এবং শরীরের সম্মুখভাগের সর্বত্র তার মুখ দিয়ে মমত্বময় পরশ বুলিয়ে পরিবৃত্তের চৌদিকে কিচিরমিচির শব্দে মুখর করে তুলছে।

খুলনার মুজগুন্নি পার্কের ভেতর ছোট একটি পুকুর। পাড়েই জামগাছটি। তার নিচে ওরা দুটিতে বসেছিল। শোভন আর উর্মি। শব্দ পেয়েই দুটিতে জামগাছের দিকে তাকায় আর ঐ সময় উর্মি ভাবাবেগ ধরে রাখতে পারে না, ‘শোভন দেখ, দেখ কী সুন্দর কাঠবিড়ালের জুড়ি। আমরা কি কখনো এই বন্দিদশা থেকে মুক্ত হতে পারবো না।’

‘এখন নিষ্পত্তি তোমার হাতে। তোমার স্পিড এন্ড কারেজই আমাদের জুড়ি বাঁধতে পারে।’

‘শোভন তুমি বুঝতে চাইছো না কেন, সামনে ক’দিন পরই আমার শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা। এরপর বাড়িতে একটু চাপ সৃষ্টি করবো। নাহলে নিজের সিদ্ধান্ত নিজেকেই নিতে হবে।’

‘উর্মি, তোমাকে এ বিষয় বুঝানো যাবে না। সত্যি বলতে কি সারাক্ষণ দিনরাতের প্রতিটি প্রহর, প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি পলক আমার হৃদয়ে তুমি উর্মিমালার মতো তোলপাড় করে রাখো। আমি বুঝতে পারিনে, এত তাড়াতাড়ি কেন এমন হলো। ক্যান ইউ গিভ মি এনি রিপ্লাই।’

‘আমি কী সারারাত ইচ্ছেমতো ঘুমোতে পারি। আমিও ইচ্ছে নিয়েই ভেতরে ভেতরে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছি। কিছু করতে পারছি না।’

‘করতে তোমাকে হবেই। না হলে ছটফট করেই দুজনের জীবন কাটাতে হবে। আর সব দোষ তোমার। আমাদের মাঝে আনুষ্ঠানিক দেখাদেখির পর তুমিই প্রথম ফোন দিয়েছিলে। আর ফোন দিলেইবা সেটা কন্টিন্যু করলে কেন? আর তোমার মা কেন সপ্তাহ ধরে মোবাইল ফোনে আশ্বাস দিয়েছিল। এ জন্য সব দায়ভার তোমার এবং তোমাদের।’

ম্যানগ্রোভ বা শ্বাসমূল বনাঞ্চলীয় নগরী খুলনা। শহরতলির একটি জায়গার নাম গোবরচাকা। সেখানে একটি বাড়ির চৌহদ্দি গ্রামের ন্যায় চৌদিকে পরিব্যাপ্ত। প্রচুর গাছগাছালির সমারোহ। ফাল্গুনের মাঝামাঝি সময়। বৃক্ষ বীথির পাতায় কচি কচি কিশলয়ের সতেজ উল্লাস। রাস্তার পাশেই শিমুল ও কৃষ্ণচূড়ার প্রাণবন্ত রঙিন হাতছানি। অদূরেই কোকিল অবিরামভাবে জানান দিচ্ছে, ‘আজি বসন্ত জাগ্রত দ্বারে’। চিরাচয়িত প্রথা অনুযায়ী শোভন তার মাতৃসম খালামণিকে নিয়ে এমনি এক বসন্ত বিকেলে কনে দেখতে যায়। বাড়ির উঠোনেই জামরুল, সফেদা, কামরাঙ্গা আর মেহেদি গাছ। উঠোনের প্রায় অর্ধেক অংশ পাকা মোজাইকৃত। কনে দেখা আলোয় বর পক্ষের জন্য তৈরি আসনের মাঝে সুদর্শনা উর্মি এসে স্থান গ্রহণ করে। সে সময় বসন্তের বিকেল যেন প্রাণপ্রাচুর্যে ভরে ওঠে। নিকানো উঠোনের একপাশে বিকশিত গাদা ফুলগুলো স্বচ্ছন্দে হেসে ওঠে। উভয় পক্ষের পারিবারিক আয়োজনে শোভন-উর্মির প্রথম সাক্ষাৎ। অকুস্থলে সবার সবাইকে গ্রহণযোগ্য মনে হয়। এ কারণে সেলফোন নম্বর বিনিময়।

সপ্তাহখানেক পরের ঘটনা। কনের মেজ বোনাই সরকারি কর্মচারী। একজন ইঞ্জিনিয়ার। সবকিছুতে সন্দেহবাতিক। সে হিসাব-নিকাশ করে দেখে, ছেলে ১৭ বছর বয়সে চাকরিতে যোগদান করেছে। তার বয়স ২৮, এখনো বিয়ে করেনি কেন। নিশ্চয়ই এর ভেতরে একটা কিছু রয়েছে। তখন গোয়েন্দা নিয়োগের ন্যায় শোভনের বাড়ির আশপাশে জরিপ করে রটনা হিসেবে উড়ো খবরে জানতে পারে, সংকীর্ণ শহরের বিশাল অর্থবান ও বৃহৎ এক নেতার চিকিৎসক কন্যার সাথে শোভনের প্রায় চার বছরকাল গভীর প্রণয় ছিল। আর যায় কোথায়!

কনে পক্ষের লোকজন ছেলের খুঁত অনুসন্ধানে আগ্রহী হয়ে ওঠে। তখন অসম্মতি ও ভিন্নমত প্রকাশের জন্য কনেপক্ষের অনেক অভিভাবক ও হিতাকাক্সক্ষী গজিয়ে ওঠে। কেউ বলে, ছেলে হয়তো সেখানে কাউকে না জানিয়ে গোপনে বিয়েই করেছিল। কেউবা বলে, ছেলে মেরিনার, মার্চেন্ট শিপে চাকরি করে আবার বাড়িও দূরে, তারপর বছরের ছ’মাস সমুদ্রেই কাটে। আবার কারো মতে, ছেলে দেখতে পলকা ইত্যাদি। কনেপক্ষ থেকে আর পজিটিভ সাড়া আসে না। কিন্তু উত্তরোত্তর শোভন-উর্মির ফোনালাপ অব্যাহত থাকে।

সর্বশেষ জাহাজ থেকে শোভন চিফ অফিসার হিসেবে সাইন অফ করে খুলনায় খালার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল। সেখান থেকেই কনে দেখা এবং পরবর্তীতে বিষয়টি বিতর্ক, জটিলতা এবং নানা ঘোরপ্যাঁচে মোড় নেয়। দীর্ঘদিনের ছুটি থাকায় শোভন তার খালার বাড়িতেই অবস্থান করতে থাকে। ঘটমান বিষয়ের সুফল পাবার আশায়। উর্মি খুলনা সরকারি মহিলা কলেজ থেকে অর্থনীতিতে অনার্স-মাস্টার্স পাস করে মাত্র দুবছর হলো প্রাইমারি স্কুলে যোগদান করেছে। তার এ চাকরিতে যেকোনো সময় সহকর্মীদের সহায়তায় শ্রেণি থেকে অনায়াসে বিচ্ছিন্ন থাকা যায়। আর শোভনের খুলনায় নিশ্চিত আবাসন সুবিধা থাকায় উর্মির সাথে প্রত্যাশামাফিক দেখা করতে কোনো বাধা থাকে না। শোভন-উর্মি সেলফোন সংযোগের সহযোগিতায় আর অনুক‚ল সময়ে কাক্সিক্ষত ভাব সম্মেলনের আশ্লেষে ক্রমশ সুমুখপানে এগিয়ে যায়- একটি মধুময় স্বপ্নের লক্ষ্যে, অবিরল অমৃতধারায় মিলনের প্রত্যাশায় কিংবা অনিশ্চিত ভবিষ্যতের নিশানায়।

শোভনের খালামণি কন্যাপক্ষের মতামতের বিষয়ে আবার জানতে চাইলে উর্মির মা বলেন, ‘আমরা কেউ এ বিয়েতে রাজি নই।’

শোভনের খালামণি অনুনয়-বিনয় করে বিষয়টি পুনর্বিবেচনার কথা বললে জানায়, ‘উর্মির বাবা দুমাসের জন্য ধর্মীয় কাফেলায় অবস্থান করছেন। হয়তো লাভ হবে না। তবু উনি না আসা পর্যন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য অপেক্ষা করতে পারেন।’ বরপক্ষ আশা-নিরাশার দোলাচলে প্রতীক্ষা করতে থাকে।

‘উর্মির বাবার স্বগৃহে প্রত্যাবর্তন পর্যন্ত সময় অপেক্ষা।’ শুধু এটুকু প্রতিশ্রæতির কথাটি জানতে পেরে শোভন-উর্মি আবার নতুন করে উদ্দীপ্ত হয়। মনে মনে আবার স্বপ্নের বীজ প্রোথিত করতে থাকে হৃদয়ের গহীনে এবং অনাগত স্বপ্নীল ভবিষ্যতের আশায়। ভাবে হয়তো এ প্রণয় একদিন পরিণতির দিকে যাবেই।

ধর্মীয় কাফেলায় নির্ধারিত সময় অতিবাহিত করে উর্মির বাবা বাসায় ফেরেন। সেসময় যেন বাড়িতে চাঁদের হাট বসে। বড় দুই জামাই, বড় দুই ছেলে, অন্যান্য আত্মীয়স্বজনসহ বাড়ি জনাকীর্ণ। উর্মির বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের জন্য রীতিমতো বৈঠক বসে। কেউ এতে ঐকমত্যে পৌঁছতে পারে না। সর্বোপরি উর্মিবিহীন বিয়েতে আর কেউ রাজি থাকে না।

ঘরোয়া বৈঠকে সংঘটিত আলোচনা খোলাসা করে বলার জন্য পরদিন উর্মি শোভনকে পার্কে ডেকে নেয়।

‘দেখো শোভন, আমি তো ক্রমাগত চেষ্টা করেই যাচ্ছি। গতকাল আমার বিয়ের ব্যাপারে ফাইনাল সিদ্ধান্তের জন্য এক ঘরোয়া বৈঠক বসেছিল। তারা কেউ একমতে পৌঁছতে পারেনি। ফলে যা হয়। কিন্তু আমাকে টলাতে পারেনি।’

‘আমাদের বাড়ি থেকেও বিয়ের জন্য কন্টিন্যু আমাকে চাপ দিচ্ছে। বলছে, দুনিয়াভর্তি অবিবাহিত মেয়ে। আর তুই কোথায় কী দেখছিস, তার পিছে পড়ে রইছিস। তুমিই বলো এখন আমি কী করি।’

‘তুমি তো জানো, আমাদের পরিবার কতটা রক্ষণশীল। হিজাব ছাড়া বাড়ি থেকে বের হওয়া যায় না। এখানে তোমার কাছে এসে আমি এখন মুক্ত, স্বচ্ছন্দ এবং বাধাহীন। তাই দেখো সব উন্মুক্ত করে তোমার জন্য নিজেকে মেলে ধরেছি।’

‘তুমি চেষ্টা করো অন্য মেয়ে পছন্দ করতে। না হলে আমার জন্য অপেক্ষা করো। অথবা আর একটি ছমাসের ভয়েজ শেষ করে এসো। এর মাঝে একটা বিহিত হয়ে যেতে পারে।’

উষ্ণকালের প্রখর তাপদাহের পর আসে বর্ষা। প্রকৃতিতে সর্বত্র নবজীবনের আন্দোলন। গ্রামীণ জনপদে কদম ফুলের ঘ্রাণ এবং তার সাদা-হলুদের বিশুদ্ধ সৌন্দর্য যথাকালে চারদিকে আপন আলোয় উদ্ভাসিত করে তোলে। তাছাড়া এই জলসিক্তকালেই কেয়া, জুঁই, গন্ধরাজ, হাসনাহেনার সৌরভ আর নানাফুলের বিচিত্র বর্ণ ও অনলৌকিক সাজ অবারিত, উন্মুক্ত হয়ে সবার দৃষ্টিকে নিবিড়ভাবে আকর্ষণ করে। কিন্তু শোভন-উর্মির অনুরাগের দ্বার পরিণতির দিকে উন্মুক্ত হয় না। নিবৃত্ত, অবরুদ্ধ, নিশ্চল, প্রতিহত ও সুপ্তির ভেতরেই থেকে যায়। রাতে ঘুমোতে পারে না শোভন। হয়তোবা উর্মিও। শোভনের নির্ঘুম রাত্রিবাস তার খালামণিকে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত করে তোলে। খালা যারপরনাই ছেলের জন্য ভেতরে ভেতরে উতলা ও উদ্বিগ্ন হয়ে ওঠেন। পরদিন বয়রা বাস স্টপেজে মেহেরপুরের বাসে উঠিয়ে দিতে গিয়ে ছেলের চোখে ছলছল কান্না দেখে তার খালাও চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি, ছেলের মর্মবেদনায় কেঁদে ফেলেন।

সময়ের হাত ধরে জীবনকাল এগিয়ে চলে। সন্ধিক্ষণ, পরিস্থিতি ও পরিজনবর্গের চাপে শোভনকে একদিন পাণিগ্রহণের পিঁড়িতে বসতে হয়। উর্মিও কি পাণিপীড়নের হাত থেকে নিষ্কৃতি পেয়েছে? পরিণায়াবদ্ধ হওয়াটাই এ ভূখণ্ডের জনজীবনের জন্য প্রাকৃতিক, প্রথাগত এবং সহজাত উপলক্ষ। চুয়াডাঙ্গা প্লাটফর্মে সুন্দরবন এক্সপ্রেস আসামাত্র পরিবার নিয়ে শোভন এসি চেয়ার কামরায় উঠে পড়ে। শোভনের স্ত্রী বন্ধ জানালার স্বচ্ছ কাচের ভেতর দিয়ে বাইরে মুখ বাড়ায়। নির্ণিমেষ দৃষ্টিতে বাইরের দৃশ্যমান বস্তুগুলো দেখতে থাকে। শোভন তার পাঁচ বছরের শিশু মেয়েটিকে সামলাতে হিমশিম খায়। শোভনের শিশু মেয়েটি দুসারি সিটের মাঝের লবি দিয়ে ক্রমাগত এদিক-ওদিক দৌড়াতে থাকে। দৌড়াবার এক পর্যায়ে শিশু বাচ্চাটি আপাদমস্তক অবগুণ্ঠিতা এক রমণীর কোলের কাছে যায়। রমণীটি সাগ্রহে ফুটফুটে বাচ্চাটিকে কোলে তুলে নিয়ে আদর করতে থাকে। পাশে উপবিষ্ট তার স্বামী হয়তো তখন তন্দ্রার ভেতরে স্বপ্নাবিষ্ট। শোভন কাছে এলে রমণীটি বুঝতে পেরে বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে লবি দিয়ে হাঁটতে থাকে। শোভন তাকে অনুসরণ করে বলতে থাকে, ‘আপনি বাচ্চা নিয়ে কোথায় যান।’

বোরখা পরিহিতা রমণীটি উত্তর দেয়, ‘বাচ্চাটির এসিতে একটু ঠাণ্ডা লেগে যাচ্ছে। আসুন, কামরার বাইরে গাড়িতে ওঠানামার দরজার পাশে যাই।’

এন্ট্রাস-এক্সিট দরজা স্পেসে দাঁড়িয়ে একজন যুবক সিগারেট টানছে। বাইরে থেকে গ্রীস্মের গরম হাওয়া খোলা জানালা দিয়ে এপাশ-ওপাশ করছে। শোভন কৌত‚হলচিত্তে গিয়ে সেই অবগুণ্ঠিতা রমণীর পাশে দাঁড়ায়। মুখের নেকাব উন্মুক্ত করে রমণীটি শোভনের দিকে তাকায় এবং অপ্রত্যাশিতভাবে বলে, ‘শোভন তুমি আমাকে চিনতে পারোনি। চিনবেই বা কীভাবে?’

খেদ এবং অভিমান মিশ্রিত গলায় উর্মি বলে চলে, ‘তুমি ভয়েজে যাবার তিন মাসের মাথায় জোর করে আমাকে এক কলেজ অধ্যাপকের সাথে বিয়ে দিয়ে দেয়। তুমিতো এসে খোঁজও নিলে না। আমি কেমন আছি জানতেও চাইলে না। হোয়াটস রং উইথ ইউ।’

‘আমার মনে হয়, ভালোই আছো। পাশে বসা বিয়াড্রেড ম্যান নিশ্চয়ই তোমার হাজব্যান্ড। আর তুমিও তো হিজাব-লেবাসে একবারে রাজজোটক।’ শোভন নিজের ভেতরে কষ্ট পুষে রেখে ভাবপ্রবণ হয়ে কথাগুলো বলে।

স¥ৃতির উত্তরাধিকার একে অন্যকে আঁকড়ে ধরে। দুজনই নস্টালজিয়ায় ফিরে যায়। উর্মিও সংসারে তার যথাযথ স্বাধিকার না থাকায় অনেকটা হিউম্যান বন্ডেজের ভেতরেই তার জীবন অতিবাহিত করছিল। এ জন্য শোভনকে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে নানারকম দুঃখ-বিষাদের কথা বলতে তৎপর হয়। এবং বলে, ‘তুমি ঠিকই ধরেছো, উনিই আমার স্বামী। গত ৯ বছরে তিনবার ফলবতী হয়েছি। বাচ্চা তিনটে খুলনায় ওদের নানুর কােেছ রেখে এসেছি। সপ্তাহখানেক পর ওরা নানির সাথে আসবে। স্বামীসহ ঢাকাতেই থাকি। উনি সরকারি চাকরি করেন। আমার চাকরিও বদলিসূত্রে বর্তমানে রাজধানীর ভেতরে। এখন এভাবে তোমার সাথে কথা বলা দেখলে আমার বারোটা বাজিয়ে দেবে। আমার সবই আছে। স্বামীর ভালো বেতন, সংসার, সন্তানাদি। শুধু তুমি নেই। তোমার কথা মনে হলে মনটা অপূর্ণতায় হাহাকার করে ওঠে।’ বলে দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ে উর্মি।

‘আমার স্ত্রীকে তো দেখেছো, সে এখন উদাসভাবে জানালা দিয়ে বাইরের সাথে মিতালি করছে। সে-ও একজন বড়মাপের সরকারি চাকুরে। রূপ যৌবনের ঘাটতি নেই। তবু মনে হয় ফিমেল ফিগার। কোথাও স্বতঃস্ফ‚র্ততা নেই। বললে না নেই। না বললে স্বেচ্ছায় কোনোকিছুতে অগ্রসর হয় না। আর আমি এখনো মাঝে মাঝে অতীত আর্তিতে ফিরে যাই। এর নামই জীবন। মনে হয় এখনো ডিটেনশনে আছি। আসলে আমাদের মানসিক মনোবৃত্তির আটকবস্থা আজো শেষ হয়নি। যেমনটি ছিল তোমার অভিভাবকদের ‘ইনডিসিশন’-এর দিনগুলোয়।’

‘শোভন আজ এই মুহূর্তে আমার কী মনে হচ্ছে জানো, এখনই ট্রেনের এ দরজা খুলে তোমার হাত ধরে ট্রেন থেকে লাফিয়ে পড়ি।’ বলতে বলতেই অপাঙ্গে দেখে, তার শ্মশ্রæমণ্ডিত পরমপতি সিট থেকে উঠতে উদ্যত। এ সময় বাচ্চাটি শোভনের কোলে দিয়ে দ্রুত কামরার ভেতরে ঢোকে।

ঢাকায় এসেই শোভনের সাথে আবার উর্মির মোবাইল কানেকশন। প্রায় সময়ই মোবাইলে কথা হয় আলোকভেদ্য দিনের নির্মল আলোয়। যা উর্মির জন্য নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ সময়। শোভনের বাসা উত্তর ইব্রাহিমপুর এবং উর্মির আগারগাঁও ক্রমাগত মোবাইল সংযোগে আলোচিত হতে থাকে পাওয়া না পাওয়ার সাতকাহন। একে অন্যের প্রতি আবার দুর্বল হয়ে পড়ে। আবার অভিসারের বাসনায় দুজনের মনে পূর্বস¥ৃতি উদ্দীপ্ত ও প্রণয়ানুভূতি মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। নিরালার সমাহারে অকথিত আবেগ উচ্ছ¡াসগুলো ব্যক্ত করার জন্য তাদের দেহমন পুলকিত হয়। আর কনে দেখা আলোয় নয়, পার্কের সূর্যালোকেও নয়। ফ্লুরোসেন্ট ল্যাম্পের আলোয় একে অন্যকে নিবিড়ভাবে দেখতে চায়। দ্বিধা-দ্ব›দ্ব, পাপ-তাপ তৃণজ্ঞান করে ক্ষোভে-দুঃখে একান্ত সান্নিধ্য পাবার লক্ষ্যে দুজন হোটেলের বুকিং কামরায় যাবার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। প্রার্থিত দিন সকাল ন’টার ভেতরে স্বামী-স্ত্রীর পরিচয়ে তারা সংরক্ষিত কামরায় অবস্থান করবে। এইভাবে দিনক্ষণ নিরুপিত হয়।

হোটেল কক্ষে যুগপৎ সংঘটনের কথা ভেবে পূর্বদিন দুপুর থেকেই শোভনের মনটা এলোমেলো হয়ে যায়। কোনোকিছু ভালো লাগে না। একেবারে কিংকর্তব্যবিমূঢ়। তবু পাওয়া-না পাওয়ার দোলাচলে মন টানে। উর্মির সাথে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে।

সন্ধ্যে সাতটা। উর্মির কাছ থেকে কল পাবার জন্য বিলকুল অনির্ধারিত সময়। তবু তার মুঠোফোন থেকে আচানক কল আসে। এবং জানায়, ‘শোভন, সরি। এবারের মতো আমাকে মাফ কর। আমার ছোট ছেলেটির প্রচণ্ড জ্বর। আমাকে ভোর পাঁচটার গাড়িতেই খুলনায় যেতে হবে। আমার কাজিন টিকেট কেটে এনেছে। বাই। পরে দেখা হবে।’

শোভন শুনে যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে।

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj