নারীর একটি জানালা দরকার : তনুশ্রী দেবনাথ

সোমবার, ২৪ জুন ২০১৯

হাজারো ত্যাগে ভরা নারীর জীবন। এই ত্যাগের মূল্য পায় কয়জন? সবাইকে খুশি রাখতে গিয়ে নিজের প্রতি দৃষ্টি দেয়াই হয় না। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পেলে সংসারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সৃষ্টি হয়। তখন নারীর মূল্যায়ন কিছুটা হলেও হয়। তাই নিজের পায়ে দাঁড়ানোটা জরুরি। তবে যাই হোক, যতদিন সমাজের মানুষ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না করবে ততদিনে নারীর দুঃখ কমবে না।

যেই স্বামীর কথায় আপনি লেখাপড়া ছেড়ে দিলেন সেই স্বামীই একদিন বলবে, ‘কি করলা জীবনে লেখাপড়াটাও করলা না, লোকজনের কাছে বলতেও শরম লাগে…।’

যেই সন্তানের কথা চিন্তা করে আরেকজন চাকরি ছেড়ে দিলেন সেই সন্তানই একদিন শোনাবে, ‘সবার মা কত বড় বড় চাকরি করে…। রিহানের মা ডক্টর, শৈলীর মা ইঞ্জিনিয়ার, সারিকের মা প্রফেসর আর তুমি? তুমি কিচ্ছু করো না।’

গৃহিণী নারী সারাজীবন সংসারের জন্য খেটে শুনতে হয়, ‘রোজগার তো করো না, টাকার মূল্য বুঝবে কেমনে…।’ অথচ এই নারী সংসারের খরচ বাঁচাতে কি-ই না করেছেন। সবার জন্য মাছের টুকরা দিলেও নিজে প্রায়ই সবজি দিয়ে খেয়ে নিয়েছেন। কি কি আইটেম রান্না করলে খরচ কমবে অথচ সবাই খুশি হবে সেই চিন্তা করেছেন। মার্কেটে গিয়ে সবার কথা ভেবে দামি শাড়ি আর নেয়া হয়নি। আর তাকেই শুনতে হয় রোজগেরে না হওয়ার খোঁটা।

স্বামী-সন্তান অসুস্থ হলে যে নারী প্রাণপণ সেবা করে যান, তিনি যখন নিজে অসুস্থ হন কয়জন সেভাবে সেবা পায়? একশ দুই জ্বরে যখন অন্যরা কাতর, নারীটি তখন একেবারে দুইটা প্যারাসিটামল খেয়ে ভাত বসাচ্ছে। তার চিন্তা স্বামী সন্তান কি খাবে…

কর্মজীবী নারীরা দ্বিগুণ পরিশ্রম করে সংসারে সবার মন জোগাতে চায়। যেখানে একই চাকরি করে স্বামীটি বিশ্রাম নেন, নারী কোমরে আঁচল গুঁজে কাজে লেগে পড়েন। তবে কর্মজীবী নারীটির একটি স্বস্তি আছে, সেটা অর্থনৈতিক স্বাধীনতা। এই ক্ষমতা তাকে অন্যান্য দিকে শক্তিশালী করে তোলে।

এরকম হাজারো ত্যাগে ভরা নারীর জীবন। এই ত্যাগের মূল্য পায় কয়জন, দিনশেষে কটু কথাও শুনতে হয়। সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার যে নারী একদিন এসব সয়ে এসেছে সে নারীও সমর্থন দেয় না। এই পুরুষ শাসিত সমাজ দাঁড়ায় বিচারকের ভূমিকায়। পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার নারীরাও তাদের সঙ্গে সুর মেলায়। প্রতিটা কাজের ব্যবচ্ছেদ করতে থাকে। যখন কোনো সন্তান ভালো কাজ করে সেটা হয় বাবার গুণে আর খারাপ করলে সন্তান লালন পালনে নারীর ভূমিকা প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। নারী সে হোক কর্মজীবী অথবা গৃহিণী সারাক্ষণ নিজের ভুলগুলো শুধরাতে ব্যস্ত থাকে, সবাইকে খুশি রাখতে চায়। এই করতে গিয়ে নিজের প্রতি দৃষ্টি দেয়াই হয় না। ব্যস্ত জীবনে নিজের জন্য একটু একান্ত সময় ভাবাই যায় না। আর বিনোদনের ব্যাপারটা যেন একতরফা পুরুষেরই। পুরুষের ঘুরে বেড়ানো, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়া, পরিবারকে সময় না দিলেও সেটা ইতিবাচকভাবে দেখা হয়।

এইসবের তুলনামূলক সমাধান হলো নারীর অর্থনৈতিক স্বাধীনতা অর্জন। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা পেলে সংসারে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সৃষ্টি হয়। তখন নারীর মূল্যায়ন কিছুটা হলেও হয়। তাই নিজের পায়ে দাঁড়ানোটা জরুরি। তবে যাই হোক, যতদিন সমাজের মানুষ দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না করবে ততদিনে নারীর দুঃখ কমবে না।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj