অন্তরালেই থাকে নারীর মানসিক নির্যাতন

সোমবার, ১ জুলাই ২০১৯

সেবিকা দেবনাথ

রিকশাচালক স্বামীর উপার্জন দিয়ে চারজনের সংসারটা কিছুতেই চালাতে পারছিল না শেফালি (৩৪)। তখন সংসারের হাল ধরতে গৃহপরিচারিকার কাজ নেয় সে। প্রতিদিন পাঁচ বাসায় মোটামুটি সব কাজ করে দিন শেষে বাড়ি ফেরে শেফালি। বাড়ি ফিরেও বিশ্রামের সুযোগ নেই তার। নামতে হয় স্বামী ও দুই সন্তানের পরিচর্যার কাজে। আলসেমি করে শেফালির স্বামী প্রায়ই কাজে বের হয় না। কাজে যাওয়ার কথা বললে কিংবা পান থেকে চুন খসলেই পৌরষত্বের প্রমাণ দিতে শেফালির ওপর চলে অত্যাচার। অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল, চড়, কিল, ঘুষি, লাথি শেফালির নিত্যদিনের পাওনা হয়ে গেছে।

এ তো গেল নি¤œবিত্ত পরিবারের চিত্র। একই চিত্র দেখা যায় মধ্যবিত্ত এমনকি উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোতেও।

চার বছর প্রেম করার পর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থায় ফারুককে ভালোবেসে বিয়ে করে সোমা। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়া অবস্থাতেই একটা আইটি ফার্মে চাকরি করত সোমা। কিন্তু বিয়ের পর ফারুকের ইচ্ছায় চাকরিটা ছেড়ে দেয় সে। ফারুক একটা মাল্টি ন্যাশনাল কোম্পানির বড় পদে কাজ করে। বিয়ের আগে প্রেমময় ও আবেগমাখা কথা বললেও বিয়ের কয়েক বছর পরই সোমাকে হেয় করে আক্রমণাত্মক কথা বলতে শুরু করে ফারুক। প্রতিবাদ করলে শুরু হয় গালাগাল। ইদানীং তা মারধরের পর্যায়েও চলে গেছে। এই ফারুককেই কি ভালোবেসেছিল সোমা? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পায় না সোমা।

শেফালি ও সোমা আমাদের সমাজের ভিন্ন দুই শ্রেণির দুই নারী। কিন্তু একটি জায়গায় তাদের দুজনের জীবন মিলে গেছে একই বিন্দুতে। দুজনই শিকার পারিবারিক নির্যাতনের। যার প্রভাব পড়ছে তাদের মানসিক অবস্থায়।

শারীরিক বা অর্থনৈতিক নির্যাতন সামনে এলেও মানসিক নির্যাতন অনেকটাই আড়ালে রয়ে যায়। কারণ বাইরে থেকে শরীরিক নির্যাতনের চিহ্ন দেখা যায়। কিন্তু মানসিক নির্যাতনের ক্ষেত্রে কোনো দাগ থাকে না। এক জরিপে দেখা গেছে, স্বামীর দ্বারা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হন ৬৫ শতাংশ নারী। আর মানসিক নির্যাতনের শিকার হন ৮২ শতাংশ নারী। অর্থাৎ মানসিক নির্যাতনের পরিমাণ বেশি। কিন্তু মানসিক নির্যাতন কোনটিকে বলা হবে আর কোনটিকে বলা হবে না, সেটি স্পষ্ট নয়। সবচেয়ে বেশি নির্যাতনের শিকার হন বিবাহিত নারীরা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের একটি গবেষণায় নারীদের দুর্বল মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য তাদের ওপর নির্যাতনকে দায়ী করেছে।

এখন মানসিক নির্যাতন কাকে বলা হবে? কোনটা কোন মানুষের জন্য মানসিক নির্যাতনের কারণ আর কোনটা নয়, তা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। তবে চাকরি করতে বাধা দেয়া, সব সময় শ্লেষ করা, বাইরের মানুষের সামনে কথা শোনানো, পুরুষতান্ত্রিক আচরণ দিয়ে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা করা, সন্দেহ করা, চলাচলে বাধা দেয়া, ভয় দেখানো, অবজ্ঞা করা- এসব আচরণ করে নারীকে মানসিক নির্যাতন করা হয়। পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ আইনে এই বিষয়গুলোর বিরুদ্ধে মামলাও করা যায়। কিন্তু মামলা করার হার মাত্র ৩ শতাংশ।

এসব ঘটনা ‘স্বামী-স্ত্রী’র নিজস্ব বিষয় বলে উড়িয়ে দেয়া হয়, এমনকি থানার জেন্ডার ইনসেনসেটিভ কর্মকর্তাদের পক্ষে এই বিষয়গুলো বুঝতে পারাও সম্ভব নয়। এ ছাড়া সামাজিক লোকলজ্জার বিষয় তো আছেই। নারী নির্যাতন প্রতিরোধ নিয়ে কর্মরত বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধি ও আইনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, দেশের নারীদের বেশিরভাগই শারীরিক ও অর্থনৈতিকসহ অন্যান্য নির্যাতনকেই অপরাধ মনে করেন।

মানসিক নির্যাতনও যে অপরাধ এবং এই বিষয়ে আইন আছে, সেটিও অনেকে জানেন না। আবার মানসিক নির্যাতন পরিমাপ সংক্রান্ত বিভিন্ন জটিলতার ফলেও আইনের ব্যবহার কম হচ্ছে। কবে থেকে মানসিক নির্যাতনকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হবে, তা এখনো অজানা।

নারী নেত্রীরা বলছেন, জাতীয় ও তৃণমূল পর্যায়ে নারী নির্যাতনের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরে সবাইকে সচেতন করতে হবে। দাম্পত্য জীবনের মানসিক নির্যাতন ঠেকাতে হলে মানবিক মূল্যবোধ জাগাতে হবে এবং দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন করতে হবে। সরকার নারী নির্যাতন প্রতিরোধে অনেক আইন প্রণয়ন করেছে। নারীদের উচিত আইনের আশ্রয় নেয়া। গ্রামাঞ্চলে অনেকেই এসব আইন সম্পর্কে অবগত নয়, তাদের এ ব্যাপারে সচেতন করতে হবে। পাশাপাশি নির্যাতন প্রতিরোধে ও নারীর অধিকার সংরক্ষণে আইনের কঠোর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj