আই লাভিউ আব্বু

শনিবার, ২২ জুন ২০১৯

শাহীন চৌধুরী ডলি

আব্বু- আমার আম্মুটা না ভালো

আমি- আমার আব্বুটা না ভালো

আব্বু- আমার আম্মুটা না ভালো

আমি- আমার আব্বুটা না ভালো…

এভাবে বাবা-মেয়ের প্রতিযোগিতা চলতে থাকে, কে বেশিবার বলতে পারে।

আব্বু বলছে, আমিও বলছি- কি মধুর খেলা!

হয়তো আব্বুর ঠিক কাছে ঘেঁষে নেই, খেলছি বা পড়ছি

আব্বু গেয়ে উঠল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মন আকুল করা গান- আয় খুকু আয়, আয় খুকু আয়। আয়রে আমার কাছে আয় মামনি- এ হাতটা ভালো করে ধর এখনই…

আব্বুর আকুলতা বুঝতে পেরে দৌড়ে এসে বুকে ঝাঁপিয়ে পরতাম। তারপর হুটোপুটি চলতে থাকত।

আব্বুর মাত্র চব্বিশ বছর বয়েসে আমার জন্ম। আমি যেন এক জীবন্ত পুতুল, নামও রাখলেন- ডলি। মাত্র একটা নাম রেখে কি আব্বুর মন ভরে। রাজকন্যাকে নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে কত নামে যে ডাকেন।

আমার সব কিছুতেই তো আব্বু। কবিতা পড়া, গল্প করতে করতে আব্বুর হাত ধরে দূর-দূরান্তে হারিয়ে যাওয়া। আব্বু বাজারে যাবে- সঙ্গে আমি, আব্বু ব্যাংকে যাবে- সঙ্গে আমি, আব্বু ব্যবসার কাজে ব্যস্ত- সঙ্গে আমি। মিটফোর্ড মেডিসিন মার্কেট থেকে হাতিরপুলের ফার্মেসি। গুলশান এক নম্বর মার্কেটের বিজনেস প্লেস থেকে গাজীপুর- সর্বত্র সঙ্গে রেখেছেন আমাকে।

কখনো একা রাস্তায় ছেড়ে দিয়ে বলেছেন- আমি পরে আসছি, বাসায় চলে যাও।

তখন থেকেই বাস্তবতার সব অনুষঙ্গ ঢেলে মেয়েকে তৈরি করতে চেষ্টা করেছেন।

সেই ছোটবেলায় ঢাকা কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরিতে নিয়ে যেতেন। নিজে বই পড়তেন সঙ্গে আমাকেও উৎসাহিত করতেন।

একুশে ফেব্রুয়ারি কিংবা স্বাধীনতা দিবসে আব্বুর সঙ্গে যেতাম ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। আব্বু জগিংয়ে- আমি এবং ছোটবোন পলি আব্বুর পেছন পেছন দৌড়াচ্ছি। আব্বু দৌড়াতে দৌড়াতে বলতেন, কে আগে আমাকে ছুঁতে পারে দেখি তো!

সেই জগিংয়ের অভ্যাস থেকে আমি আজো বেরুতে পারিনি।

যখন ক্লাস সেভেনে পড়ি আমরা ঢাকা থেকে গাজীপুর চলে গেলাম। এমন কতবার হয়েছে- জয়দেবপুরে রাজবাড়ীর ভেতরের মসজিদে আব্বু নামাজ আদায় করছেন, বাইরে আমি অপেক্ষা করছি। আমার এইচএসসি পরীক্ষা দেয়া পর্যন্ত এভাবেই কেটেছে। জয়দেবপুর পাবলিক লাইব্রেরিতে বই পড়তে পড়তে সময়জ্ঞান হারিয়ে ফেলতাম। তারপর যখন বেরিয়ে আসতাম- কে কি পড়লাম তা নিয়ে আলোচনা।

আব্বু এবং আমি গল্প করতে করতে কখনো চলে গেছি দক্ষিণ ছায়াবীথির ফনির টেকে, নীলের পাড়া, হাড়িনালে। কখনো চিলাই বা তুরাগ নদীর তীরে আবার কখনো শ্মশানে। সঙ্গে কিছু শুকনো খাবার, খবরের কাগজ ম্যাগাজিন বা কবিতা বই এবং অবশ্যই বড় একটা গামছা। ঘাসের ওপর গামছা বিছিয়ে বসে প্রকৃতি উপভোগ করতে করতে আমি আমার বা আব্বুর পছন্দমতো পড়ছি, কবিতা আবৃত্তি করছি- কী যে মধুর ছিল সেই সব দিন।

রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে আমার কবিতা আবৃত্তি শুনে তারপর আব্বু ঘুমাতেন। অনেকটা রুটিন হয়ে গিয়েছিল। পরে বুঝেছি- এগুলো ছিল আমার সঙ্গে সংস্কৃতির মেলবন্ধন গড়ে তোলার প্র?য়াস।

বাবা মানে বন্ধু, আব্বু আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু।

শুধু কি আমার? আমাদের ভাইবোনদের, আমার বন্ধুদের বন্ধুও আব্বু। বাসায় বন্ধুরা বেড়াতে এলে সবাই আব্বুর সঙ্গেই গল্পে মেতে উঠত। আবার আমি আব্বুর সঙ্গে সঙ্গে আব্বুর বন্ধুদের বাড়িতে বা কার্যক্ষেত্রেও চলে যেতাম।

আব্বু মানেই আমার এক আকাশ নির্ভরতা, একরাশ নিরাপত্তা। আব্বু ভালোবাসা, স্নেহ দিয়েই ভরিয়ে রেখেছেন। শাসন যা করার আম্মু করতেন। আব্বুর কাছ থেকে কখনো কোনোদিন বকা তো দূরের কথা, চোখও রাঙানিও পাইনি। আবদার, কাজ, অকাজের প্রশ্রয়দাতা আমার আব্বু।

সংসারজুড়ে আমাদের পিতা-কন্যার আহ্লাদীপনা বিরাজ করত। আম্মু কী বলল, কী করল, কয়বার বকা দিল লিস্ট রেডি করে রাখতাম-

আব্বু কাজ থেকে বাসায় ফিরলেই সেটা লিখিত আকারে চুপি চুপি আব্বুর হাতের তালুতে গুঁজে দিতাম।

আব্বু ইশারা দিয়ে আমাকে চুপ থাকতে বলে আম্মুকে উদ্দেশ্য করে শিল্পী মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকীর গান ধরতেন-

আমি কারো খাই না পরি, না কারো চাকরি করি!

আমাকে চোখ রাঙানো চলবে না

শোন গো রূপসী ললনা…

হা হা হা হা…

আম্মু খুব শান্ত আর চুপচাপ মানুষ। আম্মু থ হয়ে যেতেন। তারপর হাসতে হাসতে আমাকে বলতেন, শ্বাশুড়ি মা বিচার দিয়েছে বুঝি?

মাঝে মাঝে আব্বু ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ি আখাউড়ার মনিয়ন্দ গ্রামে গেলেও স্কুল ছুটিতে সঙ্গী হতাম। এখনো অবশ্য সংসারের ছুটিতে তাই করি। গ্রামময় বাড়িতে বাড়িতে আব্বুর সঙ্গে ঘুরে বেড়াই। আব্বু শহর-গ্রাম সবখানেই মানুষের মনের মণিকোঠায় এমনভাবে নিজের স্থান করে নিয়েছেন, যার জন্য মেয়ে হিসেবে গর্ব হয়। এত মানুষ আমার আব্বুকে ভালোবাসে- আলহামদুলিল্লাহ।

আব্বুর কোমল ছায়ায় আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বেড়ে উঠেছি। আব্বু আমার কাছে ডালপালা মেলা এক বিশাল বটবৃক্ষ। ধুম বৃষ্টিতে কিংবা প্রখর রোদে মাথার উপরের শান্তিদায়ক ছাতা। অন্ধকারে আলোর দিশারি।

এখন বড় হয়েও আব্বুর কাছে কখনো খুকি আবার কখনো মা। আমার কাছে আব্বু খোকা। এখনো আব্বু আমাদের সঙ্গে সমানতালে সর্বত্র দাপিয়ে বেড়ান। দেশ-বিদেশ ঘুরি, আনন্দ লুফে নিই। বই, পেপার, ম্যাগাজিন পড়ি, টেলিভিশন দেখি। দেশ-রাজনীতি নিয়ে আলোচনা করি, অনেক সময় পক্ষে-বিপক্ষে দারুণ তর্কে জড়াই। কবিতা শুনাই। কিছু জানা প্র?য়োজন, জিজ্ঞেস করতেই উত্তর পেয়ে যাই। সেটা যে কোনো ব্যাপারেই।

আব্বুর কাছে ঘেঁষে শিশুবেলার মতন শরীরের ঘ্রাণ নিই। হাত-পায়ের আঙুল, মাথা টিপে দিই। আমার আব্বু যে খুব আদুরে, আমাদের আদুরে খোকা।

আব্বুকে নিয়ে লেখা শেষ করা আমার পক্ষে অসম্ভব।

থামতে হয় বলেই থামছি। পেছনে যেমন বলি সামনেও তেমনি বারবার বলি-

আই লাভিউ আব্বু। আমার আব্বুটা না ভালো… আমার আব্বুটা না ভালো…

:: ব্রাহ্মণবাড়িয়া

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj