বাবা, ভালোবাসি তোমাকে

শনিবার, ২২ জুন ২০১৯

মোনোয়ার হোসেন

আমি যখন ছোট ছিলাম, বাবা আমাকে কিছুই দিতে পারেনি। না সুখ, না শান্তি, না ভালো খাওয়া-দাওয়া, না ভালো পোশাক-আশাক, না ভালো স্কুলে লেখাপড়া শেখার সুযোগ। প্রতিটি মুহূর্তে অভাব, অনাটন আর কষ্টের সঙ্গে তুমুল লড়াই করে বড় হতে হয়েছে আমাকে। বাবার যে ধন-সম্পদ ছিল না, তা নয়; একটি সুখী সংসার গড়ার মতো যথেষ্ট সম্পদ ছিল তার। তবুও আমরা সুখী ছিলাম না। কারণ বাবা ছিল খুবই অলস। কোনো কাজকর্ম করত না। সারাদিন গ্রামে-গঞ্জে টো টো করে ঘুরে বেড়াত, আর মানুষের সঙ্গে অহেতুক গল্প করে সময় কাটাত। সংসারের দিকে কোনো খেয়াল ছিল না তার।

সংসারের প্রতি বাবার এই উদাসীনতার কারণে বাবাকে কোনো দিন শ্রদ্ধা করতে পারিনি আমি, পারিনি ভালোবাসতে। পক্ষান্তরে, বাবা আমাকে ভালোবাসতো প্রচণ্ডভাবে। পাগলের মতো।

একদিনের ঘটনা, সম্ভবত ২০০৬ সালে হবে। আমি অফার পেলাম গ্রামীণফোন টাওয়ারের চাকরির। বেতন ছয় হাজার টাকা। ছোট ছোট ভাইবোনদের লেখাপড়ার কথা ভেবে বাড়িতে না বলে আমি গোপনে দালালের সঙ্গে যোগাযোগ করে চলে গেলাম ঢাকায়। গ্রামীণফোন অফিসে। তিনদিন থেকে ওখানকার পরিবেশ ভালো লাগল না আমার। আবার ফিরে এলাম বাড়িতে। বাড়িতে এসেই অবাক। আমার চিন্তায় এই তিনদিনে বাবা কিছুই মুখে দেয়নি। শুধু কেঁদে কেঁদে পাগলের মতো খুঁজে বেরিয়েছে আমাকে। এই তিনদিনে বাবাকে যেন চেনা যাচ্ছিল না। অনেক বুড়ো হয়ে গেছে। কুজো হয়ে গেছে। আমাকে দেখেই জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল। সাত গ্রামের কেউ বাবার কান্না থামাতে পারছে না। আমাকে জড়িয়ে ধরে বাবা কাঁদছে তো কাঁদছেই। তখন কেউ কেউ বলল, তোমার জন্যেই তো ও বাড়ি ছেড়ে পালিয়েছিল। তুমি যদি আজ বাড়িতে ঠিকঠাক কাজকর্ম করতে, সংসারে অভাব না থাকত, তাহলে কি ও বাড়ি ছেড়ে পালাতো?

বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল, এই আমি আজ আমার ছেলেকে ছুঁয়ে কথা দিচ্ছি, আর কোনোদিন সংসারের প্রতি অবহেলা করব না। আগামীকাল থেকে ভালোভাবে সংসারের হাল ধরব। কৃষিকাজ শুরু করব। বাড়িতে আর কোনো অভাব রাখব না। আমি এই ছেলেকে ছেড়ে থাকতে পারব না…।

সত্যিই সবাইকে অবাক করে দিয়ে অকর্মা বাবা রাতারাতি পরিবর্তন হয়ে পরেরদিন ভোরেই ঘুম থেকে উঠে লাঙল কাঁধে নিয়ে ছুটল মাঠে। হালচাষ শুরু করল। কৃষি কাজে মন দিল। আমাদের সংসারে কিছুটা সচ্ছলতা এল। দুই বছর পর আমার এক কোম্পানিতে চাকরি হলো। বাইরে থাকতে হবে শুনে বাবা ছোট শিশুর মতো আমাকে জড়িয়ে ধরে আবারো হু হু করে কেঁদে

উঠল। আমি সান্ত¡না দিয়ে বললাম, বাবা, তুমি কেন এমন করছো? কেন কাঁদছো? আমি তো এখন বড় হয়েছি। সব বুঝতে শিখেছি। তাছাড়া প্রতি সপ্তাহে তো আমি বাড়িতে আসবই। বাবা বলল, বাবার কাছে সন্তান কখনো বড় হয় না।

আমাদের বাড়ি থেকে একমাইল দূরে একটা বাজার আছে। নাম আখানগর বাজার। ঠাকুরগাঁও শহর থেকে দশ কিলোমিটার উত্তরে। বৃহস্পতিবার হলেই বাবা এই বাজারে এসে রাস্তার দিকে অপলক চোখে তাকিয়ে থাকত। কখন আমি বাড়ি ফিরব। যতক্ষণ না আসি, রাস্তার দিকে তাকিয়ে বাবা ঠাঁই দাঁড়িয়ে থাকত। আমাকে দেখেই প্রথম যে প্রশ্নটা করত, বাবা, এত শুকিয়ে গেছো কেন? ভালোভাবে খাওয়া-দাওয়া হয়নি না? মেসের খাওয়া কী আর তোমার চলে! আমি যতই বুঝানোর চেষ্টা করি, আমি শুকিয়ে যাইনি। বাবা মানতে নারাজ। চোখ পাকিয়ে বলে, আমার চেয়ে কী তুমি বেশি জানো?

আমি হেসে বলি, ঠিক আছে বাবা, এবার গিয়ে বেশি বেশি করে খাবো।

২০১১ সালে বাবার ক্যান্সার ধরা পড়ল। অনেক চিকিৎসা করানো হলো, তবুও বাবাকে আর বাঁচাতে পারিনি। সে বছরের ৭ রমজান বাবা আমাকে ছেড়ে চলে গেল না ফেরার দেশে। যে দেশ থেকে কেউ আর কোনোদিন ফিরে আসে না।

যে বাবা আমাকে এত ভালোবাসতো, আমার জন্য তার জীবনটাই বদলে ফেলল, তাকে আমি কোনোদিন মুখ ফুটে বলতে পারিনি- বাবা, ভালোবাসি তোমাকে।

এই বাবা দিবসে বাবাকে খুব বেশি মনে পড়ছে। চিৎকার করে বলতে

ইচ্ছে করছে -বাবা, ভালোবাসি

তোমাকে।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj