পাকিস্তানকে গুঁড়িয়ে জয়ে ফিরল অজিরা

বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০১৯

খেলা প্রতিবেদক : আনপ্রেডিক্টেবল ‘তকমা’ আবারো প্রমাণের সুযোগ পেয়েও কাজে লাগাতে পারেনি পাকিস্তান। অন্যদিকে আগের ম্যাচে ভারতের বিপক্ষে হারের ক্ষত পাকিস্তানকে দিয়ে শুকিয়ে নিয়েছে ৫ বারের বিশ^ চ্যাম্পিয়নরা। গতকাল টনটনে অস্ট্রেলিয়া ৪১ রানে পাকিস্তানকে হারিয়ে ৪ ম্যাচ থেকে ৬ পয়েন্ট নিয়ে নিউজিল্যান্ডের সঙ্গে যৌথভাবে টেবিলের শীর্ষস্থানে অবস্থান করছে। এক ম্যাচ কম খেলা কিউইরা আজ ভারতের বিপক্ষে নিজেদের চতুর্থ ম্যাচে মাঠে নামছে। অজিদের বিপক্ষে পাকিস্তান হারলেও ম্যাচটি বেশ উপভোগ্য ছিল। অ্যারন ফিঞ্চ বাহিনীর ৩০৭ রানের জবাবে খেলতে নেমে ২০০ রানে ৭ উইকেট হারিয়ে ব্যাকফুটে চলে যাওয়া পাকিস্তানকে ম্যাচ জয়ের রঙিন স্বপ্ন দেখাচ্ছিলেন ওয়াহাব রিয়াজ। অজিদের নাগাল থেকে ম্যাচ বের করতে প্রয়োজন ১০৮ রান। চার-জয় হাঁকিয়ে প্রতিপক্ষের শিবিরে ভীতি জাগিয়ে তোলেন এ পেসার। অষ্টম উইকেটে অধিনায়ক সরফরাজ আহমদের সঙ্গে ৬৩ বলে ৬৪ রানের অবিশ^াস্য এক জুটি গড়ে তুলে ম্যাচ অনেকটাই হাতের নাগালে নিয়ে আসেন। মনে হচ্ছিল, পাকিস্তানই জিতে যাবে শেষ পর্যন্ত। ম্যাচ নাটকীয় মোড় নেবে এমন সময় ৪৫তম ওভারে এসে ওয়াহাব-সরফরাজ জুটিতে ফাটল ধরান মিচেল স্টার্ক। তার দুর্দান্ত এক ডেলিভারি উইকেটরক্ষকের হাতে গেলে আবেদন করেছিলেন অস্ট্রেলিয়ান খেলোয়াড়রা, কিন্তু আম্পায়ার তাতে সাড়া দেননি। পরে রিভিউ নিয়ে জিতে যায় অজিরা। দেখা যায় বল লেগেছে ওয়াহাবের ব্যাটে।
৩৯ বলে ২ বাউন্ডারি আর ৩ ছক্কায় ৪৫ রান করা ওয়াহাব ফেরারপর আর কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারেনি ইমরান খানের উত্তরসূরিরা।
টনটনের পেসবান্ধব উইকেটে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসে ১০ উইকেট পেয়েছিলেন পেসাররা। মোহাম্মদ আমির একাই নিয়েছেন ৫ উইকেট। ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ^কাপ খেলতে নেমে পেসার আমির রীতিমতো আগুন ঝরাচ্ছেন বোলিংয়ে। নতুন এক কীর্তিও গড়ে ফেললেন তিনি অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। ওয়ানডে ক্রিকেটের সবচেয়ে সফল দলটির বিপক্ষে বিশ^কাপে পাকিস্তানের প্রথম বোলার হিসেবে ৫ উইকেট প্রাপ্তির রেকর্ড গড়ছেন টনটনের ম্যাচে। অথচ ইংল্যান্ড ও ওয়েলসের বিশ^কাপে সুযোগ পাবেন কিনা আমির, সেই সংশয় ছিল প্রবল। বিশ^মঞ্চে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ওয়াসিম আকরাম-ইমরান খানরা যা পারেননি, সেটাই করে দেখালেন ২৭ বছর বয়সী এই তারকা।
গতকাল বিশ^কাপে পাকিস্তানের সপ্তম বোলার হিসেবে ৫ উইকেট পাওয়ার আনন্দে মেতেছেন আমির। এই প্রাপ্তিতে যোগ দিয়েছেন তিনি আকরাম, শহীদ আফ্রিদি, সাকলাইন মুশতাক, আব্দুল কাদির, ওয়াহাব রিয়াজ ও সোহেল খানের সঙ্গে। তবে একটা জায়গায় তাদেরও ছাড়িয়ে আমির। বিশ^কাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এদের কেউই পাননি ৫ উইকেট, যা করে দেখিয়েছেন বাঁহাতি এ পেসার।
বিশ^কাপে অজিদের বিপক্ষে পাঁচবারের সাক্ষাতে আকরামের উইকেট সংখ্যা ১০, অন্যদিকে ৪ ম্যাচ খেলা ইমরান নিয়েছেন ৯ উইকেট। এরপরও তারা একবারও পাননি ৫ উইকেট। এতদিন বিশ^মঞ্চে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে এক ইনিংসে সেরা সাফল্য ছিল আকরামের। কিংবদন্তি এই পেসারের বোলিং ফিগার ছিল ৪০ রানে ৪ উইকেট। টনটনে গতকাল তাকে ছাড়িয়ে গেছেন আমির। ৩০ রানে নিয়েছেন ৫ উইকেট।
আমিরের আনন্দটা আরো বেশি হওয়ার কারণ বিশ^কাপে ৩ ম্যাচে ১০ উইকেট নিয়ে এখন পর্যন্ত সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি বোলারেও পরিণত হয়েছেন তিনি। পাকিস্তানের বিপক্ষে ১০৭ রানের নান্দনিক ইনিংস খেলায় ম্যাচসেরা হন ডেভিড ওয়ার্নার। শনিবার কেনিংটন ওভালে শ্রীলঙ্কার মোকাবেলা করবে অস্ট্রেলিয়া। রবিবার ওল্ড ট্রাফোর্ডে ভারতের মুখোমুখি হবে পাকিস্তান। ক্রিকেটপ্রেমীরা দুই পড়শির এই দ্বৈরথ দেখার অপেক্ষায় দীর্ঘদিন ধরে পথ চেয়ে রয়েছে। বিশ^কাপে এখনো ভারতের বিপক্ষে জিততে পারেনি পাকিস্তান।
ইংলিশ কন্ডিশন মানেই পেসারদের দাপট। তাই পাকিস্তানের বিশ^কাপ স্কোয়াডে মোহাম্মদ আমিরের নাম থাকাটা এক প্রকার নিশ্চিতই ছিল। অথচ সবাইকে বিস্মিত করে আমিরকে বাদ দিয়েই দ্বাদশ বিশ^কাপের জন্য ১৫ সদস্যের চ‚ড়ান্ত দল ঘোষণা করে ১৯৯২ সালের বিশ^ চ্যাম্পিয়নরা। তাই এবারের বিশ^কাপটা খেলারই কথা ছিল না আমিরের। কিন্তু বিশ^কাপের আগে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সিরিজে পেসার জুনাইদ খানের ব্যর্থতায় আমিরের কপাল খোলে। শেষ মুহূর্তে এসে জুনাইদের পরিবর্তে আমিরকে বিশ^কাপ দলে জায়গা দেয় পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড। আর আস্থার প্রতিদানটা গতকাল বেশ ভালোভাবেই দিয়েছেন মোহাম্মদ আমির। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে বিশ^কাপের গতকালের ম্যাচে এই বাঁহাতি পেসার একাই নেন ৫ উইকেট। তবে আমিরের এমন বিধ্বংসী বোলিংয়ের পরও মিকি আর্থারের শিষ্যদের উদ্দেশ্যে চ্যালেঞ্জিং টার্গেট ছুড়ে দিয়েছে অ্যারন ফিঞ্চের নেতৃত্বাধীন অস্ট্রেলিয়া। এক ওভার বাকি থাকতে অলআউট হওয়ার আগে ৩০৭ রান করেছে অজিরা।
টনটনে গতকাল টস হেরে আগে ব্যাটিংয়ে নামে অস্ট্রেলিয়া। শুরু থেকে মোহাম্মদ আমিরকে দেখেশুনে খেললেও পাকিস্তানের অন্য বোলারদের ওপর চড়াও হয়ে ব্যাট করতে থাকেন দুই অজি ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নার ও অ্যারন ফিঞ্চ। আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে শুরুতে ফিফটি তুলে নেন অজি দলপতি। এর ৬ ওভার পর অর্ধশতকের দেখা পান ওয়ার্নার। দুই ওপেনার ব্যাটে ভর করে বড় সংগ্রহের আশা জাগায় অজিরা। একপর্যায়ে মনে হচ্ছিল চারশ ছাড়িয়ে যাবে অজিদের সংগ্রহ। মাত্র ২২ ওভারে পাঁচবারের বিশ^ চ্যাম্পিয়নদের সংগ্রহ দাঁড়ায় ১৪৬ রান। ২৩তম ওভারে বল করতে আসেন আমির। পাকিস্তানি পেসারের আগ্রাসী রূপ দেখেন অজি ব্যাটসম্যানরা। ওই ওভারের প্রথম বলে ফিঞ্চকে হাফিজের ক্যাচ বানান তিনি। এরপর আর কোনো বড় জুটি গড়ে তুলতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। স্টিভ স্মিথ, গেøন ম্যাক্সওয়েল, শন মার্শ এবং ওসমান খাঁজারা ব্যর্থ হন ওয়ার্নার-ফিঞ্চের দেখানো পথে হাঁটতে। আর অস্ট্রেলিয়ার শেষ ৫ ব্যাটসম্যান আউট হন মাত্র ২০ রানের মধ্যেই। মূলত দ্রæত রান তুলতে চাওয়ারই প্রতিদান দিতে হয়েছে তাদের। সেই সঙ্গে আমিরের আগ্রাসী বোলিং তো ছিলই। তার বোলিং তোপের মুখে বেশিক্ষণ ক্রিজে টিকে থাকা সম্ভব হয়নি অস্ট্রেলিয়ার মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যানদের। মার্শ, খাঁজা ও অ্যালেক্স ক্যারিকে নিজের শিকার বানান আমির।
বল টেম্পারিংয়ের দায়ে আরোপিত হওয়া নিষেধাজ্ঞার কারণে এক বছরের জন্য আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে দূরে ছিলেন ওপেনার ডেভিড ওয়ার্নার। তাকে বিশ^কাপ স্কোয়াডে না রাখার পক্ষে ছিলেন অনেকেই। তবে শেষ পর্যন্ত এই বাঁহাতি ওপেনারকে রেখেই বিশ^কাপের চ‚ড়ান্ত স্কোয়াড ঘোষণা করে অস্ট্রেলিয়া। বোর্ডের আস্থার প্রতিদানটা দ্বাদশ বিশ^কাপে বেশ ভালোভাবেই দিচ্ছেন ওয়ার্নার। আগের ৩ ম্যাচের দুটিতে অর্ধশতক হাঁকানো এই ওপেনার গতকাল পেয়েছেন সেঞ্চুরির দেখা। পাকিস্তানের বিপক্ষে এ দিন ১১১ বলে ১১ চার ও ১ ছক্কায় ১০৭ রানের দর্শনীয় এক ইনিংস খেলেন ওয়ার্নার। আরেক ওপেনার ফিঞ্চ খেলেন ৮৪ বলে ৬ চার ও ৪ ছক্কায় ৮২ রানের ঝড়ো এক ইনিংস।
সরফরাজ আহমেদের দলের পক্ষে ৩০ রান খরচায় ৫ উইকেট নেন আমির। আরেক পেসার শাহিন আফ্রিদি নেন ২ উইকেট। এ ছাড়া ১টি করে উইকেট নেন হাসান আলি, ওয়াহাব রিয়াজ ও মোহাম্মদ হাফিজ।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj