সূর্য ওঠার আগে

শুক্রবার, ৫ জুলাই ২০১৯

রফিকুর রশীদ

ধারাবাহিক উপন্যাস : ৭

জেসমিন বিয়ের যোগ্য হয়েছে বই কী! লেখাপড়ায় খুব চৌকস তা বলা যাবে না। ক্লাস ফাইভ পেরুনোর সময় প্রাথমিক বৃত্তি পেয়েছিল বটে, রেজাল্টের এই ধারাবাহিকতা সে সমান তালে ধরে রাখতে পারেনি। মাঝারি রকমের রেজাল্ট নিয়ে স্থানীয় হাই ইশকুল থেকে মাধ্যমিক এবং মেহেরপুর কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করা হয়ে গেছে। ছোটবেলা থেকে তার প্রবল ঝোঁক খেলাধুলার প্রতি। ইশকুল-কলেজে পড়ার সময়েই সে ইন্টার ডিস্ট্রিক্ট এবং ইন্টার বোর্ড বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতায় রানার্স আপ হয়ে পুরস্কার নিয়ে আসে। গাংনীর মতো নিভৃত মফস্বলে সে এক বিরাট ঘটনা বটে। বেশ দু’তিনটি খবরের কাগজ থেকে সাংবাদিক এসে তার ইন্টারভিউ নিয়ে ছবিসহ ছেপেছে। ইত্তেফাকের পাতা ভাঁজ করে ফাইলের মধ্যে রেখে দিয়েছে, আগে অনেককে ডেকে সে কাগজ দেখিয়েছে, এখন আর দেখাতে ইচ্ছে করে না। শুধু খেলাধুলা নয়, দূরন্তপনাতেও জেসমিনের খুব নামডাক। গাংনীর মতো ছোট্ট থানা শহরে, শহর কোথায় এখনো গ্রামাই বলা চলে, এখানে সবার চোখের সামনে সে সাইকেল চালিয়ে বেড়িয়েছে; ছোটমামার শার্ট গায়ে দিয়ে স্মার্ট হতে চেষ্টা করেছে। তার খুব ইচ্ছে ঢাকা ইউনিভার্সিটি ভর্তি হবার। না, সে মেহেরপুর কলেজে বিএ পড়বে না। সে পড়বে বিশ্ববিদ্যালয়ে। কে যে তার চোখে এই স্বপ্নের জীয়নকাঠি বুলিয়ে দিয়েছিল কে জানে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অথবা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়- এই দুটো তার পছন্দের প্রতিষ্ঠান। কিন্তু যে মেয়ের মাথার উপরে বাপ নেই, মা আছে সেও এক অর্থে পরনির্ভরশীল; কে তার লেখাপড়ার ইচ্ছে পূরণ করবে! মামাদের মধ্যে কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের আঙিনা মাড়ায়নি, এখন ভাগ্নিকে কাঁধে নিয়ে নাচতে নাচতে কে নিয়ে যাবে ঢাকায়! সর্বোপরি দেশের যে অবস্থা, কখন যে যুদ্ধ লেগে যায়, কখন যে পাকিস্তানিরা বুনো শুয়োরের মতো লাফিয়ে পড়ে তার ঠিক ঠিকানা আছে! সবাই মিলে জেসমিনকে বুঝিয়েছে- মেয়েমানুষের জীবনের সব ইচ্ছে তো পূরণ হয় না, হবারও নয়; দেশের এই পরিস্থিতিতে বিয়ে থা করে সংসারী হবার চেষ্টা করাটাই জরুরি। হ্যাঁ, না কিছুই বলেনি সে, নিভৃতে চোখের জল ফেলেছে।

অভিজ্ঞজনেরা ধরে নিয়েছে মেয়েরা অশ্রæজলের ভাষায় জীবনের অনেক বড় বড় বিষয়ে সম্মতি জানায়। এটা নতুন কিছু নয়। কাজেই ডানপিটে স্বভাবের জেসমিনের পায়ে বিয়ের শেকল পেরিয়ে বশ মানাবার সিদ্ধান্ত নিয়েছে অভিভাবকেরা। মোটামুটি ভালো পাত্র পাওয়া গেছে। কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের সামনে ঔষধের ব্যবসা। বাড়ি এই এলাকাতেই। বয়সটা একটু, সামান্য একটু ভারি হয়ে এসেছে, এ ছাড়া পাত্রের কোনো ত্রুটি নেই। সন্ধ্যের পর অল্প দু’চারজনকে সঙ্গে নিয়ে এখানে আসবে দিনক্ষণ পাকা করতে। সন্ধ্যে পেরিয়েছে কখন, এতটা বিলম্ব তো হবার কথা নয়! খোঁজখবর নিতেই বা পাঠাবে কাকে! সবাই এখন ঢাকার খবর শোনার জন্য ব্যস্ত। বিয়ের পাত্র বলে কথা, বিলম্বে হলেও আসবে নিশ্চয়।

জেসমিনের কিন্তু টেনশন বলে কিছু নেই। পাত্রের আগমন যতই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে, তার মনের ময়ূর সবার অলক্ষে ততোই পেখম মেলছে। সে নিজেই এক সময় জুঁইয়ের গা-ঘেঁষে এগিয়ে এসে বলে- ছোট নানির ভাই তাহলে সম্পর্কে কী হচ্ছে যেন…..

বড় নানি ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বলে,

আজকের দিনেও তামাশা যাচ্ছে না তোর?

আচ্ছা নানি, আপনার জা আমার নানি, তার ভাই…

সবাইকের চমকে দিয়ে হাফিজুর হঠাৎ মুখ খোলে,

তোমারও ভাই হচ্ছে।

তামাশার উচ্ছ¡াস থামিয়ে চোখ তুলে তাকায় জেসমিন। তার বড় নানি বেশ সমর্থনও জানান,

হ্যাঁ, ভাই-ই তো। হাফিজকে তুই ভাই-ই বলিস।

হাফিজুর তার বোনের বড় জাকে উদ্দেশ্য করে বলে,

বড়বু, আমার বোনের নাম জুঁই, আর আপনার নাতনির নাম হচ্ছে জেসমিন;

একই ফুলের দুটো নাম। আমার কাছে দুটোই সমান।

এর মধ্যেও বড়বু রসিকতা করেন,

দুটোই সমান? একটুও ছোট বড় নেইরে ভাই!

হাফিজুর ফিক করে হেসে ওঠে,

তা আছে বড়বু। জুঁই আমার বছর দুয়েকের বড় বোন। আর জেসমিন বছর দুয়েকের ছোট বোন।

জেসমিন অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে।

হাফিজুর অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে বলে,

জেসমিনের কথা আমি সব শুনেছি বড়বু। আমাদের দেশটা স্বাধীন হোক, ওকে আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেব।

বড়বুর চোখের কোনা ভিজে আসে, অশ্রæদানা গড়িয়ে পড়ে। নিচুগলায় বলেন,

বাপ-মরা মেয়েটার বিয়ে থা হলে বাঁচিরে ভাই!

বিয়ে হলেও কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া যায় বুবু। দেশ স্বাধীন হোক। স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে জেসমিন মাথা উঁচু করে হাঁটবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে। আমিই সব ব্যবস্থা করে দেব তখন।

তুই আর অত স্বপ্ন দ্যাখাস নে তো ভাই। ওর বিয়েটাই আগে হোক।

হোক না, তাই হোক। গাংনীর মেয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখেছে, এটা কিন্তু অনেক বড় ব্যাপার বুবু।

এবার জেসমিনের চোখে জল।

শাড়ির আঁচল চোখে চেপে জেসমিন উঠে সরে যায়।

সাত.

সে রাতে সূর্যখোলা ফিরে যাওয়া হয়নি হাফিজুরের। ছোটবুদের খাটিয়েছে। আশ্বস্ত করেছে, আব্বাকে খবর পাঠানো হয়েছে। ছোটবু বলেছে, তোর দুলাভাইয়ের সঙ্গে দেখা করবি না?

তাইতো! ঢাকা থেকে এসে নাগাদ এই মানুষটির সঙ্গে দেখা হয়নি। তিনি থাকেন মহাব্যস্ত। রাজনীতির কোনো পদ-পদবিতে তাঁকে পাওয়া যাবে না, অথচ অবিরাম দৌড়ঝাঁপ লেগেই আছে ওই রাজনীতির পেছনে। এ বেলায় গাংনী থাকে তো ও বেলায় থাকে মেহেরপুরে। এমএনএ এমপিএ সবার কাছে অবাধ যাতায়াত। হাফিজুর তাকে দুলাভাই ডাকে না, সোজাসুজি সেলিম ভাই বলে ডাকে। তিন-চার বছরের সিনিয়র, সম্পর্কটা অনেকটা বন্ধুর মতোই। জুঁইয়ের সঙ্গে বিয়ের পর সম্পর্কটা আড়ষ্ট হতে শুরু করেছিল প্রায়, এই রাজনীতিই তাদের আবার একই সমতলে নামিয়ে আনে; সেলিম দিব্যি শালাবাবু বলে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরতে পারে হাফিজুরকে।

বাড়িতে মেহমানের আধিক্যের কারণে সে রাতে শালা-দুলাভাইকে এক বিছানায় ঘুমাতে হয়। না, ঘুম হয়নি মোটেই, হয়েছে বর্তমান সময়ের নানান রকম পর্যালোচনা। এসডিও সাহেবের সঙ্গেও নাকি খুব খাতির সেলিমের, কেন এই স্নেহধারা বয়ে যায় সে তার যথার্থ কারণও জানে না। তবে এই স্নেহসুধা সানন্দে উপভোগ করে সে। তার সামনেই নাকি সেকেন্ড অফিসার মতিয়ার রহমানকে এসডিও সাহেব বলেছেন- যুদ্ধই অনিবার্য মতিয়ার। আমি যুদ্ধের দিকটা দেখতে চাই। তুমি দেখো সিভিল প্রশাসন।

কিছুদিন থেকে সেকেন্ড অফিসারই প্রশাসন চালাচ্ছেন। এসডিও তৌফিক এলাহীর মেহেরপুরের বাইরেই যেন শতেক কাজ। বন্ধু জুটেছে এক মাহবুব উদ্দীন, ঝিনাইদহের পুলিশ প্রধান, এসডিপিও। তাঁর বাসাতেই তিন দিন ধরে গোপন মিটিং হয়েছে ২১, ২২, ২৩ মার্চ। যোগ দিয়েছেন নড়াইলের এসডিও কামালউদ্দীন সিদ্দিকী, মাগুরার এসডিও ওয়ালিউল ইসলাম এবং গোলালন্দের এসডিও শাহ্ মোহাম্মদ ফরিদ। পাকিস্তানি সৈন্যদের সম্ভাব্য আক্রমণ প্রতিরোধের নানা দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। চুয়াডাঙ্গায় ইপিআর-এর উইং হেড কোয়ার্টারে বাঙালি কমান্ডার এসেছেন মেজর আবু ওসমান চৌধুরী। তাঁর অধীনে সীমান্ত চৌকিগুলোতে খাড়া হয়ে আছে সশস্ত্র ইপিআর জওয়ানরা। যুদ্ধই যদি করতে হয়, এদের দরকার হবে সবার আগে। মেহেরপুরের এসডিও তৌফিক এলাহী চৌধুরী দায়িত্ব নেন মেজর সাহেবের সঙ্গে যোগাযোগের। সবাইকে শুনিয়ে মন্তব্য করেন- যুদ্ধ এলে তো নেতৃত্ব দিতে হবে তাঁকেই। আমরা সিভিলিয়ান, যুদ্ধের কী বুঝি!

এই সব সাতকাহনের গল্পসল্প করতে করতে দুজনেই এক সময় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে। দেশেলল কথা, রাজনীতির কথা, বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা এমনকি হাফিজুরের বন্ধু অতীনের কথাও আলোচনায় আসে। নার্গিসের কথা মনে এলেও সেটা চেপে যায় হাফিজুর। কিন্তু চোখের পাতা বুঁজে আসার পূর্ব মুহূর্তে সেলিম সহসা প্রশ্ন করে বসে- জেসমিনকে কেমন লেগেছে হাফিজ?

হাফিজুর সাত পাঁচ না ভেবে উত্তর দেয়,

ভালো।

পাশ ফিরে শুয়ে যোগ করে- কিন্তু কপাল খারাপ, বিয়েটা ভেঙে গেল!

সেলিম জানায়,

না না, বিয়ে ভাঙেনি তো! ডেট পিছিয়েছে।

ওই হলো। শুভ কাজে বাধা তো পড়ে গেল!

কী মুশকিল! রাস্তায় গাড়িঘোড়া চলছে না বলে বর সাহেব আসতে পারেনি।

তাই নাকি!

ঘটক বলে গেল কুষ্টিয়া থেকে বর এলেই দিনক্ষণ ফাইনাল হয়ে যাবে!

হাফিজুর অস্ফুটে বলে-

অ, আচ্ছা।

এরপর দুজনেই কথা বন্ধ করে এবং চোখ বন্ধ করে। কিন্তু তারপরও জেসমিনের অশ্রæ টলোমলো চোখ দুটো শেষ রাতের তারার মতো উঁকি দিয়ে যায় হাফিজুরে চোখে।

ঘড়ির কাঁটায় মধ্যরাত পেরিয়ে যাবার খানিক পরে ধসমস করে সেলিম জেগে ওঠে ঘুম থেকে। প্রথমে বিছানার উপরে বসে কান খাড়া বাইরের দিকে তাকায়। তারপর নেমে আসে বিছানা থেকে। ঘরের দরজা খুলে বারান্দায় এসে দাঁড়াতেই আছড়ে পড়ে সম্মিলিত কোলাহল এবং কণ্ঠছেঁড়া ¯েøাগান- জয় বাংলা।

এত রাতে ¯েøাগান! নিশুতি রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে খান খান। অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে না কিছুই, শত কণ্ঠের কোলাহল ভেসে চলেছে সম্মুখে। কিন্তু যাচ্ছে কোথায় এই গভীর রাতে! গাংনী বাজারে! সেখানে এখন কেন যাচ্ছে এত মানুষ! ডাকব না ডাকব না ভাবতে ভাবতে, সেলিম একবার ডেকে ওঠে- শালাবাবু!

মাত্র এক ডাকেই জেগে ওঠে হাফিজুর। বিছানা থেকে নেমে সেও গিয়ে সেলিমের কাঁধের কাছে দাঁড়ায়। উৎকর্ণ হয়ে ¯েøাগান শোনে- এবার সবাই অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর। জয় বাংলা।

ব্যাপার কী সেলিম ভাই!

আমি তো ভাবছি!

বঙ্গবন্ধুর কিছু হয়নি তো?

আরে নাহ্! বঙ্গবন্ধুর কী হবে! গাংনী-মেহেরপুরে কিছু হলো নাকি?

চলুন যাই। বাইরে থেকে দেখে আসি!

তুমি যাবে! আচ্ছা চলো।

বাড়ি থেকে বেরিয়ে রাস্তায় নেমে দু’জনেই অবাক। অন্ধকার চিরে ছুটে চলেছে এক দল রাগী মানুষ। তাদের প্রত্যেকের হাতে লাঠিসোটা বল্লম-ফালা, এমনকি হেঁসো-দা পর্যন্ত একটা না একটা কিছু আছে। যে শত্রুর কারণে ঘুম ভাঙা চোখে রাস্তায় নামতে হয়েছে তাদের, সেই শত্রুকে নাগালের মধ্যে পেলে এক কোপে কেটে ফেলবে- এমনই কঠোর এবং হিং¯্র হয়ে উঠেছে তারা। কিন্তু যাচ্ছেটা কোথায়? কী উদ্দেশ্যে? এ কথা শুধাবেই বা কাকে! অন্ধকারে কারো মুখ চেনার উপায় নেই। কিন্তু সবার চোখে মুখে উদ্ভাসিত ক্রোধের উত্তাপ ঠিকই টের পাওয়া যায়। এরই মধ্যে পা মিলিয়ে চলতে চলতে হাফিজুর একজনকে জিজ্ঞেস করে বসে,

কী হয়েছে ভাই? ঘটনা কী?

আরে ভাই আর্মি নেমে পড়েছে।

চমকে ওঠে হাফিজুর- সব আলোচনা ভেস্তে গেল! মিলিটারি দাবড়েই সব আন্দোলন দমন করবে! এও সম্ভব! পাশের লোকটা আবারও তাড়া লাগায়,

পা চালান ভাই, পা চালান। কুষ্টিয়া পর্যন্ত আর্মি চলে এসেছে।

এতক্ষণে এ কথা কানে যায় সেলিমেরও। সেও আঁৎকে ওঠে,

কুষ্টিয়ায় চলে এসেছে?

কে যেন এর সঙ্গে যোগ করে,

মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গায় ঢুকতে আর কতক্ষণ!

চৌগাছা থেকে গাংনী বাজার পর্যন্ত পৌঁছুতে বেশি সময় লাগে না। এরই মাঝে গ্রামের সাধারণ মানুষও অনেকে এসে যুক্ত হয়। উত্তপ্ত ¯েøাগান চাপা পড়ে যায় পারস্পরিক কথাবার্তা। মানুষ আসছে ধানখোলা-থানাপাড়া থেকে। মানুষ আসছে মালসাদহ-গোপালনগর-চ্যাংগাড়া থেকে। মধ্যরাতে এভাবে বাসস্ট্যান্ডে মানুষ জড়ে হবার ঘটনা আগে কখনো ঘটেনি। রাতের নৈঃশব্দ ভেঙে বক্তৃতা করছেন স্থানীয় নেতা হিসাবউদ্দীন, জালালউদ্দীন, আনসার কমান্ডার, কাশেম কোরাইশী।

কিছুক্ষণ আগে মেহেরপুরের নেতা ইসমাঈল হোসেন সয়েলটেকের একটি গাড়ি নিয়ে গাংনীতে আসেন। তার সঙ্গে আছেন সাবরেজিস্ট্রার আবু বকর। তারাই মধ্যরাতে দেশব্যাপী পাকিস্তানি আর্মির বেপরোয়া তৎপরতার খবর এখানে প্রচার করেন। ঢাকার সঙ্গে যোগাযোগ করা অসম্ভবপ্রায়। তবু টেলিফোন অপারেটর আব্দুস সামাদ বহু কষ্টে একটি সংক্ষিপ্ত মেসেজ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছে ‘মুভমেন্ট স্টার্ট।’ রাত বারটার পরপরই এমপিএ নূরুল হক টেলিফোনে এসডিও সাহেবকে জানিয়েছেন, পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী ঢাকায় ধ্বংসলীলা শুরু করেছে এবং নির্বিচারে অসামরিক মানুষজনকে হত্যা করছে। কুষ্টিয়ার টেলিফোন এক্সচেঞ্জ থেকেও খবর এসেছে যশোর সেনানিবাস থেকে সৈন্যবহর এসে গভীর রাতে কুষ্টিয়া শহর দখল করে নিয়েছে। যশোর থেকে যে কোনো সময় আরো সৈন্য ঝিনাইদহ হয়ে এসে চুয়াডাঙ্গা দখল করতে পারে। আবার কুষ্টিয়া থেকেও তারা পশ্চিমে এগিয়ে এসে মেহেরপুর আক্রমণ করতে পারে।

পঁচিশে মার্চ মধ্যরাতেই এসডিও তৌফিক ইলাহী চৌধুরী মাইকে প্রচার চালিয়ে মেহেরবাসীকে জাগিয়ে তোলার ব্যবস্থা করেন এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সাামনে দৃঢ়তার সঙ্গে জানিয়ে দেন, আজ থেকে তিনি আর পাকিস্তান সরকারের কর্মচারী নন, একজন সাধারণ বাঙালি মাত্র। সাধারণ জনগণের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তিনিও দখলদার পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চান। আনসার ইন্সট্রাক্টর আল আমিনকে নির্দেশ দিয়েছেন- গ্রামে গঞ্জে ছড়িয়ে থাকা আনসার মুজাহিদদের ডেকে আগামীকাল একত্রিত করার জন্য। তারপর রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে সঙ্গে নিয়ে নিজেই গাড়ি হাঁকিয়ে বেরিয়ে গেছেন আমঝুপি, বারাদি, রাজনগরের জনগণকে জাগিয়ে তুলবেন, এই রাতেই বড় বড় গাছ কেটে মেহেরপুর-চুয়াডাঙ্গা প্রধান সড়কে ব্যারিকেড দিতে বলবেন। বলা তো যায় না, ঝিনাইদহ-চুয়াডাঙ্গা হয়ে এই পথে যদি তারা মেহেরপুরে ঢুকতে চায়! তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর এই বর্বরোচিত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলতে চান। এ জন্য চুয়াডাঙ্গায় অবস্থিত ইপিআরের উয়িং কমান্ডার মেজর আবু ওসমান চৌধুরীর সঙ্গেও প্রাথমিক কথাবার্তা হয়ে আছে।

মেহেরপুরের নেতা ইসমাইল হোসেন মধ্যরাতে গাংনীতে এসে এত সব খবরাখবর জানিয়েছেন রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের উপস্থিত সবাইকে প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানানোর পর কুষ্টিয়া অভিমুখ রওনা দেন। ছাত্রনেতা আলড্রাম, ধুনা, হান্নান, মকছুদসহ অনেকেই গাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে বাধা দেয়। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দেয়- এত রাতে কুষ্টিয়া যাওয়া মোটেই ঠিক হবে না।

এমন ব্যবস্থার মধ্যেও গাড়ির বাইরে মুখ বাড়িয়ে এক চিলতে হেসে ওঠেন ইসমাঈল হোসেন। আনসার ইন্সট্রাক্টর আবুল কাশেম ও আলতাফ হোসেনকে দায়িত্ব দেন- গামে গ্রামে ছড়িয়ে থাকা আনসার মুজাহিদ, এমনকি অবসরপ্রাপ্ত কিংবা ছুটিতে বাড়ি আসা পুলিশ-সৈনিকদের খবর দিয়ে গাংনীতে জড়ো করার জন্য। যারা স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্ব পালন করতে চায়, তাদেরও তালিকা প্রস্তুত করতে হবে। গাছ কেটে রাস্তায় ব্যারিকেড তৈরি করতে হবে। জনগণ মুর্হুমুহু ¯েøাগান দিতে থাকে। কয়েকজন যুবক জানিয়ে দেয়- আমরা সব করছি। আপনি মেহেরপুরে ফিরে যান।

ইসমাঈল হোসেন এক লাফে নেমে আসেন গাড়ি থেকে। যুববকদের একজনের কাঁদে হাত রেখে বলেন,

তোমাদের ভালোবাসায় আমার বুক ভরে যাচ্ছে। কিন্তু আমাকে খলিসাকুণ্ডি পর্যন্ত যেতেই হবে। কাঠের ব্রিজটা আমরা আজ রাতেই ভেঙে দিতে চাই।

দু’জন যুবক লাফিয়ে উঠে পড়ে গাড়ির পেছনে। সোজা জানিয়ে দেয়,

আমরাও যাব।

কুষ্টিয়া এবং মেহেরপুর মহকুমা সীমানাকে পৃথক করেছে মাতাভাঙ্গা নদী। খলিসাকুন্ডি গ্রামে ওই নদীর উপরে কাঠের ব্রিজ বসিয়ে দুই মহকুমার সড়ক যোগাযোগ যুক্ত রাখা হয়েছে। জনস্বার্থে এটা যুক্ত থাকাটাই এতদিন ছিল জরুরি। এখন এই গভীর রাতে সেটা বিযুক্ত করে ফেলাই আবার অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে। এবং সেটা যত তাড়াতাড়ি সম্পন্ন করা যায় জনজীবনের নিরাপত্তার স্বার্থে ততই মঙ্গলজনক। জোড়াপুকুরিয়া থেকে স্বেচ্ছাসেবক নেতা আব্দুর রহমান এবং আকবরপুর থেকে মাতু বিশ^াসকে সঙ্গে নিয়ে, খলিসাকুন্ডি কাঠের ব্রিজের কাছে এসে দাঁড়ায়। রহমান আগ বাড়িয়ে জনাতে চায়,

এই গ্রামের দু’একজন মানুষকে খবর দিলে হয় না মাতুভাই?

হয় হয়। মাতু বিশ^াস এ প্রস্তাব অনুমোদন করে পরামর্শ দেন,

মোয়াজ্জেম বিশ^াসকে খবর দিতে পারবা?

যুবক দুজন হঠাৎ যেন কাজের সন্ধান খুঁজে পায়। উৎসাহের সঙ্গে তারা এ দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে বলে, মোয়াজ্জেম চাচাকে তো চিনি। এক দৌড়ে ডেকে আনছি তাকে।

আট.

সারারাত ঘুম নেই, তবু কারো চোখে মুখে ক্লান্তির ছায়া নেই। কী যে অদম্য উৎসাহ সাধারণ মানুসের দেহে মনে। গ্রামে গ্রামে রাস্তার দু’পাশে গাছ কাটার ধূম চলেছে সারারাত। সরকারি গাছ কাটার অপরাধে সাজা কেটে আসা তফেল করাতি এসডিও সাহেবের আদেশ পাবার পর একাই আমঝুপি রাস্তার প্রাচীন গাছটিতে কোপ ধরে। আমঝুপি থেকে বারাদি-রাজনগর পর্যন্ত রাস্তা অবরোধ করে রাখে গাছের গুঁড়িতে। গগনবিদারি ¯েøাগানে তারা তাড়িয়ে দেয় রাতের আঁধার।

এদিকে ভোরের আজান হবার আগেই খলিসাকুণ্ডি কাঠের ব্রিজ উপড়ে ফেলার কাজ সম্পন্ন করা হয়। হোগলবাড়িয়া, আকমপুর, খলিসাকুণ্ডি তিন গ্রামের অসংখ্য যুবক এসে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিশাল এই কর্মযজ্ঞে। কোনো কিছু গড়ে তোলার মধ্যে মানুষ আনন্দ খুঁজে পায় সেটাই স্বাভাবিক, তাই বলে ভেঙে ফেলাতেও এমন নির্দোষ আনন্দ পাওয়া সম্ভব সে কথা কারো জানাই ছিল না। নাটবল্টু খুলে খুলে কাঠের ব্রিজের এক একটা অংশ নদীর পানিতে ঝপাং করে ফেলে কী যে উল্লসিত হয়ে ওঠে লোকজন! কাঠের পিলার নয়, তারা যেন পানিতে আছড়ে মারছে এক একজন পাকিস্তানি সৈনিক। কয়েকজন তো উৎসাহের আতিশয্যে প্রস্তাব দিয়ে বসে- আমরা আরেকটু এগিয়ে যেতে চাই। আমলা-সদরপুরে সাগরখালি নদীর ওপরের ব্রিজটাও সকাল হবার আগেই…।

খলিশাকুণ্ডির মোয়াজ্জেম হোসেন সবাইকে নিরস্ত করেন এবং বুঝিয়ে বলেন- সামনে আসছে ভয়াবহ দুর্দিন, বাঁচা-মরার সংকট। আর্মি যখন কুষ্টিয়া পর্যন্ত এসে পড়েছে, এদিকে হামলা করতে পারে যে কোনো সময়ে। হেঁসো-বল্লম, লাঠি-ফালা যার যা আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত থাকতে হবে। সংকট থেকে বাঁচতে হলে প্রতিরোধ করতেই হবে।

এদিকে ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতে বিভিন্ন গ্রাম গ্রামান্তর থেকে লোকজন ছুটে আসে লাঠি বল্লম হাতে মেহেরপুরে, গাংনীতে। বিভিন্ন গ্রামের সংগ্রাম কমিটির সদস্যদের চোখে মুখে প্রবল কৌত‚হল- কতদূর এসেছে খানসেনারা? আমাদের এখন কী করতে হবে? আনসার-মুজাহিদেরাও নানান গ্রাম থেকে এসে জড়ো হচ্ছে শহরে। তারাও ভেতরে ভেতরে ফুঁসছে, হাতে হাতিয়ার চায়, হুকুম হলেই সবাই যুদ্ধে যাবে।

গাংনী থেকে হাফিজুর এবং সেলিম যখন মেহেরপুরে পৌঁছে, তখন বেলা অনেকখানি উঠে গেছে। শত শত নয়, হাজার হাজার মানুষ এসে সমবেত হয়েছে মহকুমা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে। রাজনৈতিক নেতাকর্মী উচ্চকণ্ঠে ¯েøাগান দিতে দিতে এগিয়ে আসছে। কোর্টবিল্ডিংয়ের সামনেকার অপ্রশস্ত পরিসর লোকে লোকারণ্য হয়ে যায় সামান্য কিছুক্ষণের মধ্যে। রিকশার মাথায় মাইক বেঁধে সারারাত প্রচার চালিয়ে একজন ছাত্রলীগকর্মী ভিড় ঠেলে সামনে এসে জানতে চায়,

আর কি প্রচার করব লিডার?

ইসমাঈল হোসেন কাঁধে থাবা দিয়ে বলেন,

প্রচার তো করতেই হবে। গ্রামে গ্রামে যেতে হবে। আরো দু’তিনটি মাইক বের করতে হবে। কিন্তু তুমি একা…

না না, একা হব কেন! আমার বন্ধুবান্ধব আছে না!

ঠিক আছে, তুমি সিরাজ মাইককে একটু খবর দাও। আমার সঙ্গে দেখা করতে বলো।

ঘাড় দুলিয়ে সম্মতি জানায় ছেলেটি। তারপর মাইক বাঁধা রিকশা নিয়ে চলে যাবার উদ্যোগ নিতেই শাহাবাজউদ্দীন নিজ্জুতেড়ে আসে, রিকশার হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে দিয়ে বলে,

মাইক রাখো। এসডিও সাহেব কথা বলবেন মাইকে।

তৌফিক এলাহী চৌধুরী হাত বাড়িয়ে মাউথপিসটা ধরেন, এক রাতের চিৎকারেই এমন সময় আমঝুপি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মহি ডাক্তার হন্তদন্ত হয়ে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়েন। তিনি আবেগে থর থর করে কাঁপতে কাঁপতে বলেন,

বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন, আপনারা শুনেছেন?

এসডিও সাহেব জানান,

না শুনিনি। আপনি কোথায় শুনলেন?

আমি শুনিনি স্যার। চুয়াডাঙ্গায় ইপিআরের ওয়ারলেস মেসেজে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতা ঘোষণার বাণী পাওয়া গেছে।

এমএনএ মহিউদ্দীন উত্তেজিত কণ্ঠে শুধান,

তুমি এখন আসছ কোত্থেকে?

এই তো সাইকেল ঠেলে আসছি চুয়াডাঙ্গা থেকে। ইউনুস উকিল সেই বাণী পড়ে শোনাচ্ছেন। বঙ্গবন্ধু রাত বারোটার পর এই ঘোষণা ওয়ারলেসে পাঠিয়েছেন।

ইসমাঈল হোসেন জিজ্ঞাসা করেন,

বঙ্গবন্ধু কোথায় আছেন কেমন আছেন, কোনো খবর পাওয়া গেছে?

এ প্রশ্নের উত্তর দেবার আগেই এসডিও সাহেব প্রশ্ন করেন,

আচ্ছা চেয়ারম্যান সাহেব, বঙ্গবন্ধুর বাণী কি আপনি নিজে দেখেছেন?

কী যে বলেন স্যার, আমি একটা হাতকপিও নিয়ে এসেছি।

দু’তিন জন একসঙ্গে বলে ওঠেন- তাই নাকি!

মহিউদ্দীন চেয়ারম্যান ঘামে ভিজে যাওয়া পাঞ্জাবির পকেট থেকে বের করে আনেন চার ভাঁজে ভাঁজ করা অমূল্য দলিল। তৌফিক এলাহী চৌধুরী সেটা লুফে নেন সবার আগে। কাগজের ভাঁজ খুলে দ্রুত চোখ বুলাতে থাকেন… ‘ঞযরং রং সু ষধংঃ সবংংধমব. ঋৎড়স ঃড়ফধু ইধহমষধফবংয রং রহফবঢ়বহফবহঃ…’। এবার উত্তেজনা পেয়ে বসে এসডিও সাহেবকে। কাঁপা কাঁপা হাতে তিনি মাইক্রোফোন ধরে বলেন,

বঙ্গবন্ধু ঘোষণা করেছেন- আজ থেকে আমরা স্বাধীন।

মাত্র এই একটি বাক্য উচ্চারণের পর এসডিও সাহেবের কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসে।

অপেক্ষমাণ জনতার দিকে হতবিহŸল হয়ে তাকিয়ে থাকেন। জয় বাংলা ¯েøাগানে কর্ণকুহর বধির হবার জোগাড়। এই ঘোষণার কথা শোনার জন্যই গোটা জাতি উন্মুখ এবং উৎকর্ণ হয়ে ছিল। ঘোষণার কথা শোনার পর মানুষ যেভাবে উল্লাসে ফেটে পড়ে, তাতে কে বলবে টিক্কা খানের সামরিক ফরমান দিয়ে স্বাধীনতাকামী মানুষের এই বাঁধভাঙা উচ্ছ¡াস স্তব্ধ করা সম্ভব? অথচ সেই প্রভাতবেলা থেকে রেডিও পাকিস্তান উচ্চস্বরে প্রচার করছে- সামরিক আইনের কঠোর বিধি বিধান। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর হিসেবে টিক্কা খান দেশবাসীকে সতর্ক করছেন, এ আইন অমান্যকারীদের জন্য বরাদ্দকৃত কঠিন শাস্তির ভয় দেখাচ্ছেন। কিন্তু এদের ভয় দেখিয়ে কোনো লাভ হবে! এ জাতির নেতা তো স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, ‘মরতে যখন শিখেছি, কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না।’ মেহেরপুরের এসডিও সাহেব তাঁর গত রাতের নিজস্ব ঘোষণাটির পুনরাবৃত্তি করে জানিয়েছেন, আজ থেকে আমি আর পাকিস্তান সরকারের কর্মচারী নই। বাংলাদেশের খুব সাধারণ একজন নাগরিক। দখলদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শেষ সৈনিকটি এ দেশের মাটিতে থাকা পর্যন্ত আপনাদের সঙ্গে থেকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আমি প্রাণপণে যুদ্ধ করতে চাই। চূড়ান্ত বিজয় অর্জিত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের লড়াই চলবে।

আবেগ থর থর বক্ষে কিন্তু সুদৃঢ় পদক্ষেপে তৌফিক এলাহী চৌধুরী এগিয়ে আসেন পতাকা স্ট্যান্ডের কাছে। যে দণ্ডে এতদিন চাঁদতারা খচিত পাকিস্তানের পতাকা উড়েছে পৎ পৎ করে, সেই সুউচ্চ দণ্ডের শীর্ষবিন্দু পর্যন্ত আজ উড়িয়ে দেওয়া হয় বাংলাদেশের নতুন পতাকা। তৌফিক এলাহীর পতাকা উত্তোলনের সঙ্গে সঙ্গে সমবেত জনতা শুরু করে প্রাণ জুড়ানো জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি…।’

এত মানুষের গা-ঠাসাঠাসি ভিড়ের মধ্যেও হাফিজুর ভীষণ একা হয়ে যায় যেন বা। এ রকম অনুভূতি আগে কখনো হয়নি। ‘কী শোভা কী ছায়া গো কী স্নেহ কী মায়া গো, কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে নদীর কূলে ক‚লে…।’ এ কী! তার সারা গায়ের লোম কেন শিউরে উঠছে! মাথার চুল কেন খাড়া হয়ে উঠছে! দু’চোখে কেন জ্বালা করে উঠছে! একটি গানের এ কী আশ্চর্য শক্তি! না না, তার বাপ-দাদার কারো কণ্ঠে তো কোনোকালে গান ছিল না। গানের কীইবা জানে সে! না, এ তাহলে বোধ হয় গানের প্রভাব নয়! তার মনে হয় মিছেমিছি আমি উদোর পিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপাচ্ছি! এ কাজ গানের নয়! গাইতে না পারলেও গান শুনতে তো মানা নেই। সুযোগ পেলেই তো সে কান খাড়া করে, প্রাণ ভরে গান শোনে, এমন ধারা প্রাণ উতলা ভাব কি হয়েছে কখনো! মনে তো পড়ছে না তার! গান নয়, এ তবে কিসের প্রভাব! আগুন না থাকলে আঁচ লাগবে কেন! একি তাহলে ওই নতুন পতাকার কারণে ঘটছে! ওই যে আদিগন্ত সবুজ জমিনের মাঝে গোলাকার লাল সূর্য! এ কি ওই সূর্যের উত্তাপে সারা শরীর ঘেমে উঠেছে? মার্চের নির্মেঘ রোদ্দুরে পতাকা উড়ছে সগৌরবে। লাল বৃত্তের মাঝখানে বাংলাদেশের অমলিন মানচিত্র যেন বা মৃদুমন্দ হওয়ায় দোল খাচ্ছে। কী আশ্চর্য! হাফিজুরের মাথা কি ক্রমশ উঁচু হয়ে যাচ্ছে! সবার মাথা ছাড়িয়ে ওপরে উঠে আসছে কি! নইলে সে একযোগে অগণিত মানুষের মুখ দেখতে পাচ্ছে কেমন করে। সে কি তবে দুপায়ের পাতায় ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে নেই। না না, তা হবে কেন! এ যে দুপায়ের পাতায় সবুজ ঘাসের সুড়সুড়ি টের পাচ্ছে। বুড়ো আঙুলে ভর দিতে গিয়ে নিজের অস্তিত্ব টের পাচ্ছে। তাহলে এসব কী হচ্ছে। কোরাস দলের সঙ্গে হাফিজুরও কণ্ঠ মেলায়- ‘মা তোর বদনখানি মলিন হলে আমি নয়ন জলে ভাসি। আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায়…।’

এতক্ষণে হাফিজুর টের পায় তার দু’চোখ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে অশ্রæজলের ধারা। গণ্ডদেশে অনুভব করে তারই উত্তাপ। হঠাৎ জন্মদাত্রী মায়ের মুখ মনে পড়ে যায়। এতক্ষণে কী যে করছে তার মা! রাতে বাড়ি ফেরা হলো না, নিশ্চয় দুর্ভাবনা হচ্ছে মায়ের। তবে কি তার মায়ের চোখেও বয়ে চলেছে অশ্রæধারা?

এত মানুষের এত আবেগ এত উল্লাসের মধ্যে থেকেও হঠাৎ মন খারাপ হয়ে যায় হাফিজুরের। সূর্যখোলা গ্রামে মায়ের কাছে ফিরে যেতে ইচ্ছে করে। গাংনী পর্যন্ত যাবার পথে সেলিম ভাইয়ের সঙ্গ পাওয়া সম্ভব। কিন্তু সেই লোকটা গেল কোথায়। হাফিজুর ডানে তাকায়, বামে তাকায়, সেলিম ভাইকে খুঁজে পায় না। কিন্তু মেহেরপুর কলেজের রোভার দলের আতিয়ার এবং মোবিনের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। ওরা হাতের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে দিয়ে বলে ওঠে- জয়বাংলা।

হাফিজুরও উত্তর দেয়- জয় বাংলা।

আতিয়ার জানতে চায়,

আপনি কখন এলেন হাফিজ ভাই?

আমরা তো সেই সাত সকালেই চলে এসছি গাংনী থেকে। এখন কী করতে হবে বলো দেখি।

মোবিন উৎসাহের সঙ্গে জানায়,

কেন, যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে। ওই যে লিডাররা বলে দিলেন, আগে কুষ্টিয়াকে দখলমুক্ত করতে হবে। আনসার মুজাহিদ ইপিআর তো থাকবেই। ছাত্র যুবকদেরও সংক্ষিপ্ত ট্রেনিং নিতে হবে।

হাফিজুর বুঝতে পারে সে কিছুটা অমনোযোগী হয়ে পড়েছিল। সেই জন্য এত মূল্যবান পরিকল্পনার কথা শুনতে পায়নি। এতক্ষণে সে হাত নাড়িয়ে মন্তব্য করে,

কুষ্টিয়া আমাদের জেলা শহর। সেখান থেকে পাকিস্তানি সৈন্যদের হটিয়ে দিতেই হবে। ওরা আমাদের আক্রমণ করতে পারে যে কোনো মুহূর্তে। কুষ্টিয়া থেকেও আসতে পারে। চুয়াডাঙ্গা থেকেও আসতে পারে।

আতিয়ার বলেন,

না না, চুয়াডাঙ্গাতেও প্রতিরোধের প্রস্তুতি চলছে। আমঝুপির চেয়ারম্যান সাহেব দেখে এসছেন ইউনুস উকিল, হ্যাবা ডাক্তার, বাদল ব্যারিস্টারসহ সব নেতা ছাত্র যুবক রাজনৈতিক কর্মী সবাইকে নিয়ে মিটিং করছেন। ইপিআরের বাঙালি মেজর আবু ওসমান চৌধুরীও তাদের সঙ্গেই থাকবেন। ওদিকে রাস্তার গাছ কেটে ঝিনেদা পর্যন্ত ব্যারিকেড করা হয়ে গেছে।

মেহেরপুরেও তখন কোর্টবিল্ডিং চত্বরে হাজার জনতার সামনে দাঁড়িয়ে নেতাদের বক্তৃতা চলছে। কুষ্টিয়া থেকে দখলদার পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে হটিয়ে দেবার জন্য এই মুহূর্তে কী কী করণীয় তারই বিস্তারিত পরিকল্পনার কথা বলা হচ্ছে। বিভিন্ন সেক্টরে কাজ ভাগ করে দেওয়া হচ্ছে। মানুষ যেন আজ বক্তৃতা গিলছে।

নয়.

জেলা শহর কুষ্টিয়াকে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর দখল থেকে মুক্ত করার লক্ষ্যে প্রকৃতপক্ষে ছাব্বিশে মার্চ প্রথম প্রহরেই মহকুমা শহর মেহেপুর এবং চুয়াডাঙ্গায় ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায়। (চলবে)

সাময়িকী'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj