বাছিরকাণ্ডে তদন্ত : ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা করা হবে অডিও ক্লিপ

বৃহস্পতিবার, ১৩ জুন ২০১৯

কাগজ প্রতিবেদক : পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত ডিআইজি মিজানুর রহমানের কাছ থেকে দুই দফায় ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নেয়ার অভিযোগ উঠেছে দুদকের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছিরের বিরুদ্ধে। এই অভিযোগ ওঠার পর অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য ফাঁসের অভিযোগে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে দুদক। একই সঙ্গে তিনি ঘুষের টাকা নিয়েছেন কিনা, নিলে সেই টাকা কোথায় আছে, এ বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত চলমান রয়েছে। বিভাগীয় তদন্তে ঘুষ লেনদেনের প্রমাণ পাওয়া গেলে বাছিরকে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করা হবে বলে দুদক সূত্রে জানা গেছে।

সম্প্রতি একটি টেলিভিশনের খবরে ডিআইজি মিজানুর রহমান ও দুদক কর্মকর্তা খন্দকার এনামুল বাছিরের কথোপকথনসহ একটি প্রতিবেদন প্রচার করা হয়। খবর প্রচারের পরপরই ৪০ লাখ টাকা ঘুষ নেয়ার অভিযোগে গত ৯ জুন একটি তদন্ত কমিটি করে দুদক। তিন সদস্যবিশিষ্ট তদন্ত কমিটিতে দুদক সচিব মুহাম্মদ দিলোয়ার বখতকে প্রধান করা হয়। তদন্ত কমিটি ১০ জুন কমিশনে প্রতিবেদন দেয়। সেই প্রতিবেদনে দেয়া সুপারিশের ভিত্তিতে খন্দকার এনামুল বাছিরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। একই সঙ্গে ডিআইজি মিজানুর রহমানের বিরুদ্ধে তদন্তের দায়িত্ব থেকে এই কর্মকর্তাকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। তার স্থলে গতকাল বুধবার নতুন তদন্ত কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন দুদকের আরেক পরিচালক মঞ্জুর মোর্শেদ। তিনি ডিআইজি মিজানের বিরুদ্ধে চলমান অনুসন্ধান শেষ করবেন।

এদিকে এনামুল বাছিরের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্ত সম্পর্কে দুদকের এক কর্মকর্তা বলেন, বাছিরের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে। আমরা গণমাধ্যমে প্রকাশিত অডিও ক্লিপ সংগ্রহ করব। তারপর সেটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার জন্য ফরেনসিক ল্যাবে পাঠাব। ফরেনসিক রিপোর্ট পাওয়ার পরই অডিও ক্লিপের কণ্ঠ বাছিরের কিনা, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে। এরপর আমরা আমাদের প্রতিবেদন কমিশনে উপস্থাপন করব।

তবে ঘুষ নেয়ার বিষয়টি পুরোপুরি অস্বীকার করেছেন সদ্য বরখাস্ত হওয়া দুদকের পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির। তিনি বলেন, আমাকে ফাঁসানো হয়েছে। তিনি (ডিআইজি মিজান) শুধু আমাকেই ফাঁসাননি, এর আগেও অনেককে ফাঁসিয়েছেন।

ডিআইজি মিজানুর রহমান ও খন্দকার এনামুল বাছিরের কথোপকথন থেকে জানা গেছে, দুই দফায় টাকা নিয়েছেন এনামুল বাছির। প্রথম দফায় গত ১৫ জানুয়ারি ২৫ লাখ টাকা নেন তিনি। একটি বাজারের ব্যাগের করে এই টাকা নিয়ে আসেন ডিআইজি মিজানুর। আরো ২৫ লাখ টাকা এক সপ্তাহের মধ্যে দেয়ার জন্য বলেন বাছির। তাতে রাজি হন মিজান। বাকি টাকা ১ ফেব্রুয়ারি লেনদেন হয়। ঘুষ নেয়ার পর টাকা কোথায় রাখবেন, বিষয়টি নিয়েও ডিআইজি মিজানের সঙ্গে পরামর্শ করেন এনামুল বাছির। তখন সাউথ-ইস্ট ব্যাংকে অন্য একজনের অ্যাকাউন্টে টাকা রাখার কথা বলা হয়। শুধু তা-ই নয়, ভবিষ্যতে আরো কারও কাছ থেকে এভাবে ঘুষ নিয়ে যেন অ্যাকাউন্টে রাখতে পারেন, সে ব্যাপারেও কথা হয়।

দুদক কর্মকর্তাকে ঘুষ দেয়া ও সেসবের প্রমাণ রাখা প্রসঙ্গে ডিআইজি মিজানুর রহমান বলেন, লোকটা যখন আমাকে হয়রানি করেছে, টাকা চেয়েছে, তখন আমি আমার সেফটির কথা ভেবে এটা করেছি। তিনি যে দুর্নীতিবাজ, তা প্রমাণ করার জন্য আমি এটা করেছি। দুদক একের পর এক হয়রানি করেছে অভিযোগ করে পুলিশের এই ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, আমি বাংলাদেশের নাগরিক। আমি তো তাদের কাছে কোনো ফেবার চাইনি। আমি আইনগত সহায়তা চেয়েছি। আমি এখনো বলছি, আগেও বলেছি। আমার ফাইলের বাইরে কিছু থাকলে অবশ্যই আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন। আমার ভাইয়ের প্রপার্টির জন্য আমি দায়ী নই। যার যার ফাইলের জন্য সে সে দায়ী। আমি শুধু তাদের কাছে ল’ফুল হেল্প চাই। আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান, আমার প্রতি যেন কোনো অবিচার করা না হয়।

ঘুষ নেয়া ও ডিআইজি মিজানের সঙ্গে বাছিরের কথোপকথন সম্পর্কে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ সাংবাদিকদের বলেছেন, ফরেনসিক রিপোর্ট ছাড়া ডিআইজি মিজান ও এনামুল বাছিরের মধ্যে ঘুষ লেনদেনের অডিও ক্লিপের বিশ্বাসযোগ্যতার বিষয়ের মন্তব্য করা মুশকিল। এ বিষয়ে বিভাগীয় তদন্তে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে দুদক পরিচালক এনামুল বাছির ও ডিআইজি মিজানুর রহমানের মধ্যে ঘুষ লেনদেনের যে অভিযোগ উঠেছে তা দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত করে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গত মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে সংস্থাটি বলেছে, তদন্ত কর্মকর্তার দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দুদকের পক্ষে এর দায় কোনোভাবেই এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। একই সঙ্গে ঘুষ লেনদেনে জড়িত পুলিশ কর্মকর্তার সব অনিয়মের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়ার দায়ও পুলিশ প্রশাসনের পাশাপাশি দুদকের বলে মন্তব্য করেছে সংস্থাটি।

উল্লেখ্য, এক নারীকে জোর করে বিয়ে ও নির্যাতনের অভিযোগে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনারের পদ থেকে মিজানকে প্রত্যাহার করে পুলিশ সদর দপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। এরপর তার বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ করা হয়। সে অভিযোগে একই বছরের ৩ মে মিজানুর রহমানকে জিজ্ঞাসাবাদ করে দুদক। ওই সময় অভিযোগের অনুসন্ধান কর্মকর্তা ছিলেন উপ-পরিচালক ফরিদ আহমেদ পাটোয়ারী। পরবর্তী সময়ে অনুসন্ধানের দায়িত্ব পান পরিচালক খন্দকার এনামুল বাছির।

প্রথম পাতা'র আরও সংবাদ
Bhorerkagoj