প্রগতি বেকারি : রায় অঞ্জন

শনিবার, ২৯ জুন ২০১৯

কাল রাতটা একেবারেই বিনিদ্র কাটে অবিনশ্বরের। এক অন্যরকম চিন্তা সারাক্ষণ বাগাডুলির মার্বেল গুটির মতো মগজের এ প্রান্তে-ও প্রান্তের তারকাঁটায় আঘাত খেয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিছুতেই থিতু হতে পারে না সে। সামান্য একটা মেয়ে তার মগজের প্রতি অণুতে এই বিষ ছড়িয়ে দিল! অবিনশ্বরের অবশ্য ভাবুক মন, সব কিছুতেই চুলচেরা ভাবনা তার ধাতে-মননে। দেওচণ্ডী গ্রামের অবিনশ্বর যে দিন গ্রামছাড়া হয়ে নগরে আসছিল, ট্রেনের সিটে বসে পড়ন্ত বিকেলের ডুবন্ত সুয্যির পাটে বসা দৃশ্য দেখছিল, আর মনটা সাপে কাটা দম আটকে থাকা মৃতপ্রায় রোগীর মতো ক্ষণে ক্ষণে নাড়া দিয়ে উঠছিল। গ্রাম থেকে পালিয়ে আসার সময় হৈম বলে দিয়েছিল, ট্রেনে করে যাওয়ার সময়, জানালা দিয়ে দেখবে, একে একে রাখালরা তাদের মহিষের পাল নিয়ে বাড়ি ফিরছে, প্রকাণ্ড গাছগুলো মনমরা করে দাঁড়িয়ে আছে, সার বাঁধা বাঁশঝাড়ের সরু পাতার আড়ালে সোনা সুয্যি লাল হয়ে মুখ লুকোচ্ছে, ভর পেট-আধ পেট পাখিদের নীড়ে ফেরার ডানা ঝাপটানি, সবাই যার যার মতো এগুচ্ছে কিংবা ঠায় দাঁড়িয়ে আছে, কিন্তু মনে হবে সবাই তোমাকে এড়িয়ে যাচ্ছে বা ছেড়ে যাচ্ছে, তখন যদি মন বিমর্ষ হয়, সেই বিমর্ষতার নাম ভালোবাসা, আর ভালোবাসায় মাখামাখি যে আবেগটা, সেই আবেগের নাম আমি- হৈম। আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যাব না, প্রেম আর মমতায় মাখামাখি হয়ে জড়িয়ে থাকব। রাত নেমে আসা অবধি অবিনশ্বরের মরে যাওয়া মনটায় এভাবেই হৈম একটু পরপর নড়েচড়ে উঠছিল।

দেওচণ্ডী গ্রাম। খুব ছোট। একটা পাড়ার মতো। গোটা পঞ্চাশেক ঘর, মূল সড়ক থেকে গোপাট ধরে বেশ ভেতরের দিকে। মূল সড়কটা প্রকাণ্ড কালো রংয়ের অলস অজগরের মতো চলে গেছে দূরে কোথাও, হয়তো বা দিগন্তে। দিনে শহর থেকে আসা গোটা তিনেক বাস থামে সড়কের লাগোয়া গোপাটের মুখে। সেখান থেকে মেঠোপথ ধরে হেঁটেই যেতে হয় গ্রামে। দেওচণ্ডীতে কেউ কারোর নয়, অথচ সবাই সবার। তের উঠোনের গ্রাম, উঠোনের চার মাথায় চারটে করে ঘর, ঠাকুরের উঠোনটা প্রকাণ্ড, ঘর সবে

দুখানা, গ্রামের সর্দারকে এরা ঠাকুরই বলে। পারতপক্ষে নগরের সঙ্গে যোগাযোগ নেই এদের। এদের কেউ কারো মা না, কেউ কারো বাবা কিংবা ভাই-বোনও না, বিয়েথা, প্রেম-ভালোবাসার বালাই নেই এদের। এমনভাবেই চলে আসছে চৌদ্দ পিঁড়ির পরম্পরা। কেবল ঠাকুরদেরই মা-বাবা-ভাই-বোন হয়। নিজেদের বাচ্চারা একটু বড় হলেই ঠাকুর বাটোয়ারা করে দেন কোন শিশু কার ঘরে বড় হবে। এতে এদের নিজস্ব মমত্ববোধ বা আত্মীকতার বোধ জাগ্রত হয় না কখনোই। জমিতে ফসল, পুকুরে মাছ, হাঁস-মুরগি-গরু পালন করা সবারই কাজ, কিন্তু ফসল বাটোয়ারা করেন ঠাকুর মশাই। এক নিজস্ব ধ্যান-ধারণার গ্রাম দেওচণ্ডী। সারাদিন কাজকর্ম সেরে সন্ধ্যায় ঠাকুরের উঠোনে বসে গানের মজমা, গোল হয়ে বসে বুড়ো-বুড়ি আর ছানা-পোনারা। যুবক-যুবতিরা ঢোলক-মন্দিরা-খঞ্জনি বাজিয়ে গানের মাতম তোলে। গান শেষে রাতের খাবার এই উঠোনেই। মাছের তেল গলিয়ে কুপির সলতে জ্বালানো আলোতে সবাই সার বেঁধে বসে আর গোমস্তারা শালপাতায় খিচুরি-ভাত বা যা কিছুই থাকে তা পরিবেশন করে। ঘরে ফেরার সময় নারী-পুরুষের ঘরের পথ ইচ্ছেমতোই পরিবর্তন হয় যখন-তখন।

দেওচণ্ডীতে চণ্ডী পূজাতেই সাজ সাজ রব ওঠে। বিশাল মণ্ডপে পূজা হয় শরৎকালে আর বসন্তে। বছরের এই দুইটা পার্বণে ঠাকুর বাড়িতে দিন-রাত আনন্দ আর ভরপেট খাবার চলে পুরো গ্রামের। পূজার কয়দিন মহুয়া-চোলাইয়ে সয়লাব হয়ে যায়। গ্রামের নামের সঙ্গে এই পূজার এক ঐতিহাসিক সম্ব^ন্ধ আছে। আগে এই গ্রামের নাম ছিল বাসন্তী গ্রাম। অনেক বছর আগে এক বাসন্তী পূজার দিন আকাশ কালো করে ঝড় উঠল এক ভরদুপুরে। চারদিক তিমিরে কালো হয়ে উঠল ঝড়, বাতাসে গরম ভাপ, ঠাকুর গিন্নী তখন পোয়াতি, সে দিনের মেঘের গর্জনে ঠাকুর গিন্নীর অকাল গর্ভস্খলন হলো, ভূমিষ্ঠ হলো অমানবীয় অবয়বের এক শিশু। সবার ধারণা, এ কোনো সাধারণ শিশু না, নিশ্চয়ই কোনো দেও-দানব এটা। শিশুটিকে জীবন্ত পুঁতে ফেলা হলো, ক’দিন পরে ঠাকুর গিন্নীও চোখ মুদলেন। সেই থেকে এই গ্রামের নাম বাসন্তী বদল হলো, হয়ে গেল দেওচণ্ডী। তখন থেকেই দেবী চণ্ডীকে তুষ্ট করতে বছরে দুবার পূজার আয়োজন করা হয়।

একবার পূজার সময় গ্রামে এল এক বাউল, সফেদ দাড়ি, একতারা হাতে, সঙ্গে তার কিশোর চ্যালা। ঈশ্বর সংশ্রব বাউল এমন গ্রাম দেখে ধরেই নিলেন দেহ-জাতি-সংসারের মায়াবিহীন এমন গ্রামেই হওয়া উচিত তার বাউলিয়ানা আশ্রম। এ গ্রামের সবাই যেন তারই পথের অনুসারী। বাউল আর চ্যালার সম্মিলনে আশ্রম জমে উঠল। বছর কয়েক বাদে বাউল সাধক দেহ রাখলেন, চলে গেলেন ঊর্ধ্বালোকে। চ্যালা হয়ে গেল নিঃসঙ্গ, আশ্রমের এক কোণেই তার ছাউনি। গুরুর চ্যালা গুরুর গদিনসীন হবেন, ভক্তদের মনে এটাই প্রচলিত। কিন্তু গুরুর শক্তি পায় ক’জনায়। গুরুজি যেমন আপনারে চিনতেন, অচেনাকে চিনতে পেরেছেন, চলে গেছেন সেই শাশ্বত অচিনের কাছে, কিন্তু শিষ্য অবিনশ্বরের তো সেই অবধি বিচরণ ঘটেনি। তার মনে জাগতিক প্রেম ঢুকেছে। ঘর বাঁধার সাধ জেগেছে। তার মনে বাসা বেঁধেছে হৈম। কিন্তু দেওচণ্ডী গ্রামে যে এই রেওয়াজ নেই। শেষ পর্যন্ত দেওচণ্ডীর পাট তাকে চুকাতেই হলো। গ্রাম ছেড়ে নগরে।

নগরে এসেই যেন রাগে-ক্ষোভে নিজেকে পাল্টে ফেলার ভীষণ তোড়জোড় অবিনশ্বরের। সবার আগে বদলে দিল গুরুর দেয়া নিজের নামকে। গুরুজি বলতেন, নিজের চেয়ে ভক্ত বড়, তাই ভক্তকে চিরস্থায়ী রাখতেই নাম দিয়েছিলেন অবিনশ্বর! যত্তসব আজগুবি। জীবনই যেখানে পাল্টাচ্ছে দিনে রাতে সেখানে আবার অবিনশ্বর! নিজের নাম অনীক রেখে পেট ভাত আর মাথা গোঁজার জন্য চাকরি নিল রুটি-বিস্কিটের দোকান ‘প্রগতি বেকারি’তে। বেকারির মালিকের মেসঘরেই থাকার জায়গা। গায়ে গতরে শক্তিশালী দেখে মালিকের বেশ পছন্দ অনীককে, বড় ওস্তাদের সাগরেদ হিসেবে ময়দা মাখানোর কাজ অনীকের। ওস্তাদ বা গুরুজির তরিকাটা অনীকের ভালোই জানা, অল্প ক’দিনেই সে ওস্তাদের হাত থেকে কাজ শিখে নিল। সারাদিন হাড়ভাঙা কাজ আর রাতে মেসঘরে বেভোরে ঘুম। ভালোই কাটছিল দিন, মালিক-ওস্তাদ দুজনেরই প্রিয় হয়ে উঠল অনীক। মালিক যখন দোকানে থাকেন না, মাঝে মাঝে তাকেই চুলাঘর থেকে এসে তহবিল আগলাতে হয়। দোকানের বিক্রি-বাট্টাও বাড়ছে দিনে দিনে। একদিন আড়াল থেকে মালিক আর ওস্তাদের আলাপ শুনছিল সে।

– একটা জিনিস খেয়াল করছো, রমজান?

– জি মালিক।

– এই পুলাটা আসার পর থেকে দোকানটা কেমন চাঙ্গা চাঙ্গা লাগতাছে, বেচাকেনাও বাড়তেছে।

– জি মালিক, পুলাটা কিন্তু বেশ ভালা। খুব তমিজি পুলা, আমারে সম্মানও করে। এমন সাগরেদ থাকলে ওস্তাদের মনও হয় ফুড়ফুইড়া।

– আমি আরেকটা কথা ভাবতাছি, পেটে-ভাতে কামলার মালিকের বরকত হয় না, এই পুলা তো একরকম পেটে-ভাতেই আছে, দিমুনি বেতন একটু বাড়াইয়া?

– আমিও এইটা কইতেছিলাম, আপনে মেজাজি মানুষ, কি থেইক্কা কি মনে করেন, এলাইজ্ঞা জিহ্বার আগার কথাটাও কই না আপনেরে।

– আচ্ছা যাও, মাসের তো আর কয় দিন বাকি, আগামী মাস থেকে তার বেতন বাড়াইয়া দেই, কাম-কাইজ মন দিয়া করতে বইল।

অনীকের পোয়া এখন বারোতে। কাজ আর মন দুইটাই চলছে সমান তালে। মাঝে মাঝেই হৈমকে মনে পড়ে খুব। সে দিন জ্বরের ঘোরে হৈমর মুখটা কেমন আবছা আবছা চোখে ভাসছিল। মন চায় উড়াল দেয় অনীক। কিন্তু তা তো সম্ভব না। দেওচণ্ডীতে আর না। দিন ঘুরলে হৈমকেই শহরে নিয়ে আসবে। মালিককে বলে মেসঘরের থেকেই নিজেদের একটা ঘর আলাদা করে নিবে। ওস্তাদেরও তো ঘর আছে। এই মেসঘরের কোনার ঘরে ওস্তাদ আর তার স্ত্রী থাকে। বাচ্চা-কাচ্চা হয় না বউটার। অপরূপা বউ। অনীকের দিকে যখন তাকায়, কেমন যেন একটা লাগে শরীরের ভেতর। একলা ঘর, ঘরের ভেতর হৈম। নীলাম্ব^রীতে হৈমকে পরীর মতো লাগে! আহ কি সুখ! ভাবতে গা ঘেমে যায়। লজ্জা পায় অনীক।

দোকানে আয় রোজগার ভালোই বাড়ছে, সঙ্গে নিজেকে পাল্টে ফেলার ইচ্ছাটা আবার চাওড় দিছে অনীকের। সে দিন রাতের বেলা, মেসঘরে পাশের চৌকি থেকে মিজান বলছিল, ‘শোন অনীক। সারাদিন যা মেহন্নত যায়, শরীর আর ধইরা রাখতে পারি না ভাই। এমন নেতাইন্না শরীর নিয়ে গেরামে বউর কাছে যাইতে শরম লাগে। তুমি এসব বুঝবা না, তোমার তো আবার কেউ নাই। শরীরটা চাঙ্গা রাখতে হইব, বুঝলা? চাঙ্গা। টং ঘর থেইক্কা মাঝে মাঝে এক শিশি চোলাই নিতে হইব, খাইলেই দেখবা, নৌকা কেমনে পাহাড় বাইয়া যায়। ‘তোমার তো কেউ নাই- শুনতেই হৈমর মুখ চোখে ভাসছিল অনীকের। সেও ভাবল, ‘হ্যাঁ- শরীরটা চাঙ্গা রাখতে হবে- চাঙ্গা’। এই চাঙ্গাই অনীককে অন্য পথে টেনে নিয়ে যায় প্রতি সন্ধ্যায়। রাতে পা টলতে টলতে ঘরে ফেরে মাঝরাতে। সকালে লাল চোখে দোকানের ঝাঁপি খোলে। মালিকের শরীরটা ভালো নাই, তাই তার ছেলেই বসে এখন দোকানে। ছেলেটার আবার দিলে রহম কম। কথায় কথায় বাপ-মা তুলে গালি দেয়, অনীকের মাথায় রক্ত চড়ে। সে শিশির মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। আজকাল প্রতিদিন না হলে চলে না। এটা মালিকের ছেলের চোখ এড়ায় নাই।

হৈমর জন্য মন পোড়ে, দেওচণ্ডী খুব টানে তাকে, মনে হয় এর চেয়ে দেওচণ্ডী গ্রাম অনেক ভালো। নাহ, আর থাকবে না সে প্রগতি বেকারিতে, হৈমর কাছে যাবে। ভাবে আর একটা করে চুমুক দেয় প্লাস্টিকের গøাসে। মাথাটা বেশ ভার ভার লাগছে। একটু কিছু বের করতে পারলে ভালো লাগত। ভাবতে ভাবতে কখন যে মেসঘরের সামনে এসে পড়েছে টের পায়নি। মাথা ঘুরছে প্রচণ্ড, একটু পরেই সে জ্ঞান হারাল।

পরের দিন সকালে যখন চোখ খুলল, তখন জানল, মেসঘরের মালিকের ছেলে আসছিল কাল রাতে। সবাই বলাবলি করছে, এমন মাতালের আর এই মেসঘরে জায়গা নেই, সে যেন আজই মেস ছাড়ে, দরজায় বোর্ড ঝুলিয়ে দিছে মালিকের ছেলে- ‘মেসঘর ভাড়া হইবে, যোগাযোগ- প্রগতি বেকারি’। অনীক মনস্থির করল, আজই শহর ছাড়বে সে, আবার ফিরে যাবে দেওচণ্ডী গ্রামে। তার হৈমর কাছে। যেখানে হৈম তার জন্য প্রেম আর মমতার আবেগ মিশিয়ে রেখে দিয়েছে। কপালে দুহাত ঠেকিয়ে প্রণাম করল অনীক। কার উদ্দেশে, নিজেই জানে না।

:: টিকাটুলী, ঢাকা

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj