জেন্ডার বাজেট ২০১৯-২০ প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

সোমবার, ১৭ জুন ২০১৯

‘জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট’ এই ধারণা বাংলাদেশের জন্য এখন আর নতুন নয়। সম্প্রতি সংসদে প্রস্তাবিত হয়েছে জেন্ডার সংবেদনশীল ১১তম বাজেট। তবে এই বাজেটের বাস্তব অগ্রগতি নিয়ে বিভিন্ন মহলে রয়েছে প্রশ্ন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেটের মূল দর্শন একটি দেশের নারীর ক্ষমতায়ন পূর্ণাঙ্গরূপে নিশ্চিত করা। সরকারের আয় ও ব্যয়ের নীতির প্রভাব জেন্ডারের ওপর কতটুকু পড়ে তার বিস্তারিত বিশ্লেষণ থাকে এই বাজেটে। তবে নজরদারির অভাবে বাজেট বরাদ্দের কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছে, নারীর জীবনে কোন কোন ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে, তার কোনো তথ্য নেই। যা এই বাজেট বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও বড় প্রতিবন্ধকতা বলে মনে করেন তারা। প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট সম্পর্কে বিশিষ্ট নারীদের ভাবনা

নিয়ে এবারের অন্যপক্ষের আয়োজন। প্রতিবেদক : সেবিকা দেবনাথ

সরকার দেশে জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট প্রথম ঘোষণা করেন ২০০৯-১০ অর্থবছরে। ওই অর্থবছরে ৪টি মন্ত্রণালয়ের জন্য জেন্ডার বাজেট প্রস্তাব করা হয়। সে সময় বরাদ্দ ছিল ২৭ হাজার ২৪৮ কোটি টাকা। আর ১৩ জুন সংসদে উত্থাপিত ১১তম জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেটে ২০১৯-২০ অর্থবছরে এই ক্ষেত্রে বরাদ্দ করা হয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ২৪৭ কোটি টাকা। যা গত অর্থবছরের তুলনায় ২৩ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা বেশি। এবং মোট বাজেটের ৩০ দশমিক ৮২ শতাংশ এবং জিডিপির ৫ দশমিক ৫৬ শতাংশ। ৪৩টি মন্ত্রণালয়/বিভাগের জন্য এই জেন্ডার বাজেট উপস্থাপন করেন তিনি। এর মধ্যে ২৭টি মন্ত্রণালয় ও ১৬টি বিভাগকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

বিগত বছরগুলোর বাজেট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১০-১১ অর্থবছরে জেন্ডার বাজেটে ১০টি মন্ত্রণালয়ের জন্য ৩৪ হাজার ২২১ কোটি টাকা, ২০১১-১২ অর্থবছরে ২০টি মন্ত্রণালয়ে ৪২ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা এবং ২০১২-১৩ অর্থবছরে ২৫টি মন্ত্রণালয়ে ৫৪ হাজার ৩০২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৪০টি মন্ত্রণালয়কে অন্তর্ভুক্ত করে জেন্ডার বাজেটে বরাদ্দ ধরা হয়েছিল ৫৯ হাজার ৭৫৬ কোটি টাকা। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এই বরাদ্দ ছিল ৬৪ হাজার ৮৭ কোটি টাকা। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ছিল ৭১ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৯২ হাজার ৭৬৫ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১ লাখ ১২ হাজার ১৯ কোটি টাকা। ২০১৭-১৮ অর্থবছর থেকে ৪৩টি মন্ত্রণালয়/বিভাগে জেন্ডার বাজেট ঘোষণা করা হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে বাজেট বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৭ হাজার ৭৪২ কোটি টাকায়।

টাকার অঙ্ক বাড়লেও গতানুগতিক বাজেট

মালেকা বানু

সাধারণ সম্পাদক

বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ

গতবারের চেয়ে এবারের জেন্ডার বাজেটে টাকার অঙ্ক বেড়েছে। তবে আমার কাছে এবারের জেন্ডার বাজেট গতানুগতিকই মনে হয়েছে। বরাদ্দকৃত অর্থ কোনো কোনো খাতে কী পরিমাণ খরচ হবে তা হয়তো সরকারের পরিকল্পনায় আছে কিন্তু বাজেট বক্তৃতায় তার উল্লেখ ছিল না। বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়েছে, নারী প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতা দূর করতে আইনগত সংস্কার করা হবে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক একটি দিক। সিডও সনদের বৈষম্যমূলক একটি ধারায় এখনো সংরক্ষণ রাখা হয়েছে। পারিবারিক আইনেও বৈষম্য রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সব ধরনের বৈষম্যমূলক আইন বিলোপের ঘোষণা আমাদের আশান্বিত করে। এখন দেখার বিষয় এটি কেবলই বলার জন্য বলা কিনা।

এ ছাড়া বরাদ্দকৃত অর্থ নারীর জীবনে কিভাবে প্রভাব ফেলছে, কোথায় কোথায় দুর্বলতা আছে সেই বিষয়টি দেখা প্রয়োজন। অর্থাৎ এই ক্ষেত্রে কতটুকু লক্ষ্য অর্জন করতে পেরেছি তা জানা জরুরি। কারণ বাজেটে শুধু সংখ্যাগত নয়, গুণগত পরিবর্তনের দিকে দৃষ্টি দেয়া দরকার।

জেন্ডার বাজেট বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে তথ্য নেই

ড. নাজনীন আহমেদ

সিনিয়র রিসার্চ ফেলো

বিআইডিএস

নারীদের সন্তুষ্ট করা বা দিতে হবে দিলাম জেন্ডার বাজেট কিন্তু তেমনটি নয়। জেন্ডার বাজেট যে কারণে দাবি করা হয়েছিল তা হলো- যেহেতু নারীরা বিভিন্ন ক্ষেত্রে পুরুষের তুলনায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার শিকার হয় তাই সেই প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করে নারীর প্রতি বৈষম্য দূর করা। জেন্ডার বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থ নারী কতটুকু পাচ্ছে কিংবা কোনো গোষ্ঠী কতটা পাচ্ছে তা বোঝার জন্য ভালো একটা সিস্টেম আমাদের দেশে তৈরি হয়েছে। এটি সত্যিই ইতিবাচক দিক।

নারী-পুরুষ অসমতার কারণে জেন্ডার বাজেটের প্রয়োজন হয়েছে। শতকরা ৫০ ভাগ জেন্ডার বাজেটে বরাদ্দ রাখলেই যে তা ফলপ্রসূ হবে তা নয়। আমরা বারবার বলে আসছি, বরাদ্দ দেয়ার পাশাপাশি বিগত বছরে এ ক্ষেত্রে কী কী অর্জন আছে সেইগুলো তুলে ধারার। কিন্তু সেটি হচ্ছে না। অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় ছোট করে বলেছেন, নারীর উন্নয়ন ও নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে সরকার দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। সেই জায়গায় আমি মনে করি সহিংসতার শিকার এবং দুঃস্থ নারীকে সহায়তার পাশাপাশি নারীর দক্ষতা বৃদ্ধি যা নারীকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার জন্য দরকার সেই বিষয়ে জোর দেয়া দরকার।

বরাদ্দকৃত বাজেট কতটা সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে তা দেখা দরকার

শাহনাজ সুমি

উপপরিচালক

বাংলাদেশ নারী প্রগতি সংঘ

জেন্ডার সংবেদনশীলতা নিশ্চিত করতেই বাজেটে জেন্ডার বাজেটের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এই উদ্যোগ যখন নেয়া হয়েছিল আমরা তখন স্বাগত জানিয়েছিলাম। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় জেন্ডার বাজেটে যা বলা হয়েছে তা একেবারেই গতানুগতিক। নারী আন্দোলনের পক্ষে থেকে আমাদের যা দাবি ছিল বিশেষ করে নারীর নিরাপত্তার বিষয়টি তা সেখানে প্রতিফলিত হয়নি। তবে সরকারি সেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে নারীর সুযোগ বৃদ্ধি, নারী উদ্যোক্তাদের ব্যবসা পরিচালনার জন্য দোকান/স্পেস ভাড়ার ক্ষেত্রে যে ভ্যাট দিতে হতো তা প্রত্যাহার, সামাজিক সুরক্ষার আওতায় বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতা বৃদ্ধির বিষয়টি অবশ্যই ইতিবাচক। তবে এখন সময় এসেছে বরাদ্দকৃত বাজেট কতটা সফলভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য কিছুই নেই বাজেটে

আশরাফুন নাহার মিষ্টি

নির্বাহী পরিচালক

ওমেন উইথ ডিসাবেল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন

বাজেটে নতুনত্ব কিছু পাইনি। প্রস্তাবিত বাজেটে যে ‘জেন্ডার বাজেট’ ঘোষণা করা হয়েছে সেখানে প্রতিবন্ধী নারীদের জন্য কিছুই নেই। আমরা নারীদের উন্নয়নে সরকারের আরো নতুন উদ্যোগ আশা করেছিলাম। সরকার সামাজিক সুরক্ষা খাতে ল্যাকটেটিং মাদার, বিধবা ভাতা, বয়স্ক ভাতাভোগীদের সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু এর সুফল প্রতিবন্ধীরা কতটুকু পাবে? প্রতিবন্ধীদের জন্যও ভাতা দিচ্ছে সরকার। কিন্তু সেই ভাতার সুবিধা প্রতিবন্ধী নারীরা পাচ্ছেন না। পুরুষ প্রতিবন্ধীরাই বেশি পাচ্ছেন। আমার ক্ষুদ্র নারী উদ্যোক্তা তৈরি, কৃষি, গৃহশ্রমিকসহ বিভিন্ন অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতকে গুরুত্ব দেয়ার দাবি করেছিলাম। কিন্তু এর প্রতিফলন পাইনি। বাজেটে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সংখ্যা ১৫ লাখ উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের সবাইকে ভাতার আওতায় আনা হবে বলে জানানো হয়েছে। এই ১৫ লাখের মধ্যে সবাই ভাতার সুবিধা নেবো না। এগুলো চিহ্নিত না করে কাজ করলে ভুক্তভোগীরা উপকৃত হবে না।

আদিবাসী নারীদের জন্য আলাদা বরাদ্দ নেই

চঞ্চনা চাকমা

সাবেক সভাপতি

হিল উইমেন্স ফেডারেশন

বাংলাদেশের অব্যাহত উন্নতি ও প্রবৃদ্ধিতে ধারাবাহিকতা বজায় রাখার যে প্রক্রিয়া সেখানে বাজেটের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের উন্নতির ধারাবাহিকতা থাকলেও সেখানে বৈষম্য কমছে না। বরং বাড়ছে। নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বৈষম্যের শিকার।

অন্য নারীর তুলনায় আদিবাসী নারীরা এখনো অনেক পিছিয়ে আছে। তাই আমার দীর্ঘদিন ধরে বাজেটে আদিবাসী নারীদের জন্য আলাদা বরাদ্দের দাবি করে আসছি। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে এর কোনো প্রতিফলন হয়নি। বাজেটে সবার জন্য অগ্রগতি হলেও আদিবাসী নারীদের উন্নয়নে কোনো ভূমিকা রাখবে বলে আমি মনে করছি না।

অন্যপক্ষ'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj