পানের পিক : সৈয়দা ইয়াসমিন আরা

শনিবার, ২৯ জুন ২০১৯

এই তো কিছুদিন আগে চোখের সামনে একটি মজার ঘটনা ঘটে গেল। বাসার একদম কাছেই আমার কর্মস্থল। বাসা থেকে পায়ে হেঁটে ১০ মিনিটের পথ মাত্র। একদিন সকালে কাজে যাওয়ার জন্য বাসা থেকে রওনা দিলাম। কিছু দূর এগিয়ে গিয়ে দেখি রাস্তা ব্লুক করে ৩-৪ টি অ্যাম্বুলেন্স আর কিছু মানুষের জটলা। জটলার মাঝে আমার দুজন পরিচিত মুখও আছে। তাদের একজন আমাকে দেখে ছুটে এল। এসে হড়বড় করে যে ঘটনা বলল, শুনে আমার আক্কেল গুড়ুম!

ঘটনা এই- আমার ঘনিষ্ঠ বান্ধবী নীলার চাচিকে প্রথমে পুলিশ ধরেছে, এরপর এমন মার দিয়েছে, উনার নাক-মুখ দিয়ে রক্ত ছুটছে। এখন উনার মরণাপন্ন অবস্থা। অ্যাম্বুলেন্স এসে উনাকে কম্বল দিয়ে পেঁচিয়ে, অক্সিজেন মাক্স পরিয়ে, হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছে। আশপাশের যারা ছিল, তারা শুধু চাচির মরণ চিৎকার, আল্লাহ গো আমারে বাঁচাও… ও মাগো ও বাবাগো… ধরনের আর্তনাদ শুনতে পেরেছে। আর কিছু জানে না। পুলিশও কিছু বলেনি। পুলিশকে কেউ জিজ্ঞাসা করার সাহসও পায়নি, চাচির অপরাধ কি?

আমি ভেবে ক‚ল পাচ্ছি না, আমেরিকার মতো দেশে যেখানে মেয়েদের সর্বোচ্চ সম্মান দেয়া হয়, মেয়েদের গায়ে আঁচড়টি দেয়া দূরের কথা, অসম্মান করে কিছু বললেও শাস্তি পেতে হয়। সেখানে পুলিশ একজন বয়স্ক মহিলাকে মেরে নাক মুখ দিয়ে রক্ত ছুটিয়ে দিয়েছে! আর সেটা আমেরিকার নিউইয়র্কের পুলিশ! যারা কিনা বড় বড় দাগি আসামিকেও খুব সৌজন্যতার সঙ্গে স্যার/ম্যাডাম বলে সম্বোধন করে! আমার কাছে সবকিছুই অবিশ্বাস্য লাগছে। আমি তাড়াতাড়ি নীলাকে কল দিলাম।

যা শুনেছি বিস্তারিত সব জানিয়ে দিলাম। নীলা আমার কাছে জানতে চাইলো, আমি ফ্রি আছি কিনা? আমি জানালাম অফিস যাচ্ছিলাম, তবে অসুবিধা নেই। আমি এখন বাসায় ফিরে অপেক্ষা করছি, তুমি আসো। তারপর যাওয়া যাবে হাসপাতালে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই নীলা এসে হাজির। আমি আর নীলা দুজনে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে ছুটলাম। পথেই দুজনে আলোচনা সেরে নিলাম, পুলিশের বিরুদ্ধে আইনি লড়াইয়ে যাব। এত বড় সাহস কীভাবে হলো, হোক চাচির যতবড় অপরাধ। তাই বলে উনাকে মেরে আধমরা বানাবে? মেনে নেয়া যায় না এমন অনাচার। যাই হোক, হাসপাতালে পৌঁছে প্রথমেই ইমারজেন্সিতে খোঁজ নিলাম। কারণ জানা আছে প্রথমে এখানেই চাচিকে আনা হবে।

চাচিকে খুঁজে পেতে বেশি বেগ পেতে হলো না। তার চারপাশে ডাক্তার-নার্স গিজগিজ করছে। এলাহী কাণ্ডকারখানা চলছে চাচিকে নিয়ে। আমেরিকা এমন একটি দেশ, মানুষের জীবনের মূল্য এখানে সবার উপরে। একজন রোগী ধনী কি গরিব, তা দেখার প্রয়োজন নেই। চিকিৎসা খরচের ধার ধারে না, ধার ধারে শুধু রোগীর রোগটিকে। যমে মানুষে টানাটানি চলতে থাকে, যতক্ষণ পর্যন্ত একপক্ষ হার না মানে। যাই হোক, আমি ও নীলা ইমার্জেন্সিতে গিয়ে বহু কষ্টে অনুমতি পেলাম চাচির কাছে যাওয়ার। আমরা যাওয়ার পর ডাক্তার-নার্সরা যেন কিছুটা হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। কারণ চাচি একটি ইংরেজি শব্দও জানেন না। ডাক্তাররা যাই জিজ্ঞাসা করছেন, উনি কিছুই বলতে পারছেন না, সমানে কেঁদে যাচ্ছেন। নীলাকে দেখে চাচি আরো জোরে হাউমাউ করে যা বললেন আর উপস্থিত পুলিশ ও ডাক্তার থেকে যে ঘটনার বর্ণনা উদ্ধারে সক্ষম হলাম, তা শুনে আমি ও নীলার মনের অবস্থা, হে ধরণী দ্বিধা বিভক্ত হও। আমরা দুইজন তার ভেতর লুকিয়ে যাই। ঘটনা হচ্ছে, চাচির সুগার লেবেল অনেক বেশি। ডাক্তার পরামর্শ দিয়েছে, প্রতিদিন প্রচুর হাঁটাহাঁটি করতে। দেশে থাকতে উনি সকালে পাড়াময় হেঁটে বেড়িয়েছেন। এখানেও তাই করতে বেড়িয়েছিলেন। শুধু জানা ছিল না দেশের আর এখানকার আইন ব্যবস্থা।

আজ সকালে উনি যখন বেড়িয়ে ছিলেন, ফুরফুরে মনে এদিক-ওদিক হাঁটছিলেন। আর মুখের ভেতর ছিল পানে ঠাসা। আয়েসিভাবেই চিবোচ্ছিলেন। চিবানোর জন্য মুখ ভরে উঠে ছিল পানের রসে। এমন সময় রাস্তায় দুজন পুলিশের মুখোমুখি হওয়ায় তারা চাচিকে সৌজন্য হিসেবে হাই বললেন। চাচিও আধুনিক কায়দায় হাই বলতে গিয়েছিলেন, তখনই লাল টুকটুকে কিছু পানের পিক মুখ বেয়ে পড়ে গিয়েছিল। পুলিশ দুজন তা দেখে কিছুটা বিস্মিত। ওদের বিস্ময় কাটার আগেই চাচি পুরো পানের পিক পিচকারির মতো পুলিশের সামনেই ছপাৎ করে মাটিতে ছিটিয়ে ফেলে দিলেন। এটা দেখেই পুলিশ দুজনের মাথা খারাপ অবস্থা। তারা ভেবেছে চাচির ভয়ানক অবস্থা। হয়তো তক্ষুনি চাচি ভবের লীলা সাঙ্গ করতে যাচ্ছেন। তাই এক মুহূর্ত দেরি না করে সঙ্গে সঙ্গে চাচিকে দুই পাশ থেকে ধরে ফেললেন। চাচি ঘটনার আকস্মিকতায় সম্পূর্ণ বেকুব। কারণ পুলিশ দুজন হাই বলেছে, উনি তো তাই বলেছেন। তাহলে এরা এমন করে তাকে ধরে বসল কেন? উনি যেহেতু ইংরেজি বলতে পারেন না। কিন্তু বাবাগো, মাগো বলে চেঁচাতে তো পারেন। উনি সমানে চেঁচামেচি আর গালি পাড়ছেন। পুলিশ বেচারা ভেবেছিল, এটা উনার যন্ত্রণার প্রকাশ। কালবিলম্ব না করে পুলিশ অ্যাম্বুলেন্স কল করে চাচিকে নিয়ে সোজা হাসপাতালে ভোঁ ভোঁ ভোঁ …।

আমি ও নীলা কিছুটা ধাতস্থ হয়ে উপস্থিত সবাইকে বুঝালাম চাচির মুখ দিয়ে রক্ত বের হওয়ার আসল রহস্য। ওদের বললাম, চুইংগামের মতো এটিও একটি চিবানো জাতীয় খাবার, যার নাম পানপাতা। যার সঙ্গে সুপারি, জর্দা নামক টোব্যাকো, খয়ের ও চুন লাগিয়ে চিবানো হয়। এটাও সিগারেটের মতো এক জাতীয় টোব্যাকো। সিগারেট টানলে ধোঁয়া ছাড়ে আর এই পান জাতীয় টোব্যাকো চিবালে এক ধরনের লালা জমে। যেটা আমরা বলি পানের পিক, যা তোমরা ভাবছো রক্ত। উনি সম্পূর্ণ সুস্থ আছে। উনাকে দয়া করে ছেড়ে দাও।

সব শুনে উপস্থিত প্রায় সবার মুখ কিছুটা হাঁ আর বিস্ফারিত নেত্র। এমন পরিস্থিতি সামাল দিয়ে চাচিকে নিয়ে আমি ও নীলা বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিলাম। আর চাচি কান্নাকাটি ভুলে যত বাঙালি বিখ্যাত গালি আছে সব ঝাড়তে ঝাড়তে বীরদর্পে দুই ভাতিজিসহ হাসপাতাল ত্যাগ করলেন। বাসায় যাওয়ার পথে আমি চাচিকে বুঝালাম, আমাদের এখানে যেখানে সেখানে থুতু ও ময়লা ফেলা নিষেধ আছে। নয়তো ৫০ ডলার জরিমানা করত। ওরা ভেবেছিল, আপনার মুখ ভরে রক্ত বের হচ্ছে, তাই এই এলাহী কাণ্ড ঘটেছে।

শুধুমাত্র টুকটুকে লাল রংয়ের পানের পিকের কারণে আজ আপনি জরিমানা থেকে বেঁচে গেলেন। চাচি সবকিছু বুঝে হু হু হা হা অট্টহাসি দিলেন। আমরাও চাচির সঙ্গে হাসতে হাসতে বাসায় ফিরলাম।

:: জ্যামাইকা, আমেরিকা

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj