চিকিৎসকদের আন্দোলন : পশ্চিমবঙ্গে হাসপাতালে অচলাবস্থা

শনিবার, ১৫ জুন ২০১৯

কাগজ ডেস্ক : ভারতের পশ্চিমবঙ্গে চলমান জুনিয়র চিকিৎসকদের আন্দোলনের ফলে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসা ব্যবস্থায় অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। এরই মাঝে আন্দোলনের ঢেউ আছড়ে পড়তে শুরু করেছে বেসরকারি নার্সিং হোম ও ক্লিনিকগুলোতে। গত সোমবার কলকাতার নীলরতন সরকারি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (এনআরএস) এক রোগীর মৃত্যু ও তার জেরে মৃতের আত্মীয়স্বজনের হাতে চিকিৎসককে মারধরের ঘটনায় এ আন্দোলনের সূত্রপাত হয়।

জানা যায়, ওই দিন মারধরের ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে নার্সিং হোমে ভর্তি হতে হয় এনআরএস হাসপাতালের জুনিয়র চিকিৎসক পরিবহ মুখোপাধ্যায়কে। পরে তারই প্রতিবাদে এনআরএস হাসপাতালের জুনিয়র ডাক্তাররা চিকিৎসা পরিসেবা বন্ধ করে অবস্থান বিক্ষোভে বসেন। পরবর্তী সময়ে ওই ঘটনায় সংহতি প্রকাশ করে রাজ্যজুড়ে সব সরকারি মেডিকেল কলেজের জুনিয়র চিকিৎসকরা ৪৮ ঘণ্টার জন্য চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে দেন।

আন্দোলনের ফলে চূড়ান্ত ভোগান্তিতে পড়েন রোগীরা। তিন দিন ধরে কোনোরকম চিকিৎসাসেবা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন তারা। বুধবার বন্ধ রাখা হয় রাজ্যের সব সরকারি হাসপাতালের বহির্বিভাগের সেবা। ভেঙে পড়ে জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থাও। ফলে গোটা রাজ্যে কয়েকজন রোগীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে।

এদিকে ওই অচলাবস্থা কাটাতে আন্দোলনরত জুনিয়র চিকিৎসকদের কাছে আবেদন করে রাজ্য সরকার। স্বাস্থ্য দপ্তরের এক বিবৃতিতে বলা হয়, জনস্বাস্থ্য জরুরি পরিসেবা। জুনিয়র ডাক্তারদের কর্মবিরতি আন্দোলনের জেরে পরিসেবা পাচ্ছেন না রোগীরা। হয়রানির শিকার হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এটা কোনোভাবেই কাম্য নয়।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়, জুনিয়র ডাক্তারকে মারধরের ওই ঘটনায় সব রকম প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। পুলিস এ ব্যাপারে পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে এবং জামিন আবেদন খারিজ করে তাদের পুলিশ হেফাজতে পাঠিয়েছেন আদালত। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টির ওপর নজর রাখছেন। এ ছাড়া আহত পরিবহ মুখোপাধ্যায়ের চিকিৎসার সব খরচ রাজ্য সরকার বহন করবে বলে জানানো হয়। অন্যদিকে বিবৃতির প্রতিক্রিয়ায় জুনিয়র ডাক্তারদের জন্য যথাযথ নিরাপত্তার ব্যবস্থা গ্রহণে রাজ্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান আন্দোলনকারীরা। সরকার এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার হুমকি দেন তারা। পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল কেশরিনাথ ত্রিপাঠী জুনিয়র ডাক্তারদের কর্মবিরতি তুলে নেয়ার আবেদন জানালেও কোনো কাজ হয়নি। এদিকে বৃহস্পতিবার মুখ্যমন্ত্রীর এক বক্তব্যের জেরে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে পড়েছে। গতকাল কলকাতার এসএসকেএম হাসপাতালে গিয়ে চলমান আন্দোলনকারীদের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে মমতা বলেন, এরা ডাক্তার! কী ভেবেছে ওরা? অনেকে নাটক করছে। যারা নাটক করছে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। কাদের বুদ্ধিতে কাজ করছে ওরা? ডাক্তারিতে হিন্দু-মুসলমান হয় না। এতদিন ধরে কিসের বিক্ষোভ চলছে। যারা এসব করছেন পলিটিক্যালি খেলছেন। চিকিৎসায় রাজনীতি বরদাশত নয়। কাদের ভোট দিয়েছেন ভাবুন! কাদের বুদ্ধিতে এসব চলছে, সবাই বুঝতে পারছে। এগুলো মেনে নেব না।

যারা আন্দোলন করছে তারা বহিরাগত দাবি করে মমতা আরো বলেন, অবিলম্বে কাজে যোগ দিতে হবে চিকিৎসকদের। আজকের মধ্যে যারা কাজে যোগ দেবে না, সরকার তাদের দায়িত্ব নেবে না। চার ঘণ্টা সময়সীমা বেঁধে দেয়া হলো। এর মধ্যে কাজে যোগ না দিলে এসেনসিয়াল সার্ভিস মেইনটেন্যান্স অ্যাক্ট (এসমা) জারি করব।

হাসপাতালের ভেতরে মুখ্যমন্ত্রী যখন এ বক্তব্য দিচ্ছিলেন, তখন বাইরে বিক্ষোভে ফেটে পড়েন জুনিয়র ডাক্তাররা। ‘আমরা বিচার চাই’ বলে ¯েøাগান তুলতে থাকেন তারা। বিক্ষোভ দেখান মুখ্যমন্ত্রীকে ঘিরেও। হাসপাতালে জরুরি এক বৈঠকে বসে জুনিয়র ডাক্তাররা ওই বক্তব্যের জন্য মমতাকে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে বলে দাবি তোলেন।

মমতার বক্তব্যের পর পরই আরো পারদ চড়তে থাকে আন্দোলনে। তার বক্তব্যের প্রতিবাদে পদত্যাগ করেন এনআরএস হাসপাতালের সুপার সৌরভ চট্টোপাধ্যায় ও অধ্যক্ষ শৈবাল মুখোপাধ্যায়। একই কারণে পদত্যাগ করেন রাজ্যের বিভিন্ন হাসপাতালের প্রায় একশর মতো চিকিৎসক। দিল্লির এইমস-এর চিকিৎসকরাও কলকাতার জুনিয়র চিকিৎসকদের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেন। এদিকে মমতার বক্তব্যের সূত্র ধরে রাজনৈতিকভাবে মাঠে নেমেছে বিজেপি। মমতার সমালোচনা করে দলটির নেতা মুকুল রায় বলেন, আহত চিকিৎকদের প্রতি কোনো সহানুভূতি নেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের।

তিনি জুনিয়র চিকিৎসকদের হোস্টেল ছাড়ার যে কথা বলছেন, তা অনৈতিক। তার বক্তব্য স্বৈরাচারী মনোভাবের প্রকাশ। তার পদত্যাগ করা উচিত। তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে ব্যর্থ, স্বাস্থ্যমন্ত্রী হিসেবে ব্যর্থ। পদত্যাগ করা উচিত এই মুহূর্তেই। হিটলারকেও হার মানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী।

দূরের জানালা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj