ঘৃণা

শনিবার, ২২ জুন ২০১৯

জোবায়ের রাজু

প্লেট ভাঙার অপরাধে মা আমার পিঠে এলোপাতাড়ি কয়েকটা কিল বসিয়ে দিলেন। এই নিয়ে মায়ের সঙ্গে আব্বার সে কি ঝগড়া। আব্বার ভাষ্য- ‘এতটুকু ছেলের হাত থেকে প্লেট পড়ে ভাঙতেই পারে। তাই বলে মারতে হবে!’ আব্বার এই এক ধরনের ঝগড়ায় মা তর্ক না করে সংসারের কাজে নিরিবিলি মনোযোগ দিলেন। আব্বা আমার পাশে এসে বসে আদুরে গলায় বললেন ‘মন খারাপ করিসনে বাপ।’ বলেই আমাকে জড়িয়ে ধরে গালে চুমু খেলেন।

আব্বার এই চুমু খাওয়াটায় আজকাল আমার রাগ হয়। আমার কী এখন চুমু খাওয়ার বয়স আছে! আমি বড় হচ্ছি না! তার কাছে এমন অভিযোগ তুলতেই বললেন ‘তাই নাকি! আমার বাপ বড় হইছে? দাঁত নড়ে? হা হা হা।’ আব্বার উন্মাদ হাসি যেন আকাশে বাতাসে ছড়িয়ে গেল। ‘শোনো বাপ, সন্তান পিতার কাছে কখনো বড় হয় না। ছোট-ই থাকে।’ আব্বার এমন ধারণা সম্পূর্ণ ভুল বলে দৃঢ় কণ্ঠে বললাম ‘না আমি বড় হচ্ছি। আমার শার্টগুলো এখন আর আমার গায়ে লাগে না।’

সন্ধ্যায় আব্বা কতগুলো শার্ট নিয়ে আমার সামনে হাজির। বললেন ‘সব আমার বাপের জন্যে।’ একসঙ্গে এতগুলো শার্ট পেয়ে আমার আনন্দ আকাশে বাতাসে। নীল রংয়ের যে শার্টটি আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে, সেটা গায়ে দিয়ে আব্বার সামনে আসতেই তিনি আমাকে আবার একটি চুমু খেলেন।

রাতে আব্বার সঙ্গে মায়ের নিচু গলার আলাপ আমার কানে আসে। মা নিচু গলায় বললেন ‘এসব ছাড়ো এবার। ছেলে বড় হচ্ছে। সমাজে মুখ দেখাতে হবে।’ আব্বা মরা গলায় বললেন ‘কি করব বউ, সবাই আমার কুকীর্তির কথা জানে। কেউ কাজ দেয় না। নিরুপায় হয়ে এই কাজ করি।’

সেই শিশু বয়সে একদিন জেনে গেলাম আমার আব্বা একজন চোর। অভাব তাকে চোর বানিয়েছে। গ্রামবাসী তাকে চোর হিসেবে চেনে। আব্বা চোর, তার এই কলঙ্কিত পরিচয় আমাকে দিন দিন আঘাত করতে থাকে। মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় রসুইঘর থেকে বঁটি এনে তাকে কুপিয়ে মারি। বলতে ইচ্ছে করে ‘আপনি খারাপ মানুষ। আপনার জন্যে মাকে সবাই আড়াল থেকে চোরের বউ ডাকে।’

না, কিছুই বলতে পারি না একবারো। অথচ রোজদিন তিনি নিজেকে উজাড় করে আমাকে পিতৃ¯েœহ ঢেলে দেন। সেই ¯েœহ আমার কাছে এখন বিষের মতো লাগে।

সে বার সাঁতার শিখতে গিয়ে অল্পের জন্যে বেঁচে গেলাম। আমি পানিতে ক্রমশ তলিয়ে যেতে যেতে বেঁচে যাই। অজ্ঞান আমাকে পানি থেকে তুলে আনা হলো। আব্বা আমাকে কোলে করে এক দৌড়ে নিয়ে গেলেন ডাক্তারের কাছে। জ্ঞান ফেরার পর দেখি আমার চারপাশে পাড়ার সমস্ত ছেলে-বুড়োর পাশে বসে আব্বা অঝোরে কাঁদছেন। আমি বেঁচে আছি, এই আনন্দে আব্বা ছুটে এসে আমাকে অঘোরে চুমু খেতে লাগলেন।

ফাইভের বার্ষিক পরীক্ষায় সর্বোচ্চ নাম্বার নিয়ে আমি পাস করি। সত্যবাবু স্যার মাইকে আমার নাম ঘোষণা করলেন। পাসের খবর নিয়ে প্রাইমারির আঙিনা থেকে ফেরার পথে দেখি আব্বা স্কুলের পাশে দাঁড়িয়ে। তার পরনে ময়লাচ্ছন্ন লুঙ্গি। তার ছেলে পরীক্ষায় প্রথম হয়েছে, এই আনন্দে তার চোখ মুখ চকচক করছে। ছুটে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে কয়েকটা চুমু খেয়ে গাঢ় কণ্ঠে বললেন ‘আমার ছেলে প্রথম হবে না তো কে হবে! আজ দু কেজি মিষ্টি কিনব।’ আব্বার কথা শুনে আমি মনে মনে আন্দোলিত হই। ইচ্ছে হলো একবার বলি ‘চুরির টাকার মিষ্টি আমি খাবো না আব্বা।’

২.

সাত সকালে পালপাড়ার মামুন চৌধুরী আমাদের বাড়িতে এলেন। সঙ্গে একদল পুলিশ। পুলিশ আব্বার হাতে হাতকড়া পরালো। মা চাপাস্বরে কাঁদছেন। তার স্বামীটি গত তিনদিন আগে মামুন চৌধুরীর ঘরে চুরি করেছেন। আজ মামুন চৌধুরী পুলিশ নিয়ে চোরের বাড়ি হাজির।

হাতকড়া পরানো আব্বাকে কিছুক্ষণ পর পুলিশ হাজতে নিয়ে যাবেন। তারপর সেখানে তাকে বেদম পেটানো হবে। ডালিম তলায় দাঁড়ানো আমাকে আব্বা কাছে ডাকছেন। ঘৃণা আর লজ্জায় আমি তার কাছে যেতে পারছি না।

শেষে পুলিশই আব্বাকে আমার কাছে নিয়ে এল। খুব কাতর গলায় আব্বা বললেন ‘এই চোর বাবাকে ক্ষমা করিস। বাবাকে খুব ঘৃণা হয়, নারে বাপ! হা হা হা।’ আব্বা হাসছেন, কিন্তু সে হাসিতে যন্ত্রণা ঝরে পড়ছে। কতদিনের লালিত যন্ত্রণা। হয়তো তার বুকটাও ব্যথায় তখন চিনচিন করেছিল।

আব্বাকে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ। পুলিশের গাড়ির কাছে যেতেই আব্বা আবার আমার দিকে ফিরে তাকালেন। ইশারায় কাছে ডাকলেন। আমি কাছে যেতেই আব্বা আমাকে জড়িয়ে ধরে ব্যাকুল হয়ে চুমু খেতে লাগলেন। তার চোখের নোনাজলে আমার মুখ ভিজে গেল। মা ঘর ছেড়ে বারান্দায় এসে আকুল হয়ে কাঁদছেন।

:: আমিশাপাড়া, নোয়াখালী।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj