বাজেটে চমক নেই তবে কিছু বিষয়ের প্রশংসা নিশ্চয়ই হবে

শনিবার, ১৫ জুন ২০১৯


অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জাতীয় সংসদে তার প্রথম বাজেট পেশ করেছেন ১৩ জুন। আগেই তিনি বলছিলেন এবারের বাজেট হবে ‘স্মার্ট বাজেট’। কোন অর্থে এবারের বাজেট স্মার্ট বাজেট তা তিনি খোলাসা করেননি, বাজেট ঘোষণার পর এটা কারো কাছে স্মার্ট বলে মনে হয়েছে কিনা তাও স্পষ্ট নয়। অর্থমন্ত্রী বাজেট পেশ করতে গিয়ে ‘আনলাকি থার্টিন’-এর কবলে পড়েছিলেন বলেই কারো কারো কাছে মনে হয়েছে। অসুস্থতার কারণে অর্থমন্ত্রী সংসদে বাজেট বক্তৃতা পুরোটা পড়তে পারেননি। তার পক্ষ থেকে বাজেট বক্তৃতা পড়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে। অতীতে এমন ঘটনা আর কখনো ঘটেনি। সেদিক থেকে বিষয়টিতে নতুনত্ব আছে বলে মনে করা যেতেই পারে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজেও চোখের সমস্যায় ভুগছেন, বিদেশ থেকে ফিরে একটু জ্বরে আক্রান্ত হয়েছিলেন, তারপরও সংসদে অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা পাঠ করতে তিনি দ্বিধা করেননি। তার মতো আর কেউ যে নেই, তার থেকে ‘ফিট’ যে আর কেউ নয়- সেটা তিনি আবার বোঝালেন, প্রমাণ করলেন।

কেমন বাজেট হয়েছে তা নিয়ে আলোচনা করার যোগ্য ব্যক্তি আমি নই। বাজেট নিয়ে ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ বিষয়বিশেষজ্ঞরা করবেন, করছেন। আমি আদার ব্যাপারী, জাহাজের খোঁজখবরে তাই আমার আগ্রহ নেই। তবে বাজেট নিয়ে দুয়েকটি সাধারণ মন্তব্য করা যেতে পারে। এবারের বাজেটের আকার এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড়। দেশের অর্থনীতি মজবুত ভিতের ওপর দাঁড়ানোর কারণেই বাজেটের আকারও স্ফীত হচ্ছে দিন দিন। এবারের বাজেটে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। এত বড় সংখ্যা মনে রাখা এবং বলাও সাধারণ মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়। এ ছাড়া বাজেটের জটিল হিসাব-নিকাশও সবার বোঝার কথা নয়। সাধারণ মানুষ বাজেট বোঝে, বাজারে জিনিসপত্রের দাম কমবেশি হওয়া থেকে। বাজেট ঘোষণা হলে বাজারে তার তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া হয়। যেসব জিনিসের দাম বাড়ার সেগুলো ঠিকই বাড়ে, কিন্তু কমার কথা যেগুলোর সেগুলো কমে বলে শোনা যায় না। এবারো কি তাই হবে?

বাজেটে আয়-ব্যয়ের একটি বড় ব্যবধান রয়েছে। আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৮১ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা। অর্থাৎ ঘাটতি আছে ১ লাখ ৪১ হাজার ২১২ কোটি টাকা। এই বিপুল পরিমাণ ঘাটতি কীভাবে পূরণ করা হবে সেটাই একটি বড় প্রশ্ন। সরকার হয়তো ব্যাংক থেকে ঋণ নেবে, বিদেশ থেকে অনুদান নেবে, কিন্তু তাতে কি ভালো হবে?

বাজেটের প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় কেউ কেউ বলেছেন, এ বাজেট গতানুগতিক, নতুন কিছু এতে নেই। এখানে কোনো স্বপ্নকল্পের কথাও নেই। সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতও বলেছেন যে, বাজেট বাস্তবায়ন খুবই কঠিন হবে। এটাও নতুন কথা নয়। মুহিত সাহেবের বাজেটও বাস্তবায়ন কঠিন বলেই সমালোচিত হয়েছিল।

বাজেটে ধনীদের ছাড় দিয়ে মধ্যবিত্তের ওপর চাপ বাড়ানোর সমালোচনা অনেকেই করছেন। কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হয়েছে, কিন্তু ব্যাংক খাতের সংকট নিরসনের উপায় বাতলানো হয়নি। শস্যবীমার আশ্বাস থাকলেও কৃষকের ধানের ন্যায়সঙ্গত দাম পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। নতুন অর্থমন্ত্রীর নতুন বাজেটে কিছু নতুন চমক থাকবে বলে যারা আশা করেছিলেন তারা হতাশ হয়েছেন। তবে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী সম্প্রসারণসহ কিছু বিষয়ের প্রশংসা নিশ্চয়ই হবে।

কোনো সরকারের কোনো বাজেটেরই সবাই সমানভাবে প্রশংসা করেন না। তবে ইতোপূর্বে বাজেট ঘোষণার আগেই যেভাবে ‘মানি না, মানবো না’ বলে মিছিল বের হতো এখন সেটা হয় না। সব বাজেটকেই ‘গরিব মারার বাজেট’ বলারও একটা প্রবণতা আছে। এবারো তার ব্যতিক্রম হবে না। বাজেট নিয়ে সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা অবশ্য আকাশচুম্বী নয়, সাধারণ। তারা পোলাও-মাংসের স্বপ্ন দেখে না। তারা মোটামুটি পেট ভরে খেতে পারলেই খুশি। কাজের নিশ্চয়তা, চিকিৎসা সেবা সহজে পাওয়া, মাথার ওপর একটু ছাউনি থাকলেই তারা বর্তে যায়। এ বিষয়গুলোর প্রতি সরকারের নজর থাকলে মানুষ খুশি হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশের সাধারণ মানুষের সাধারণ আশা-আকাক্সক্ষাগুলো পূরণে অত্যন্ত আন্তরিক বলেই মনে হয়। আমাদের বড় শত্রু দারিদ্র্য। তাই দারিদ্র্য দূর করার লক্ষ্য ও পরিকল্পনা সরকারের আছে। দারিদ্র্য পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। তবে দেশে আয় এবং ধনবৈষম্যও বাড়ছে।

দেশের উন্নয়ন-অগ্রগতির ক্ষেত্রে আরেকটি বড় সমস্যা দুর্নীতি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি ঘোষণা করেছেন। তবে বললেই বা নীতি ঘোষণা করলেই দেশ রাতারাতি দুর্নীতিমুক্ত হয়ে যাবে বলে মনে করা ঠিক নয়। দুর্নীতি একটি দুরারোগ্য সামাজিক ব্যাধি। এই ব্যাধি নিরাময়ের জন্যও দরকার ধারাবাহিক কঠিন চিকিৎসা। দেশে যে দুর্নীতি আছে, সেটা কেউ অস্বীকার করতে পারবেন না। সম্প্রতি একজন পুলিশ কর্মকর্তা এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের একজন পরিচালকের ঘুষ লেনদেনের ঘটনা ব্যাপকভাবে আলোচনায় এসেছে। তবে এটা একটি ঘটনা মাত্র। দুর্নীতিমুক্ত কোনো খাত খুঁজে পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না।

তবে দুর্নীতি দমন কমিশন এবং পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের দুর্নীতি সংশ্লিষ্টতার খবর এ কারণেই উদ্বেগের যে, তাদের ওপরই দুর্নীতি দমনের ভার ন্যস্ত। যারা রক্ষক তারা ভক্ষকের ভূমিকায় নামলে মানুষ প্রতিকার পাওয়ার আশা হারিয়ে ফেলে। বিষয়টি নিয়ে গত ১২ জুন সংসদে কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রশ্নোত্তর পর্বে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনেকে দুর্নীতির ব্যাধিতে আক্রান্ত বলে জনশ্রæতি আছে, এ কথা একেবারে মিথ্যা নয়। সবাই শতভাগ সৎ হবেন, এমন নিশ্চয়তা কেউ দিতে পারবেন না’। প্রধানমন্ত্রীর এই কথার মধ্যে কি দুদকের দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়ার কোনো ইঙ্গিত আছে? না। প্রধানমন্ত্রী বরং বলেছেন, এই সংস্থাকে এখন থেকে সচেতন হতে হবে। যারা এই সংস্থায় কাজ করেন তাদের তাদের ব্যাপারে সংস্থাটির সতর্ক থাকতে হবে। ঘুষ দেয়া এবং নেয়া- দুটিকেই অপরাধ হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, শুধু ঘুষ নিলে তাকে ধরা হবে, তা নয়। যে ঘুষ দেবে তাকেও ধরা হবে। ঘুষ দেয়াটাও অপরাধ। ঘুষ যে দেবে এবং নেবে উভয়ই অপরাধী। সেভাবেই বিচার করতে হবে। অপরাধ যারা করছে আর অপরাধে যারা উসকানিদাতা, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

প্রধানমন্ত্রী সংসদে আরো বলেছেন, সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছে। দুর্নীতি প্রতিরোধে দুদককে শক্তিশালী করা, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা এবং তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দুর্নীতির পরিধি ক্রমান্বয়ে শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনার সরকারের বিশেষ পরিকল্পনার কথাও প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন। দেশে কোথায় কি ঘটছে তার সব খোঁজখবরই প্রধানমন্ত্রী রাখেন। তাকে এটা রাখতে হয়। এটা যেমন ভালো, তেমনই এর খারাপ দিকও আছে। প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ বা উদ্যোগ ছাড়া এখন কোনো কাজই আর হতে চায় না। তার ওপর এই অতিনির্ভরতা সরকারের কাজকর্মের গতিশীলতা কমিয়ে আনতে পারে। সম্প্রতি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারকে নিয়ে যে ঘটনা ঘটেছে তা একেবারেই কাম্য ছিল না। বিষয়টি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী নিজেই বলেছেন, এই রমজানে তিনি যখন দেশের বাইরে ছিলেন তখন বেশ কিছু জায়গায় একজন কর্মকর্তা হাত দিয়েছিলেন বলে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে হঠাৎ একটা ব্যবস্থা নেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিষয়টি গ্রহণযোগ্য মনে না হওয়ায় তিনি ওই কর্মকর্তাকে তার পদে বহাল রাখার নির্দেশ দেন।

এখন প্রশ্ন হলো, অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার সরকারি নীতি বাস্তবায়ন করতে যাওয়ায় মঞ্জুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারকে কে বা কারা বদলির নির্দেশ নিয়েছিলেন? এটা নিশ্চয়ই কোনো জুনিয়র অফিসারের একক সিদ্ধান্তে হয়নি। কে বা কারা এটা করলেন? প্রধানমন্ত্রী দেশে ছিলেন না, কিন্তু সংস্থাপন প্রতিমন্ত্রী দেশে ছিলেন, ছিলেন মন্ত্রিসভার অন্য সদস্যরা। কাউকে কিছু না জানিয়ে একজন কর্মকর্তাকে রাতারাতি বদলির নির্দেশ যে বা যারা দিয়েছিলেন, তারা যে সরকারের ভেতরে থেকেই সরকারের নীতির বিরুদ্ধে কাজ করেছেন, সেজন্য কি তার বা তাদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া উচিত নয়? প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘সাধারণ ছোটখাটো প্রতিষ্ঠান হলে ধরা যাবে, বড় অর্থশালী হলে ধরা যাবে না, এটা হয় না। অপরাধী অপরাধীই’। প্রধানমন্ত্রীর এই স্পষ্ট বার্তা মন্ত্রী এবং শীর্ষ সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা উচিত।

বিভুরঞ্জন সরকার : যুগ্ম সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়।

মুক্তচিন্তা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj