আব্বা

শনিবার, ২২ জুন ২০১৯

এস এম সাথী বেগম

রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোয়ার্টারে থাকতাম আমরা। খুব কড়াকড়ি নিয়ম ছিল আমাদের পরিবারে। সকালে স্কুল, দুপুরে ঘুম, বিকেলে হোমটাস্ক আর রাতে পড়া। আমি বিকেল হলেই প্রতিদিন বাসা থেকে বের হয়ে ছোট মাঠটায় খেলতে যেতাম। বড় মাঠে বড় ছেলেমেয়েরা খেলত। সেখানে ছোট ছেলেমেয়েদের যাওয়ার সুযোগ কম হতো।

আমাদের পরিবার ছিল খেলোয়াড় পরিবার। প্রতি বছর বার্ষিক খেলায় ভাই সবুজ, আমি আর আব্বা কম পক্ষে ৯টি পুরস্কার পেতাম। মনে পড়ে, সাইকেল প্রতিযোগিতায় আব্বা যখন সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরতেন তখনই চারপাশ থেকে আব্বার নাম ধরে সুরে সুরে সবাই ¯েøাগান দিত। সবাই জানত, আব্বা প্রথম হবেই। সাইকেল খেলায় আব্বাকে কখনো দ্বিতীয় হতে দেখিনি। যেমন খুশি তেমন সাজো প্রতিযোগিতা ঘিরে আব্বার মাথায় নতুন নতুন আইডিয়া বের হতো। সেখানেও আব্বার দল প্রথম হতো।

আব্বা নাটক করতেন। ভালো অভিনেতা ছিলেন। সেরা অভিনয়ের জন্য পুরস্কার পেতেন। আজ মনে পড়ছে, শেষবার নায়িকার বাবার চরিত্রে অভিনয় করে পুরস্কার পেয়েছিলেন। আব্বার অভিনয় দেখে সব নারী শিশু দর্শকের চোখে পানি এসেছিল। পরদিন স্কুলে গিয়ে সব বান্ধবীর কাছে আব্বার অভিনয়ের প্রশংসা শুনে গর্বে বুকটা ভরে উঠেছিল।

আমরা ভাইবোনরা আব্বাকে ভয় পেলেও তিনি আমাদের খুব আদর করতেন। একদিন আম্মা বললেন, তোমার আব্বাকে পানি ঢেলে দাও। খাওয়া শেষে আমি গøাসে পানি দিচ্ছি তো দিচ্ছি… এক সময় খেয়াল করলাম জগের সব পানি শেষ। চারপাশে পানি আর পানি, আব্বার শরীরও ভিজে গেছে। আমি ভয়ে একাকার- এই বুঝি আব্বা বকা দেবেন। কাঁপছি দেখে আব্বা হেসে বললেন, তুমিতো ঠিকমতো গøাসে পানি ঢালতে পারো না তাই আমি তোমাকে পানি ঢালার সুযোগ দিলাম। যাতে জগের সব পানি শেষ করে হলেও তুমি সেটা শিখতে পারো।

মাঠের কথায় আবার যাই। একদিন আমি ইচ্ছে করেই বড় মাঠে বড় মেয়েদের সঙ্গে খেলতে গেলাম। বলা যায়, প্রায় জোর করেই খেলছি। ইরা আপা আমাদের অনেক সিনিয়র ছিলেন। তিনি রেগে আমাকে ৫০০ বার দড়ি লাফ করতে বললেন। আমিও জেদ ধরে লাফিয়ে যাচ্ছি। একসময় দেখি আমার চারপাশে সবাই ঘিরে ধরে আছে আর আমি আব্বা বুকে মাথা রেখে আছি। কেউ বলছে, মোশারফ ভাই মেয়ের মাথায় আরো পানি দেন। কেউ বলছে, আঙ্কেল আপনি ভিজে গেলেন তো। আমি আস্তে আস্তে বুঝতে পারলাম আমার চুল ভেজা। মাথায় পানি দেয়া হয়েছে। আব্বারও পুরো শরীর ভিজে গেছে।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj