ক্ষমা করো বাবা

শনিবার, ১৫ জুন ২০১৯

আলাউদ্দিন খোকন

বাবাকে আমরা ‘আপনি’ করে বলতাম। অনেক ভাই-বোন থাকায় ছোট বেলায় বাবার ততটা কাছে কারোই যাওয়া হতো না। আমরা তাকে বাবা ডাকতাম না, আব্বুও না। আব্বা ডাকতাম। যদিও ছোটবেলায় আমি ছিলাম একমাত্র পুত্র সন্তান (পরে আমি যখন এসএসসি দিচ্ছি তখন ছোট ভাইয়ের জন্ম), তাই বাবার কিছুটা স্নেহ-সান্নিধ্য পেলেও প্রচণ্ড ভয় পেতাম।

আমার বাবা ছিলেন রাগী। বদমেজাজিও বটে। আসলে আমাদের লতায়-পাতায় আত্মীয়পরিজন মিলে প্রায় ৪০-৪৫ জন মানুষের জীবিকা নির্বাহের ভার নিয়েছিলেন বাবা। ব্যবসা করতেন। যা আয় করতেন- সব ছেলেমেয়ে আত্মীয়-পরিজন পাড়া-প্রতিবেশীদের দিয়ে খাইয়ে চলতেন। তাই সব সময় সংসার চিন্তায় মাথা গরম থাকতো তার।

আমাদের ছয় ভাই-বোনকে রেখে যখন মা মারা যান, তখন আমি পাঁচ বছরের। আমার মাকে খুবই ভালো বাসতেন বাবা। তাই দ্বিতীয় বিয়ে করতে চাননি। পরিচিত সবার পীড়াপীড়িতে এবং আমার ছোট আরো তিন বোনের মুখ চেয়ে আবার বিয়ে করতে বাধ্য হন তিনি।

আস্তে আস্তে বাবা আমাদের আরো দূরের মানুষ হয়ে যান। এরপর বাবাকে আমরা পাই শাসনের বেলায়ই বেশি। যদিও আমরা জানতাম, বাবা আমাদের অসম্ভব ভালোবাসেন। কিন্তু সংসার জাঁতাকলে পিষ্ট বাবা তা প্রকাশ করতে পারতেন না। আমাদের সৎমা কখনো বেড়াতে গেলে দেখতাম বাবার সেই আদর! বাবা যেনো হাপ ছেড়ে বাঁচতেন।

বাবা চেয়েছিলেন, আমি তার ব্যবসার হাল ধরি। চেষ্টাও করেছিলাম অনেক দিন। কিন্তু আমি যে সংসার-বিবাগী পলাতক এক সন্ন্যাসী। আমার জীবনের নিয়তি যে বাধা অন্য এক কর্মে। আমি তাই তেমন আগ্রহী হতে পারিনি বাবার পেশায়। যদিও অমি ব্যবসায় সংযুক্ত হওয়ার আগেই সৎ মামারা বাবার ব্যবসায় লালবাতি জ্বালিয়ে দিয়েছে।

যাই হোক, আমি বাবার বড় পুত্র সন্তান। আমার ওপরেই বাবার সব আশা-ভরসা। সেই আমি যখন জীবিকার উদ্দেশে চট্টগ্রাম এসে অন্য এক সংগ্রামে অন্য এক অভীক্ষায় নিজেকে জড়িয়ে ফেলি; সংসার বিমুখ জীবনকে পাথেয় করি- বাবা তা মেনে নিতে পারেননি।

আসলে কোনো বাবাই মেনে নিতে পারতেন না।

বাবা আমাকে চিঠির পর চিঠি দিয়ে বাড়ি ফেরাতে চেয়েছেন। শেষে নিজে বারবার চট্টগ্রাম এসে শহর থেকে অনেক দূরের গ্রাম বোয়ালখালী থানার পোপাদিয়ায় গিয়ে আমাকে ফিরিয়ে আনতে চেয়েছেন। আমি আসিনি। কারণ আমি তখন জীবনের অন্য মানে খুঁজে পেয়েছি। আমি তখন বীরাঙ্গনা, একাত্তরের জননী, সাহিত্যিক রমা চৌধুরীর সঙ্গে তার শহীদ পুত্রদের স্মৃতির উদ্দেশ্যে ‘দয়ার কুটির’ নামে অনাথাশ্রম গড়ার কাজে নিবিষ্ট। আমার ফেরা হয় না। বাবা এবং আমার আত্মীয় পরিচিতজনরা এসে ফিরে যান।

এভাবেই ১৯৯৭ সালের আগস্ট মাসের শুরুর দিকে বাবা আমাকে বাড়ি ফিরিয়ে নিতে আসেন। আমার সাধারণ আশ্রম জীবন (যেমন- খড়ের বিছানায় শোয়া, জানালা হীন ভাঙা দরজার ঘরে মাটিতে থাকা, স্বপাক আহার করা, খেতখামার করা, গরু পালন, মাছ ধরা, লাকড়ি কাটা ইত্যাদি ইত্যাদি) দেখে বাবার চোখ ফেটে জল আসে। বাবা আমাকে অনুরোধ করেন- বাড়ি ফিরে যেতে, সংসারের ভার নিতে। আমার যাওয়া হয় না। বাবা দেখেন- আমার ছেঁড়া লুঙি, মলিন বেশভূষা, কষ্টকর কাজকর্ম; আর কষ্ট পান। আমি যাই না বাবার সঙ্গে। বাবাকে শহরে যাবার গাড়িতে তুলে দিয়ে আসি। বাবা আমার হাত ধরে থাকেন। সেই শেষবার আমাদের দেখা। আমি বাবার পায়ে হাত দিয়ে সালাম করি। বলি, বাবা আমি আপনার অক্ষম পুত্র। আমাকে ক্ষমা করে দেবেন! আমি আপনার কথা রাখতে পারলাম না।

এরপর সেই মাসের ২০ তারিখে বাবা আমাকে ফিরিয়ে আনতে আবার পোপাদিয়ায় যান। আমি তখন দিদিকে (রমা চৌধুরী) নিয়ে বই বিক্রির কাজে চট্টগ্রাম শহরে। বাবা আমার সৎমাকেও সঙ্গে নিয়ে যান। আমাদের দেখা হয় না। প্রতিবেশীদের বলে যান আমি যেন ফিরে যাই। সেই খবর কোন প্রতিবেশী আমাদের দেয় না।

বাবা শহরে গিয়ে আমার এই সংসার বিচ্ছিন্নতার শোক আর নিতে পারেন না। অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার হার্ট এটাক হয়। বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। বাবার কথা বন্ধ। মুখে শুধু একটাই শব্দ- খোকন… খোকন! আর ফিরে ফিরে তাকান দরজার দিকে। আমি আসছি কিনা দেখেন। আমি আসি না। আমার কাছে খবর যায় অন্য মারফতে। আমি ভাবি এটা মিথ্যা! আমাকে ফেরাবার জন্য হয়তো সবাই মিথ্যা বলছে। আমি গেলেই দেখবো, সব ঠিক… শুধু আমাকেই আটকে দেবে সবাই!

এইসব ভেবে আমি আর আসি না। বাবা দীর্ঘ ৯ দিন চট্টগ্রামেরই একটি ক্লিনিকে আমার পথ চেয়ে থেকে ৩১ আগস্ট সকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। আর এই দিনটি আমার মায়েরও মৃতুর দিন ছিল।

তবুও আমার আসা হয় না! আমাকে খবর দেয়া হয়। আমি সবকিছুই মিথ্যা মনে করে আসি না। আমি ঝামেলা এড়াতে চট্টগ্রাম থেকে দিদিকে নিয়ে কয়েকদিনের জন্য নোয়াখালী চৌমুহনী রাম ঠাকুরের সমাধি আশ্রমে চলে যাই।

আমার আর ফেরা হয় না। আমার আর জানা হয় না- বাবাকে কীভাবে বাড়িতে নিয়ে গেল। আমার অভাবে আমার ওপর নির্ভরশীল পুরো পরিবার কীভাবে ভেসে গেল!

বাবা, আমার এই কর্মকাণ্ডের কোনো ক্ষমা হয় না জানি। জানি আমি মহাপাতক। তবু আজ এই প্রায় দুই যুগ পর আমি ক্ষমা প্রার্থী। আমি আপনার অযোগ্য সন্তান। আমায় ক্ষমা করুন বাবা।

পাঠক ফোরাম'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj