বেদনাময় নীল গল্পগুলো জানা হয় না

সোমবার, ১ জুলাই ২০১৯

আহমেদ মুশফিকা নাজনীন

সেদিন ছিল ওদের প্রথম বিয়েবার্ষিকী। মেয়েটি খুব যতœ করে হাতে মেহেদি লাগায়। ছেলেটি অফিস থেকে তাড়াতাড়ি আসে বাসায়। তারপর দুজনই বেড়াতে বের হয়। কিছুদূর যাওয়ার পর হঠাৎ একটি ট্রাক ধাক্কা দেয় ওদের মোটরসাইকেলটিকে। সঙ্গে সঙ্গে মারা যায় ছেলেটি। আহত মেয়েটি ছেলেটির কফিন ধরে অঝোর ধারায় কাঁদতে থাকে। কফিনের ওপর মেয়েটির লাল টুকটুকে মেহেদি পরা হাতটা দেখে বিষাদে ভরে উঠে মন। ঘটনাটি ঘটেছিল নওগাঁয়। সংবাদটি লিখতে যেয়ে হাত কাঁপছিল। বারবার চোখের সামনে ভাসছিল মেয়েটির কান্না। ছেলেটির নিথর দেহ। এরপর কি হয়েছিল আমার জানা নেই। জানা নেই ছেলেটিকে হারিয়ে মেয়েটি কেমন আছে! ওর দিনগুলো কেমন কাটছে। ওকি আবার বিয়ে করেছে? নাকি প্রিয় মানুষটার স্মৃতি আঁকড়ে পার করছে যন্ত্রণাময় দিন।

আমাদের দেশে একটি মেয়ে হঠাৎ করে প্রিয় মানুষটাকে হারিয়ে ফেললে পুরো পৃথিবী যেন পালটে যায় তার। চিরচেনা মানুষগুলো হয়ে পড়ে অনেক অচেনা। চারদিকের সব আলো মুহূর্তে নিভে যায় তার। রাতের অন্ধকারে গুমরে গুমরে একাকী কাঁদে সে। প্রশ্ন তার নিজের কাছে, সমাজের কাছে, কখনো বা সৃষ্টিকর্তার কাছে, আমার কী হবে? উত্তর মেলে না। প্রিয় মানুষটাকে হারানোর পর চারদিকে তখন নির্মম বাস্তবতা। সব ছাপিয়ে সে ভুগতে থাকে নিরাপত্তাহীনতায়। মেয়েটি যদি চাকরিজীবী হয়, তাহলে কিছুটা রক্ষা। সে মানসিকভাবে শক্তি পায় নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। জীবনের সঙ্গে লড়াই করার। কিন্তু সে যদি কোনো চাকরি না করে! তাহলে তার মতো অসহায় বুঝি আর কেউ নেই। ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে সে পরে অতল সাগরে। ঠাঁই হয় তার বাবার বাড়ি, শ^শুর বাড়ি কিংবা ভাইয়ের বাড়ি। সেখানে তৈরি হয় আরেক যন্ত্রণা। সব কাজ করেও সম্মান মেলে না। করুণা আর চারদিকে অপমানজনক পরিবেশ। একটু বেঁচে থাকার জন্য চলে তার ক্লান্তিহীন সংগ্রাম। হীনমন্যতায় ভুগতে থাকে সে ও তার সন্তানরা। রঙিন জগৎ হয়ে পরে ক্রমশ ধূসর… সাদা। সেখানে কোনো চাওয়া নেই, পাওয়া নেই, আনন্দ নেই, নেই কোলাহল। থাকে শুধু জীবনকে বয়ে বেড়ানোর বেদনা আর দীর্ঘশ্বাস। আমার এক সাংবাদিক বন্ধু শোনায় তার গল্প। জানো আপু, বাবা মারা যাওয়ার পর আমার মা এক কাপড়ে চলে আসে বাবার বাড়ি। সঙ্গে আমরা দুই ভাইবোন। মার অপরাধ, মা শুধু ঘরে থাকতে চাননি। আমাদের মানুষ করতে চাকরি করতে চেয়েছিলেন। এ অপরাধে তাকে সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা হয়। অনেক দুপুর আমরা না খেয়ে ছিলাম। উৎসবে কিনতে পারিনি রঙিন জামা। খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে অঝোরে কেঁদেছি দুই ভাইবোন। আমাদের দিকে কেউ ফিরেও তাকায়নি, যদি টাকা দিতে হয়! আরেক সহকর্মী বলে, তার ৫ বছর বয়সে বাবা মারা গেছেন। এরপর মা তাদের খুব কষ্ট করে বড় করেছেন। ছোটবেলায় খালাতো-মামাতো ভাইবোনরা যখন মুরগির মাংসের রান খেত তখন তারও খুব খেতে ইচ্ছে করত। কিন্তু কখনো ভাগ্যে জোটেনি তা। না দিতে পারার যন্ত্রণায় মাকে দেখেছেন শুধু কাঁদতে। আজ বড় হয়ে মুরগির মাংস দেখলে তার বমি পায়। বাবাকে হারিয়ে এক রাতে ওরা যেন রাজত্ব হারিয়ে হয়ে পড়ে একদম নিঃস্ব। মার বয়স বেড়ে যায় কয়েকগুণ। ওর কথা শুনে চারপাশে শুধু স্বজন হারানো মানুষদের দেখি। প্রিয় মানুষটাকে আঁকড়ে তাদের হাহাকার ভেসে বেড়ায় আকাশে বাতাসে, আমার কি হবে? কীভাবে চলবে জীবন? এর পেছনে বুঝি থাকে সেই একই বেদনাময় ইতিহাস। সেই ইতিহাসে সামাজিক অর্থনৈতিকভাবে সব হারানোর ভয়। যা শুধু একটা মেয়েকেই বয়ে বেড়াতে হয় আজীবন। এর থেকে যেন মুক্তি নেই মেয়েদের। পুরুষদের জীবনে এ রকম ঘটনা ঘটলে তাকে কিছুটা অসহায় অবস্থায় হয়তো পড়তে হয় তবে সব হারিয়ে যায় না। সমাজ তার পক্ষেই থাকে। সমবেদনার হাত বাড়ায়। কিন্তু মেয়েদের বেলায় সমাজ করে বিরূপ আচরণ। সেখানে মেয়েটির পাশে কেউ থাকে না। তার যুদ্ধ তাকে একাই করতে হয়। নিজের সঙ্গে, অন্যের সঙ্গে। আমাদের চারপাশে অনেক পরিচিত মানুষ আছেন যারা এ রকম বিব্রতকর অবস্থায় রয়েছেন। রয়েছেন নানা সামাজিক সমস্যায়। আমরা সেসব দেখেও না দেখার ভান করি। মানবিক না হয়ে হয়ে উঠি স্বার্থপর। ভাবি আমার সঙ্গে তো ঘটছে না! যেচে কে আর যায় অন্যের সমস্যায় মাথা ঘামাতে। চারপাশে অনেক পুরুষকে দম্ভ করে বলতে শুনি আমার স্ত্রীকে আমি চাকরি করতে দেইনি। ঘরের বউ ঘরে থাকবে। মেয়েদের আবার চাকরি কি? তিনি কি জানেন যদি কখনো কিছু হয়ে যায় তার স্ত্রীর সাজানো জীবনটা হয়তো এক মিনিটে হয়ে যাবে এলোমেলো? তাই মেয়েদের নিজের পায়ে দাঁড়ানো খুব দরকার। দরকার এসব পরিবারগুলোর খোঁজ নেয়া। আমরা কি কখনো নিয়েছি? হয়তো হ্যাঁ। হয়তো না। ক’দিন শোক জানিয়ে আমরা আবার আগের মতো ব্যস্ত হয়ে যাই। প্রিয় মানুষদের বেদনাময় নীল গল্পগুলো আমাদের জানা হয় না। রাতের অন্ধকারে সেসব না বলা গল্পগুলো শুধু জমা হতে থাকে রাতের আকাশে। ছোট ছোট সংসারে বাড়তে থাকে রক্তক্ষরণ আর ভাঙতে থাকে স্বপ্নগুলো। পাশে থেকেও কখনো বলা হয় না নরম গলায়, আমরাও আছি তোমার সঙ্গে, তোমাদের জীবনের সঙ্গে। যান্ত্রিকতায়, স্বার্থপরতায় আমরা ক্রমশ আমাদের বোধগুলোকে মেরে ফেলছি। আমরা ভুলে যাচ্ছি সূর্য দেখতে, পলাশ ফুল দেখতে। বিকেলের নরম রোদ গায়ে মাখতে। এবার মনে হয় নিজেদের জন্য একটু ভাবা দরকার। এক হওয়া দরকার আমাদের স্বার্থেই। আমাদের একটু উদ্যোগ, সহমর্মিতার হাত রঙিন করে তুলতে পারে আরেকটি জীবন। উৎসবে, বিশেষ দিনে ফোন করে কিংবা নিজেরা গিয়ে সব হারানো নীলকণ্ঠ মানুষগুলোর পাশে দাঁড়িয়ে বলতেই পারি, এই দেখ, তুমি একা নও। আমরা আছি তোমার সঙ্গে।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj