কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম : ডা. মনিরুজ্জামান খান

শুক্রবার, ২১ জুন ২০১৯

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির উন্নতি, উৎকর্ষতা সাধনের ফলে কম্পিউটার, টেলিভিশন, মোবাইল ফোন, ট্যাবলেট পিসি, ই-বুক রিডার, ট্যাবসহ নানান ধরনের প্রযুক্তি পণ্য যেমন সহজলভ্য হয়েছে তেমনিভাবে মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে।

এসব পণ্যের ব্যবহার আমাদের জীবনকে করেছে আরো সহজ, স্বাচ্ছন্দ্যময় এবং গতিশীল। এসব আকর্ষণীয় যন্ত্রগুলো আমাদের মনোযোগ কেড়ে নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মগ্ন রাখতে সক্ষম। তবে এসব যন্ত্রের ব্যবহারে স্বাস্থ্যবিধি সঠিকভাবে অনুসরণ না করলে ব্যবহারকারী সম্মুুখীন হতে পারেন শারীরিক সমস্যা এবং দীর্ঘমেয়াদি কষ্টের। যেমন- নিয়মিতভাবে দীর্ঘ সময় মনিটরের বর্ণিল উজ্জ্বল আলোর দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব পড়ে, ব্যবহারের সময় ব্যবহারকারীর বসার স্থান এবং ধরন স্বাস্থ্যকর না হলে ঘাড়, কাঁধ ও কোমরে অসহনীয় ব্যথা হতে পারে।

অনেকেই কোলে ল্যাপটপ, ট্যাবলেট পিসি, ট্যাব, ই-বুক রিডার নিয়ে দীর্ঘ সময় মাথা নিচু করে ব্যবহারে অভ্যস্থ কিন্তু এভাবে ব্যবহারের ফলে মেরুদণ্ডের উপরের দিকের হাড়ের সন্ধিস্থল, ঘাড়ের মাংস পেশিতে চাপ পড়ে মাংস পেশি, স্নায়ু, লিগামেন্ট ও সুষুম্মা ডিস্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এরূপ ঘটনা কোমরের ক্ষেত্রেও ঘটতে পারে।

এভাবে দীর্ঘসময় কাজ করতে গিয়ে দেখা দিতে পারে কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম।

কম্পিউটার ভিশন সিনড্রোম অর্থাৎ মাথাব্যথা, চোখব্যথা, লাল হয়ে যাওয়া, চোখে জ্বালাপোড়া করা, জল পড়া, চোখে ঝাপসা দেখা বা মাঝে মাঝে একটি বস্তুকে দুটি দেখা, চোখের ক্লান্তি বোধ করা এবং ঘাড়ে, কাঁধে ব্যথা ইত্যাদি উপসর্গ।

চোখে কেন এমন সমস্যার সৃষ্টি হয়?

ইলেকট্রনিক্স যন্ত্রের মনিটরের অক্ষরগুলো ছাপার অক্ষরের মতো নয়। খেয়াল করবেন, ছাপার অক্ষরগুলোর মধ্যভাগ ও পার্শ্বের ঘনত্ব একই রকম ফলে, এগুলো দেখার জন্য সহজেই চোখের ফোকাস করা যায়। অপরদিকে মনিটরের অক্ষরগুলোর মধ্যভাগ ভালো দেখা যায় কিন্তু পার্শ্ব ভাগের ঘনত্ব কম হওয়ায় চোখে পরিষ্কার ফোকাস হয় না। মনিটরের একই অক্ষরগুলোর মধ্যে অসম ফোকাসের জন্য চোখের একোমোডেশন রিফ্লেক্স বা প্রক্রিয়া সঠিকভাবে কাজ করতে পারে না তখন, চোখের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে। এ ছাড়াও মনিটরের দ্রুত পরিবর্তন হওয়া বর্ণিল উজ্জ্বল আলোর প্রভাব তো রয়েছেই।

এ শতাব্দীর মানুষ দুই জগতে বাস করছে। ভার্চুয়াল জগতে আমাদের বিচরণ ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলছে। ফেসবুক, টুইটারসহ সব সামাজিক সাইটগুলো, যোগাযোগের মাধ্যম, অফিস-আদালত, শিক্ষা-চিকিৎসা, হিসাব-নিকাশ, অর্থনীতি সবকিছুতেই ডিজিটাল প্রযুক্তির আলো ছড়িয়েছে সমানতালে। প্রতিনিয়ত যুক্ত হচ্ছে নতুন নতুন কম্পিউটারনির্ভর প্রযুক্তি।

১৪৮,৯৪০,০০০ বর্গকি.মি. আয়তনের পৃথিবী আজ গ্লোবাল ভিলেজ অর্থাৎ একটি গ্রামে পরিণত হয়েছে। আধুনিক সব প্রযুক্তিযন্ত্রের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। কিন্তু কর্মে দক্ষতার জন্যই শারীরিক সুস্থতা বজায় রাখা জরুরি। এ ধরনের সমস্যা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য স্বাস্থ্য সচেতন হতে হবে।

কাজ করার সময় সচেতনভাবে খেয়াল করুন নিজের অবস্থান।

:: শারীরিক অবস্থান ঠিক রেখে কাজ করছেন কিনা?

:: আপনার পিঠ কি বাঁকা হয়ে আছে?

:: কাঁধ দুটো কি কুঁজো হয়ে আছে?

:: মাথা কি দীর্ঘ সময় নিচু করে রেখেছেন?

:: চিবুক সামনের দিকে অথবা মাথাটা কি এক কাঁধের দিকে হেলে রয়েছে?

:: পা দুটো কি আড়াআড়ি রয়েছে?

:: নিতম্ববের এক পাশ কি উঁচুতে রয়েছে অনেকক্ষণ ধরে?

:: আপনি কি একনাগাড়ে অনেকক্ষণ বসে আছেন?

:: আপনি কি অপলক মনিটরের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন?

যদি প্রথম প্রশ্নের উত্তর-না এবং বাকিগুলোর উত্তর হ্যাঁ হয়। তাহলে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন; অনাকাক্সিক্ষত শারীরিক সমস্যাগুলো এড়ানো যাবে।

কি কি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলবেন?

১. আরামদায়ক এমন চেয়ারে বসুন যাতে কোমরের নিচের অংশে স্বস্তি হয়। প্রয়োজনে পিছনে ছোট বালিশ রাখুন।

২. মেরুদণ্ড সোজা রেখে বসুন।

৩. বাঁকা বা কুজো হয়ে সামনের দিকে ঝুঁকে বসবেন না।

৪. কাঁধ দুটো শিথিল এবং কনুই দুটো শরীরের কাছাকাছি রেখে বসুন।

৫. দুই হাত, কবজি, পুরো বাহু ও দুই উরু মেঝে বা ফ্লোরের সমান্তরালে রাখুন।

৬. রুমে আলোর ব্যবস্থা করতে হবে স্বাস্থ্যসম্মতভাবে।

৭. মনিটরের কনট্রাস্ট যথাসম্ভব কম করে রাখুন। কম্পিউটার মনিটরে অ্যান্টি-গেøয়ার স্ক্রিন লাগিয়ে নিতে পারেন অথবা ব্যবহারের সময় অ্যান্টি রিফ্লেকটিভ চশমা ব্যবহার করতে পারেন।

৮. কম্পিউটারে অক্ষরের ফ্রন্টের আকার সঠিকভাবে সেট করে নিন।

৯. একদৃষ্টে অনেকক্ষণ মনিটরের দিকে তাকিয়ে থাকবেন না। মাঝে মাঝে পলক ফেলুন।

১০. চোখে ব্যথা অনুভব করলেই চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নিন বা চোখে-মুখে দিন জলের ঝাপটা।

১১. চোখ শুষ্ক ও কাটা কাটা অনুভবে বেশি অসুবিধা হলে ডাক্তারের পরামর্শ গ্রহণপূর্বক চোখে দিনে দুই-তিন বার আর্টিফিসিয়াল টিয়ার ড্রপ ব্যবহার করতে পারেন। এতে চোখের আর্দ্রতা বজায় থাকে।

১২. একটা নির্দিষ্ট সময় পর পর চোখের ব্যয়াম করুন :

চোখ যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে বা চোখে ঝাপসা দেখতে শুরু করেন, তখন চোখের নমনীয়তার জন্য কিছু ব্যায়াম করা প্রয়োজন।

চোখকে উপরে নিচে এবং ডান পাশ থেকে বাম পাশে ঘোরান। এরপর ধীরে ধীরে ‘৪’ এর মতো করে চোখ ঘোরান। চোখের পেশি গুলে শিথিল করতে চোখের চারপাশ হালকাভাবে ম্যাসাজ করুন আলতোভাবে।

চোখকে নমনীয় করার জন্য আরো ব্যায়াম করতে পারেন অফিসে বা বাসায় রুমের মধ্যেও। বুড়ো আঙুলকে চোখের সামনে ধরুন এবং আঙুলের দিকে দৃষ্টি দিন। এরপর চোখের দৃষ্টি সরিয়ে অন্তত ২০ কদম দূরে আছে এমন কোনো বস্তুর দিকে তাকান। একসঙ্গে কাছের এবং দূরের বস্তুর দিকে তাকানো চোখকে শক্তিশালী করে। আপনার চোখ ক্লান্ত থাকলেও এটা শিথিল করতে সাহায্য করবে। এই ব্যায়াম ধীরে ধীরে অভ্যাসে পরিণত করলে চোখের ঝাপসাভাব অনুভূতিও দূর হবে।

১৩. কাজে বিরতি দিন এবং স্বাচ্ছন্দ্য আনয়ন করুন :

দীর্ঘ সময় ধরে কম্পিউটারের দিকে তাকিয়ে থাকা খারাপ। তাই কাজের ফাঁকে বিরতি দেয়া প্রয়োজন। অন্তত প্রতি ঘণ্টায় চোখের বিরতির জন্য অফিসের ডেস্ক থেকে উঠে একটু হেঁটে আসুন। শারীরিক অবস্থানের এই পরিবর্তন অত্যন্ত জরুরি, ফলপ্রসূ ও আরামদায়ক।

১৪. রোদ দেখুন এবং প্রকৃতির সান্নিধ্যে আসুন:

অফিস রুমের বাইরে; বারান্দায় সূর্যের আলোর কাছে আসুন। তবে প্রখর রোদে নয় সহনীয় মৃদু আলোর কাছে যান। এ সময় চোখ বন্ধ করুন এবং ধীরে ধীরে মাথা এক পাশ থেকে আরেক পাশে ঘোরান। চোখমুখ মেলে ধরুন রোদের আলোতে। এটা চোখকে শিথিল করতে সাহায্য করবে।

১৫. অনেকের চোখে দৃষ্টির ত্রুটি এবং অন্যান্য সমস্যা থাকতে পারে। তারা চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করে চিকিৎসা গ্রহণপূর্বক বিশেষ পরামর্শ মতে চলবেন।

আমাদের ডিজিটাল জীবন হোক ডিসিপ্লিন (নিয়মানুগ অভ্যাস) এবং ডেকোরেটেড (সুশোভিত)। আমরা প্রযুক্তির সুফল যেমন ভোগ করব তেমনি নিজের শরীরিক সুস্থতার ব্যাপারেও সচেতন হবো।

মেডিকেল অফিসার (এডি)

বাংলাদেশ ব্যাংক মেডিকেল সেন্টার

(সেন্ট্রাল ব্যাংক অফ বাংলাদেশ)

মতিঝিল, ঢাকা।

পরামর্শ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj